জীবন

জীবন
চোখে আইলাইনার লাগিয়ে চোখ বন্ধ করতেই টের পেলাম রান্নাঘর থেকে মাংসের ঘ্রাণ আসছে।ঘ্রাণটা আমার অতিপরিচিত নিশ্চয়ই বাবা রান্না করছেন।চিরপরিচিত ঘ্রাণটা আমি বাবা ছাড়া আর কারো রান্নাতে পাই না।মাকে কথাটা বললেই মা হেসে উড়িয়ে দিবে,বলবে-কোথায় অন্যরকম ঘ্রাণ।আমি তো তোর বাবা আর আমার রান্নায় একই ঘ্রাণ পাই।বাবার কিছু প্রিয় কাজ আছে তারমধ্যে রান্না করাটা অন্যতম।প্রায় ছুটির দিনেই বাবা মাংস রান্না করেন।খাসির মাংস ছোট ছোট করে কেটে বেশী ঝাল দিয়ে বাবার বানানো রান্নাটা পৃথিবীর সেরা শেফের রান্নাকেও হার বানাবে।বাবার রান্নার ঘ্রাণেই মন ভালো হয়ে যায়।অন্যদিন হলে বাবাকে মাংস কেটে দেয়া থেকে শুরু করে খাবার সার্ভ করা সবকিছুতে আমি সাহায্য করি।
এই দিনটায় মা বসে থাকে, ঠোটের কোনে থাকে মুচকি হাসি।আমাদের কপট রাগ দেখালেও মা শত চেষ্টা করেও হাসি মুখটায় রাগি রাগি লুক আনতে পারেন না।মায়ের এই অবস্থা দেখলে আমি আর বাবা দুজনেই হেসে দেই।মাও রাগি রাগি চেহারা বানানো বাদ দিয়ে হেসে উঠে।আজ বাবার সাথে রান্না করতে ইচ্ছে করছে না।।আজ সাজব ইচ্ছা মতো সাজব।।মা দুইবার উকি দিয়ে দেখে গেছেন কি করছি।বাবা একটু পরপরই ডাকছেন- তাবাসসুম, দেখে যায় রান্নাটা কেমন হয়েছে।কথা বলতে ইচ্ছে করছে না তাই জবাব দেইনি।বাবা নাছোড়বান্দা একটু পর আবার ডাকছেন।বিরক্তি লাগছে-যখন মন খারাপ থাকে তখন মনে হয় সবকিছু বিরক্তিকর লাগে।চোখে মাশকারা শাড়ীটা ঠিক করে ডাইনিং এ যেতেই দেখলাম বাবা টেবিলে খাবার সার্ভ করছে।খেতে ইচ্ছে করছে না তারপরও খেলাম।খেতে গিয়ে বারবার মনে হলো হয়তো এটাই বাবা মায়ের সাথে একসাথে বসে আমার শেষ খাওয়া।আর কখনো বাবা মায়ের সাথে একসাথে খেতে পারব না।।
মা বারবার জিজ্ঞেস করছে -এই তাবু তোর মন খারাপ নাকি।চুপচাপ খেতে উঠে এলাম।কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।৩ টা বেজে গেছে আমি ঠিক করেছি ঠিক ৫ টায় আত্মহত্যা করব।আমার বেঁচে থাকার কোনো ইচ্ছে নেই।যাকে নিজের চেয়ে বেশি ভালোবেসে ছিলাম সেই আমাকে ধোকা দিতে পারল।ও কেন বুঝতে পারল না ওকে ছাড়া আমার জীবন অসম্পূর্ণ।কিছুদিন ধরে ও আমাকে ঈগনোর করছে। ফোন দিলে ধরে না মেসেজের রিপ্লাই দেয় না।কাল রাত ১২ টায় হঠাৎ ফোন দিল।বাথরুমে ছিলাম তাই ফোন ধরতে পারিনি। বাথরুম থেকে এসে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলাম ২ টা মিসডকল।কলব্যাক করে হ্যালো বলাই আগেই রিফাত হড়বড় করে যা বলল -তাবাসসুম, তুমি আমায় ক্ষমা করে দাও।আমি পূর্নিয়া নামের এক মেয়েকে ভালবাসতাম।কাল আমরা বিয়ে করেছি।
রিনির কথা মনে হল কিছুদিন আগে রিনি বলেছিল-তাবু তুই রিফাতকে বিশ্বাস করিস না।আমার কেন জানি মনে হয় এই ছেলে তোকে ভালোবাসে না।শুধু শুধু তোর সাথে ভালোবাসার নাটক করছে।সেদিন রিনিকে অনেক কথা শুনিয়েছিলাম।কয়েকদিন ধরে ওর সাথে কথা বলছিনা।এখন নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে।এরকম একটা ছেলের জন্য আমি আমার সবচেয়ে কাছে বান্ধবিকে অপমান করেছি।রাতেই মনে হয়েছে আমার বেচে থাকার কোনো অধিকার নেই।রিনিকে যে ফোন করে ক্ষমা চাইব সে মুখও আমার নেই।সেদিন রিনিকে বলেছিলাম ও যেন আমার সাথে যোগাযোগ না করে।রিনি বারবার ফোন দিয়েছিল আমি ধরিনি।’কি হলো তাবাসসুম কথা বলছ না কেন?’ রিফাতের কথায় বাস্তবে ফিরে এলাম- কি বলছ রিফাত।তুমি আমার সাথে ঠাট্টা করছ তাই না।
– আমাকে তুমি ক্ষমা কর তাবাসসুম।
কলটা কেটে দিলাম।রিফাত নামক প্রতারকের সাথে একমুহূর্ত আর কথা বলার ইচ্ছা ছিল না। সাড়ে চারটা বাজে।বারান্দায় গিয়ে দাড়ালাম।অর্কিডের গাছগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে।ওরাও কি আমার মত প্রতারিত – শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। আলতোকরে গাছগুলোতে হাত ভুলিয়ে দিলাম।মনে হলো রিনির স্পর্শ পেলাম।আমার ১৯ তম জন্মদিনে রিনি ১৯ টা অর্কিডের চারা নিয়ে এসেছিল।অনেক হেসেছিলাম সেদিন জন্মদিনে কেউ আবার ফুলের গাছ গিফট করে।কিছু চারা ছাদে আর কিছু চারা বারান্দায় লাগিয়ে দিয়েছিলাম।ঘরে গিয়ে মোবাইলটা নিয়ে এসে রিনিকে ফোন দিলাম।ফোন ধরেই রিনি ওর ভুবনজয়ী হাসি দিয়ে বলল-যাক রাগ ভেঙেছে তাহলে।
-তুই আমার ক্ষমা কর রিনি।
-ক্ষমা কেন?কি অপরাধ করেছিস তুই?
-আমি তোকে সেদিন ভুল বুঝেছিলাম,রিনি।আসলেই রিফাত ভাল না।ও আমার সাথে প্রতারনা করেছে।
-হাহাহা আমার কথা সেদিন বিশ্বাস হয়নি।এখন কি হল গরীবের কথা বাসি হলেও ফলে।যা হবার হয়ে গেছে তাই বলে তুই কাদছিস কেন?
– কই কাদছি?তুই আমার ক্ষমা করেছিস তো?
-ক্ষমা পাওয়ার জন্য এত কান্না। যা ক্ষমা করে দিলাম।
-রিনি একটা কথা বলি?
-বলুন।
-আমি না মরে যাব।এখন সাড়ে চারটা বাজে।ঠিক পাঁচটায় মরে যাব
-কিভাবে মরবি।হেল্প লাগলে বলতে পারিস।সাহায্য করব হাজার হোক তুই আমার বান্ধবী।ছ্যাকা খেয়ে আত্মহত্যা করবি আর আমি সাহায্য করব না।
– তুই হাসছিস।আমি সত্যি বলছি ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করব।
– আরে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করবি।সেতো খুব ভালো।তুই এক কাজ কর আমাদের বাসায় চলে আয়।তোদের বাসা তো দুতালা।লাফ দিয়ে বড়জোর হাত পা ভেঙে বসে থাকবি।তারচাইতে আমাদের বাসায় আয়-পাঁচতালা থেকে লাফ দিলে নিশ্চিত মরবি।গ্যারান্টি সহকারে বলছি না মরলে টাকা ফেরত।
-রিনি তুই সত্যি আমার কথা বিশ্বাস করিস নি।
-আরে বিশ্বাস করব না কেন? করেছি-তুই আত্মহত্যা করলে কার কি?মরলেই সব শেষ।
রিফাতের জন্য মরবি কিন্তু তুই মরলে ওর কি।ও দিব্যি সুখে থাকবে।রাখি-পাঁচটা বেজে যাচ্ছে তুই মরার জন্য প্রিপারেশন নে। ঘড়ির দিকে তাকালাম সত্যিই পাঁচটা বেজে যাচ্ছে।চোখের পানি মুছে বাবাকে গিয়ে বললাম- বাবা রেডি হও তো।অনেকদিন তোমার সাথে ঘুরিনি।আজ তোমার আর মায়ের সাথে ঘুরব। সত্যিই বেঁচে থাকাটা কত আনন্দের।বাবার রান্নার ঘ্রাণ,মায়ের বকুনি আর রিনি নামের মেয়েটার দুষ্টু দুষ্টু কথা শোনার জন্য বেঁচে থাকা প্রয়োজন। ভীষন প্রয়োজন।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত