আম্মু সমগ্র

আম্মু সমগ্র
কয়েকদিন আগে মুখ কালো করে আম্মুকে বললাম, “আম্মু আমার মন খারাপ!”আম্মু তখন সোফায় বসে সিআইডি দেখছেন। আমার কথা তিনি কানেও তুললেন না। আমি আবার বললাম, “আম্মু শরীরে জ্বর আছে কি-না হাত দিয়ে একবার দেখবে? শরীরটা ভালো লাগছে না।” আম্মু ইশারায় হাত দিয়ে পাশে বসতে বললেন অথচ টিভি থেকে চোখ সরালেন না। আমি বললাম, “মুখের ভিতরে ব্যথা করছে। কিছু খেতে পারছি না।” টিভির রিমোর্ট হাতে নিয়ে আম্মু কৌতূহলী চোখে ভলিউম বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “শেষপর্যন্ত দেখা যাবে এই মেয়েটা খুন করেনি অথচ একে সবাই মিলে এখন সন্দেহ করছে।” আমি বিরক্ত হলাম। কিছুক্ষণ পর টিভি এ্যাড শুরু হল। আম্মু বললেন, “হ্যাঁ বল, কী জানি বলছিলি!”
“ইদানীং তুমি আমার কথার গুরুত্ব দাও কম। কেন বলো তো, জ্বরের বিষয়ের চেয়ে তোমার সিআইডি দেখা বেশি হয়ে গেল?”
“ব্যস্ত থাকি, তুই ব্যস্ত থাকিস না? তোর লেখালেখির সময় তো তুই রুমেও যেতে দিস না। তা কার জ্বর? তোর কোনো বন্ধুর? আমি তো আর ডাক্তার না!”
“লেখালেখির সাথে সিআইডি দেখার তুলনা হয় না, দু’টো আলাদা বিষয়।”
“কেন হবে না, আমি বরং তোকে প্রতিদিন সিআইডি দেখতে সাজেস্ট করব, সারাক্ষণ প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে গল্প না লিখে তাহলে কিছু থ্রিলার লিখতে পারবি।”
“আমি সারাক্ষণ প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে লিখি?”
“অবশ্যই, কী জানি একটা মেয়ে আয়েশা ফায়েশা নাম। তাকে নিয়ে লিখিস। আর তো নতুন কিছু দেখি না।”
আমার বিরক্তির সীমা তখন অতিক্রম করেছে। আর অপেক্ষা না করে নিজের রুমে চলে এলাম। বিকেলে জ্বর বাড়লো, সাথে মুখের ফোস্কার ব্যথা। কিছু মুখে দিতে পারছিলাম না যন্ত্রণায়। আম্মু একবাটি স্যুপ এনে পাশে রেখে বললেন, “চাপচে স্যুপ নিয়ে ফুঁ দিবি, তারপর ঠাণ্ডা হলে গলায় ঢেলে দিবি। তাহলে ব্যথা পাবি না, পেটও ভরবে।”
“আমি কিছু খাব না।” – বলার জন্য বলা। ক্ষুধায় আমার পেটের নাড়িভুঁড়ি এক হয়ে যাচ্ছিল। আম্মু বললেন, “না খেলে তুই কষ্ট পাবি আমার তো কিছু না। করোনা কমেনি, ডাক্তারের কাছে যেতে পারব না। তাছাড়া তোর গায়ে আহামরি জ্বর নেই।”
আমার শরীরে হাত না দিয়ে আম্মু জ্বর নেই এটা কীভাবে বুঝলেন আমার মাথায় এল না। তার ব্যবহারে খুবই কষ্ট পেলাম। আগে এমন তিনি ছিলেন না, এখন কেন আমার সাথে এইধরনের আচরণ করছেন? আমি সত্যি সত্যি দীর্ঘ সময় নিয়ে গলায় চামচের সহযোগিতায় ধীরে সুস্থে স্যুপ খেলাম। নাপা খেয়ে জ্বর কিছুটা কমলো। তবে মুখের ব্যথা আগের চেয়ে বাড়লো। অন্য খাবার খাওয়া হচ্ছে না, তার চেয়েও বড় সমস্যা চা-কফি খেতে পারছি না। দুপুরে ভাত খেতে গিয়ে চোখে জল চলে এল। আম্মু বললেন, “এতবড় একটা ছেলের ভাত খাওয়ার সময় চোখে পানি, দেখতে কী খারাপ লাগছে জানিস?”
“না জানি না, আমার জেনে কাজ নেই।”
“ব্যথা দু’একদিন থাকবে। একজন ডাক্তারের সাথে কথা হয়েছে। বিকেলে একটা মলম এনে দেব।”
“আমার কোনো চিকিৎসার দরকার নেই। তোমার সিআইডি চলছে না? সিআইডি দেখো।”
আম্মু আমার পাশের চেয়ারটা কাছে টেনে বসে বললেন, “একটা সময় ছিল যখন তোর বই বের হয়নি, ফেসবুকে প্রতিদিন আমাকে নিয়ে একটা পোস্ট থাকতো। এখন আর থাকে না কেন?”
“একটা বই বের হয়েছে, আরো বের করব, সেই লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকি।”
“এই জিনিসটা আমার খুব খারাপ লাগে। আগে লিখতি এখন কেন লিখবি না? মাসে দু’একটা পোস্ট দিস তাও ওই আয়েশা মেয়েটাকে নিয়ে। কোনোদিন তো তাকে দেখিনি। শুধু কল্পনা করে গেলাম। মেয়েটা দেখতে কেমন?”
“ভালো।”
“দেখতে সুন্দরী? নাকি আমার মতো শ্যামলা?”
“তোমার সাথে তুলনা আসছে কেন?”
“তুলনা তো করিনি। গায়ের বর্ণ কেমন জানতে চাইতে পারি না?”
“না এই ধরনের প্রশ্ন ভালো লাগে না।”
“মেয়ের মাথায় চুল কেমন, লম্বা কেমন?”
“আয়েশা নামে কেউ নেই আম্মু। এটা শুধু কল্পনা!”
“মিথ্যা বলবি না। আমার মিথ্যা কথা খুব অপছন্দ!”
“কীভাবে বুঝলে আমি মিথ্যা বলেছি?”
“মিথ্যা কথা বলার সময় তোর চোখ পিটপিট করে, নিচের দিকে তাকিয়ে কথা বলিস।”
“আমি খেতে পারছি না আম্মু, মুখে ব্যথা করে।”
“আয়েশা ছেমরির কাছে যা, ভাত মাখিয়ে মুখে তুলে দিবে। ব্যথা ট্যথা লাগবে না, সব ভুলে যাবি।”
“এগুলো কেমন ধরনের কথা?”
“এটাই সোজাসাপটা কথা। স্পষ্ট করে বলবি, আয়েশা কে? কোথায় থাকে? মেয়ের গায়ের রঙ কী?”
“আমি কিছু জানি না।” – এটুকু বলে চলে এলাম। আমার দুপুরের খাবার হল না। মুখে ব্যথা কমলো না। শরীর ভীষণ খারাপ করলো। আম্মু আমার সামনে কেয়ারলেস ভাব নিয়ে থাকলেও রাতে কয়েকবার এসে কপালে হাত দিয়ে জ্বর দেখে যেতেন সেটা টের পেলাম। কাল বহুদিন পর তার সাথে সিআইডি দেখতে বসলাম। তিনি বললেন, “ব্যাপার কী?”
“টিভি দেখতে মন চাচ্ছে, ভাবছি সত্যি সত্যি থ্রিলার লেখা শুরু করব।”
“সেদিন মিথ্যা বলেছিলাম, তোর লেখা খারাপ না। প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে লিখলেও ভালো লিখিস।”
“মিথ্যা কেন বলেছিলে?”
“কতদিন আমাকে নিয়ে লিখিস না। আজকাল তোর লেখক বন্ধু, পাঠক বন্ধু, সোসাল মিডিয়ার বন্ধু, রিয়েল লাইফ বন্ধু সবাইকে সময় দিস শুধু আমাকে ছাড়া।” আমি হেসে বললাম, “আয়েশার কথা তো আজ বললে না?”
“ওই ছেমরির কথা বলবি না।”
“কেন, সে তো আমার ভালোবাসা!”
“ছেমরির গায়ের রঙ কী?”
“আমি বুঝতে পারছি না, তুমি সবার আগে গায়ের রঙ কেন জানতে চাচ্ছ।”
“তাইলে কী জানতে চাইব? কিছুই তো বলিস না।”
“ছেমরি বলিও না আম্মু, শুনতে খারাপ লাগে।”
“ছেমরিকে ছেমরি বলব না তো কি ছেমরা বলব?”
“আম্মু।”
“কী?”
“আয়েশাকে তুমি পছন্দ করো না?”
“আয়েশাটা কে?”
আমি নিঃশ্বাস ছাড়লাম। আম্মু টিভির দিকে তাকিয়ে বললেন, “এখন দেখবি এখানে খুন হবে, সাথে সাথে সিআইডি উপস্থিত! আমি কিন্তু আগেই আঁচ করতে পারি কে শয়তান।” আমি বললাম, “তুমি টিভি দেখ, আমার ঘুম পাচ্ছে।” আমি চলে আসার সময় শুনলাম আম্মু বলছেন, “বললি না কিন্তু ছেমরির গায়ের রঙ কেমন!” যখন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম তখন একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম! হালকা অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে আম্মু আর আয়েশা একটা বিশাল ডাইনিং টেবিলের দু’প্রান্তে দু’টি চেয়ারে বসা। টেবিলের উপরে আমাকে হাত-পা বেঁধে বসিয়ে রাখা হয়েছে। মুখ টেপ দিয়ে লাগানো। আম্মু বললেন, “এই ছেমরি, এই!” আয়েশা বলল, “আমাকে ছেমরি বলবেন না। আমি ভদ্র পরিবারের মেয়ে।”
“কেমন মেয়ে তা তো জানি, আমার ছেলেকে ফাঁসিয়েছিস। এখন তার হাত-পা বেঁধে রেখেছিস।”
“আজেবাজে কথা বলবেন না। আমি আপনার ছেলের হাত-পা বেঁধে রাখিনি। সে নিজেই নিজের হাত-পা বেঁধেছে। আর মুখে আপনি টেপ লাগিয়েছেন।”
আমি গোঙানির মতো শব্দ করে বলতে চাইলাম, তোমরা ঝগড়া করো না প্লিজ। কিন্তু স্বপ্নে মুখ থেকে কথা বেরুল না। আম্মু বললেন, “তোর গায়ের রঙ তো ময়লা। কীভাবে আমার ছেলেকে ফাঁসালি?” আয়েশা বলল, “আমি মাশাল্লাহ সুন্দর আছি। আপনিই প্রথম নারী যে আমাকে কালো বললেন।” “তুই যে সারাক্ষণ মেকাপ করে থাকিস, সেটা শুধু আমি ধরতে পেরেছি। আর কোনো নারী পারেনি, তাই আমি সত্যি বললাম।” আয়েশা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার মায়ের সাথে আমার আর কোনো কথা থাকতে পারে না।” আমি টেবিলের উপর ছটফট করছি, আম্মু মিটমিটিয়ে হাসছেন। আম্মু বললেন, “ছেমরি বস! তোর প্রেমিকের মুখে ফোস্কা পরছে,
তারে ভাত খাইয়ে দিয়ে তারপর যা। সে এখন তোর হাতের ভাত ছাড়া খাবে না।”
“আমাকে ছেমরি ডাকবেন না। আমার নাম, আয়েশা। আয়েশা নামে ডাকবেন।”
“ছেমরি, ছেমরি, ছেমরি! তুই একটা ছেমরি!”
আয়েশা কেঁদে ফেলল। আমি তখনও টেবিলের উপর ছটফট করছি। আম্মু বললেন, “খবরদার কাঁদবি না, আমার ছেলের মুখে মলমটা লাগিয়ে দিয়ে তারপর যা।” আয়েশা কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলল, “কীসের মলম?” “ওর মুখে ফোস্কা পরেছে কতবার একটা কথা বলব?” আয়েশা ফোপাঁতে ফোপাঁতে ভ্যানিটিব্যাগ থেকে একটা লাল গোলাপ বের করল। তারপর বলল, “মলম লাগবে না, এই ফুল ওর মুখে ছোঁয়ালে ব্যথা কমে যাবে।” আম্মু দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে বললেন, “ওরে পিরিত! পুরাই তো বাংলা সিনেমা চলছে।” আয়েশা গোলাপ ফুল আমার মুখে ছোঁয়ানোর আগেই মোবাইলের ভাইব্রেটে আমার ঘুম ভেঙে গেল। রিসিভ করার সাথে সাথে আয়েশা বলল, “তোমার সাথে আমার কিছু জরুরি কথা আছে।” আমি ঘুম চোখে বললাম, “কী কথা!”
“আমি কিছু গোলাপ কিনতে বাইরে বের হব, তুমি কি একবার এইদিক টায় আসতে পারবে।” আমি উঠে বসে বললাম, “ফোস্কা ভালো হওয়ার লাল গোলাপ?”
“আমি তোমার কথা বুঝলাম না। কী ভালো হওয়ার গোলাপ?”
“না কিছু না। একটা খারাপ স্বপ্ন দেখেছি।”
“আচ্ছা ঠিকাছে, বিকেলে বের হতে পারবে?”
“পারব।”
বিকেলে বের হওয়ার সময় দেখলাম আম্মু সিআইডি ছেড়ে চা খাচ্ছেন। আমি কোথায় যাচ্ছি জানতে চাইলেন না। শুধু বললেন, “অভিজিৎ আর দায়া যাকে খুনি ভাবছে, ও আসলে খুন করেনি। পুরো কাহিনীটার শুরু হয়েছে গোলাপ ফুল নিয়ে। এই লাল গোলাপ যার হাতে ছিল সেই আসল খুনি।”
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত