অবশেষে বিয়ে

অবশেষে বিয়ে
কালো মেয়েটাকে নিয়ে যখন মায়ের অনেক চিন্তা।”
— ঠিক তখনই মা সাহস করে মেয়েকে বললেন।
–ছেলেটা নাকি তিনমাস সংসার করার পর বউটা চলে গেছে। ছেলে ভালো যা সমস্যা ওই মেয়ের।
—- এখন তোর আপত্তি না থাকলে তোর বাবা বলছিলো, ওই ছেলের ব্যাপারে ছেলের চাচার সাথে কথা বলবে।
কথাটা শুনে আমার মাথাটা কেমন যেন একটু ঘুরে উঠলো। আমি ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছি তো আঁচড়াচ্ছি। মা আবারও বলে উঠলেন, কি রে তন্দ্রা কিছু বলছিস না যে! কি বলবো মা! আজব ছেলেটা আগে একটা বিয়ে করেছে তোকে বললাম, হ্যাঁ না তো অন্তত কিছু একটা বলবি! দেখো মা, ছেলেটা আগে বিয়ে করেছে।
এটা নিয়ে যদি তোমাদের শিক্ষিত,আত্মনির্ভরশীল মেয়েকে নিয়ে ভাবতে খারাপ না লাগে আমারও মেনে নিতে আপত্তি নেই। মা আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, আমি তোর কষ্টটা বুঝি মা। কিন্তু কি করবো বল, তোর তো বয়স বেড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া ছেলেটা ভালো চাকরি করে নিজের ফ্ল্যাটে থাকে, স্যালারিও নাকি বেশ ভালোই পায়। তাই এ বিষয়টা ভাবলাম। তাছাড়া পুরুষ মানুষ দ্বিতীয় বিয়ে করলেও ঠেকেনারে মা। হ্যাঁ মা, সে তো বুঝতে পারছি। কিন্তু কি আশ্চর্য মেয়েদের গায়ের রং একটু ময়লা কিংবা উচ্চতা চাহিদা মাফিক না হলে এই বিয়ের বাজারে তার কোন দামই থাকেনা।এভাবে বলছিস কেনো? আমরা তো আর কম চেষ্টা করলাম না। না মা তোমাদের দোষ দিচ্ছিনা। আমার ভাগ্যের দোষ দিচ্ছি।
মাঝে মাঝে মনে হয় কি জানো মা, জীবনে মনে হয় খুব বেশি সততার সাথে না চলাই ভালো ছিলো। দেখো না চোখের সামনে কত বন্ধু বান্ধবকে দেখলাম কত খারাপি করলো। অথচ দেখো না আজ তার সবাই কত সুখী আর আমার ভাগ্যটা! “আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন” এ কথা বলেই মা আমাকে বলল এদিকে আয় চুলে খোঁপাটা করে দেই। আমিও কথা না বাড়িয়ে মায়ের পাশে গিয়ে বসলাম। মা মাথায় চিরুনি টানতে টানতে বললেন, ছেলে নাকি কালই তোকে দেখতে চাচ্ছে, তুই কি বলিস! হুম আসলে আসবে। কিন্তু বাড়িতে নাকি, অফিসে? ওরা বলছিলো বাড়িতে আসলে বাড়তি ঝামেলা তাই অফিসেই দেখে যাবে। কিন্তু মা আমার আর অফিসে কেউ দেখতে আসলে ভাল্লাগেনা। কলিগদের ওই ত্যাড়াবাঁকা কথা কেনো জানি আজকাল খুব লাগে। শোন মা, এই যাত্রায় এসে দেখে যাক পরেরটা পরে দেখা যাবে।
–আমিও আর কথা বাড়ালাম না।
পরদিন ওরা আমাকে অফিসে দেখতে আসলো। বিশ্বাস আমি একেবারেই সাধারণ হয়ে গেলাম। কালো একটা জামা ওড়না সাদা মাথায় ঘোমটা দেওয়া। ছেলের চাচা অফিসে আসলেন আমাকে দেখলেন। কোন কথাই জিজ্ঞেস করেননি। কারণ উনারা আমাদের আগেরই পরিচিত। তার কিছুক্ষণ পর ছেলে আসলো। পাঞ্জাবি পরা, হালকা চাপ দাড়ি কলিগদের সাথে যেটুকু কথা বলছিলো ভদ্রই মনে হচ্ছিলো। ছেলে আমার পছন্দ হয়েছে। যদিও ভদ্রলোকের একটা সমস্যা ছিলো। কিন্তু সাত পাঁচ সব ভেবে আমি মত দিলাম। ওরা কেউই আমার সাথে কথা বললো না। আন অফিশিয়ালি দেখে চলে গেলো। প্রায় একদিন, যাওয়ার পর ওদের দিক হতে কোন সাড়া না পেয়ে বাবাই ছেলের চাচাকে ফোন দিলো। কি ভাইজান মেয়ে দেখে গেলেন কিছুতো আর জানালেন না! ছেলের চাচা আমতা আমতা করে বললেন, মেয়ের গায়ের রং চাপা বুঝেনই তো ভাই আজকালকার ছেলে পেলের পছন্দ।
বুঝতে বাকি রইলোনা আমাকে পছন্দ। সেদিন আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম, মনে হলো আমার চাকুরী, উচ্চ শিক্ষা, ভদ্রতা, বংশ সবটাই যেনো ওই চাপা রংয়ের কাছে হেরে গেলো। নিজের প্রতি খুব ঘৃনা হচ্ছিলো। মায়েরও নিজের মনটা বেশ খারাপ হলো এই ভেবে যে,ওরা উনার মেয়েকে অপমান করেছে। মা বলেই বসলেন, “আগের বউ সুন্দর দেইখ্যা পালাই গেছে। তবুও পোলার ওই সুন্দর বউই চাই”। হায়রে সুন্দর! এখন মনে হয় কি তন্দ্রার বাবা মেয়েরে এত পড়াশোনা, চাকরী এগুলোতে না দিয়াই টাকা খরচ কইরা বিদেশ নিয়া লেজার করাই চামড়া বদল করতাম তবু অন্তত অপমান হতে হতো না। বাবা মাকে জোরে ধমক দিয়া বললেন, কি বলো এগুলা! মেয়ে আসছে দুনিয়ায়, ওর ভাগ্য ও নিয়া আসছে। উল্টা পাল্টা কথা বলে চিন্তা ধরাইও না।
–এই প্রথম মনে হলো, আমি মনে হয় বাছাইয়ের তালিকায় পড়ে গেলাম। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম বিয়ের চিন্তাই বাদ। বিয়েই কি জীবনের একমাত্র সমাধান। তারপরও মাও কখনও আর বিয়ের কথা বলেনি। প্রায় বছর খানেক পর একদিন মা আমাকে বললেন, তন্দ্রা এতদিন আসলে তোর কথার উপরে কিছু বলিনি। এখন মা তোর সিদ্ধান্ত কি পরিবর্তন করা যায়না। আমি চুপ করে রইলাম। বাবা আমার দুহাত চেপে বলল,মারে বিয়ে জীবনের সবকিছু নয় ঠিক আছে। কিন্তু বিয়ে ছাড়া একটা মেয়ের সমাজে টিকে থাকা খুব কঠিন। তোর সিদ্ধান্তটা বদলা। তাহলে আমার হাতে ভালো একটা পাত্রের খোঁজ আছে দেখতে পারিস।
আমি একটু তাচ্ছিল্য করেই বললাম, তোমার মেয়ে তো আর ভালোনা। ছেলেরা আসবে, দেখবে এরপর চলে যাবে।
এভাবে বলিসনা মা, আমার মন বলছে এবার তোর বিয়েটা হবে। আর দেখবি আমার মেয়ের ভাগ্যে আল্লাহ ভালো কিছুই রাখছেন। যদি হয় তো ভালো এ কথা বলে,অফিসের জন্য বেরুতেই বাবা বললেন ছেলেটা তোকে আজই দেখতে চাচ্ছে। কিন্তু বাবা আমার অফিস! ছুটি নে, একদিন ছুটি নিলে কি এমন হবে! ঠিক আছে বাবা,কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে। কি শর্ত বল? আমি ছেলেটার সাথে আলাদা বাহিরে কোথাও বসতে চাইছি। তাহলে তো ভালোই, ছেলেরাও তাই বলল। আমি ভাবলাম, তুই রাজী হবি কি না! দ্বিতীয় শর্ত বাবা ছেলেরা বলতে অন্য কেউ নয়, শুধু ছেলেকে আসতে বলো। কিন্তু মা ছেলে যদি ওর কোন বন্ধুকে নিয়ে আসে,! সে আসা যায়। যথারীতি আমি একটা রেস্টুরেন্টে দেখা করতে গেলাম। সেখানে গিয়ে আমি অবাক এক বছর আগে ডিভোর্স হওয়া ছেলেটা।
আমি হকচকিয়ে বের হয়ে আসতেই ছেলেটা বলল, আমার জন্য নয়। আমার বন্ধু আপনাকে দেখতে এসেছে।
তারপর ছেলেটা সব ডিটেইলস বলল। উনি একটা কলেজে শিক্ষকতা করেন। উনি নিজে এক ছেলে, বোন দুটোর বিয়ে দিয়েছে। মা বাবা দুজনেই এখনও আছে। সব শুনে ছেলেটাকে আমার পছন্দ হলো। এই প্রথম কেউ খুব গুরুত্ব দিয়ে বলল, “আমাকে আপনার পছন্দ হয়েছে”? কি বলছেন, মেয়েদের পছন্দ করার আলাদা স্বাধীনতা নেই। সে আপনি বোঝেন তবে আপনাকে আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। কথাটা শুনে চোখটা ভিজে উঠলো। চোখের পানি লুকোতেই ছেলের বন্ধু বলে উঠলেন, আমাকে ক্ষমা করা যায়না তন্দ্রা! কেনো বলুনতো! আসলে আপনাকে ইগনোর করাটা আমার ঠিক হয়নি। তা কেনো হবে, ছেলেদের পছন্দের স্বাধীনতা আছে।
ভালো লাগেনি তাই এড়িয়ে গেছেন। এখন নিশ্চয়ই বউ নিয়ে ভালোই আছেন! আর ভালো থাকা এবারেও বউটা চলে গেছে। আসলে শুধুমাত্র সুন্দরী দেখে মেয়েটাকে বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু মেয়েটার শরীরের সৌন্দর্যের কাছে আমার মনের সৌন্দর্য হারিয়ে গেছে। যাক সে কথা আমার বন্ধুর সাথে নিশ্চয়ই আপনি সুখে থাকবেন। কারণ ও শারিরিক সৌন্দর্য কোনদিনই চায়নি, যা চেয়েছিলো তার পুরোটাই আপনিময়। আপনারা সুখে থাকুন এই দোয়া আমার। দেখতে আসা ছেলেটার নিরবতা দেখে বুঝতে পারলাম, উনি আগেই সব জানতেন। আচ্ছা আমি উঠবো বলে, চলে যেতেই ছেলেটা বলল, বাসায় গিয়ে বাবাকে বলবেন আমার বাবার সাথে কথা বলতে। আর নামাজ পড়ে আমাদের দাম্পত্য জীবনের সুখ কামনা করুন।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত