আকাশ ভরা সূর্য তারা

আকাশ ভরা সূর্য তারা

“আকাশ ভরা সূর্য তারা, বিশ্বভরা প্রাণ” – mp3 player-এ গানটা শুনতে শুনতে বাড়ি ফিরছে অভিমন্যু। সেই ২০০২-এ কলকাতা ছেড়ে চলে এসেছিলো গুয়াহাটি, কাজের জন্যে। ঠিক দায়ে পড়ে না, তার চাকরির প্রথমেই গুয়াহাটি পোস্টিং পড়েছে। সে যাবে নাই ঠিক করে নিয়েছিলো, শেষমেশ বাবা মা-এর অনেক পীড়াপীড়ির পর রাজি হল। মনে আছে, যাওয়ার আগের দিন ছাদে উঠে সারারাত চুপ করে বসে ছিলো।

৪ঠা এপ্রিল, ২০০২

ওদের বাড়ির ছাদ দিয়ে হাওড়া ও দ্বিতীয় হুগলি ব্রিজ দুটোই দেখা যায়, গোটা পাড়ায় ওদের মতো পুরোনো বাড়ি আর সেই খোলামেলা ছাদ কারোর নেই। মনে আছে, অঙ্ক পরীক্ষার আগের দিন সারা দুপুর থেকে অঙ্ক করে যখন মাথা ভার হয়ে যেত, সে টুক করে ছাদে চলে আসতো, ফুরফুরে বিকেলের হাওয়া তার সমস্ত জটিলতা কাটিয়ে দিতো। চিলেকোঠার ঘরে বসে শীতকালের দুপুরের রোদ্দুর খেতে খেতে কত পান্ডব গোয়েন্দা পড়েছে সে। ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায় ওর দাদুর অফিস কলিগ, তাই নতুন কোনো গল্প বেড়োলে ফার্স্ট এডিশন আগে ওর কাছে চলে আসতো। সেসব আর হবে না, ছেলে বড় হয়ে গেছে, এবার কাজ করে সংসারের হাল চালিয়ে যেতে হবে। সারারাত ছাদে বসে থাকবে আজ সে। জানিনা কবে আবার বাড়ি ফিরবে, একেই বেসরকারি চাকরিতে ছুটিছাটা কম থাকে, আর দুর্ভাগ্য এটাই যে পূজোতেও ছুটি নেই।

৫ই এপ্রিল, ২০০২

গাড়ি এসে গেছে, দুপুর তিনটে পঞ্চান্নয় ট্রেন, রিজার্ভেশন আগে থেকেই করা ছিলো। যাওয়ার দিন বাড়িতে কান্নাকাটি। অভিমন্যু বললো, মাস গেলে টাকা পাঠাবে, আর কোন ছুটি পেলে বাড়ি আসবে ঠিক।

বর্তমান সময়

সামান্য একটু ঘোর এসে গিয়েছিলো অভিমন্যুর, সেই সাব কনস্যাস মাইন্ডে দেখলো, লাস্ট এসেছিলো ২০০৬ তে, তারপর কাজের চাপে আর আসা হয়ে ওঠেনি। এই তেরো বছরে হয়তো মানুষগুলোর আর ঘরবাড়ির বয়েস বেড়েছে। সে আবার ছাদে উঠবে রাতে, দেখবে হাওড়া আর দ্বিতীয় হুগলি ব্রিজ আবার। গত দশ বছরের লাগাতার সাফল্য তাকে তার হোম টেরিটোরিতে ফিরতে সাহায্য করেছে। এবার সে কলকাতা থেকেই অপারেট করতে পারবে।

কামরূপ এক্সপ্রেস দেড় ঘন্টা লেট, তাই হাওড়া ঢুকতে ঢুকতে সকাল সাড়ে সাতটা বেজে গেলো। নেমেই দেখলো, বাবা মা দাঁড়িয়ে আছে। বয়েস হয়েছে দুজনেরই, চুল পেকেছে। অভিমন্যুরও চল্লিশ পেড়িয়ে গেছে। প্রণাম সেড়ে সে ক্যাব বুক করলো উবের পয়েন্টে গিয়ে। এবার বাড়ি ফিরবে, সেই পুরোনো স্মৃতি আবার চাঙ্গা হয়ে উঠলো।

উবের নামালো গলির মুখে। গাড়ি থেকে নেমে তার মাথাটা ঘুরে গেলো। এ কোথায় এলো সে? গলির মুখে একটা রক ছিলো না, দাসদের বাড়িটাই বা কই? সেখানে একটা দশতলা অট্টালিকা!! অভিমন্যু গলিতে ঢুকলো, মনে আছে ছেলেবেলায় সে স্কুলে গর্ব করে বলতো যে তাদের গলির মুখ থেকেই তাদের বাড়ি দেখতে পাওয়া যায়, আজ সে দেখতে পেলো না, বরং দেখতে পেলো আরেকটা সাততলা অ্যাপার্টমেন্ট। অভিমন্যুর মাথা ভোঁ ভোঁ করতে লাগলো, সে ঠিক জায়গায় এলো তো? মায়ের দিকে তাকাতে মা বললেন, “কিচ্ছু চিনতে পারবি না রে বাবু, আমাদের বাড়ি টা ঠিকই আছে, কিন্তু তার দু’পাশের দুটো বাড়িই প্রোমোটার কে দিয়ে দিয়েছে। এই পাঁচ বছরে পাড়ায় ছটা ফ্ল্যাট উঠে গেছে, আমাদের বাড়িটাকেও তক্কে তক্কে আছে কবে নেয়, গত ছ’মাস ধরে প্রায় এসে নরম গরম কথায় বাড়িটা বিক্রি করতে বলছে, তবে তোর বাবা বিক্রি করবে না সাফ বলে দিয়েছে”।

বাড়িতে ঢুকে আগে অভিমন্যু দৌড়ে ছাদে গেলো। সে ছাদ আর সেই আগের ছাদ নেই। আর কোনো ব্রিজ দেখতে পাওয়া যাবে না কোনোদিন। সে চিলেকোঠার ঘরে ঢুকলো, দীর্ঘদিন অব্যবহারের ফলে ধুলো জমে গেছে সেখানে। অভিমন্যু সেই ধুলোর মেঝেতে ধপ করে বসে পড়লো, মাথায় হাত, চোখের জল গাল বেয়ে মেঝেতে পড়ছে। পাশের ফ্ল্যাট থেকে হোম থিয়েটারে অঞ্জন দত্তের গান বাজছে, অভিমন্যুর মনে হলো গোটা ছাদের পাঁচিলের সমবেত দীর্ঘশ্বাস সেই গানটাকে রিপ্রেজেন্ট করছে, “আকাশ ভরা সূর্য তারা, আকাশমুখী সারি সারি, কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়া ঠাসাঠাসি বাক্সবাড়ি, এখান থেকেই চলার শুরু, এখান থেকেই হামাগুড়ি, এখানটাতেই আমার বাসা, আমার বাড়ি”।

গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত