একজন হিমু কিংবা মানুষের গল্প

একজন হিমু কিংবা মানুষের গল্প
হুমায়ূন পছন্দ জেনে অরিন আমাকে প্রশ্ন করেছিলো, “ভাইয়া, তুমি হিমু হতে চাও না?” আমি মুচকি হেসে বলেছিলাম, “হিমু হতে কী করতে হয় অরিন?”
-“রাস্তায় রাস্তায় রাত বিরাতে ঘুরতে হয়। পকেট ছাড়া হলুদ পাঞ্জাবী পরতে হয়। রূপা টাইপের একটা প্রেমিকা থাকতে হয়, যে নীল শাড়ি পরে হিমুর জন্য ওয়েট করবে, কিন্তু হিমু দেখতে যাবে না। সবচেয়ে বড় কথা, হিমুদের হতে হয় নির্বিকার । কোনো আবেগ তাদের স্পর্শ করতে পারবে না।” আমি মাথা নেড়ে বললাম, “না অরিন। আমার হিমু হতে ইচ্ছে করে না, হিমু হওয়া তো দেখি বিরাট ঝামেলা। আমি বেকার মানুষ, খুবই ব্যস্ত, আমার এত সময় কই?” অরিন নতুন হুমায়ূন পড়া শুরু করেছে। স্বাভাবিকভাবেই ওর মাথার ভিতরটা এখন হিমুর দখলে। এই ভূত আপনাআপনি মাথায় আসে আবার একটা সময় পর আপনাআপনি চলে যায় ।
অরিনকে পড়ানোর পর আরো দুইটা টিউশনি করে ফিরছি। রাতের আঁধার আর ল্যাম্পপোস্টের নিয়ন আলোয় হাঁটা আপনাদের কাছে কাব্যিক লাগতে পারে, আমার কাছে বিরক্তিকর। কিন্তু কিছু করার নাই। রাত দশটার পর এই শহরে রিক্সাভাড়া ডাবল হয়ে যায়। একজন বেকারের জন্য রিকশাই যেখানে বিলাসিতা, ডাবল ভাড়া তখন কী? রেলগেটের ওখানে কয়েকজন বুড়ো রিক্সাওয়ালা চিৎকার করে কাঁদছে । ওদের রিক্সা আজ ক্রোক করা হয়েছে, লাইসেন্স ছিলো না তাই। আমার রিক্সাওয়ালার জন্য খারাপ লাগা উচিত। কিন্তু লাগছে না। বরং একধরনের পৈশাচিক আনন্দ হচ্ছে । শালারা লাইসেন্স করবি না কেন? দেশ উন্নত হচ্ছে, দেশে এখন বালিশের দাম হাজার টাকা, ঢেউটিনের দাম লক্ষ টাকা, পর্দার দাম কোটি টাকা। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, ঐগুলার সবার লাইসেন্স আছে আর পাঁচ টাকার রিক্সার লাইসেন্স করতে পারিস না?
গভীর রাতে বাসায় ফেরার সবচেয়ে বড় অসুবিধা গেট লাগানো থাকে, দেয়াল টপকে ঢুকতে হয়। আর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সিড়িতে কিংবা খাবার টেবিলেও কারো সাথে দেখা করতে হয় না। আজকাল আমি লাইট না জ্বালিয়েই খেতে পারি। ঠান্ডা ভাত আর তরকারি আমার জন্য ঢাকা থাকে, আমি হাপুস হুপুস করে খাই। ঠান্ডা ভাত খেতে পারতাম না বলে মা একসময় ভাত গরম করে দিতো। এখন ঠান্ডা ভাতই আমার ভালো লাগে। তাছাড়া বেকারদের গরম ভাতের অভ্যাস থাকা ভালো না। একা একা অন্ধকারে খেতে আমার একটুও খারাপ লাগে না, বরং নিঃশব্দ রাতে আমার ভাত চিবানোর শব্দ আমার ভালো লাগে, বড় ভালো লাগে!! আজকে আমার ২৩৭ তম ইন্টারভিউ ছিলো। সকালে মিষ্টি একটা স্বপ্ন দেখতে দেখতে সকালটাই পার হয়ে গেলো। নাকি পকেটে অতদূর গিয়ে ইন্টারভিউ দেওয়ার টাকা ছিলো না বলেই ঘুম ভেঙেছিলো, স্বপ্ন ভাঙেনি? জানি না। জানতে চাইও না।
এককালে অনেক কিছু জানার ইচ্ছে ছিলো। এখন আর নেই। এখন আমার আর কিছু জানতে ইচ্ছে করে না। এইতো সকালে পাশের বাড়ির জেনি আন্টি জিজ্ঞাসা করলো, “চাকরি বাকরি কিছু হলো?” আমি মৃদু হাসলাম। কিছু বললাম না। এখন নিশ্চয়ই তিনি তার বড় বোনের ছেলের ক্যাডার হওয়ার গল্পটা আমাকে হাজারতম বারের জন্য শোনাবেন? অবশ্য শুনতে ভালোই লাগে।আমার সমবয়সী একজন মানুষ একটা ভালো চাকরি পেয়েছে, রাজকন্যার মতো ফুটফুটে মেয়েকে বিয়ে করে সুখে শান্তিতে বসবাস করছে এত সুন্দর গল্প ভালো না লাগার মানে হয়? তাছাড়া আন্টি প্রতিদিন আমার মতো বেকারকে এই গল্প শুনিয়ে প্রবল আনন্দ পান, এটাও কি ছোটখাটো ব্যাপার?
তিথির বিয়ে ঠিক হয়েছে। প্রতিবার আমার হাতে নির্ভরতার হাত রাখা মানুষটিও আজকে আমার হাতে একটা বিয়ের কার্ড দিয়ে চলে গেছে। ভালোবাসাও তবে ক্লান্ত হয়? নাকি ভালোবাসা ঠিকই থাকে শুধু অপেক্ষারা ক্লান্ত হয়ে যায়? তিথির উপর আমার বিন্দুমাত্র রাগ, দুঃখ কিংবা অভিমান আসছে না কেন? বরং কেমন একটা আনন্দ হচ্ছে । তিথির বর নিশ্চয়ই জেনি আন্টির বোনের ছেলের মতো কোন একজন সফল মানুষ। ধুমধাম বিয়ে হবে, তারপর ওরা সুখে শান্তিতে বাস করতে শুরু করবে। রূপকথার মতো সুন্দর গল্প, অস্থির সময়ে স্বস্তির গল্প। তিথির বিয়েতে আমি যাই নি । না, প্রেমিকার বিয়েতে যাওয়া নিয়ে আমার কোনো ইগো প্রবলেম ছিলো না, তবে মানি প্রবলেম ছিলো। টিউশনির বেতন এখনও পাইনি, উপহার কেনাও হয়নি।
হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরছি প্রতিরাতের মতোই। ডান পায়ের স্যান্ডেলটা ছিঁড়ে গেছে। খালি পায়ে হাঁটতে অবশ্য সমস্যা হচ্ছে না। আলোতে এখন রাতকে রাত মনে হয় না, দিনের মতোই মনে হয়। এই শহরে এখন আর রাত নামে না। শুনেছি রাতে হিমুরা হাঁটে। মানুষেরা যখন ঘুমায়, চাঁদের আলোতে হিমুরা তখন খালি পায়ে পিচঢালা রাস্তায় বের হয়। না। আমি তো হিমু হতে চাইনি। আমি গভীর রাতে রাস্তায় হাঁটতে চাইনি। বরং প্রতি রাতে রিকশায় চড়েই বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলাম। আমি নির্বিকার হতে চাই নি । রেলগেটে রিকশা ক্রোক করা রিকশাওয়ালার জন্য আমি দুঃখ পেতে চেয়েছিলাম। জেনি আন্টির বোনের ছেলের গল্প শুনে অপমান বোধ করতে চেয়েছিলাম, প্রেমিকার বিয়ের দিন মন খুলে কাঁদতে চেয়েছিলাম।
আমি রূপার মতো চিরদিন অপেক্ষা করে থাকা জল তরঙ্গের হাসি হাসা কোনো প্রেমিকা চাইনি। আমি খুব সাধারণ একটা মেয়েকে বিয়ে করে সংসার করতে চেয়েছিলাম। একজন সাধারণ মানুষ হয়ে একটি সাধারণ জীবন কাটাতে চেয়েছিলাম। তবে আমি হিমুর মতো নির্বিকার হয়ে গেলাম কেন? নাকি এই শহরের প্রতিটি মধ্যবিত্ত বেকার প্রেমিককে বেঁচে থাকার জন্য না চাইলেও হিমু হতে হয়? হুমায়ূন পছন্দ জেনে অরিন একদিন আমাকে প্রশ্ন করেছিলো, “ভাইয়া, তুমি হিমু হতে চাও না?”
গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত