পরিবর্তন

পরিবর্তন
আমার মোট দুজন বেস্টফ্রেণ্ড ছিল।কি অবাক হচ্ছেন?ভাবছেন বেস্টফ্রেণ্ডতো একজনই হয়,তাহলে আমার আবার দুজন হয় কিভাবে?হ্যাঁ ঠিকই বলছি,আমার আসলেই দুজন বেস্টফ্রেণ্ড ছিল আর তার কারণ একজনের চলে যাওয়ার পর অন্যজনের আবির্ভাব।তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি যে এখন তারা কে কোথায় আছে তার কিছুই আমি জানিনা।
কাকতালীয়ভাবে প্রথম জনের নামও সেতু,তার সাথে আমার পরিচয় ক্লাস টুতে পড়ার সময়।চাকরির সুবাদে আব্বু যখন বদলি হয়ে যান তখন ওখানকারই নামকরা এক সরকারি স্কুলে ভর্তি হই আর প্রথমদিন সবার সামনে নিজের পরিচয় দিতেই জানলাম ওখানে নাকি আরও একজন সেতু আছে!তো এক ক্লাসে দুজন সেতু ব্যাপারটায় একটু ভেজাল আছে তাই আমার নাম দেওয়া হলো ছোট সেতু আর আগের জনের বড় সেতু,অনেকটা দীপু নাম্বার টু সিনেমার মতো।আমরা অবশ্য দুজন দুজনকে মিতি বলেই ডাকতাম।
নাম এক হলে কি হবে,দুজনে ছিলাম সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর দুই বাসিন্দা।আমি যেখানে নিতান্তই শান্ত-শিষ্ট পিচ্চি একটা মেয়ে,মিতি সেখানে বয়সের তুলনায় একটু বেশিই লম্বা,প্রচণ্ড রাগী,একরোখা আর গুণ্ডি টাইপের একটা মেয়ে।আমাকে কেউ কিছু বললেই ঢাল হয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে পড়তো।একবার ক্লাসের ইংরেজি স্যারের পাঁজি ছেলেটা খুব জ্বালাচ্ছিল আমাকে আর আমি যেমন মানুষ,একটুতেই ভ্যাঁ করে কান্না জুড়ে দিলাম আর তাতেই বেচারার কপাল পুড়লো।ছেলেটার শার্টের কলার ধরে নাক বরাবর একটা ঘুষি বসিয়ে দিল মিতি,অবশ্য তারজন্য বেচারিকে শাস্তিটাও দেওয়া হয়েছিল একটু বেশিই কড়া আর পাগলিটা তাতেও দাঁত বের করে হাসছিল!
আমি সবসময়ই টপারদের মধ্যেই থাকতাম আর মিতি?টপ না করলেও মোটামোটি দশের মধ্যেই থাকতো।ক্লাস ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষা,তখনতো আর এখনকার মতো পিএসসি,জেএসসি এমন কিছু ছিল না।তখন প্রতিটা স্কুল থেকে টপারগুলোকে বেছে নিয়ে আলাদাভাবে এক্সাম নেওয়া হতো আর তার কোয়েশ্চেনও হতো প্রচণ্ড রকমের হার্ড।আমাদের স্কুল থেকে ঠিক কতজনকে বৃত্তি পরীক্ষা দিতে দেওয়া হয়েছিল ঠিক মনে নেই কিন্তু আমি আর মিতি দুজনেই দিয়েছিলাম এক্সামটা।অবশ্য আমি ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেলেও মিতি বাদ পড়ে গিয়েছিল। পরীক্ষার শেষে লম্বা একটা ছুটি ছিল,আর তারপরেই প্রাইমারীর গণ্ডি পেরিয়ে হাইস্কুলে ভর্তির পালা।কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণীর ক্লাস শুরু হওয়া সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও মিতির কোন দেখা পেলাম না,তারপর হঠাৎই শুনলাম ওর আম্মুর ট্রান্সফার হয়ে গেছে আর ওরা চলেও গেছে।খুব রাগ হচ্ছিলো যাওয়ার আগে আমাকে বাই পর্যন্ত বলে গেল না!এখন অবশ্য বুঝি ও কেন এমনটা করেছিল,ওর জায়গায় আমি হলে হয়তো আমিও বাই বলার সাহস পেতাম না।আফটার অল ছোটবেলার বেস্টফ্রেণ্ড বলে কথা,এতো সহজে কি বিদায় বলা যায়? এখনকার মতোতো তখন এমন মোবাইল ফোনের দৌরাত্ম ছিল না তাই  অনেক করেও মিতির কোন খোঁজ পেলাম না।
রিতার সাথে আমার বন্ধুত্বের শুরু মিতি চলে যাওয়ার পর।অবশ্য আমরা প্রাইমারী লেভেলেও একই স্কুলে পড়তাম কিন্তু অন্য সেকশনে ছিলাম তাই ভালো করে চিনতাম না।মিতির বিরহ কাটানোর পেছনে অনেক বড় একটা অবদান ছিল রিতার।এভারেজ স্টুডেন্ট ছিল,পড়াশোনাটা খুব একটা বুঝতো না কিন্তু তবুও দেখতে দেখতেই দুজন দুজনার বেস্টফ্রেণ্ড হয়ে গেলাম। আমরা তখন অষ্টম শ্রেণীতে।একদিন হঠাৎই রিতা আমাকে একটা রুমাল গিফট করে বসলো,কোন উপলক্ষ ছাড়াই।হাতে বানানো রুমাল আর তার উপরের দিকে ওর আনাড়ি হাতে লেখা,”সেতু+রিতা” আর নিচে একটা লাভ শেপের মধ্যে লেখা,”Friends forever…ভুলোনা আমায়।
নাহ ওকে আজও ভুলিনি,রুমালটাও যত্ন করে রেখে দিয়েছি নিজের কাছে।কথায় আছে কাউকে রুমাল দেওয়ার মানেই নাকি বিচ্ছেদ আর এই কথাটা সত্যি প্রমাণ করতেই বোধহয় কয়েকদিন বাদেই শুনলাম ওর নাকি বিয়ে!তাও আবার পাগলিটা নিজেই একগাল হেসে খবরটা দিল আমাদের! ক্লাস এইট পড়ুয়া একটা মেয়ে,কতইবা হবে বয়সটা?এখনকার ছেলেমেয়ের মতো আমরা কিন্তু এতোকিছু বুঝতাম না তাই এইটে পড়া একটা মেয়ে ভালো করে বিয়ে কি জিনিস সেটাও বুঝতো না।আর না বুঝেই মেয়েটা এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছিলো বিয়েরদিন কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,”কেন করছো বিয়েটা?”
জবাবে পাগলিটা একগাল হেসে বলেছিল,”মেয়ে হয়ে জন্মেছি যখন,বিয়েতো একদিন করতেই হতো।আমার নাম্বারটা নাহয় একটু আগেই চলে আসলো “আর তোর পড়াশোনা?” “এমনিতেও আমার পড়াশোনা কোন কালেই ভালো লাগতো না আর উনি বলেছেন বিয়ের আগেও আমাকে পড়তে দেবেন” নাহ রিতার আর পড়াশোনা হয়নি,বিয়ের আগে পড়াবে বললেও উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে যাওয়ার পর কথাটা বেমালুম ভুলে গেছে ওর শ্বশুরবাড়ির লোকজন।আর তার ফলস্বরূপ আমরা যখন এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছি,রিতা তখন এক সন্তানের জননী এদিকে কয়েকমাস আগে শুনেছিলাম রিতার ছোট ভাইটি পলিটেকনিক থেকে সিভিল/মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা কমপ্লিট করে একটা কোম্পানিতে জব করছে।চাকরির সাথে সাথে বিএসসিটাও চালিয়ে যাচ্ছে,শেষ হলেই ভালো সেলারির একটা জব কনফার্ম।
এরপর কেটে গেছে লম্বা একটা সময়,আর কাউকে বেস্টফ্রেণ্ড বানানোর সাহস হয়নি হারিয়ে ফেলার ভয়ে।আমি তখন এইচএসসি পরীক্ষার পর এডমিশন প্রিপারেশন নিতে ঢাকায়।উদ্ভাসের ফার্মগেট শাখায় ভর্তি হয়েছি আর উঠেছি লালমাটিয়ার একটা মেসে,স্কুলেরই সিনিয়র এক বড় ভাইয়া মেসটা ঠিক করে দিয়েছিলেন।একদিন হঠাৎই মেসের ছাদে কাপড় মেলতে গিয়ে মিতির সাথে দেখা,ও ও নাকি উঠেছে এই মেসেই আর কোচিং করছে UCC ফার্মগেট ব্রাঞ্চে।
আমি পুরোপুরি বদলে গেলেও এত বছরে এতোটুকু চেঞ্জ আসেনি মিতির চেহারায়,অবশ্য আগের থেকে অনেক শান্ত-শিষ্ট হয়ে গেছে মেয়েটা।সেদিন থেকে আবারও পুরনো বন্ধুত্বটা তাজা হয়ে উঠলো,সব ভুলে আবারও নতুন করে শুরু করলাম সবকিছু।ঢাকায় কাটানো ওই ছয়টি মাস জীবনের বেস্ট মেমোরিজ হয়ে উঠলো।দুজনেই স্বপ্ন দেখতাম জীবনে বড় কিছু হওয়ার তাই চেষ্টাও করেছিলাম প্রাণপণে কিন্তু আমি রাবিতে চান্স পেলেও মিতি ছিটকে পড়লো,ভর্তি হলো পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে। রাজশাহী চলে আসার পরও মাঝে মাঝেই যোগাযোগ হতো মিতির সাথে,তারপর একদিন খবর পেলাম ওর বিয়ে!কোন এক হাইস্কুল শিক্ষকের সাথে বিয়েটা হয়েও গেল।বিয়ের পর কিছুদিন পড়াশোনা কন্টিনিউ করলেও আল্টিমেটলি গ্রাজুয়েশনটা আর কমপ্লিট করা হয়নি মিতির।কি করে হবে?বিয়ের দুবছর হওয়ার আগেই যে সে এক সন্তানের জননী!
তারপর আর কি?ধীরে ধীরে যোগাযোগটা কমতে কমতে কবে যে একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল বুঝতেও পারলাম না।যে যার লাইফ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম,একদিন আনমনেই নাম্বারটা ডায়াল করেছিলাম কিন্তু নাম্বারটা বন্ধ।ব্যাস আবারও হারিয়ে ফেললাম আমার বেস্টফ্রেণ্ডকে এতো গেল আমার দুজন বেস্টফ্রেণ্ডের কথা,এবারে একটু অন্য প্রেক্ষাপটে আসি। আমার আব্বু-আম্মুর যখন বিয়ে হয়,তখন আম্মু বিএ তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী।শুনেছি বিয়ের পর থেকেই শ্বাশুড়ি,ননদ,জা আর পাড়া প্রতিবেশীদের হাজারো কটুকথায় তার পক্ষেও গ্রাজুয়েশনটা কমপ্লিট করা সম্ভব হয়নি,আর চাকরি?আমার জন্মের দু বছরের মাথায় যখন আমার ছোট ভাই সৈকতের জন্ম হয় তখন একরকম বাধ্য হয়েই চাকরিটা ছাড়তে হয়।
আমার মেজো আব্বুর একমাত্র মেয়ের নাম সাথী আমার থেকে কম করে হলেও বছর পাঁচেকের ছোট,খুব বেশি হলে ২০ বছর বয়স।এই বয়সেই বছর চারেকের এক ছেলের জননী,স্বামীর সাথে ঠিকমতো বনিবনা না হওয়ায় ডিভোর্সের প্রিপারেশন চলছে। আমার বড় আব্বুর সাত সন্তান,সব ছোটটার নাম ইতি।এ বছরই এসএসসি পাশ করলো,রেজাল্টও বেশ ভালো,স্বপ্ন দেখে লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হবে,শিক্ষক হয়ে সবার মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেবে।কিন্তু এরই মাঝে কারো সাথে গাঁটছড়া বেঁধে ওর সেই স্বপ্নকে গলা টিপে হত্যা করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে একদল মানুষ।সবার সাথে যুদ্ধ করে ওকে কলেজেতো ভর্তি করাতে পেরেছি কিন্তু ঠিক কতদিন আটকাতে পারবো জানিনা।
এতো ছিল স্বল্পশিক্ষিত গ্রাম্য জনগোষ্ঠীর চিত্র,এবার আশা যাক শিক্ষিত সমাজে। আমার এক কাজিন দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে,কাজ করছেন মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি ফেলো হিসেবে,কিছুদিন আগেই অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্বও পেয়ে গেছেন।তার স্ত্রী মানে আমার ভাবীও রাবির স্টুডেন্ট,একাউন্টিংয়ে মাস্টার্স করেছেন।কিন্তু এখন অস্ট্রেলিয়াতে ঘর সামলানোর কাজ করছেন কারণ ভাইয়া চান না উনি কোন জব করুক। হলের ২২২ নং রুমে উঠার পর থেকেই আমার এক রুমমেটকে দেখতাম বিসিএসের জন্য দিন-রাত পড়াশুনা করতে।আপু ম্যাথে একটু দুর্বল ছিলেন কিন্তু আমার ম্যাথটা বেশ স্ট্রং তাই সময় করে সপ্তাহে অন্তত দুদিন করে আমার কাছে ম্যাথ শিখতেন।মাস্টার্স শেষ করার কিছুদিন পরেই তার বিয়ে হলো,ভাইয়া বিসিএস ক্যাডার তাই নাকি তার আর কিছু করার দরকার নেই,সব ছেড়েছুড়ে তাই ঘরকন্যায় মন দিয়েছেন।
আমার ডিপার্টমেন্টে চার বছরের গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট হওয়ার আগেই ৫/৬ জনের বিয়ে কমপ্লিট,দুজনতো এরই মধ্যে মাও হয়ে গেছে।হ্যাঁ তারা গ্রাজুয়েটতো হয়েছে তবে কাঙ্ক্ষিত রেজাল্ট থেকে কিছুটা হলেও পিছিয়ে পড়েছে।
আমাদের গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট হয়েছে গত বছরের শেষের দিকে,তারপর থেকেই একের পর এক বিয়ের প্রস্তাব আসছেই।শুধু আমারই না আমার ক্লাসের ৮১ জন ছাত্র-ছাত্রীর প্রায় ৪৫% ছাত্রীর সবাইকেই ফেস করতে হচ্ছে এমন সিচুয়েশনের আর তারসাথে সোনায় সোহাগা হয়ে ধরা দিয়েছে গত ছয় মাসের কথিত লকডাউন।এরই মধ্যে ৫/৬ জনের বিয়ের খবর পেয়েছি আর আড়ালে যে এমন আরও ৫-৬ জনের যে বিয়ে হয়নি তার গ্যারান্টি কি?
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও বেশ তিক্ত।এই ছয় মাসে আত্মীয়-সজ্বন,পাড়া প্রতিবেশী যেই আসে,যার সাথেই দেখা হয় সবার মুখেই একটা কমন প্রশ্ন,”মেয়েরতো বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেল,বিয়েটা কবে দেবেন?” আমার ভাগ্য ভালো যে আমার আম্মু নিজে ভুক্তভোগী হওয়ায় সমস্যাটা বোঝেন তাই সবাইকেই হাসিমুখে ফিরিয়ে দিচ্ছেন কিন্তু সবারতো এমন সৌভাগ্য হয় না।আর যাদের বাবা-মা কিছুটা সাপোর্টিভ তারাও বারবার সবার এতো কথা শুনতে শুনতে একসময় অতিষ্ট হয়ে ঠিকই মেনে নেন,এমনই চিত্র রাবির আর বাঁকি ডিপার্টমেন্ট গুলোতেও।শুধু রাবিই না দেশের বাকি সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোর চিত্রও এই একইরকম।এক পরিসংখ্যানে দেখেছিলাম সর্বোচ্চ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯০% ছাত্রীর ভাগ্যেই জোটে এই রকম পরিণতি।
কই আমার বন্ধুদেরতো এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় না?একটা ছেলে গ্রাজুয়েট হলে কেউ বিয়ের প্রস্তাব দেয় না,বরং শিক্ষিত বেকার বলে দূরে সরিয়ে দেয়।ক্যারিয়ারে কিছু একটা করতে পারলে তবেই তাদের বিয়ে নিয়ে ভাবা হয় তাও আবার অল্পবয়সী কোন মেয়ের সাথে!সমবয়সী বা কলিগদের মাঝে বিয়ের প্রবণতা নেই বললেই চলে,তাও যেগুলো দেখা যায় সবই লাভ ম্যারেজ বা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা হয়েছে এমন। এতো আমি সামান্য কয়েকটা উদাহরণ দিলাম,এমন হাজারো দৃষ্টান্ত আপনি চাইলেই আপনার আশেপাশে দেখতে পাবেন।সময় বদলেছে,দিন বদলেছে,বদলেছে যুগ কিন্তু আমাদের চিন্তা ভাবনা এখনও সেই মান্ধাত্তা আমলেই পড়ে আছে।হ্যাঁ স্বাক্ষরতার হার হয়তো বেড়েছে,নারীর ক্ষমতায়ন,কর্মসংস্থান তাও বেড়েছে কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা অতিশয় নগন্য,ক্ষেত্রবিশেষে তা আগের চেয়েও কম।
স্বল্প শিক্ষিতদের কথা নাহয় বাদই দিলাম কিন্তু এডমিশন টেস্টে লাখ লাখ ক্যাণ্ডিডেটের সাথে লড়াই করে যেই মেয়েটা পাবলিকে চান্স পায়,সে নিশ্চয়ই শিক্ষিত গৃহিনী হওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে ক্যাম্পাসে ঢোকে না?আমার মতোই তারাও নিশ্চয়ই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর,বড় কোন প্রফেশনে গিয়ে বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করার স্বপ্ন দেখে।তাহলে কেন তা পূরণ করার আগেই…স্বপ্ন দেখার অধিকার যখন কেড়ে নেওয়ারই ছিল তখন আগেই কেন নিল না?কেন তা পূরণের জন্য এতো বছরের স্ট্রাগল আর লড়াইয়ের পরেও পরাজয়কে বরণ করতে হলো?এমন হাজারও প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ভেতরে ভেতরে কুকড়ে মরে অনেক মেয়ে,নারী হয়ে জন্ম নেওয়াকে পাপা মনে করে।
এখন যদি কেউ বলেন যে বিয়ে মানেইতো সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া তারতো কোন মানে নেই,তাদের কাছে আমার প্রশ্ন এমন সাপোর্টিভ ফ্যামিলি শতকরা কত ভাগইবা দেখা যায়?আর যদি ভাগ্যগুণে এমন মিলেও যায় তাহলেও পুরো সংসারের ভার বয়ে,সবার সব আবদার মিটিয়ে যেটুকু সময় নিজের জন্য অবশিষ্ট থাকে তা কি আসলেই পর্যাপ্ত?হ্যাঁ ব্যতিক্রম যে নেই তা না কিন্তু সেটাও যে অতিশয় নগন্য। উন্নত বিশ্বে যেখানে সমবয়সী ছেলে-মেয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে করতে নিজেদের মাঝেই পারফেক্ট লাইফ পার্টনার খুঁজে নিচ্ছে,শুধুমাত্র হাউজ ওয়াইফ যেখানে বিলাসিতা আমরা সেখানে বিয়ের জন্য হন্যে হয়ে একজন পারফেক্ট হাউজ ওয়াইফ মেটারিয়াল খুঁজে ফিরছি।
তাইতো বর্তমানে ইয়াং জেনারাশনের মাঝে সবচেয়ে পপুলার কোরিয়ান,চাইনিজ,থাই বা জাপানিজ ড্রামা শোগুলোতে যেখানে সমবয়সী ওয়ার্কিং কাপলগুলোকে ফোকাস করা হচ্ছে,আমরা সেখানে ঝুঁকে পড়ছি “স্টার জলসার শ্রীময়ী”কিংবা “স্টার প্লাসের অনুপমা বা শাদি মোবারকের” মতো শোতে যেখানে সারাদিন সবার জন্য খেটে মরেও দিনশেষে কেন্দ্রীয় চরিত্রের কপালে জুটছে বেকার আর অশিক্ষতর তকমা।কারণ সে গ্রাজুয়েশন লেভেল পর্যন্ত এসেছে তাতে কি গ্রাজুয়েটতো হয়নি আর সবাই সারাদিন বাইরে খেটে মরে কিন্তু সেতো বাড়ি বসে বসে কিছুই করে না শুধুমাত্র মশা মারা ছাড়া।
এতো হওয়ারও ছিল,সিরিয়ালগুলো যে বাস্তবতার নিরিখেই তৈরি হয়।একদিকে আমরা নারীর ক্ষমতায়ন,নারীশিক্ষার বিস্তার,বাল্যবিবাহ নিরোধের জন্য নানাবিধ আইন পাশ করছি আর অন্যদিকে ১৩/১৪ বছরের একটা মেয়ের বয়স ১৮ লিখে নির্দ্বিধায় তাকে বিয়ের পীড়িতে বসতে বাধ্য করছি। হ্যাঁ সিচুয়েশন অনেকটাই বদলেছে,দেশও উন্নতির শিখরে উঠছে কিন্তু এই উন্নয়ন কি আশানুরূপ হচ্ছে?সোজাসাপ্টা উত্তর হচ্ছে না,যে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীই নারী আর তাদের প্রায় দুই তৃতীয়াশই পরনির্ভরশীল,তার থেকে কাঙ্ক্ষিত সফলতার আশা করাটাও যে বোকামি।এ দায় কার?এ দায় আপনার,আমার,আমাদের গোটা সমাজ ব্যবস্থার।
আমরা এগোচ্ছি,দেশও এগোচ্ছে কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে উন্নত বিশ্ব কিন্তু ওখানেই থেমে নেই,তারা কিন্তু আমাদের দ্বিগুন বেগে সফলতার দিকে এগোচ্ছে।তাই তাদের সাথে তাল মিলিয়ে এগোতে চাইলে এখনই সময় নিজেদের মানসিকতা বদলানোর। আমি কিন্তু মোটেও বিয়ের বিরুদ্ধে না কারণ আমি জানি বিয়ে জীবনের একটা অপরিহার্য অংশ,আমাদের আসল সমস্যাটা আমাদের মানসিকতার আর এই ক্ষেত্রেই দরকার বড় একটা পরিবর্তনের।কুড়িতেই বুড়ি নয়,বিয়ে মানেই সব স্বপ্নের শেষ নয় বরং নতুন করে স্বপ্ন দেখা,শ্বশুর বাড়ি মধুর হাড়ি,যে রাধে সে চুলও বাঁধে এমন উক্তি আর প্রবাদবাক্যগুলো শুধুমাত্র বই-পুস্তকে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে প্রয়োগ করুন।
অনেক হয়েছে আর না,এখন সময় এসেছে পরিবর্তনের।নিজে বদলান,অন্যকে বদলাতে সাহায্য করুন।নারীকে নারীর মতো করে বাঁচতে দিন,পরাধীনতার শিকল ভেঙ্গে মুক্ত আকাশে ডানা মেলে উড়তে দিন,একটা সুযোগ দিন স্বপ্ন পূরণের তবেইতো এগিয়ে যাবে দেশ,এগোব আমরা গোটা জাতি…
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত