ভিন্নতা

ভিন্নতা
বিয়ের ৫ বছরের মাথায় আমি জানতে পারলাম আমি কখনো মা হতে পারবো না।এই নিউজ শুনে আমার পুরো পৃথিবি থমকে গেলো।কিন্তু আমার স্বামী আয়াজ এবং আমার শাশুড়ি মায়ের মধ্যে তেমন একটা পরিবর্তন দেখতে পেলাম না।তারা এই ব্যাপারটা কিভাবে নিয়েছে এটা তাদের দেখে বুঝা যাচ্ছে না।
আমি ইরা। আমার আর আয়াজের প্রেমের সম্পর্ক ছিলো ৪ বছরের। তারপর আমাদের বিয়ের ৫ বছর।একে অপরকে খুব ভালোবাসি আমরা। কিন্তু আমার এখন মনে হচ্ছে আমি আয়াজকে হারিয়ে ফেলবো।আয়াজের বরাবরই বাচ্চাদের প্রতি অসম্ভব টান কাজ করে।আর সেই মানুষটাকে আমি বাবা হওয়ার সুখ দিতে পারবোনা ভাবতেই কান্না পাচ্ছে আমার।নিজে বড্ড অপরাধী মনে হচ্ছে আমার।আয়াজের দিকে তাকাতে পারছিনা আমি।
বারান্দায় দাড়িয়ে কথা গুলো ভাবছিলাম।তখনি আয়াজ পেছন থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। “কি ভাবছেন এতো?” আমি আয়াজকে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে ফেললাম।আমাকে মাফ করে দাও প্লিজ। আমি জানতাম না যে আমি কোনো দিনো মা হতে পারবোনা।তুমি আমাকে ছেড়ে দিবে না তো বলো।আয়াজ আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। “আরে বোকা মেয়ে এগুলো কি আবোলতাবোল বলছো?।আর বাচ্চা তো আল্লাহর হাতে। আল্লাহ না দিতে চাইলে আমরা কিভাবে পাবো।” আয়াজের কথা কিছুটা শান্ত হলাম।কিন্তু মন থেকে ভয় দূর করতে পারলাম না।প্রচন্ড ভয় লাগছে। রাতে আমি আয়াজের বুকে শুয়ে আছি।আয়াজ আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।আমি ঘুমাতে চেষ্টা করলেও কেমন যেনো ছটফট করছি।এক অজানা ভয় আমাকে ঘিরে ধরেছে।
এভাবেই দুদিন পার হয়ে যায়। বাসার সবাই আমার সাথে নরমাল ব্যাবহার ই করছে।এমন কি আয়াজও।সবার ভাব এমন কিছুই ঘটেনি।কিন্তু আমার মাঝে আমি এক অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করি।আমার মধ্যে আয়াজকে নিয়ের সন্দেহের বাসা বাঁধতে থাকে।আমার খালি মনে হয় আয়াজ যদি আমাকে ছেড়ে অন্য কারো কাছে চলে যায়।কেনোনা আমি যে অপূর্ণ।আমাদের সম্পর্কের পূর্ণতা দেয়ার সাধ্য যে আমার কাছে নেই।দিন রাত নামাযে বসে কান্নাকাটি করি যে আল্লাহ আমার সাথে এমন কেন করে। বিকেলে শাশুড়ীর রুমে যেতেই শুনতে পাই সে কারো সাথে কথা বলছে।আমাকে দেখেই ফোনটা কেটে দিলো।আমার মনে হলো সে আমার থেকে কিছু লুকাচ্ছে।সে কি আয়াজের বিয়ে দিতে চায়? আমাকে তাড়িয়ে দিতে চায়? ভাবতেই আৎকে উঠলাম।আবার পরক্ষণেই মনে হলো যে না সে একজন ভালোমানুষ।আর আমাকে মেয়ের মতোই ভালোবাসে।কিন্তু আবার ভাবলাম সে তো আগে তার ছেলের টা দেখবে।তার একমাত্র ছেলে তারও তো শখ আহ্লাদ হয় নাতি নাতনিদের সাথে খেলার।মা আমাকে দেখতে পেয়ে তার কাছে বসতে বললেন।আমি তার পাশে যেয়ে বসলাম।
“তোমরা এহনকার যুগের মাইয়া হইয়াও চেহারার এই কি হাল বানাইছো? একটু সাইজাগুইজা থাকলেও তো পারো।চুলে তেল দাও না মনে হইলো কয় যুগ ধইরা?আহো আমি তোমারে তেল দিয়া দেই।” মায়ের কথায় আমার মনে পরলো আসলেই তো আমি আয়না দেখিনা বহুদিন হয়েছে।আজ ভাবছি একটু সাজবো।আয়াজ আমার সাজগুজ অনেক পছন্দ করে।আমি রুমে এসে গোসল দিয়ে সুন্দর আকাশী একটা শাড়ি পরলাম।চুল গুলো হাত খোপা করলাম।ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপ্সটিক।আর ছোট একটা টিপ।আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম।শাশুড়ী মা দেখেও অনেক প্রসংশা করলেন।আমি তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।বিকেল গড়িয়ে সন্ধা হলো তার আসার নাম নেই।ফোন দিলাম সেটাও রিসিভ হলো না।দেখতে দেখতে রাত ১১ টা বেজে গেলো।তখনি কলিংবেলের আওয়াজ শুনে দৌড়ে গেলাম।ও এসেছে।মায়ের সাথে কিছু একটা নিয়ে কথা বলছে তাই আমি আর ডিস্টার্ব না করে রুমে চলে এলাম।
আয়াজ রুমে এসে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো আমার দিকে একটাবারের জন্যও তাকালো না। প্রায় আধা ঘন্টা পর বের হলো। আমাকে চা দিতে বলে সে মায়ের রুমে চলে গেলো।বাবার সাথে কি যেনো কথা আছে। আমার কেমন যেনো ভয় হতে লাগলো।তার সাথে রাগ ও হলো প্রচন্ড।ভয় রাগ মিলিয়ে এক মিশ্র অনুভূতি সৃষ্টি হলো।নিজের ভিতর যে অশান্তি চলছে তা কাউকে বুঝাতে পারলাম না। প্রায় ১২ঃ৩০ এর দিকে আয়াজ রুমে এলো। আয়াজকে দেখেই আমি চিৎকাড় সুরু করে দিলাম।অতিরিক্ত ভয়ে আমি বিবেকবোধ সব হারিয়ে ফেলেছিলাম।আয়জাকে যা ইচ্ছে তাই বলতে লাগলাম। “আমাকে এখন ভাল্লাগেনা তাইনা? আমি তো অপয়া।তাই তো তোমরা মিলে আমাকে বের করে দেওয়ার সরযন্ত্র করছো।তোমাদের ভালো হবে না।আমাকে রেখে এসো আমার বাবার বাড়ি।” অনেক আবোলতাবোল বললাম।একপর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে নিজেই থেমে গেলাম।আয়াজ আমাকে বুকে টেনে নিলো।আমিও শান্ত হয়ে ওর বুকে পরে রইলাম।কখন যে ঘুমিয়ে গিয়েছি নিজেও বুঝিনি।
ঘুমের মধ্যে খুব খারাপ একটা স্বপ্ন দেখে ঘুম বেঙে গেলো।আমি ধরফরিয়ে উঠলাম।উঠে দেখি পাশে আয়াজ নেই।বারান্দার দিকে তাকাতেই দেখতে পেলাম আয়াজ কার সাথে যেনো কথা বলছে। আমি ব্যাপারটা নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামালাম না। এভাবেই দিন যেতে লাগলো।ইদানিং নিজেকে কেমন যেনো বোঝা মনে হচ্ছে।আয়াজের সাথেও কথা বলা কমিয়ে দিয়েছি।প্রায়ই আয়াজকে ফোনে কথা বলতে দেখি আমাকে দেখেই ফোন রেখে দেয়।শাশুড়ী মাও একই কাজ করেন।আমি মনে মনে প্রস্তুত হচ্ছিলাম খুব শীঘ্রই আমার দিন শেষ হয়ে যাবে।আমার হয়তোবা আয়াজের জীবন থেকে চিরজীবনের মতো চলে যেতে হবে।
একদিন শাশুড়ীকে ফোনে বলতে শুনলাম সুন্দর দেখে যেনো মেয়ে খুঁজে।তখন আমি শিওর হয়ে গেলাম আমাকে এবার বিদায় নিতেই হবে।ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিলো।কিন্তু কাউকে কিছুই বলতে পারছিলাম না।আমি আমার ব্যাগ আস্তে আস্তে গোছাতে লাগলাম।দেখতে দেখতে কেটে গেলো দুটো মাস। আমার চোখের নিচে কালি পরে গিয়েছে।কতগুলো রাত যে নির্ঘুম কেটেছে হিসেব ছাড়া।আয়াজ এতো বিজি আর টায়ার্ড থাকে যে এসেই ঘুমিয়ে পরে।এই একমাসে ৩-৪ বার হয়তোবা আয়াজ আমাকে বুকে নিয়ে ঘুমিয়েছে।ঐ দিনগুলোতেই আমি শুধু ঘুমোতে পেরেছি।আর বাকি রাত গুলো কেটেছে অশান্তিতে। সব থেকে আশ্চর্যের ব্যাপার কেউ আমার সাথে বাচ্চা নিয়ে কোনো কথা বলেনি এমনকি আমাকে সান্ত্বনাও দেয়নি।হয়তোবা তারা চায় ঝামেলা একেবারেই মিটে যাক।
আজ সকাল থেকে বাহিরে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে।ঝুম বৃষ্টি দেখতে আমার বেশ ভালো লাগে।আমার মনে হয় আমার মতো তারাও দুখী। হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠলো। আমি দরজা খোলার জন্য গেলামনা।কেনো জানি যেতে ইচ্ছে করছে না।আয়াজের গলার আওয়াজ পেলাম। সাথে একটা বাচ্চার কান্নার শব্দ ও পেলাম মনে হলো।আবার ভাবলাম এটা হয়তোবা আমার ভুল।কেনোনা আমি মা হতে পারবোনা জানার পর থেকে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনতে পাই। আবার কলিংবেল বেজে উঠলো। এবার কে এসেছে কে জানে।যেই আসুক আমার আর কি।আমি ই তো এই বাড়িতে আছি আর মত্র কয়টাদিন। কাধে কারো হাতের স্পর্শ পেলাম।পেছনে তাকিয়ে দেখি আয়াজ দাড়ানো। তার কোলে ছোট একটা বাচ্চা।একদম ছোট।বাচ্চাটাকে দেখে আমি যেনো আকাশ থেকে পরলাম।অবাকের চরম সীমানায় পৌছে গেলাম। আয়াজ আমার হাতে বাচ্চাটাকে ধরিয়ে দিয়ে বললো, “এই নাও বাবা তোমার ছেলেকে ধরো।জানোনা তো কি কি যে হয়েছে। এতো জ্বালায়।একটু পরই ভ্যাভ্যা করে।তোমার ছেলে তোমার মতোই দুষ্ট হয়েছে। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি হ্যা।” বলেই আয়াজ সোজা ওয়াশরুমে ঢুকলো। আমি বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে বোকার মতো দাড়িয়ে রইলাম।বাচ্চাটার দিকে এক নজরে তাকিয়ে রইলাম।
কোনোভাবেই নিজের চোখকে বিশ্বাসই করতে পারছিনা।ও আমার ছেলে আমি ওর মা।এই অনুভূতি বলে বুঝানো যাবেনা।আমি ওকে হাজারো চুমু খেতে থাকলাম।এক পর্যায়ে আমি হাউমাউ করে কেঁদে ফেললাম।আমার কান্নার আওয়াজে শাশুড়ী ননদ ননদের মেয়ে এবং আমার শশুর আমার রুমে চলে এলেন।”এমা বউমা তুমি এম্নে কান্তাছো ক্যা? এতো বড় ধামরি মাইয়া কানলে কিমুন দেহা যায়।আর এহন তোমারপোলাসিনা কানবো তুমি কান্দো ক্যারে?” মা বললেন। “তোমার মা এক্কারে ঠিক কইছে।আমার দাদু ভাই দেখো তোমারে দেইখা কেমন হাসতাছে।তুমি ওর সামনে এমনে কানতাছো ছি ছি।” আমি আরো বেশি অবাক হয়ে গেলাম।তারা এতো সহজে সবটা মেনে নিলো।আমার ননদ নিরা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। “কংর্যাচুলেশন ভাবি। আমি ফুপি হয়ে গেলাম।কই দেখে আমার ভাতিজাকে কোলে দাও তো।” নিরার মেয়েটা লাফাতে শুরু করলো বাচ্চাকে দেখে। আমার কাছে সবটা স্বপ্নের মতো লাগছে।ততক্ষনে আয়াজ ও ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে পরেছে।আমি সবার সামনেই আয়াজকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললাম।
আমাকে মাফ করে দাও আমি তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম।আমি ভেবেছিলাম তোমরা আমাকে আর রাখবে না।তোমরা এতো ভালো কেনো? আমি নিশ্চই কোনো পূন্য করেছিলাম তাইতো তোমাদেরকে পেয়েছি।আমি মা বাবার কাছে যেয়েও ক্ষমা চাইলাম। “আরে পাগলি মাইয়া।এডি আমাগোর এহানে চলেনা।বাচ্চা দিবো কি দিবোনা এডা আল্লাহর ইচ্ছা।এহানে তো আমাগর কোনো হাত নাই।তয় শুধু শুধু আমরা তোমারে দোষ কেন দিমু? আজ যদি সমস্যা আমাগোর আয়াজের হইতো তয় তুমি কি ওরে ছাইড়া যাইতা? যাইতানাতো।তাইলে আয়াজ তোমারে ছাড়বো কোন দুঃখে? আর এহন তো তোমাগোর পোলাও আয়া পরছে। দে তো আয়াজ আমার নাতি ডারে আমার কোলে দে আমি একটু খেলি ওরে লইয়া।”
মা বাবা আর আমার ননদ আমার ছেলেকে নিয়ে রুম থেকে চলে গেলেন।। আয়াজ আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছেন।সে আমার কাছে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। “পাগলি আমার।এতো ভয় পাও আমাকে হারানোর।আমিও যে তোমাকে খুব ভালোবাসি।একটা বাচ্চার জন্য আমি তোমাকে ছেড়ে দিবো এটা তুমি ভাবলে কি করে? বিয়েটা আমাদের হয়েছিলো।ভালোবেসে আমরা বিয়ে করেছিলাম।সারাজীবন সাথে থাকার প্রতিজ্ঞ করেছিলাম।আমার জীবনের প্রথম প্রায়োরিটি তো তুমি। তারপর আমাদের সন্তান আর বাচ্চা না হওয়া কোনো দোষের কিছু না।পৃথিবীতে কত এতিম বাচ্চা আছে।আমরা না হয় তাদের মধ্যে কারো বাবা মা হলাম।আল্লাহ আমাদের কে দিয়ে অনেক বড় পুন্য করালো মনে করো।
আর এইকদিন তোমাকে সময় দিতে পারিনি।ব্যাবসায় ঝামেলা হয়েছিলো তার উপর এই এডপ্টিং প্রসেসে ঝামেলা ছিলো।আমি শুধু চেয়েছিলাম তুমি খুশি থাকো।বাবা মাও আমাকে অনেক সাহায্য করেছে বাচ্চা এডপ্ট করতে।মা তো রীতিমতো ঝগড়া করেছে যাতে তাড়াতাড়ি প্রসেসটা কমপ্লিট হয়।আর তোমার সাথেও এই ব্যাপার নিয়ে কথা তুলিনি কারণ আমরা কেউই চাইনি তুমি এই ব্যাপারটা ভেবে কষ্ট পাও।বা তোমার মনে হোক আমরা তোমাকে করুণা করছি।তাই আমরা ভেবেছিলাম সব কিছু স্বাভাবিক রেখেই যা করার করবো।” সব কিছু শুনে আমার নিজেকে পৃথিবীর সব থেকে সুখী মানুষ মনে হলো।আমি চির কৃতজ্ঞ এম একটা শশুর বাড়ি পেয়ে এমন একটা হাসব্যান্ড পেয়ে।
রাতে আমি আমার ছেলেকে ঘুম পারাচ্ছি।আয়াজ পাশে বসে লেপ্টপে কাজ করছে। “আচ্ছা ওর নাম কি দেয়া যায়?” আয়াজ বললো। “ওর না হচ্ছে পূর্ন।” কেনোনা ও আসায় আমাদের পূর্নতা এসেছে।ও আমাকে একজন নারী হিসেবে পূর্ণ করে দিয়েছে। আয়াজ পূর্নের কপালে চুমু খেলো।পূর্ন ঘুমিয়ে গেলে আমি আর আয়াজ বারান্দায় যেয়ে বসলাম।তুমি দুনিয়ার সব থেকে ভালো হাসব্যান্ড। বলেই আয়াজকে জড়িয়ে ধরলাম।আয়াজ ও পরম আবেশে আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে।আমি মনে মনে আল্লাহর কাছে সুক্রিয়া আদায় করলাম।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত