টুয়েন্টি ফোর ক্যারাট

টুয়েন্টি ফোর ক্যারাট
বাটিতে থাকা বাকি পুঁইশাকটুকুও প্লেটে তুলে নিয়ে বললাম, “সরি তিথি, এই জিনিসের ভাগ আর কাউকে দিতে ইচ্ছা করছে না। আমার ক্ষমতা থাকলে এই রান্নাটা করার জন্য তোমার হাত আমি সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে দিতাম। প্লেটিং করার সস্তা গোল্ড না, টুয়েন্টি ফোর ক্যারাট গোল্ড দিয়ে বাঁধিয়ে দিতাম!” তিথি চোখ সরু করে আমার দিকে তাকালো। সেই দৃষ্টিকে পাত্তা দেয়া যাবে না। টেবিলে আরো তিন চারটা আইটেম আছে। এই প্রতিটার জন্যই তিথির হাত স্বর্ণ দিয়ে বাঁধিয়ে দেয়া যাবে আমি জানি। তার রান্নার হাত অতি চমৎকার। খেতে খেতে বললাম, “তুমি দাঁড়িয়ে থেকো না প্লিজ। একটা প্লেট নিয়ে বসে যাও। তোমাকে রেখে খেতে ইচ্ছা করছে না।” তিথি বললো, “আমার খিদে নেই।”
“খিদে নেই এটা কেমন কথা! দুপুর দুটায় একজন মানুষের খিদে থাকবে না? যাও আরেকটা প্লেট নিয়ে আসো!”
“আমি মাসুমের সাথে লাঞ্চ করি। ও আসার পর। সাড়ে চারটার আগে না।”
আমি একটু থমকে গেলাম। তিথি প্রতিদিন মাসুমের সাথে লাঞ্চ করে। খাবার নিয়ে অপেক্ষা করে। মাসুম অফিস থেকে ফেরে, ফ্রেশ হয়, তিথি টেবিলে খাবার সাজিয়ে অপেক্ষা করে। মাসুম টাওয়েল দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে চেয়ারে বসে বলে, “আর বোলো না, বস আজকে এতো যন্ত্রণা করেছে!” তিথি বলে, “আগে খেয়ে নাও তো, তার আগে কোনো কথা শুনবো না!” দৃশ্যটা কল্পনা করে বুকের ভেতরে কোথায় যেন একটু ব্যথা করে উঠলো! তিথি প্লেট আনে নি, তবে সে বসেছে। আমার মুখোমুখি বসে আছে। খেতে খেতে আড়চোখে তিথির দিকে তাকালাম। আড়াই বছর পর দেখছি, অথচ মনে হচ্ছে সেদিনও ঠিক এমনই ছিল দেখতে! মুরগী ভুনার বাটিটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে সে বললো, “কয়দিনের ছুটিতে এসেছো?”
“একমাস।”
“ঢাকায় কবে পৌঁছেছো?”
“গতকাল রাতে।”
তিথি আর কিছু বললো না। আড়াই বছর পর বিদেশ থেকে এসে পরদিনই প্রাক্তন প্রেমিকার বাসায় চলে আসাটা সম্ভবত বুদ্ধিমানের কাজ হয় নি। আস্তে করে বললাম, “তোমাকে দেখতে ইচ্ছা করছিলো। তাই চলে এসেছি।”
“তোমার বউ জানে তুমি এখানে এসেছো?”
“জানে তো। সকালে ফোন করে বলেছি, গুড মর্নিং ডার্লিং। আজকে যার সাথে দেখা করতে যাবো তার প্রতি তোমার সারাজীবন থ্যাংকফুল থাকা উচিত। এই মেয়ে আমাকে বিয়ে করে ফেললে তুমি এতো চমৎকার একজন পুরুষের সাথে জীবন কাটাতে পারতে না!” বলে আমি হো হো করে হেসে ফেললাম।
তিথি সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, “তুমি জানো না তুমি একজন ভয়ংকর বিরক্তিকর মানুষ।”
আমি ঘাবড়ালাম না। সুন্দরী মেয়েরা বিরক্ত হতে পছন্দ করে। তিথির মতো সুন্দরী মেয়েদের বিরক্তির কারণ হতে পারলে পৃথিবীর যেকোনো পুরুষ বর্তে যাবে। বললাম, “তিথি শোনো, তোমার মুরগী ভুনাও অতি চমৎকার হয়েছে। তোমার কি কোনো সিক্রেট রেসিপি আছে? ফিরে গিয়ে বউকে রেসিপিটা বলবো। অবশ্য পারবে বলে মনে হয় না। বাঙালি মেয়েদের মধ্যে রান্না করার একটা ইনট্রিনসিক কোয়ালিটি থাকে। যে মেয়ে জীবনে রান্নাঘরে যায়নি সেও রান্নাঘর থেকে বের হবে বাটিভর্তি অমৃত নিয়ে। বিদেশিনীরা এইসব পারে না। তবু বলে দেখলাম আর কী!”
“তোমার বউকে ফোনে ধরিয়ে দিও। আমি বলে দেবো।”
“তথাস্তু!”
তিথি আরেক পিস মুরগী আমার প্লেটে তুলে দিলো। আমি অতি আনন্দের সাথে সেইটা খাওয়া শুরু করলাম। আবার কবে তিথির রান্না খাওয়ার সৌভাগ্য হবে আমি জানি না। তৃপ্তি করে খাওয়া শেষ করলাম আমি। শব্দ করে ঢেঁকুর তুলে বললাম, “শুকুর আলহামদুলিল্লাহ। তিথি, তুমি অনেক সুখী হবা, আল্লাহ তা’আলার কাছে আমি তোমার জন্য বিশেষ মোনাজাত করবো!” তিথি ফিক করে হেসে ফেললো। হাসতে হাসতেই বললো, “এক্সট্রা মোনাজাত লাগবে না। আমি এমনিতেই অনেক সুখে আছি!” আমিও হেসে ফেললাম।
“তুমি অনেকদিন পর এমন তৃপ্তি করে খেলে, তাই না?”
“হুঁ।”
“যারা বিদেশে একা একা থাকে তারা কিন্তু একটা সময় ভাল রান্না শিখে যায়। তুমি এখনো শিখতে পারো নি?”
“আমি ভাল রাঁধতে পারি। কিন্তু নিজের রান্না নিজে খেয়ে তৃপ্তি পাওয়া যায় না। আমার বউ বাঙালি রান্না এখনো ভাল শিখতে পারে নি।”
“বুঝেছি।”
একটু সময় বিরতি নিয়ে বললো, “আর কতো বছর এইভাবে একা একা থাকবে? বিয়েটা করে ফেলো না, প্লিজ!”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “বিয়ে তো করেছিই!”
“করোনি। মিথ্যা বলে কী লাভ?”
“বউয়ের গল্প করি না তোমার কাছে? বানিয়ে বানিয়ে বলি সেগুলি?”
“আমার ধারণা বানিয়ে বানিয়েই বলো। বিয়ের দুইবছর পরেও কেউ যখন গল্প করে তখন বারবার আমার বউ আমার বউ বলে গল্প করে না। এখনো পর্যন্ত একবারও তুমি আমাকে মেয়েটার নাম বলোনি।” আমি হাসলাম। বললাম, “তিথি, তুমি অতি বুদ্ধিমতী মেয়ে। তোমার মাথাটাও স্বর্ণ দিয়ে বাঁধিয়ে দেয়া উচিত। টুয়েন্টি ফোর ক্যারাট!”
“কথায় কথায় স্বর্ণ দিয়ে বাঁধিয়ে দেবার কথা বলবে না। ভেবেই আমার দমবন্ধ লাগছে। চা খাবে?”
“খাবো। চিনি ছাড়া।”
“দশ মিনিট বোসো। করে আনছি।”
তিথির হাতের চা আমার কাছে অমৃত লাগে। দশ মিনিট পর কাপভর্তি অমৃতে চুমুক দেয়া যাবে ভেবেই আনন্দে আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। তিথির সাথে আমার পরিচয় আজকে থেকে দশ বছর আগে। আমি সবেমাত্র ম্যাট্রিক পাস করেছি। রেজাল্ট খুব ভাল। গ্রামে ভাল কলেজ নেই। স্কুলের স্যাররা বললেন, “বাবা, এতো ভাল মাথা নিয়ে তুমি এইখানে পড়লে সেইটা হবে বিশাল অপচয়। বাড়িতে বুঝাও। দরকার হলে আমরা কথাবার্তা বলি তোমার বাড়িতে। ঢাকায় ভাল কলেজে পড়বা, ভাল ভার্সিটিতে চান্স পাবা। এইখানে থাকলে তোমার পড়াশুনা হবে না।” আমার বাবা-মা আমাকে পড়তে পাঠালেন ঢাকায়। সমস্যা হলো, ভালো হোস্টেলে আমাকে রেখে পড়ানোর সামর্থ্য তাদের নেই। অতএব, মা তার খালাতো ভাইকে চিঠি লিখলেন। “শ্রদ্ধেয় ভাইসাহেব, সালাম নিবেন।
কেমন আছেন? বাড়ির সকলে কেমন আছে?” ইত্যাদি ইত্যাদি সমাচার শেষে মা ইনিয়ে বিনিয়ে লিখে ফেললেন তার পুত্রের অতি ভাল ফলাফলের কথা এবং তাকে ঢাকায় পড়ানোর ক্ষেত্রে তাঁদের অপারগতা কোন কোন জায়গায়। মা’র উদ্দেশ্য ছিল আমাকে মামার বাসায় পাঠিয়ে দেয়া যাতে আমার থাকা এবং খাওয়ার খরচটুকু বেঁচে যায়। মামা পাষাণ ছিলেন না। তিনি ফিরতি চিঠিতেই মাকে বলেছিলেন যেন মা কোনরকম দ্বিধা না করে আমাকে তাঁর বাসায় পাঠিয়ে দেন। আমি এবং আমার তল্পিতল্পাসহ আমাকে মামার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হলো। বাসা খুঁজে পেতে আমার যথেষ্ট কষ্ট হলো। পুরো একটা দুপুর পঞ্চান্নর এ নাম্বার বাসা গরুখোঁজা খুঁজে অবশেষে পেয়ে আমি যখন কলিংবেল চাপলাম, আমার বয়সী একটা মেয়ে দরজা খুলে দিলো। আমি বললাম, “এইটা কি পঞ্চান্ন এ, তালতলা?” মেয়েটা বললো, “বাসার বাইরে নাম্বারপ্লেট দেয়া আছে তো। পড়তে পারেন না আপনি?”
“জ্বী পড়তে পারি। আপনি কি ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা না বলে সোজা উত্তর দিতে পারেন না?” মেয়েটি সন্দেহের দৃষ্টিতে আমাকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে বললো, “আপনি কোত্থেকে আসছেন? কী চান?”
“আমি জামালপুর থেকে আসছি। আসতে খুব কষ্ট হয়েছে। এখন ভরপেট খেয়ে একটা ঘুম দিতে চাই। এর বেশি কিছু আপাতত লাগবে না।”
“আপনার কী ধারণা, এইটা আপনার মামাবাড়ি? আপনি যা ইচ্ছা তা বলবেন, আর তাইই হয়ে যাবে?”
“যা ইচ্ছা বললে যে হবে তা না, তবে এইটা সত্য যে এইটা আমার মামাবাড়ি।” মেয়েটি কঠিন মুখ করে বললো, “ফাজলামি করেন?”
“জ্বী না। ছেলে হিসেবে আমি অতি ভদ্র।”
“আপনি কি এখনি বের হবেন নাকি বাবাকে ডাকবো?”
“প্লিজ, ডাকলে খুব ভাল হয়। আমার নামটাও বলবেন উনাকে।
তারিক।” মেয়েটা চোখমুখ শক্ত করে আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলো, কিন্তু তখন পাঞ্জাবী পাজামা পরা একজন ভদ্রলোক বের হয়ে আসলেন। আমি ধরে নিলাম ইনিই মামা হবেন, আমি তাঁকে কদমবুসি করে ফেললাম। এরপর বললাম, “মামা আমি তারিক। আপনার শরীরটা ভাল?”
মেয়েটা সন্দেহের দৃষ্টি আরো তীক্ষ্ণ হয়েছে। সেই দৃষ্টি মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেলো। সে অত্যন্ত অবাক হয়ে গেলো যখন সে দেখলো তার বাবা সত্যি সত্যিই আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “বাবা তুমি ভালো আছো? অনেক ছোট দেখেছি তোমাকে। তোমার বাবা মা ভাল আছেন? আসতে কোন কষ্ট হয়নি তো?” আমি বিগলিত হাসি দিয়ে মাথা নাড়ছি। মামা বললেন, “তিথি, ও ছাদের রুমটায় থাকবে। একটু দেখিয়ে দে তো মা।” আমি তিথির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলাম। তিথির সাথে যখন আমার উথাল পাথাল প্রেম, তখন সে আমাকে বলেছে, আমার সেই হাসি দেখে সেদিন তার পিত্তি জ্বলে গেছিলো। টুংটাং শব্দ শুনে চোখ খুলে দেখি তিথি চা নিয়ে এসেছে। টিপটের ঢাকনা খুলে কাপে চা ঢালছে। আমি তাকাতেই হেসে বললো, “আমি ভাবলাম তুমি ঘুমিয়ে পড়েছো।” আমিও হাসলাম। বললাম, “ঘুমাইনি, জেগে জেগেই স্বপ্ন দেখছিলাম।”
“সব সময় এমন অদ্ভূত করে কথা না বললে চলে না, না?”
“উহু, প্রথমদিনের কথা ভাবছিলাম। তোমাকে বেকুব বানিয়ে তোমাদের বাসায় ঢুকে গেলাম, সেই কথা।”
“আমি মোটেই বেকুব হইনি। আমার ভয়ংকর রাগ হচ্ছিল। আমি ভাবছিলাম, এই ফাজিল ছেলে কোত্থেকে আসলো!” “সেই ফাজিল ছেলের জন্য তো একসময় কেঁদে ভাসিয়েও ফেলেছো, তাই না?”
তিথি উত্তর দিলো না। আমিও মাথা নিচু করে চায়ে চুমুক দিলাম। মনে মনে বললাম, টুয়েন্টি ফোর ক্যারাট!
তিথি আর আমার প্রেমের কথা জানাজানি হওয়ার পর মামা আমাকে ডাকলেন। মামা মানুষটা খুব খারাপ না, তাই আমি তেমন ভয় পেলাম না। তিনি গম্ভীরভাবে বললেন, “তারিক, তুমি তিথিকে পছন্দ করো, তাই না?” আমি ফাজিল, তবে গুরুজনের সামনে ফাজলামি করার মতো ফাজিল না। আমি কথার উত্তর দিলাম না। মামা আবার জিজ্ঞেস করলেন, “সেও তোমাকে পছন্দ করে, তাই তো?” আমি এবারও উত্তর দিলাম না। সম্ভবত মামাও আমার কাছ থেকে উত্তর আশা করেন নি। যে ছেলে ইউনিভার্সিটি শেষ করে বেকার অবস্থায় চাকরির আশায় ঘুরছে আর টিউশনি করে বাড়িতে টাকা পাঠাচ্ছে, যার গ্রামের বাড়িঘরের ঠিক নাই এবং যার বাবা-মা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায় ‘গরীবের চেয়েও গরীব’, সেই ছেলের কাছ থেকে এইসব প্রশ্নের উত্তর মেয়ের বাবারা আর যা-ই হোক, ‘হ্যাঁ’ অন্তত শুনতে চান না।
“দেখো তারিক, আমি আত্মীয় হিসেবে যতোটুকু কর্তব্য, করেছি। তার মানে কিন্তু এই না যে এখন তোমার সাথে আমি আমার মেয়েকে বিয়ে দেবো। পড়াশুনা শেষ হয়েছে, এখন নিজে কিছু একটা ব্যবস্থা করে এই বাসা থেকে বিদায় হও। যত তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করতে পারবে, তোমার জন্যও ভালো, আমার জন্যও ভালো। নিজের রাস্তা মাপো বাবা।”
এতোক্ষণে বলার মতো একটা কথা খুঁজে পেয়ে আমার খুব ভাল লাগলো। আমি হাঁফ ছেড়ে বললাম, “জ্বী আচ্ছা মামা।” তিথির সাথে আমার দেখা হওয়া বন্ধ, কথা বলা বন্ধ। তিথিকে বাসা থেকেও বের হতে দেয়া হচ্ছে না যে অন্য কোথাও গিয়ে তাকে সবকিছু খুলে বলা যাবে। এক ফাঁকে একটুখানি সময় পাওয়া গেলো। তিথি জিজ্ঞেস করলো, “বাবা তোমাকে কী বলেছেন?” আমি বললাম, “মামা আমাকে বলেছেন নিজের রাস্তা মাপতে।”
“তুমি কী বলেছো?”
“আমি বলেছি, জ্বী মাপবো। অবশ্যই মাপবো। স্কেল দিয়ে মাপবো না টেপ দিয়ে মাপবো এইটা ঠিক করে ফেলতে পারলেই মাপামাপির শুরু হয়ে যাবে।”
তিথি ঠাস করে আমার গালে একটা চড় বসিয়ে দিলো। আমি কিছু মনে করলাম না, কারণ আমি জানি সুন্দরী মেয়েরা যখন চোখভর্তি পানি নিয়ে কাউকে চড় মারে, সেই চড়ে শুধু ভালবাসাই থাকে, রাগ না। আমি আস্তে করে তিথিকে বললাম, “আমার জন্য দুইটা বছর অপেক্ষা করতে পারবে তিথি?” “দুই বছর কী করবে তুমি? রাস্তা মাপা শিখবে?” “উহু, আমি একটা স্কলারশিপের জন্য এপ্লাই করেছিলাম। কাউকে বলিনি। গতকাল চিঠি এসেছে, আমি স্কলারশিপটা পেয়েছি। আগামী মাসে কানাডা যাবো আমি। দুই বছরের আগে আসতে পারবো না। তোমার বাবা আজকে আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু দুই বছর পর আমার মতো ছেলেকে তোমার বাবা ফেরাতে পারবে না। দুইটা বছর আটকাতে পারবে না বিয়েটা?”
“তুমি চলে গেলে আমি মরে যাবো জানো?”
“মরবে না। দুইটা বছর তিথি, শুধু দুইটা বছর। একটু দাঁতে দাঁত চেপে কাটিয়ে দিও?” তিথি চেষ্টা করেছিলো দুইটা বছর দাঁতে দাঁত চেপে কাটানোর। সে পারেনি। জোর করেই তাকে বিয়ে দেয়া হয়েছিলো, তার মত না নিয়েই।
দুই বছর পর আমি ফিরে এসেছিলাম। সব শুনে তিথির সাথে দেখাও করেছিলাম। মাসুম নামের অতি চমৎকার ছেলেটা তাকে অসম্ভব ভালবাসে, সেইটা বুঝে বললাম, “বিয়ে করে ফেলেছো, খুব ভাল করেছো। এবার আমাকে দাওয়াত করে খাওয়াও। বিয়ের দাওয়াত মিস করেছি আমি!” তিথি রেগে গেলো। সুন্দরী মেয়েরা মাঝে মাঝে কারণ ছাড়াই রেগে যায়, আমি আগেও দেখেছি। তিথি শাড়ির আঁচল হাতের আঙুলে প্যাঁচাচ্ছে। আমার চোখে চোখ পড়তে একটু ইতস্তত করে বললো, “তুমি আমাকে এখনো ভালবাসো কেন তারিক? আমি তো আরেকজনের সাথে ঠিকই সুখে সংসার করছি। তুমি কেন এই জায়গাটায় আটকে আছো এখনো?” আমি উত্তর দিলাম না। তিথিকে এখনো কেন ভালবাসি সেই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। পালটা প্রশ্ন করলাম, “তুমি মাসুমকে ভালবাসো তিথি?” তিথি উত্তর দিলো, “বাসি। একটা সময় পর্যন্ত আমি কঠিন প্রতিজ্ঞা করে বসে ছিলাম, আর কাউকে ভালবাসবো না। পরে মনে হলো, সেই বেচারার তো কোন দোষ ছিল না। সে কেন অযথা শাস্তি পাবে?” কথা সত্যি। মাসুম ছেলেটা ভালো। তার অযথা শাস্তি পাবার কোন কারণ নেই।
তিথি আবার বলা শুরু করলো, “পরশুদিন প্রেগন্যান্সি টেস্টের রিপোর্ট পেয়েছি। আমি কনসিভ করেছি। কাউকে এখনো বলতে পারি নি। কেন জানি তোমাকেই প্রথম জানাতে ইচ্ছা করছিলো। দেখো কী কো-ইন্সিডেন্স, আজকেই তুমি চলে এলে।” আমার বুকের ভেতর কোথায় জানি আবারো ব্যথা করে উঠলো। কষ্ট করে একটু হেসে বললাম, “মাসুমকে জানিয়ে দিও। দেরি কোরো না। শুনলে অনেক খুশি হবে, তাই না?” তিথি অন্যমনস্কভাবে উত্তর দিলো, “হু।” আমি চুপচাপ চা শেষ করলাম। তিথি বলেছিলো মাসুমের সাথে দেখা করে যেতে। আমার আর বসতে ইচ্ছা করছিলো না। আমি উঠলাম। দরজার কাছে এসে তিথি বললো, “প্লিজ, একা থেকো না। তুমি একা আছো, আর আমি এইখানে সংসার করছি, এইটা চিন্তা করলে আমার ভয়ংকর অপরাধবোধ হয়।”
“তোমার অপরাধবোধে ভোগার কোন কারণ নেই তিথি।”
“তবু, প্লিজ!”
“চেষ্টা করবো।”
“শোনো, প্রেগন্যান্সি টেস্ট পজিটিভ আসার পর আমি ফিসফিস করে বলেছি, বল্টু মিয়া, ওয়েলকাম টু দ্য ওয়ার্ল্ড!”
আমি একটু হাসলাম। আমি তিথিকে বল্টুর মা বলে ডাকতাম। বললাম, “মেয়ে হলেও বল্টু বলেই ডাকবে?”
তিথি উত্তর দিলো, “মেয়ে হলে মনে মনে ডাকবো,তাহলে তো আর কেউ হাসবে না।” বল্টুর মাকে বলা যাবে না, গত সপ্তাহে তাকে দেখার জন্য আমার ভয়ংকর মন কেমন করছিলো বলে শুধু দুইদিনের জন্য বাংলাদেশে এসেছিলাম, কালকে রাতের ফ্লাইটে আবার ফিরে যাবো। এরপর আর আসা যাবে না এইখানে। আসলেই বল্টুকে দেখতে ইচ্ছা করবে, বল্টুর মাকে দেখতে ইচ্ছা করবে। কী লাভ শুধু শুধু মায়া বাড়িয়ে? টুয়েন্টি ফোর ক্যারাট গোল্ডের মতো খাঁটি হৃদয়ের মানুষটার কাছ থেকে শেষবারের মতো বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছি, শুধু এই কথাটা ভেবে আমার চোখে পানি এসে গেলো।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত