প্রেমের মড়া

প্রেমের মড়া

শায়লা এবং তুহিনের ছোট্ট সাজানো গোছানো সংসার। ঘর ভর্তি প্রচুর আসবাবপত্র না থাকলেও অভাব নেই এ কথা বলা চলে। আসলে তাদের দুজনই এক নীতিতে বিশ্বাসী- নিজের যতটুকু প্রয়োজন তার বেশী কিছুর প্রতি আগ্রহ বা লোভ না থাকলেই জীবনে শান্তিতে থাকা যায়।

কিন্তু বিয়ের পরবর্তী কয়েকমাস বেশ স্বর্গীয় সুখে কাটলে ধীরে ধীরে কেন জানি তাদের সংসারে অভিশাপের কালো ছায়া নেমে আসে। যেন কোথাও সুর এবং ছন্দের গড়মিল দেখা দেয়। দুজনের কেউই আর আগের মতন আকর্ষণ বোধ করে না। হোক তা শারীরিকভাবে কিংবা মানসিকভাবে। সংসার অতিরিক্ত ঝোলে ডুবে থাকা তরকারির মতন কেমন যেন পানসে মনে হয়।

এদিকে তুহিন নীলা নামের এক মেয়ের সাথে পরকীয়া প্রেমে লিপ্ত হয়েছে। সে তুহিন যে ব্যাংকে চাকরি করে, সেখানেই কাজ করে। কিন্তু তুহিন শায়লাকে কোনোভাবেই তার এই অবৈধ সম্পর্কের ব্যাপারে জানতে দেয়নি। সে খুব চাতুরতার সাথে দুই নারীর সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তুহিন এখন নিজের স্ত্রীর চেয়ে পরনারী নীলার সাথেই বেশী বেশী দৈহিক সম্পর্কে জড়াচ্ছে।

শায়লার দেহ তার কাছে পুরনো মনে হয়; যেন পরিত্যেক্ত কোনও বাড়ি, যেখানে নতুন করে কিছু আবিস্কার করার নেই, যে বাড়ির প্রতিটি কোণা, প্রতিটি স্তরে সে বহুবার গমন করে করে ক্লান্ত। শায়লাও তুহিনের বিষয়ে একই রকম চিন্তা করে কি না তুহিনের সেসব নিয়ে ভাবার কোনও অবকাশই নেই! সে যে হাতে নতুন স্বর্গ পেয়েছে! বর্তমানে এই স্বর্গেই তার প্রশান্তিময় সময় অতিবাহিত হচ্ছে।

কিন্তু সব দুঃখের যেমন ইতি আছে, তেমনি সব সুখেরও পরিসমাপ্তি অনিবার্য। পৃথিবীতে কোনও কিছুই চিরস্থায়ী নয়। প্রতি সেকেন্ডে সূক্ষ্ম হতে বৃহৎ পরিসরে পরিবর্তন ঘটে চলেছে অবিরত। শায়লাও তুহিনের মতন ধীরে ধীরে এক অন্য শায়লায় পরিণত হতে শুরু করেছে। সে আসাদ নামের একজন ট্যাক্সি চালকের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছে।

আসলে আসাদের সাথে সম্পর্কে জড়ানোর কোনও ইচ্ছেই ছিল না শায়লার। কিন্তু একদিন মার্কেট থেকে বাসায় ফেরার পথে কিভাবে কিভাবে যেন সে আসাদের সাথে কথার জালে জড়িয়ে পড়ে। আসাদের কথার জাদুতে সে চমৎকৃত হয়; তার যে বিষয়টি শায়লার সবচেয়ে বেশী ভালো লাগে তা হচ্ছে এই যে আসাদ কোনও সাধু বাবার মতন শায়লার মন মানসিকতা খুব ভালো করেই বোঝে। সে তাকে সময় দেয়, তার সাথে কথা বলে, পার্কে বেড়াতে নিয়ে যায় ইত্যাদি।

এখনও পর্যন্ত শায়লা এবং আসাদের সম্পর্কটা কেবলই মানসিক পর্যায়ে রয়েছে; এখনও দুটি দেহ এক হয়নি। তবে দুজনই পাপ পুণ্যের হিসেব না করে যে সেই দৈহিক পুলকের রাজ্যে বিচরণ করতে উন্মুখ হয়ে আছে সে কথা বলাই বাহুল্য!

একদিন তুহিন ব্যাংক থেকে বাসায় ফেরার পথে শায়লাকে আসাদের সাথে একটি পার্কে বসে বাদাম খেতে দেখে। প্রথমে দৃষ্টিভ্রম ভেবে শিকারি বাঘের মতন অতি সাবধানে কিছুটা নিকটে গিয়ে নিশ্চিত হয় যে মেয়েটি আর কেউ নয় তার স্ত্রী শায়লা। এ দৃশ্য দেখার পর তার মনে হয় কেউ যেন গরম খুন্তি দিয়ে তার পিঠে ছেঁকা দিয়েছে!

তুহিন নিজে যে অবৈধ সম্পর্কে ইতোমধ্যে জড়িয়ে আছে সেটা ভেবে শায়লার প্রতি তার বিন্দুমাত্র সহানুভূতি জন্মে না। বরং তার মনে একটু একটু করে জমা শ্যাওলার মতন ঘৃণা জমতে থাকে। সে একটিবারের জন্যও নিজের পাপের জন্য ক্ষমা চাওয়া বা প্রায়শ্চিত্ত করার কথা না ভেবে কিভাবে তার কূলটা ও ব্যভিচারি বউকে শায়েস্তা করা যায় সেটা নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

শায়লা ঘরে ফিরে; তার হাতে সবজির থলে। সে চালাকি করে সবজি কিনে এনেছে যাতে কেউ সন্দেহ করতে না পারে; লোকে দেখলে ভাববে যে সে সবজি কিনতে বাজারে গিয়েছিল। কিন্তু অঘটন যা ঘটার তা তো ঘটেই গেছে! নেকড়ের মতন ক্রোধে উন্মত্ত তুহিন গড়গড় করে বলে,

– কোথায় গিয়েছিলে?

– বাজারে। দেখতেইতো পাচ্ছ যে সবজি কিনতে গিয়েছিলাম।

– সবজি কিনতে গিয়েছিলে নাকি প্রেমিকের সাথে ফষ্টিনষ্টি করতে গিয়েছিলে?

– মানে? কি বলো এসব আবোলতাবোল? তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে নাকি?

– মাথা আমার খারাপ হয়নি, তোমার খারাপ হয়েছে। নিজের স্বামী থাকতে পরপুরুষের সাথে সম্পর্কে জড়াতে তোমার লজ্জা করে না?

– দেখো, মুখ সামলে কথা বলো! এভাবে মিথ্যা অপবাদ দেবে না আমাকে! কি প্রমাণ আছে তোমার কাছে?

– আমি একটু আগে তোমাকে একজনের সাথে পার্কে দেখলাম! এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে?

এ কথার শোনার পর শায়লা আর কোনও কথা না বাড়িয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। ঐদিন তুহিন এবং শায়লা কেউ কারো মুখের দিকে তাকায় না। দুজন দুজনকে এতোটাই ঘৃণা করতে থাকে যেন যুদ্ধের ময়দানে তারা দুই প্রতিপক্ষ! রাতে তুহিন বালিশ নিয়ে সোফা সেটে ঘুমাতে যায়। সারারাত তুহিন এবং শায়লা দুজনই স্বগতোক্তি করে কাটিয়ে দেয়।

সকালে তুহিন নাস্তা না করেই কোনও কথা না বলে ব্যাংকের দিকে রওনা হয়। এদিকে তুহিন ঘর থেকে বের হতে না হতেই শায়লা আসাদের কাছে চলে যায়। সে তুহিনের ব্যাপারে সবকিছু খুলে বলে। আসাদ বলে,

– চলো বিয়ে করে ফেলি!

– বললেই হলো?

– কেন, সমস্যা কি? মিয়া বিবি রাজি তো কেয়া কারেগা কাজি?

– যেহেতু আমি এখনও আইগতভাবে তুহিনের স্ত্রী তাই তালাক না হওয়া পর্যন্ত বৈধভাবে বিবাহ বন্ধনে জড়ানো সম্ভব নয়।

– হুম, এটাতো মাথায়ই আসেনি! তাহলে তুমি তাকে তালাক দিয়ে দাও।

– তালাক দিতে গেলেও অনেক ঝামেলা আছে। এখন তোমার আমার সম্পর্কের কথা শুধুমাত্র তুহিন জানে কিন্তু তালাকের প্রসঙ্গ উঠলেই দুই পরিবারের সবাই জানবে, পাড়া প্রতিবেশীরাও এসব নিয়ে কানাঘুষা করবে, তাছাড়া কে জানে তুহিন হয়তো বিষয়টিকে কোর্ট পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে! তখনতো কোর্টে হাজিরা দিতে দিতেই জীবন পার হয়ে যাবে!

– ধুর! তুমি একটু বেশীই চিন্তা করছো! সব দুশ্চিন্তা আমার উপরে ছেড়ে দাওতো!

– “ছেড়ে দাও” বললেই হয়ে গেলো! তোমার কাছে কি কোনও সমাধান আছে নাকি?

– আপাতত নেই তবে সমাধান করতে কতক্ষণ বলো?

ঐদিন শায়লা আসাদের সাথে আর বেশীক্ষণ সময় না কাটিয়ে ঘরে ফিরে যায়। কারণ যদি তুহিন কোনও কারণে দ্রুত বাড়ি ফিরে আসে তবেতো কারবালার যুদ্ধ লেগে যাবে! ইতোমধ্যে আসাদ শায়লার সাথে চিরতরে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হবার জন্য এক মারাত্মক সমাধানের দিকে ধাবিত হয়। সে গভীর রাতে রাস্তার একজন ভাসমান বেশ্যাকে খুন করে তার গায়ে শায়লার পোশাক পরিয়ে দেয়। আগের দিন শায়লার কাছ থেকে আসাদ একটি ড্রেস চেয়ে নিয়েছিল। প্রথমে বেশ অবাক হলেও পরে শায়লা তাকে একটি পোশাক দেয়। বেশ্যার শারীরিক গঠন, উচ্চতা, গায়ের রং ইত্যাদি শায়লার সাথে মিলে যায় বলেই আসাদ তাকে হত্যার জন্য বেছে নেয়। বেশ্যার মুখ দেখে যাতে তার পরিচিতি বোঝা না যায় সে জন্য একটি ধারালো অস্ত্র দিয়ে আসাদ মেয়েটির দেহ থেকে মাথাটি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে সেটি নদীতে ছুঁড়ে ফেলে। তার প্ল্যান হচ্ছে এই যে পুলিশ যখন লাশ এবং খুনের ব্যাপারে তদন্ত শুরু করবে, তখন যেন মৃতদেহ দেখে মনে হয় যে এটা শায়লার দেহ।

আসাদ শায়লাকে নিয়ে সিলেট শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়; এখন তারা সুনামগঞ্জে আছে। দুজনেই কাজি অফিসে গিয়ে বিয়ে করেছে। সিলেটে তুহিন পুলিশের দ্বারস্থ হয়ে তার স্ত্রী নিখোঁজ এই মর্মে একটি সাধারণ ডায়রি করেছে। দুইদিন পর পুলিশ তুহিনকে সেই লাশটি দাখিয়ে শনাক্ত করতে বললে সে মস্তকবিহীন মেয়েটির গায়ের পোশাক দেখে নিশ্চিত হয় যে লাশটি তার স্ত্রীর শায়লারই।

বছর ঘুরতে না ঘুরতেই একদিন তুহিন তার ব্যাংকের সহকর্মীদের সাথে সুনামগঞ্জে বেড়াতে যায়। সেখানে একটি দোকানে সে শায়লাকে দেখতে পায়। কাউকে কিছু না বলে সে চুপিসারে ছায়ার মতন তাকে অনুসরণ করতে থাকে। শায়লাইতো! সেই চোখ, সেই মুখ! তাহলে নিজের স্ত্রী ভেবে নিজ হাতে কাকে কবর দিলো সে? এই ভাবনাটি তুহিনের পা হতে মাথা পর্যন্ত একটি বৈদ্যুতিক প্রবাহ ছড়িয়ে দিয়েছে যেন! সে আবারও ভাবে- এই মেয়েটি হয়তো শায়লার মত দেখতে, হয়তো শায়লা নয়!

কিন্তু যদি সে তুহিনের হারানো স্ত্রী হয়ে থাকে! তার মন মানে না। সে কোনও কথা না বলে মেয়েটিকে গোয়েন্দার মতন অনুসরণ করে। এভাবে অনুসরণ করতে করতে এক পর্যায়ে তুহিন মেয়েটির বাসা খুঁজে পায়। আর একটুও সময় নষ্ট না করে সে সিলেটের সেই পুলিশ কর্মকর্তাকে ফোন করে যিনি নিখোঁজ শায়লাকে খোঁজার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। সেদিনই সেই পুলিশ কর্মকর্তা এসে শায়লার বাসা থেকে তাকে সিলেটে নিয়ে আসেন। পুলিশ কর্মকর্তা তাকে প্রশ্ন করেন,

– তোমার নাম কি?

– আমার নাম মিতু জাবের।

– তুমি কি বিবাহিতা?

– জি।

– তোমার স্বামীর নাম?

– আসাদ জাবের।

– তোমার স্বামীকেতো ঘরে দেখলাম না; সে কোথায়?

– তিনি কয়েকদিনের জন্য ঢাকায় গেছেন।

– ঢাকায় সে যেখানে গেছে সেই জায়গার ঠিকানা এই কাগজে লিখে দাও।

– ঢাকায়তো তার কোনও আত্মীয় নেই!

– তাহলে কোথায় থাকে?

– সেখানে গেলে সাধারণত কোনও হোটেলে উঠে।

– ঠিক আছে, তার ফোন নাম্বারটা লিখে দাও।

– জি, দিচ্ছি।

– তুমি এই লোকটিকে চেনো? তুহিনকে শায়লার মুখোমুখি করে পুলিশ কর্মকর্তা প্রশ্ন করেন।

– জি না।

তুহিন বাইরে এসে উত্তেজিত হয়ে পুলিশ কর্মকর্তাকে বলে,

– এ আমার শায়লা অফিসার সাহেব! একই চেহারা, একই কণ্ঠ! এতো কিছুতো আর কাকতালীয় হতে পারে না, তাই না?

– হুম, আপনার কাছ থেকে নেয়া আপনার স্ত্রীর ছবির সাথে এই মেয়েটির হুবহু মিল দেখতে পাচ্ছি। নিশ্চয়ই সে অনেক কিছু লুকাচ্ছে। একবার যদি ঐ ক্রিমিনাল আসাদকে ধরতে পারি, তাহলে মামলাটি পানির মতন পরিষ্কার হয়ে যাবে!

আসাদ তার প্রতিবেশী কারো কাছ থেকে খবর পেয়েছে যে সুনামগঞ্জে তার বাসায় পুলিশ এসে স্ত্রীকে নিয়ে গেছে। তখন থেকেই আতংকে সে তার মোবাইল ফোন বন্ধ করে রেখেছে। এদিকে পুলিশ কর্মকর্তা যখন শায়লাকে বলেন যে আসাদ একটি বেশ্যাকে খুন করে পালিয়েছিল, তখন তার পায়ের নীচের মাটি সরে যায়। সে কখনো স্বপ্নেও ভাবেনি যে আসাদ তাকে পাবার জন্য এতো নৃশংস একটি কাজ করে বসবে। শায়লা সাথে সাথেই স্বীকার করে যে সেই শায়লা। সে তার পাপের জন্য চরমভাবে অনুতপ্ত। দেরিতে হলেও সে এই চিরন্তন সত্যটি উপলব্ধি করতে পেরেছে যে পাপের ফল কখনোই ভালো হয় না। জামিনে বের হবার পর কলঙ্ক থেকে বাঁচার জন্য শায়লা আরেকটি ভুল পথ বেছে নেয়; সে বিষপানে আত্মহত্যা করে।

গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত