মনুষ্যত্ব

মনুষ্যত্ব
রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফুচকা খাচ্ছি। আর আমার পাশে দাঁড়িয়ে নাক ছিটকুচ্ছে আমার হবু বর সানি। ওর সাথে বিয়ের কথা চলছে। তবে এখনও কিছু ঠিক করা হয়ে ওঠেনি। বড়লোকের ছেলে। ভার্সিটির টিচার। উনার বাবা নাকি আমাকে ওনাদের অফিসে দেখেছিলেন। আর ছেলের বউ হিসেবে পছন্দ করলেন। ওনারা যেহেতু শিক্ষিত-মার্জিত পরিপাটি সবদিক থেকে সেহেতু আমার ফ্যামিলি অমত করলেন না। কিন্তু তাকে প্রথম থেকে আমার কেন জানি অপছন্দ। ছেলে মেয়ে একে অপরকে চেনার জন্য হাতে কিছুদিন সময় রেখেছে।
সেই সুবাদে আজকে তার সাথে বের হওয়া। কিন্তু কথা হয়েছে সীমিত পরিসরে। কারন আমার বের হওয়ার কোনো ইচ্ছেই ছিলো না। ফুচকা খাবো বলাতেও প্রথম অমত করেছিল। এগুলা নাকি ফুটপাতের খাবার। ভিখারিরা খাই। উনার এই কথা শোনার পর আরও বেশি জেদ চাপলো আজকে আমি ফুচকা খাবোই। আর তাই একপ্রকার জোর করেই খাচ্ছি। খেতে খেতে খেয়াল করলাম অনেকক্ষণ ধরে দুটো ছেলেমেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে নিম্নবিত্ত ঘরের হবে হইতো।পড়নে একটু নোংরা টাইপ জামা কাপড়। দুজনের হাতেই দুটো পুটলি। ওদের করুণ চোখের দৃষ্টি দেখে মায়া হল। তাই মুচকি হেসে হাতের ইশারায় কাছে ডাকলাম। ছেলেমেয়েগুলো ভয়ার্ত চোখে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। কিছুটা অবাক হলাম তাদের আচরণে। আবারো কাছে ডাকলাম,,
– এদিকে এসো তোমরা। এবার ওরা ভয়ে ভয়ে এগিয়ে এলো।ওদের এই ভয়ার্ত মুখ দেখে আমি মুচকি হাসলাম,,
– কি নাম তোমাদের? বাচ্চা ছেলেটা কাপা গলায় উত্তর দিলো,
– আম আমার নাম সিয়াম আর আমার বোন সামিয়া।
– ফুচকা খাবে? ক্ষিদে পেয়েছে? আমার এই প্রশ্নে যেন ওদের ভয়ের মাত্রাটা আরও বেড়ে গেলো। তাই জিগ্গাসা করলাম,
– আমাকে ভয় হচ্ছে? ওরা মাথা নাড়লো যার মানে না,, হচ্ছেনা। ওদের উত্তরে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলাম,
– তাহলে তখন ডাকলাম কাছে এলেনা কেনো? কি হলো বলো? তখনি ওরা কাপা কাপা হাতে আমার পেছনে ইশারা করলো। ওদের ইশারাকে লক্ষ্য করে আমার পেছনে তাকাতেই চোখে পড়লো সানির রাগী মুখ।তার এই দৃষ্টি দেখে বাচ্চা গুলো আরও বেশী ভয় পাচ্ছে। কিন্তু ওরা আমাকে ভয় পাচ্ছেনা অথচ সানিকে কেন ভয় পাচ্ছে? আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই ধমকের স্বরে বলে ওঠলো সানি
– তোরা এখানে? আবার এসেছিস?
ছেলে -আ আমরা ট টাকা চাইতে আ আসিনি,,,
– তোদের বলেছিলাম যেন আশে পাশে আর না দেখি,,
আমি – আস্তে সানি,,, আপনি কি ওদের আগে থেকে চেনেন?
সানি – আরে আর বলোনা, এদের কাজ ই মিথ্যে সাজিয়ে এটা ওটা বলে টাকা হাতানো। সানির কথাশুনে মাথা গরম হয়ে গেলো। এর মানে এটা স্পষ্ট যে, এদের সাথে সানির আগে থেকেই পরিচয় আছে। আর এমন কিছু বলেছে যাতে বাচ্চাগুলো ভয় পাচ্ছে।আমি বাচ্চাগুলোর সামনে হাটু গেড়ে বললাম,
– ওনাকে চেনো? বাচ্চা গুলো মাথা নাড়লো যার মানে চেনে।
– কিভাবে চেনো ওনাকে? কোথায় দেখেছিলে? আমার প্রশ্নে বাচ্চাগুলো উত্তর দেওয়ার আগেই ধমকের সুরে বলে উঠল সানি,
– আহ প্রাপ্তি, তুমিও এদের সাথে কি শুরু করলে? আর তুমি এদেরকে এভাবে জড়িয়ে ধরছো কেনো? দেখছোনা এদের কাপড় জামা কি নোংরা? তোমার শরীরে ময়লা লেগে যাবে, ওঠে এসো তো ( আমার হাত টেনে)
– সানি হাতটা ছাড়ুন।
– কেনো?
– এভাবে হুটহাট হাত ধরা আমার পছন্দ নয়।
– প্রাপ্তি দুদিন পর আমাদের বিয়ে, তুমি আমার বউ হবে। সুতরাং হাত আমি ধরতেই পারি।
– বউ হবো, হয়নি এখনো ওকে? সো যখন হই তখন দেখা যাবে। এখন হাত ছাড়ুন। কথাটা বলেই এক ঝটকায় সানির থেকে হাতটা ছাড়িয়ে নিলাম। বাচ্চাগুলোর দিকে আবার ও ঘুরে তাকিয়ে বললাম,
– তোমাদের কোনো ভয় নেই, ওনি তোমাদের কি বলেছেন সেটা বলোতো। সিয়াম- ঐ দিন হুটেল ওনি খাইতেছিলেন। আমি কয়লাম আমি আর আমার বইন খাইনায় সারাদিন। কিছু টেকা দিতে। নাইলে দুইডা রুটি কিইনা দিতে।ওনি কইলেন আমরা নাকি ধান্ধা করি। এগুলা নাকি আমাদের কাম। তারপর আমার বইনরে দেক্কা দিয়া ফালাইয়া কইছে আর যেন ধারে কাছে না দেহে। ঐ দেখেন আমার বইনের হাতটা এখন লাল হয়া আছে ( সামিয়ার হাতের দিকে ইশারা করে) সিয়ামের কথা শুনে মাথায়,রক্ত ওঠে গেছে। এরা কি মানুষ?মনুষ্যত্ব বলে কিছু নেই নাকি? সামান্য একটু খাবার চাওয়ার অপরাধে এমন একটা বাচ্চাকে এভাবে? ছিহ,, আমি সানির দিকে তাকাতেই সানি রাগী গলায় ধমকে ওঠলো বাচ্চাটাকে,
– এই ফাজিলের বাচ্চা , এসব মিথ্যে কথা কে শিখিয়ে পাঠিয়েছে তোদের? প্রাপ্তি সব মিথ্যে কথা বলছে। এদের কাজ ই এসব।
সিয়াম – আফা আমি মিছা কতা কইনায়, বিশ্বাস করেন। আপনে মারলে মারেন, বকলে বকেন, কিছু কমুনা।বড়লোক গোর মার খাওন আমাগো অভ্যাস। তবুও অবিশ্বাস কইরেন না। সিয়ামের কথাটায় বুকটা মুচর দিয়ে ওঠলো। সিয়াম কথাটা বলতেই সানি সিয়ামকে থাপ্পড় মারতে হাত তুললো, সাথে সাথেই ওদের কে দু হাতে জড়িয়ে ধরে চোখ মুখ খিচে বন্ধ করলাম আমি। অনেক্ষণ কোনো সারাশব্দ না পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন তাকাতেই দেখতে পেলাম অচেনা কোনো একটা ছেলে সানির হাতটা ধরে আছে। হয়তো সানি থাপ্পড় দেয়ার আগেই সে হাতটা ধরে নিয়েছে। তাকে দেখে খুব সাধারণ ঘরের ছেলেই মনে হচ্ছে। পড়নে সাদা মাটা একটা জিন্স আর টি শার্ট। চোখে একটা চশমা, ডানহাতে ব্রেন্ডের ঘড়ি, পায়ে নরমাল জুতো। আমি ওঠে দাঁড়িয়ে ফুচকাওয়ালা মামাকে ইশারা করলাম সিয়াম সামিয়া কি খাবে দেয়ার জন্য। ওরা জানালো ফুচকায় খাবে কখনো নাকি খাইনি। পাশের বেঞ্চে বসিয়ে দু প্লেট ফুচকা হাতে দিয়ে বললাম,
– আমি একটু আসছি। তাড়াতাড়ি এটা শেষ করবে। ফিরে এসে যদি কারো একটু বাকি মার খাবে। ওদের মাথায় হাত বুলিয়ে ধীর পায়ে হেটে এসে সানি আর অচেনা ছেলেটার মাঝামাঝি দাঁড়ালাম।ছেলেটা এখনো সানির হাত ধরে আছে। আমি দাঁড়াতেই সানির হাতটা ছেড়ে দিয়ে বললো ছেলেটা,
– দামী পোশাক, দামী বাড়ি, দামী গাড়ি থাকলেই কেউ বড়লোক হয়ে যায়না। আসল বড়লোক তো সে যার মনটা আকাশের মতো বিশাল। আর আকাশের মতো বিশাল মন তখন ই হয়, যখন সে মনে ধনী -গরিব, নোংরা- পরিষ্কার, জাতি – ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকালের সমান জায়গা থাকে। আর আপনার মনে তো সামান্য দুটো বাচ্চার ও জায়গা নেই। ওনার কথার মাঝখানে বলে ওঠলাম আমি,
– আমার তো সন্দেহ হচ্ছে, আপনার আদৌ কোনো মন আছে কিনা।
সানি- প্রাপ্তি, ( চিৎকার করে)
– একদম চেঁচাবেন না। আপনাদের উঁচু গলা মানায় না। সারা জীবন এই মানুষ গুলোর সাথে হেসেছি, এই বাচ্চাদের সাথে খেলেছি, এক প্লেটে খাবার খেতেও দ্বিধা বোধ করিনি কোনদিন। আর আমার বাবা কিনা এমন একজন মানুষকে আমার জন্য পছন্দ করলো যে কিনা গরীব বলে নাক ছিটকোয়,, অবশ্য সেই বা কি করে বুঝবে। সে তো জানে একজন শিক্ষকের হাতে তুলে দিচ্ছে মেয়েকে। কিন্তু সেই শিক্ষকের ভেতরে যে আসল শিক্ষাটাই নেই সেটা কি করে জানবে?
সানি – প্রাপ্তি তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছো যে, আমি চাইলে এক মুহুর্তে তোমার সাথে বিয়েটা ভেঙ্গে দিতে পারি।
– হাসালেন মিষ্টার সানি,, আপনি ভাবলেন কি করে আজকের পর আমি আপনার সাথে বিয়ে তো দূর দ্বিতায় বার আপনার সামনেও দাঁড়াবো? যার ভেতরে _মনুষ্যত্ব নেই আর যাইহোক তার সাথে জীবন কাটানো যায়না। আমি শুধুমাত্র বাবার কথা রাখতে বিয়েতে রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু আজকের পর সেটা পসিবল না।
সানি – তোমার মতো মিডিলক্লাস ফ্যামিলির মেয়েদের থেকে এর বেশী কিছু আশা করা যায়না।
– মিষ্টার সানি মুখ সামলে কথা বলুন ( অচেনা ছেলেটা)
সানি – হেই ইউ,,, কে আপনি? এত লাফাচ্ছেন কেনো?
– আমি একজন মানুষ ( মুচকি হেসে)
আমি – সানি, আপনি না এখানে দাঁড়িয়ে থেকে আর সময় নষ্ট করবেন না। আর আপনি নিশ্চিত থাকুন আপনার বাড়িতে বিয়ে ভাঙ্গার প্রপোজাল টা দায়িত্ব নিয়ে আমিই পৌছে দেবো। আসুন,,, ( মুচকি হেসে)
– আমি তোমাকে দেখে নেবো প্রাপ্তি। আমার এই অপমানের শোধ আমি তুলবো।
– আমি অল টাইম রেডী। সানি রেগে মেগে সেখান থেকে চলে যেতেই ঘুরে দাঁড়ালাম সেই ছেলেটাকে ধন্যবাদ দেবো বলে।আমি ঘুরে দাঁড়াতেই ছেলেটা আমার সামনে হাটু গেড়ে বসে বললো,
– তোমার রুপে নয় মানবতায় বরাবরই মুগ্ধ ছিলাম।তোমার বাচ্চামো আর হাসিগুলো বিভোর ছিলাম। আজ আবারো নতুন করে মুগ্ধ হলাম। যতু দেখী ততই নতুন করে দেখার ইচ্ছে জাগে। মায়াবিনী, কোমলিনী, মমতাময়ী নতুন নতুন রুপে এসো তুমি।হয়তো তোমায় দামী রেস্টুরেন্ট এ নিয়ে খাওয়াতে পারবোনা, তবে এই ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাওয়াতে চেষ্টা করবো। হয়তো দামী গাড়িতে চড়াতে পারবোনা, কিন্তু খোলা আকাশের নিচে হুড খোলা রিকশায় চড়াতে পারবো। হয়তো দামী কিছু গিফট করতে পারবোনা, তবে খোপায় বকুলের মালা, হাতে কাচের চুরি আর পায়ে আলতা দিয়ে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে রাখবো। না হোক পাশাপাশি পেছন পেছন হাটার অধিকার কি পেতে পারি? ( আমার দিকে হাত বাড়িয়ে) লোকটার কথা শুনে আমি পুরাই তাসকি। এ এখন বলে কি? এভাবে অজানা অচেনা একটা লোক মাঝরাস্তায় হাটু গেড়ে বসে এভাবে বলবে কখনো ভাবিনী। আমি অবাক হয়ে ওনার দিকে তাকাতেই বললেন ওনি,
– হয়তো ভাবছেন অজানা অচেনা লোকটি এভাবে বলছে কেনো? আমি শুভম আমি আপনাকে চিনি, হয়তো হাজার বছর আগে থেকে চিনি। আর আমাকে আপনি আস্তে আস্তে চিনে নিতে পারবেন। আপাতত নামটাই যথেষ্ট নয় কি?
আবার ও একদফা অবাক হলাম। আমি কি ভাবছি সেটা ওনি বুঝলো কি করে? আমাকে আবারো অবাক করে দিয়ে বললেন ওনি,
– ভালোবাসলে মনের কথা এমনি বুঝা যায়। সেটা আপনিও একসময় বুঝবেন। আমি আজ এক দু দিন নয়,, অনেকদিনের অনুভুতি প্রকাশ করলাম। সেগুলো কোনো মূল্য কি পাবো? আবারো কিছুক্ষণ অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে বলে ওঠলাম,
– সরি আপনি আসতে পারেন। সাথে সাথেই ওঠে দাঁড়ালেন ওনি। মুচকি হেসে বললেন,
– আবারো হয়তো এভাবে কোনো অচেনা শহরে মাঝরাস্তায় এভাবেই চাইবো আপনাকে। সেদিন ফেরাতে পারবেননা। জোর করবোনা। কথাগুলো বলেই সামনে হাটা দিলেন ওনি। আমি কিছুক্ষণ ঠাই দাঁড়িয়ে থেকে কি মনে করে দৌড়ে গিয়ে ওনার সামনে হাটলাম। হাটতে হাটতে পেছনে না তাকিয়ে বললাম,
– সবাইকে মানিয়ে জয় করে নিতে পারলে পেছনে নয় পাশাপাশি হাটার অধিকারটাও পাওয়া যেতে পারে। আর পাশাপাশি হাটলে কিন্তু হাত ও ধরা যায়। পেছনে না তাকিয়ে ও বুঝতে পারলাম ওনি হ্যাং মেরে দাঁড়িয়ে আছে। মুচকি হেসে আরও দুপা এগোলাম। আমি জানি গত এক বছর ধরে ওনি আমার ছায়া হয়ে পাশে আছেন। হয়তো ধরা দিইনি। তাকে আজ অধিকারটা না দিলে আমার কিছু হতোনা, তবে হয়তো মনুষ্যত্ব এটা নয়। তাই দিয়েই দিলাম। হঠাৎ করেই পেছন থেকে কানে ভেসে এলো শুভমের কন্ঠ।
– হেই মেডাম,, লোভ দেখাচ্ছো? ওকে ফাইন রেডী থাকো। আসছি জয় করে নিতে। তখন কিন্তু কথার খেলাপ মানবোনা। একদম মানবোনা। কথাটা বলেই মুচকি হেসে ওল্টো দিকে হাটা দিলেন ওনি। আমিও মুচকি হেসে পা চালালাম গন্তব্যে। কাউকে দেওয়া কথা রাখার প্রস্তুতি নিতে।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত