জীবনের মেঘলা পথে

জীবনের মেঘলা পথে

“দেখুন সন্দীপ বাবু, কথাটা শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই সত্যি যে আপনার স্ত্রীকে mental asylum-এ রাখা ছাড়া কোনো পথ নেই।” ডাক্তার বাবুর কথা শুনে সন্দীপ বাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললেন, “একবার চেষ্টা করে দেখুন না অন্য কোনো ওষুধে যদি কাজ হয়। Please ডাক্তার বাবু আর কি কোনো ওষুধ নেই?” সন্দীপ বাবুর কথা শুনে ডাক্তার বললেন, “দেখুন যা বলার আপনাকে তো বললাম। এবার আপনার স্ত্রীর ভাল-মন্দ বোঝার দায়িত্ব আপনার।” আর কথা না বাড়িয়ে সন্দীপ বাবু ডাক্তারের chamber থেকে বেরিয়ে এলেন।

আজ ডাক্তারের কথা শোনার পর সন্দীপ বাবুর কাল ব্যাঙ্কে যাবারও মন নেই। কি করে কাজ করবেন তিনি! তার স্ত্রীর মাথা খারাপ হলেও তিনি যে তাকেই ভালবাসেন। ডাক্তারের কথা মেনে নিয়ে তিনি যদি তার স্ত্রীকে mental asylum-এ রেখে দিয়েও আসেন তাতে কি তার স্ত্রী তাকে ছাড়া ভালো থাকবেন? তার স্ত্রী যে তার হাতকে নিজের হাতের সাথে নিয়ে ঘুমান। কি করে থাকবেন সেই অসুস্থ মানুষটা তাকে ছেড়ে? একরাশ চিন্তা সন্দীপ বাবুর মাথাই এসে ভিড় করলো। নিজেকে খুব অস্থির লাগছে।

কোন সঠিক সিদ্ধান্তেই আসতে পারছেন না। তিনি যে আয়া রাখবেন তারও উপায় নেই, কারণ আগের আয়াকে গালমন্দ করায় সে চলে গেছে। এসব ভাবতে ভাবতে বাড়ি পৌঁছে যান সন্দীপ বাবু। বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই পাশের বাড়ির প্রবীর ডাক দিল। সন্দীপ বাবু গেলেন তার কাছে। প্রবীর বলল, “দাদা আজ আপনার স্ত্রী ইট ছুঁড়ে নিতাই-এর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছেন।” সন্দীপ বাবু তো শুনেই চমকে উঠলেন। একটু থেমে প্রবীর আবার বলল, “এতে অবশ্য দোষ নিতাই-এরই।” সন্দীপ বাবু বললেন, “কেন? কি হয়েছিল?” প্রবীর বলল, “আপনি বরং আমার সাথে নিতাই-এর বাড়িতে চলুন। সেখানেই সব পরিস্কার করে জানতে পারবেন। কারণটা আমিও ঠিকঠাক জানি না। পাড়ার লোকের মুখে শুনে আপনাকে জানালাম।”

প্রবীরের সাথে নিতাই-এর বাড়ি গেলেন সন্দীপ বাবু। ঘরে ঢুকতেই নিতাই-এর বউ সন্দীপ বাবুকে দেখে কেঁদে কেঁদে বলল, “আজ আপনার স্ত্রী যা করেছেন তা অনেক সুস্থ মানুষও করবেন না। আজ উনি ইট ছুঁড়ে না মারলে আমার স্বামী আমায় মেরেই ফেলত। আমি বাঁচাও! বাঁচাও! বলে চিৎকার করছিলাম। কিন্তু কেউ আমায় সাহায্য করতে আসেনি। একমাত্র উনিই সাহায্য করলেন আমায়।” সবটা শুনে নিজের অসুস্থ স্ত্রীর ওপর গর্ববোধই হল। সন্দীপ বাবু কিছু টাকা দিয়ে এলেন নিতাই-এর চিকিৎসার জন্য এবং নিতাইকেও সাবধান করে এলেন, এমন ঘৃণ্য কাজ সে যেন আর না করে।

সন্দীপ বাবু বাড়ি এসে দেখেন রোজকার মতোই ঘর অগোছালো আর তার স্ত্রী বিছানায় বসে তাকে দেখে হাসছেন আর পা দোলাচ্ছেন। সন্দীপ বাবু তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে হেসে ঘরের কাজে লেগে পড়লেন। তারপর কাজ শেষে স্ত্রী কে খাইয়ে এবং নিজে খেয়ে স্ত্রীকে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। এখনও তিনি কি সিদ্ধান্ত নেবেন বুঝতে পারছেন না। এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মোবাইল ফোনে ভেসে উঠল শাশুড়ির নাম। ফোনটা ধরলেন সন্দীপ বাবু। সন্দীপ বাবু তার শাশুড়িকে ডাক্তারের কথা ও নিতাই-এর কথা, সবটা গুছিয়ে বললেন। “কি করব কিছু বুঝতে পারছি না মা। ও তো আমাকে ছেড়ে থাকতে পারে না। ওর জ্বালাতন গুলোই আমার কাছে ওর ভালোবাসা।” বলতে বলতে সন্দীপ বাবুর গলা এবার একটু কেঁপেই উঠলো। সন্দীপ বাবুর শাশুড়ি মা সব শুনে বললেন, “ঠিক আছে, দেখছি কি করতে পারি।” বলে তাদের বাক্যালাপ সমাপ্ত হল। সন্দীপ বাবু এবার নিজের কাজ নিয়ে কম্পিউটারে বসলেন। কাল তো তাকে ব্যাঙ্কে কাজে যেতেই হবে। কতদিন আর ছুটি খরচ করবেন! আজকের দিনটা চিন্তা-ভাবনার সাথেই কেটে গেল সন্দীপ বাবুর।

‘টিং টং টিং টং’

সন্দীপ বাবু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন সকাল ৮ টা বাজে। এখন আবার কে এলো? গিয়ে দরজা খুলতেই সন্দীপ বাবু দেখেন তার শাশুড়ি মা এসে উপস্থিত। শাশুড়ি মা ঘরে এসে বললেন, “আর কোনো চিন্তা করিস না সোনু, আমি এসে গেছি। আমি এবার থেকে এখানে থেকেই আমার মেয়েকে দেখব। তুই যদি ওর পাশে থাকতে পারিস, তাহলে ওর মা হয়ে আমি কেন আমার মেয়ের পাশে থাকব না! তুই কাল থেকে নিশ্চিন্তে কাজে যাস।” সন্দীপ বাবুর তো হাতে চাঁদ পাবার মতো অবস্থা। আর তো কোনো ভাবনাই থাকল না। সন্দীপ বাবু আশ্বস্থ হয়ে বললেন, “তাহলে বাবাকে কে দেখবে?”

“আয়া রেখেছি তোর বাবার জন্য। আর মাসে দুবার যাবো, তোর বাবাকে দেখে আসব”, শাশুড়ি মা বললেন। সন্দীপ বাবু তার শাশুড়ি মায়ের কাছে এগিয়ে এসে তাঁর হাত দুটো ধরে স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন, “কাল আমি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি নি, কিন্তু আজ একটা সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। আমি বাবকেও এখানে নিয়ে আসব। সবাই একসাথে এখানেই থাকব। তুমি যদি তোমার মেয়ের জন্য সংসার ছেড়ে আসতে পারো তাহলে আমি তোমাদের ছেলে হয়ে তোমাদের জন্য এইটুকু করতে পারব না? তোমার কোন চিন্তা নেই, আমি আছি তো।” শাশুড়ি মা শুনে সন্দীপ বাবুর মাথায় একটা স্নেহ চুম্বন দিয়ে বললেন, “ভাল থাকিস বাবা।”

গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত