শৈশবের স্মৃতি

শৈশবের স্মৃতি

ক্লাস VII আমার রেজাল্ট খারাপ হয়, পরীক্ষার সময় আমি অসুস্থ ছিলাম। মন খুব খারাপ হয়ে যায়, এর কারনও আছে, আসলে VII উঠেলে আমার দাদা দিদিরা যে স্কুলে পড়ে সেই স্কুলে চলে যেতাম , কিন্তু রেজাল্ট খারাপ হওয়ায় এখন আর যাওয়া হবে না । আমাদের একটাই সাইকেল যাতায়াতের অসুবিধার জন্য আমাকে সামনে স্কুলে ভর্তি করেছিল । আমার যখন সেভেন হবে দিদির তখন উচ্চ মাধ্যমিক হয়ে যাবে এবং আমি ওই স্কুলে চলে যেতে পারবো । কিন্তু আমার ভাগ্য খারাপ আমার আর সাইকেল চড়ে স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো না। আবার আমার Bestfriend সঙ্গীতা আমি অন্য স্কুলে যাবে বলে সেও তার বাবাকে রাজি করিয়েছিল , এখন বাড়িতে বারন করতে পারছে না , তাই ওকে চলে যেতে হচ্ছে। এই সবের কারনে মন খারাপ হয়ে যায় , স্কুল যেতে ভালো লাগে না, তবুও যেতে হয়।

গরমে সকাল স্কুল তবুও তাড়াতাড়ি যেতে পারি না দেরি হয়ে যায় ।তবে আমার জায়গায় ঘেরা থাকে তাই বসতে পাই । আমার ক্লাস চেঞ্জ হলেও বেঞ্চ চেঞ্জ হয়না আমি সব দিন দ্বিতীয় বেঞ্চের ধারে বসি , কিন্তু এখন আমার জায়গায় লাবনী নামে নতুন মেয়েটা বসেছে । আমাদের ক্লাসে নতুন ভর্তি হয়েছে । কাকুলী জায়গা ঘিরে রাখলেও লাবনী শুনেনি , উল্টে বলে- আমি আগে এসেছি আমি বসব। দ্বিতীয় বেঞ্চ জায়গা থাকলেও আমি শেষ বেঞ্চে গিয়ে বসি ।

কিন্তু ক্লাসে বড়দিদি জায়গা ফাঁকা থাকা সর্তও শেষ বেঞ্চে বসার জন্য খুব বকেন এবং দ্বিতীয় বেঞ্চ উঠে আসতে বলেন। আমি বাধ্য হয়ে চলে আমি কিন্তু লাবনী আমার জায়গা ছাড়ে না আমাকে ওর পরে বসতে হয় আমার লাবনী প্রতি খুব রাগ হয়।এই ভাবে আর ও ৭দিন লাবনী সবার প্রথমে এসে জায়গা ঘিরে নেয়। লাবনী এটা দে ওটা দে করে আমাদের বিরক্ত করে চলে কিন্তু আমরা কিছু বলিনা । তবে মঞ্জু মাঝে মাঝে বলে , তুই ওই জায়গাটা ছাড় না হলে তোকে কিছুই দেব না । আমরা বিরক্ত দেখালেও লাবনী কিছু মনে করে না । পরের দিন বেঞ্চ ফাঁকা দেখে, আমি ছুটে গিয়ে ব্যাগ রেখে দেই, তখন পিছন থেকে লাবনী বলে- তোর জায়গা ছেড়ে দিলাম ,বেঞ্চে বসাতে না পাওয়ার জন্য তোর এতো রাগ ।এই কয়দিন আমি এতো বকবক করছি , তবুও তোরা কিছু বলিস নি।তোর ওই জায়গাটা খুব প্রিয় তাই না।

– ক্লাস ২ থেকে দ্বিতীয় বেঞ্চের ধারে বসে এসেছি, বুঝলি।এর জন্য কতো মার ও খেয়েছি ।
– আমাকে তোদের দলে নিবি ।
– নিতে পারি তবে আমার জায়গায় বসা যাবে না।
– ঠিক আছে যেখানে ইচ্ছে বসতে দিলেই হবে। আসলে দ্বিতীয় বেঞ্চের ধার আমার ও খুব প্রিয়।

এইভাবে লাবনী আমাদের friend হয়ে ওঠে , আগে মতোই আমরা পাঁচ জন ,শুধু সঙ্গীতার জায়গায় লাবনী এসেছে। আমাদের মধ্যে লাবনী খুব হাসি খুশি মেয়ে , সব সময় নিজেও হাসে আমাদেরকেও হাসায় , আমাদের বেঞ্চটা টেবিলের ডানদিকে হওয়ায় দিদিরা সোজাসুজি দেখতে পায় , ওর এই বকবকের কারনে আমাদের সবাই কে অনেক বার বেঞ্চের ওপর দাঁড়াতে হয়েছে নয়তো ক্লাসের বাইরে গিয়ে নিলডাউন হতে হয়েছে । তবুও লাবনী বকবক বন্ধ করে না, তবে ওর এই কথা বলা,এই হাসানো আমাদের ও খুব ভালো লাগে,ও না স্কুলে আসলে আমাদের দিনটা খুব খারাপ যায় । ওর মতো বন্ধু পেয়ে আমার ও স্কুল যেতে খুব ভালো লাগে।

লাবনী এতো ছটপটে ছিল যে বেশি সময় চুপ করে থাকতো পারে না, প্রার্থনার সময় লুকিয়ে লুকিয়ে কথা বলে । স্কুলে পড়াশোনা ছাড়াও যে এতো আনন্দ করা যাব সেটা লাবনীর আমাদের শিখিয়েছে , প্রেজেন্ট দেওয়ার সময় আমাদের মুখ চেপে ধরে আমাদের গলা নকল করে প্রেজেন্ট দেয়। আর একটা মজার বিষয় লাবনীর সবাইয়ের নতুন নতুন নাম ধরে ডাকে এর জন্য মার ও খেয়েছে শুধু আমাদের না, দিদিদের ও নতুন নাম দিত। লাবনী আমাদের জন্য আম , পেয়ারা, তেঁতুল আনতো টিফিনে আমাদের খুব মজা হয় । শহরের থেকে বেড়ে ওঠা মেয়ে যে এমন হয় ওকে দেখলে বোঝা যায়। স্কুলের দিদিরা ও খুব ভালোবাসে ,, অঙ্ক খুব ভালো পারে তাই অঙ্কের দিদিদের খুব প্রিয় ছিল,আমাদের কেও অঙ্কে সাহায্য করতে। এই ভাবে দিন গুলো খুব তাড়াতাড়ি চলে যায় এবং আমাদের ফাইনাল পরীক্ষা চলে আসে ।

পরীক্ষা পর প্রায় একমাস ছুটি থাকে,কারে সাথে দেখা ও হয়না কথাও হয়না। সবাইয়ের বাড়ি দূরে তাই যাওয়ার কোনো প্রশ্ন উঠেনা ,একে বারে রেজাল্ট এর দিনে দেখা হবে। রেজাল্ট বেরনোর দিনে সবাই আগে থেকে চলে আসি ,কতো গল্প জুমে আছে বলতো হবে না তাই কিন্তু লাবনী আসছে না দেখে ওদের গ্রামের একটা মেয়েকে জিজ্ঞেস করতো গেলাম সে বলল , লাবনীদের বাড়িতে এখন কেউ থাকে না ,বাড়িতে তালা দেওয়া আছে , মনে হয় আসবে না। আমরা কিছুই বুঝতে পারলাম না কেন আসবে না। আমাদের রেজাল্ট ভালো এসেছে , রেজাল্ট নেওয়ার পরেও অপেক্ষা করলাম কিছু সময়, যদি লাবনী আসে তাহলে দেখা হবে , কিন্তু এল না। লাবনী আর আসেনি কোনো দিন কয়েক দিন পর বড়দিদিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তিনি বলেন ,লাবনীর দাদু এসে টিসি আর রেজাল্ট নিয়ে গিয়েছে ,ও আর আসবে না।

এমন প্রান উচ্ছ্বাস মেয়ে এতো তাড়াতাড়ি হারিয়ে যাবে আমরা ভাবিনি তাও আবার কোনো কোনো কারণ ছাড়াই । আমাদের আগে থেকে কেন কিছু জানালো না , লাবনী কি হারিয়ে যাবে বলেই আমাদের কে জীবনের আনন্দ শেখাতেই এসেছিল এই সব কতো প্রশ্ন মাথায় মধ্যে আসতে লাগল , কিন্তু কোনো উত্তর পেলাম না। আবার কোনো দিন দেখা হবে কিনা তাও জানিনা । যদি দেখা করতে আসে এই ভেবে আমি ও আর স্কুল ছেড়ে গেলাম না ওই স্কুলেই রয়ে গেলাম বাকি বান্ধবীদের সাথে ।

গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত