এক জোড়া চোখ

এক জোড়া চোখ
কাকলীর বিয়ের দিন বরযাত্রীর নৌকা ডুবে গিয়েছিল। কলা গাছের ভেলা নিয়ে সে খবর দিয়ে গেল উত্তর পাড়ার মিজান। কাকলী সে খবর শুনে ভাঙ্গা বেড়ার ফাঁক দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে আছে। ঢেউহীন ঘোলা পানি। তাকে যেন অবজ্ঞা করে বলছে, “কিরে কালি? তোর আবার বিয়েরও শখ নাকি?” তার নাম কাকলী হলেও আড়ালে তাকে অনেকেই কালি বলে ডাকে। কারো কারো ধারণা, এই উজান চরে কাকলীর মতো কালো মেয়ে একটাও নেই।
কাকলীর চোখ রক্তশূণ্য। বুকের ভিতর পানির কেমন অভাব মনে হচ্ছে। এক গ্লাস নয়, মনে হচ্ছে এক জগ পানি খেলেও তার তৃষ্ণা মিটবে না। এখনো তার বউ সাজা হয়নি। বরপক্ষ বিয়ের শাড়ি আর কসমেটিক নিয়ে আসলে তাকে সাজানো হবে। এর মধ্যে খবর পেল বরপক্ষের নৌকা ডুবে গেছে। কাকলীর বাবা মজিবর মিয়া মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছিল। আবার উঠে নৌকাটা নিয়ে বেরিয়ে গেল।
এটি কামালের দ্বিতীয় বিয়ে। প্রথম বউ মাস ছয়েক আগে বাপের বাড়ি গিয়ে আর ফিরে আসেনি। কামালও আর আনতে যায়নি। দ্বিতীয় বিয়ে ঢাক ঢোল পিটিয়ে করতে হয় না। তাই বরযাত্রীও এবার কম, মাত্র সতেরোজন। মাঝিসহ আঠারোজনের নৌকাটি নদী বেরিয়ে উজানচরে ঢুকে পড়েছে। বন্যার পানি এখনো নামেনি। তাই নৌকা মানুষের বাড়ির উঠান পেরিয়ে যেতে হবে মজিবর মিয়ার বাড়িতে। এর মধ্যে নৌকা একপাশে কাত হয়ে যাওয়াতে সবাই পড়ে নাকানি চুবানি খেয়ে ফেলেছে।
কপাল ভালো, নৌকাটি নদীতে ডুবেনি। তীরে এসে নৌকা ডুবল। সব মিলিয়ে পানি কোমড় অবধি। বর যাত্রীতে কোনো বাচ্চা থাকলে মুশকিলে পড়তে হতো। রহিম মাঝিও দুই চার ঢুক পানি গিলে ফেলেছে। সে এখন নৌকার পানি সেচতে ব্যস্ত। এরই মধ্যে মজিবর মিয়া সেখানে নৌকা নিয়ে হাজির। বরযাত্রী দাঁড়িয়ে আছে কোমড় পানিতে। কামাল তার মাথার পাগড়ি খুঁজে পেলেও নাকে ধরার রুমাল কোথাও খুঁজে পেল না। পানিতে চুপসে যাওয়া পাগড়িটিই কামাল তার মাথায় দিলো। শত হলেও তার হবু শ্বশুড় উপস্থিত হয়েছে নৌকা নিয়ে। পাগড়ি থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। মজিবর মিয়া কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “সবাই ঠিক আছেন নাকি? আমি হুইন্যাই আইয়া পড়ছি। কী একটা বিপদ যে লাগলো। জামাই বাবাজি, কয়জন উঠছিলা নৌকায়?” কামাল কিছু বলার আগেই তার চাচা বলে উঠলো, “বিয়াই আমরা ঠিক আছি। নৌকাডা ছোট হইয়া গেল। দুইট্টা নৌকা লওয়ার দরকার আছিলো।”
মজিবর মিয়া বলল, “আল্লাহর কাম সবই ভালা, নদীত যে কিচ্ছু হয় নাই। অর্ধেক মানুষ আমার নৌকাডাত উডেন।”
উত্তর পাড়ার মিজান আবারো তার কলাগাছের ভেলা নিয়ে কাকলীদের বাড়ি খবর নিয়ে গেল। জোর গলায় বলল, “চিন্তার কোনো কারণ নাইগা। জামাইর নৌকা আইতাছে। কেউ ডুবে নাই, আডু পানিত নৌকা ডুবজে।” কাকলী বড় করে একটা নিঃশ্বাস নিলো। বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখছে, পানিতে হালকা ঢেউ। তার বাবা বিয়ের জন্য জামাইকে অনেকগুলো টাকা দিচ্ছে। কাকলী এখনো জানে না তার বাবা কীভাবে টাকা জোগাড় করেছে। কিন্তু সে জানে, তার বাবার কাছে এতো টাকা নেই। মানুষের ক্ষেতে ধানের আবাদ করে তে’ভাগা ফসল তুলে ঘরে। এবারের বন্যায় ধান সব পানির নিচে। পানি নেমে গেলে খাওয়ার ধান-চালেরই অভাব দেখা দিবে। তার মধ্যে এতো টাকা কীভাবে জোগাড় করবে? নিশ্চয় মন্ডলের কাছে বাড়ির ভিটা বন্ধক রেখেছে। কিন্তু মজিবর মিয়া কাকলীর কাছে এসব কিছুই জানায়নি। একমাত্র মেয়েটাকে কোনোরকমে ভালো ঘরে বিয়ে দেয়াটাই তার ফরজ কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কাকলীও জানে, তার মতো কালো চেহারার মেয়ের বিয়ে টাকা ছাড়া হবে না। কেউ এমন কালি মেয়েকে বিয়ে করতে রাজী হবে না। যার সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে, তার আগের বউ নাকি চলে গেছে। সব জেনেও কাকলী বিয়েতে রাজী। বাবার কথা কখনো ফেলতে পারবে না সে। তার মা নেই, বাবা’ই সব। সুন্দর এই পৃথিবীতে অসুন্দর হয়ে জন্মালেও আট দশটা মেয়ের মতো কাকলীর জীবনেও প্রেম এসেছিল। কাকলী নিজেকে কখনোই অসুন্দর ভাবতো না। গায়ের রং কালো হলেই কেউ অসুন্দর হয় না। বিধাতার সকল সৃষ্টিই কোনো না কোনোভাবে সুন্দর। মিজানের চাচাতো ভাই মিলন ভালোবাসতো কাকলীকে। একদিন নদীর ধারে পিঁড়িতে কাপড় কাঁচতে বসেছিল কাকলী। তখন তার বয়স সতেরোতে। জন্মতারিখ জানা না থাকলেও কাকলী জানে, কার্তিকের শেষে যখন বন্যার পানির রং বুড়া হয়।
পানি যখন বাড়ির উঠান থেকে নামতে শুরু করে। সেই সময়টাতে তার একেকটি বছর পূর্ণ হয়। বাবার কাছে শুনেছে, তার মা এমনি এক কার্তিকের শেষে মারা গেছে। তখন কাকলীর বয়স এগারো। সেই থেকে কাকলী নিজের বয়স নিজেই গুনতে শুরু করে। নিজের বয়সের কথা ভাবতে ভাবতে দুই হাত তুলে নিজের ছেঁড়া কামিজটাই শূণ্যে তুলেছে কাঁচার জন্য। তখনি দেখতে পেল, উত্তর পাড়ার মিলন তার দিকে ঢ্যাব ঢ্যাব করে তাকিয়ে আছে। কাকলী আর কোনো ছেলেকে কোনোদিন তার দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখেনি। সে ভাবতো কালো মেয়েদের কেউ পছন্দ করে না। কিন্তু মিলন তাকে পছন্দ করে? পছন্দ না করলে তাকিয়ে আছে কেন? ভাবতে ভাবতে সেদিনের মতো কাপড় ধুয়ে বাড়ি ফিরে কাকলী। পাশের বাড়ির হোসনা ভাবি একটা কাপড় নিয়ে এসে কাকলীকে বলল, “নৌকা ডুইব্বা সব কাপড় আর সাজুনি ভিজ্জা শেষ। আমার লাল কাপড়ডা পিন্দা যাবি জামাইর বাইত। আমি অলদি আনতাম যাই।”
কাকলী কাপড় হাতে নিয়ে বসে আছে। পাশের ঘরে বরপক্ষকে খেতে দেয়া হয়েছে। মজিবর মিয়া কোথা থেকে যেন একটা লুঙ্গি আর একটা পাঞ্জাবি এনে দিলো কামালকে। বাকিরা ভেজা কাপড়ে বসেই খাচ্ছে। ভাটিরচর এখান থেকে বেশি দূরে না। কোনো রকমে খেয়ে বিয়ে পড়ানো হলেই চলে যেতে চায় বর পক্ষ। মজিবর মিয়া কামালকে বলেছিল, পানি নেমে গেলে যেন বিয়ের আয়োজন করে। কিন্তু কামাল মিয়ার টাকার দরকার। গঞ্জে একটি দোকান খাড়া করতে হবে। এখন দোকান না নিলে অন্যজন এই জায়গায় দোকান করে ফেলবে। তাই তাড়াতাড়ি করে বিয়ের আয়োজন। বউ আনা হলো, সাথে দোকানটাও খাড়া করা হলো। হোসনা কাঁচা হলুদ কেটে নিয়ে এলো। সাথে পান খাওয়ার চুন। কাঁচা হলুদে কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে ছোট একটা গর্ত তৈরী হবে। সেই গর্তে অল্প চুন দিয়ে কাঠি দিয়ে নাড়লে একটা কাঁচা রং তৈরী হবে। সেই রং দিয়ে কাকলীর কপাল থেকে গাল অবধি ফোটা ফোটা কারুকাজে সাজানো হবে। হোসনা এসে কাকলীকে বলল, “তুই এহনো কাপড় পিন্দসনাই? জামাইর খাওয়া শেষ অইলেই বিয়া। তাড়াতাড়ি কাপড় পিন্দা আমার সামনে আয় সাজাই তোরে।”
কাকলী অনেক আগে থেকেই লম্বা কাপড় পরতে পারে। তার মা মারা যাবার পর মায়ের কাপড়গুলো একসময় পরে পুরাতন করেছে। সেই কাপড় দিয়ে কাঁথাও সেলাই করেছে। শীতের রাতে গায়ে দিলে মনে হয় কাকলী তার মা’কে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। হোসনা হলুদে আর চুনে রং তৈরী করতে করতে কাকলীর কাপড় পরা হয়ে গেছে। তারপর চোখ বন্ধ করে হোসনার সামনে বসে পড়েছে কাকলী। চোখ বন্ধ না করলে চুনের পানি চোখে যেতে পারে। হোসনা কাকলীকে সাজানো শুরু করেছে। আর কাকলী চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগলো, সকাল থেকে আজ সে কারো সাথে কথা বলেনি। এই ঘরটাতেই বসে আছে। শুধু আজ না, কয়েকদিন ধরেই এই ঘরটাই তার ঠিকানা। উঠান জুড়ে বন্যার পানি। কাপড় ভিজিয়ে কারো বাড়ি যাওয়ার চেয়ে ঘরে থাকাই ভালো। কাকলী আরো ভাবছে, আজ তার বিয়ে অথচ মিলন জানে না। কারণ মাস চারেক আগে এলাকার মানুষ মিলনকে এই চর খেকে বের করে দিয়েছে। গত চার মাস ধরে কাকলী একটিবারের জন্যও মিলনকে দেখেনি।
নদীর ধারে কাপড় ধোয়ার দিন যে মিলন ঢ্যাব ঢ্যাব করে তাকিয়ে ছিল কাকলীর দিকে। এর সপ্তাহ দেড়েক পর আবার দেখা হয়েছিল তাদের। চৈত্রের আগুন ঝরা রোদে মাঠের ঘাস পুঁড়ে যাবার অবস্থা। কাকলী সেদিন তার ছাগলটাকে ঘাস খাওয়াতে গিয়েছিল ক্ষেতের আইলে। ছাগলের গলার দড়ি কাকলীর হাতে। দড়ি ছাড়া ছাগল ছেড়ে দিলে মানুষের ক্ষেতের মাসের ডাল খেয়ে সাবার করে ফেলবে। ছাগল গরু আপন পর চিনে না। নিজের মালিকের জমি চিনে না। যেখানে খাবার পায় সেখানেই খেতে থাকে।
মিলন গঞ্জ থেকে ফেরার পথে কাকলীকে দেখতে পেয়ে হাঁটার গতি কমিয়ে দিলো। কাকলী মিলনকে দেখতে পেয়ে ঘুরে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। মাথার ওড়না লম্বা করে টেনে দিলো। মিলন কাছাকাছি এসে সরাসরি জিজ্ঞেস করলো, “তুমি দহিন পাড়ার মজিবর চাচার মাইয়া না? তুমি না কত্ত ছোডু আছিলা?” কাকলী ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে বলল, “মাইনষে হারাজীবন ছোডুই থাকব নাকি?” সেই যে এক কথায় দুই কথা শুরু হলো। এর পর থেকে রোজই কোনো ক্ষেতের আইলে বা নদীর পাড়ে তাদের দেখা হতো কথা হতো। চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকা হতো। কাকলী কতবার কাপড় ধরেই রাখতো, কাঁচতে ভুলে যেত। আবার লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিতো। মিলন গঞ্জ থেকে দুইবার প্লাষ্টিকের দুই গোছা চুড়িও এনে দিয়েছিল। হাতে দিয়ে বলেছিল, “গঞ্জেত্তে লইয়া আইলাম। আবার টেহা জমাইয়া শাড়িও কিন্যালামু। বিয়ার আগে সব জোগাড় কইরা রাহি।”
কাকলী সেদিন হাতে চুড়ি নিয়ে দৌড়ে বাড়িতে চলে এসেছিল লজ্জায়।
হোসনা কাকলীর সাজানো শেষ করে বলল, “দেইখ্যা আহি, জামাইর খাওয়া কদ্দুর।” কাকলী এবারও কোনো কখা বলল না। সে যেন কেমন পাথর হয়ে আছে। সে নিজেও জানে না কষ্টে আছে না আনন্দে আছে। সে জানে না তার আনন্দে থাকা দরকার না কেঁদে বুক ভাসানো উচিত। বাবা তার বিয়ে দিতে পেরে আনন্দিত। কিন্তু কাকলীর মনটা কারো জন্য পুঁড়ে? মিলনকে যেদিন এই চর থেকে বের করে দেয়া হয়, সেদিন শেষ দেখাও দেখতে পারেনি কাকলী। আগেরদিন রাতে মেম্বারের বাড়িতে ডাকাতি হয়েছিল। সামুগ্রাম এলাকার ডাকাত সব। ডাকাতি করে যাবার সময় দুইজন ধরা পড়ে নদীর ঘাটে। সেই দু’জনের মধ্যে একজন মিলন।
মিলনই সামুগ্রামের ডাকাতদের এই মেম্বারের বাড়িতে নিয়ে এসেছিল রাতের বেলা। মেম্বার বাড়ির উঠানে দুইজন দাঁড়িয়ে ছিল রাম দা নিয়ে। বাকি তিনজন ঘরে ঢুকেছিল। মেম্বারের গলায় একজন দা ধরে রেখে বাকি দু’জন যা যা নেবার দরকার নিয়েছিল। সবারই গামছা দিয়ে মুখ বাঁধা। কিন্তু ধরা পড়ার পর মুখ থেকে গামছা সরিয়ে দেখা গেল একজন সাসুগ্রামের আরেকজন স্বয়ং মিলন। এলাকাতে আগে ছোটো খাটো চুরি করতো মিলন। এই কথা কাকলী কখনো জানতে পারেনি। কিন্তু মেম্বারের বাড়ির ডাকাতির পর পুরো চরের মানুষই জানতে পেরেছে। হাত দুটো পেছনে নিয়ে কুরবানির গরুর মতো বেঁধে তিন চারজন মিলে পিটিয়ে শেষে দুইজনকে ছেড়ে দিয়েছে। জান ভিক্ষা দিয়ে মিলনকে বলে দেয়া হয়েছিল, আর কোনোদিন যদি মিলনকে এই চরে দেখা যায় তাহলে চরের মানুষ পিটিয়ে মেরে ফেলবে। সেই থেকে বিগত চার মাস আর মিলনকে কেউ এই চরে দেখতে পায়নি।
বিয়ে সম্পন্ন হতে হতে তবুও বিকেল গড়িয়ে গেল। কাকলী তার বাবা’কে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ নিঃশব্দে কেঁদেছিল। বিয়ের কনেরা বাবার বাড়ি ছেড়ে যাবার সময় একটু শব্দ করেই কাঁদে। কাকলী শুধু চোখের জল ফেলল। কোনো শব্দ করলো না। কাকলীর বাবা মজিবর মিয়া তার নৌকাটি সাথে করে দিয়ে দিলো। মাচাহীন ছোট নৌকায় করে এসে এমনিতেই একবার নৌকা কাত হয়ে ডুবেছে। দ্বিতীয়বার যেন এমনটা না হয়, তাই নৌকাটি সাথে দিয়ে দিলো। সাথে গেল মিজান। যে বর পক্ষের নৌকা ডুবে যাবার খবর বলেছিল। মিজানকে পাঠানো হচ্ছে যেন মজিবর মিয়ার নৌকাটি ফেরত আনতে পারে। মজিবর মিয়ারও এই নৌকাটিই সম্বল। ফসল বন্যার পানিতে ডুবে যাবার পর এই নৌকা দিয়েই মজিবর মিয়া বরা পেতে মাছ ধরে। দু’বেলা খেয়ে তো বাঁচতে হবে। নৌকা ছাড়তে ছাড়তে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার উপক্রম।
পাশাপাশি দুইটা নৌকা যাচ্ছে। সূর্য্য আকাশ থেকে আড়ালে চলে গেছে। কাকলী এখন আর কান্না করছে না। হোসনা ভাবীর দেয়া লাল কাপড়টির ঘোমটা টেনে বসে আছে। যাচ্ছে অচেনা কারো বাড়িতে। হঠাৎ একটা ইঞ্জিনের নৌকা ছুটে আসছে এদিকে। দূর থেকে নৌকা দুটিকে থামতে বলা হচ্ছে। মাঝি বৈঠা মারতে সাহস পাচ্ছে না। ইঞ্জিনের নৌকায় সাত আটজন মানুষ দেখা যাচ্ছে। সবার হাতে রামদা আর ছুড়ি। তবে কারো মুখ গামছা দিয়ে ঢাকা নেই। মনে হচ্ছে খুব সাহসী ডাকাত। কাউকে ভয় পায় না তারা। তাই নিজেদের আড়াল করার প্রয়োজন নেই। ইঞ্জিনের নৌকাটি কাছে চলে এলো। ইঞ্জিন বন্ধ করে দুইজন বর পক্ষের নৌকায় চলে এলো। দা উপর দিকে তুলে একজন বলে উঠলো, “ঐ কেউ চিল্লাবি না। লগে যা আছে সব দে। নগদ টেহা, স্বর্ণ যা আছে দে একজন কইরা।”
ভয়ে ভয়ে এক এক করে সবাই সবকিছু দিচ্ছে। কামালের চাচার কাছ থেকে টাকার থলেটিও কেড়ে নেয়া হলো। যে টাকাটা কাকলীর বাবা মজিবর মিয়া দিয়েছিল। হঠাৎ একজন কাকলীর কাছে এসে বলল, “এই নতুন বউ, নাক কান খালি কইরা সব দে।” কাকলীর গলায় তার মায়ের একটা চেইন আর কানে দুইটা ছোট ঝুমকা। কামাল পাশ থেকে বলল, “দেও তাগাতাড়ি, বাইচ্যা থাকলে জিনিস পাওয়া যাইবনে।”
কাকলী কানের ঝুমকা আর গলার চেইন খুলে ডাকাতটির হাতে দেয়ার সময় অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এই চোখ দুটির দিকে কাকলী দিনের পর দিন তাকিয়েছিল। কখনো লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিত। আর এখন তাকিয়ে আছে ঘৃণা নিয়ে। ডাকাত লোকটিও মিনিট খানেক তাকিয়ে থেকে ইঞ্জিনের নৌকায় চলে গেল। ইঞ্জিন চালু করে নৌকাটি এগিয়ে যাচ্ছে। চারিদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে অন্ধকার হচ্ছে। কাকলী যেন তবুও সেই ডাকাতটির চোখ জোড়া দেখতে পাচ্ছে। ডাকাতটি আর কেউ নয়, উজানচর থেকে বিতাড়িত হওয়া সেই মিলন। কাকলীর চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে। এবারও কাকলী শব্দ করে কাঁদল না। কিছু কান্নার কোনো শব্দ নেই। এটাকে তবে বোবা কান্না বলা যেতে পারে।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত