ত্যাগ

ত্যাগ
৪বছর সংসার করার পর,ডিভোর্স দিলাম সুরাইয়াকে। আমার ছোট্ট মেয়েটাকে কোলে নিয়ে বাড়ির দিকে ফিরছি, অনেক কান্না করেছিলো মেয়েটা । মেয়েটার বয়স তখন দেড় বছর। একটু আকটু কথা বলতে শিখেছিলো । আমি সে দিন সুরাইয়া’কে ডিভোর্স দিতে একটুও কষ্ট হয়নি। যখন ডিভোর্সের কাগজে সাক্ষর করছিলাম, তখন সুরাইয়া আমাকে বলে, “আমাদের মেয়েটার দিকে একবার ভেবে দেখো। আমি চলে গেলে, মেয়েটা মা পাবে না। আমার মতো কেউ ভালবাসবে না” আমি সে দিন হাসি দিয়ে বলেছিলাম, মেয়েটাকে নিয়ে আমি দিব্বি ভালো থাকবো। সে কোনদিনও তোমার নামটাও জানতে চাইবে না। আমি সেই দিন ডিভোর্স দিয়েছি। আমাদের বিয়ের কাবিন ছিলো ১লাখ, আমি জমি কিনবো বলে, টাকা রেখেছিলাম তা দিয়ে দিলাম সুরাইয়া’কে ।
আদলতের বিচারক মেয়েটাকে সুরাইয়ার কাছেই রাখতে বলছে। সুরাইয়া সে দিন বলেছিলো, আমার ডিভোর্স হয়েই গেলে। তার মেয়ে আমি কি করবো? আমার প্রয়োজন নাই। মেয়ে ওর কাছেই থাকুক। সুরাইয়ার এই কথা গুলো, এটাই বুঝাতে চাইছে। মেয়ে নিবে, যদি তাকে নিয়ে থাকি। আমার মেয়ে ওর লাগবে না। সব কিছুর পরও সেদিন ডিভোর্স দিয়ে দিলাম। বাড়ি ফেরার পথে, পার্কে গিয়ে বসলাম, অনেক কান্না করলাম। অনেকে আমাকে, বলেছিলো মেয়েটার মা মারা গেছে নাকি? আপনি মেয়েটা নিয়ে চোখ দিয়ে পানি ফেলেই যাচ্ছেন কেন ? পার্কে মেয়েটা কান্না করতে করতে কোলো ঘুমিয়ে গিয়েছে। অনেক ভাবলাম তখন, আমিই দোষী নাকি? ২বছর ভালবাসার পর বিয়ে করেছিলাম। একটা ভালো চাকুরীও করি। অনেক ভালবাসার পর বিয়ে। সুখেই জীবন কাটতেছিলো, বিয়ের প্রায় ২বছর পর, একদিন অফিস থেকে বাসায় ফিরলে সুরাইয়া বলে আমাদের সন্তান হবে। বাবা হওয়ার আনন্দ যে কতটা মধুর, যে প্রথম বাবা হওয়ার খবর শুনে সে বুঝে।
কথা শুনে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। বাচ্চাটা পেটে আসার পরই সুরাইয়াকে অনেক যত্ন করতাম। মা’কে বলেছিলাম সুরাইয়া খেয়াল রাখতে। বাবা, ভাই বোন কেউ ছিলো না। বাবা মারা যাওয়ার পর, মা আমাকে ও আমার বড় ভাইকে অনেক কষ্টে বড় করেছিলো। বাবার রেখে যাওয়া টাকা থেকে ব্যাংক আমাদের মাসিক মুনাফা দিতো ৩হাজার। কিছু ধানের জমি ছিলো ওটা লোক দিয়ে করিয়ে ধান ফলাতো। আমার খাবারের চাউল হতো ওই গুলো। শহরে চলে আসলাম চাকুরী পাওয়ার পর। সুরাইয়ার কেমন জানি হয়ে গিয়েছিলো। মেয়ে হওয়ার পরই, মায়ের সাথে অনেক খারাপ আচরণ করতে শুরু করলো, অফিস থেকে বাসায় ফিরে দেখতাম মায়ের সাথে এটা ওটা নিয়ে লেগে থাকতো। আমাকে কিছু বলতো না দুজনই। আমিও জানতে চাইতাম না। তাদের বুঝ অবুঝ ওরাই বুঝবে। কিছুদিন পরই একদিন সুরাইয়া আমাকে বলে, “আমি তোমায় মায়ের সাথে আর থাকতে পারবো না। ওনাকে গ্রামে পাঠিয়ে দাও ” কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম তখন, “আমার মা থাকলে কি সমস্যা? “
সুরাইয়ার জবাব ছিলো এমন, ” আমাকে নিয়ে এই বাসায় থাকতে চাইলে মা’কে গ্রামে পাঠিয়ে দাও আর মা এই বাসায় থাকলে আমাকে আলাদা বাসা নিয়ে দাও। তবুও তোমার মায়ের সাথে থাকবো না। তা না পারলে, আমি ডিভোর্স চাই। তোমার মায়ের দায়িত্ব তোমার একার না। ভাইও আছে ” “তোমার ভাই যদি তোমার মাকে না দেখে কি করবা? সবার মা সবার কাছেই দামি ” উত্তরটা এমন ছিলো, “আমার মা’কে কিছু করলে আমি এই বাসায় আনবো। আমার মা’কে তুমিই পালতে হবে ” “আজ তোমার মাকে আলাদা রাখার কথা বলতে পারতে না। তাহলে আমার মায়ের সাথে কেন এত অভিযোগ?
সুরাইয়া বললো, “তোমার স্বীদ্ধান্ত কি করবা? মা’কে আলাদা করবা নাকি আমাকে? নাকি আমাকে ডিভোর্স দিবা?” আমি সেই দিন মুহূর্তে স্বীদ্ধান্ত নিলাম, আর বললাম, “মায়ের সাথে থাকতে না পারলে। তোমাকে আর রাখতে চাই না। ডিভোর্স দিবো ” সেও রাজি হয়ে যায়। কিছুদিন পরই সুরাইয়াকে ডিভোর্স। সেইদিন মাও চেয়েছিলো গ্রামের বাড়ি খাগড়াছড়ি চলে যেতে। কুমিল্লায় সুরাইয়া বাবার বাসা। এখানে চাকুরীর সুবাদে তার সাথে পরিচয় প্রেম হয়। বিয়ে করে এখানেই থাকা।৷ আমার ফ্লাটে আমার মা থাকবে। এমন স্ত্রী চাই না। সেইদিন ডিভোর্স দিয়ে বাসায় ফিরলে, মা বললো রাগ করে এইসব করা ঠিক হয়নি। মা অনেক আদর যত্ন করতো। মেয়েটাকে দেখা শুনা করতো।
গ্রামে বড় ভাই জমিতে চাষ করে, আর একটা ছোট মুদি দোকানও আছে। আমিই দোকান দিতে টাকা দিয়েছি। আমার ভাইয়ের ছেলে মেয়ে সংসার বেশি কষ্ট হতো চালাতে। তাই মা’কে আমিই রাখি। মাসে মাসে কিছু টাকা দিতে হয় বড় ভাইকে। ভাই যদিও মাকে নিয়ে থাকতে চাইতো, আমি বললাম, শহরে আমি একা। তাই মা সাথে থাকুক।
সবাই অনেক মিলেমিশে থাকি। হঠাৎ সংসারে অশান্তি আসার আগেই সুরাইয়াকে বিদায় দিলাম। যে মা এত কষ্ট করে বড় করলো, তাকে দূর করার চেয়ে ওই নারীরই দূরে থাকুক। কিছু দিন পরই, একটা এতিম মেয়ে বিয়ে করলাম। অনেক ভাল আর ভদ্র, আমার অফিসেই চাকুরী খোঁজে করতে এসেছিলো। কথা শুনে সেইদিন ভালো লেগেছিলো। সব ঠিকানা জেনে মা’কে নিয়ে তার সাথে কথা বলে বিয়ের প্রস্তাব দিলাম। আমার সকল কিছু বুঝিয়ে বলেছি।
বিয়ে করে নিলাম সানজিদাকে। বিয়ের পর জানলাম সে হাফেজাও, হিফজ্ শেষ হওয়ার পর, মাদ্রাসা পড়াশোনা করে। তারপর কলেজে ভর্তি হয়ে, নিজের খরচ নিজে চালাতো। পড়াশোনা শেষ করে, নিজের একটা ঠিকানা হয়তো বানাতে চেয়েছিলো। সুরাইয়াকে ডিভোর্স দেওয়ার সাড়ে তিনমাস পরই সানজিদাকে বিয়ে করলাম। এতিম হওয়ায়, আমার মা’কে মায়ের মতোই ভালবাসতো। আমার মেয়েটা যেনো তারই মেয়ে এমন ভাবে দেখাশোনা করতো। মেয়েটাও বড় হয়ে সানজিদাকেই মা বলে ডাকে। বিয়ের ৩বছর পর সানজিদা মা হয়। আমাদের সুখের নীড়ে আসে, একটা ছেলে সন্তান। দু-ছেলেমেয়ে নিয়ে আমাদের সংসার ভালোই চললো। কিভাবে ২০টা বছর কেটে গেলো জানি না! আমার মেয়ের যখন ৭বছর বয়স তখন আমার মা আমাদের ছেড়ে, দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলো।
মেয়েটাকে নিজের মায়ের মতো ভালবাসি। আজকে এই মা আমাকে ছেড়ে যাচ্ছে নতুন ঘরে। আজকে আমাদের মেয়ের বিয়ে। এই ২০বছরে সে আজও জানে না, তার মায়ের নাম সুরাইয়া ; সানজিদা যে তার জন্ম দেয়নি। সে এটাই জানে সানজিদা তার মা। কোনদিন বুঝেনি, আর সানজিদা কখনো অপরের মেয়ে ভাবেনি। একটু পরই মেয়েটা বিদায় নিয়ে যাবে শ্বশুরবাড়ি। সানজিদা এতটাই ভালবাসা দিয়ে ছিলো, আমাদের সংসার যেনো স্বর্গ হয়েছিলো। সানজিদা আমাকে উল্টো বলেছিলো, যেনো কখনো মেয়েকে এটা না বলি, তার সৎ মেয়ে। আল্লাহ হয়তো মায়ের জন্য, ত্যাগ করাটা পছন্দ করেছিলো। তাই রহমত করে এমন স্ত্রী আমাকে দিয়েছিলো। এটাই সত্য, ত্যাগ করলে ভালো কিছু হবেই।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত