জীবন

জীবন
বিয়ের চার বছরের মাথায় শুভ আমাকে আপা,মা এসব বলে ডাকতে শুরু করে।প্রায় ও আমাকে চিনতে পারেনা মাঝে মাঝে ও আমাকে মারার জন্য তেড়ে আসে।ওর এসব আচরণ দেখে প্রতিনিয়ত আমি অবাক হয়েছি আর কাঁদছি।
বেশ ধুমধাম করে পারিবারিকভাবে আমাদের বিয়ে হয়।বিয়ের পরের তিনবছর ভালোই কাটে।বেশ সুখে সংসার করছিলাম ওর সাথে আমার একটি মেয়ে এবং একটি ছেলেকে নিয়ে।কিন্তু সংসার সময়ের চার বছরের মাথায় ওর এরকম অদ্ভুত আচরণ দেখে হতভম্ব হয়েছিলাম আমি। ওর এরকম উদ্ভট আচরণের কারণে শুভকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় আমার শ্বশুর। বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা করার পর জানা যায় ওর ব্রেইন টিউমার।যার জন্যই দিশেহারা হয়ে আমাকে মা বা আপা বলে ডাকে।নিজের ছেলেমেয়েদের চিনতে পারেনা।
ওর ট্রিটমেন্টের জন্য এখন অনেক টাকার দরকার।ইমার্জেন্সি অপারেশন করাতে হবে।আমার বাবার বাড়ি কিংবা শ্বশুরবাড়ি, কারোরই আর্থিক অবস্থা খুব একটা সচ্ছল ছিলো না।যার জন্য এত টাকা ম্যানেজ করাটা ভীষণ সময়সাপেক্ষ এবং কষ্টকর আমাদের জন্য। আমার স্বামী ছিলেন মসজিদের ইমাম।ভাসুর কোনো এক মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন।আর শ্বশুর ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ।আমার বাবাও হচ্ছেন একজন হাফেজ।বরাবরই ধার্মিক পরিবারে বেড়ে ওঠা এবং ধার্মিক পরিবারে বিয়ে। ১৪বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যায় আমার।লেখাপড়াও খুব একটা করিনি।মায়ের কাজ হাতে হাতে করতাম সবসময়। তার জন্য ঘরের সব কাজই মোটামুটি পারি।হাতের কাজও বেশ ভালো পারি। লোকমুখে শোনা,দেখতে নাকি বেশ সুন্দরী ছিলাম।
ভাসুর,শ্বশুর এবং আমার বাবা কিছু টাকা দিয়েছেন এবং শুভর জমানো সবগুলো টাকা নিয়ে মাদ্রাজের উদ্দেশ্যে রওনা হলো আমার শ্বশুর শাশুড়ি। এত দূর ঘরের বৌ’কে নিয়ে যাওয়া নাকি যাবেনা।তাই উনারা শুভকে নিয়ে যায় অপারেশন এর উদ্দেশ্যে। সবকিছুই ঠিকঠাক ছিলো। অপারেশনটাও ভালোভাবে হয়।অপারেশন এর কয়েকদিন পর উনারা ফেরত আসেন শুভকে নিয়ে। কয়েকদিন পর আমার মা বাবা আমিসহ শুভকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসে কিছুদিনের জন্য। এগুলো গত রমজান মাসেরই কথা। এখানে কয়েকদিন থাকার পর ও আমাকে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার কথা বলছিলো।তখন মা ওকে বললো,
–বাবা,তুমি গেলে যাও।কিন্তু ও আরও কিছুদিন থাকুক। শুভ মায়ের কথায় রাজি হয়ে চলে গেলো।চলে যাওয়ার কিছুদিন পর ওয়াশরুমে একা একা যেতে গিয়ে পড়ে যায় এবং মাথায় মারাত্মকভাবে আঘাত পায়।কিন্তু আমার মা বাবা আমাকে বিষয়টা শোনায় নি।আমি জানতামও না। ২২তম রোজার দিনে আমার ছেলে আমাকে বললো,
–মা, আমি ঘুমানোর পর দেখলাম কে যেনো আমাকে বলছে,তোরা এখনো এখানে কি করিস? তোর বাবা তো বেশিদিন বাঁচবে না।তোরা তোর বাবার কাছে চলে যা। আমার ছেলের কথাগুলো শুনে আমি তড়িঘড়ি করে রেডি হচ্ছি শুভর কাছে যাওয়ার জন্য।এদিকে মায়ের কড়া নিষেধ,আমি যেন বের না হই।একসাথে ঈদের পর যেন যাই।শুভ নাকি এখন সুস্থ আছে।মায়ের সব নিষেধ উপেক্ষা করে আমি আমার বাচ্চাদের নিয়ে চলে যাই শ্বশুরবাড়ি।
এখানে আসার পর শুভর পড়ে যাওয়ার বিষয়টা জানতে পারি।এখানকার ডাক্তার দিয়ে দেখানো হয় শুভকে দ্বিতীয়বার মাদ্রাজে যাওয়ার মত টাকা ছিলোনা আমাদের হাতে।তারপর থেকেই শুভর অবস্থার আরও অবনতি হতে থাকে। শুভর পাশে বসে থেকেই আমার দিন রাত কাটে।কিন্তু সে আমার সাথে একটি কথাও বলতে পারেনা।চোখ বন্ধ করেই সর্বক্ষণ পড়ে থাকে। আমি আসার তিনদিন পর সে চলে যায় না ফেরার দেশে।শুভর মারা যাওয়াটা মেনে নিতে পারছিলাম না।আমার জীবনে সবটা কেন এত তাড়াতাড়ি হতে হলো!রূপে গুণে বেড়ে ওঠা তাড়াতাড়ি, আর তাড়াতাড়ি বিয়ে, মা হওয়া এবং বিধবা হওয়া।
সবকিছুই আমার জীবনে তাড়াতাড়ি হয়ে গেলো। আমি জানতাম না স্বামী নামের লোকটি না থাকলে মেয়েদের যে দুনিয়াতে কোনো শক্তি বা ভরসা থাকেনা।শ্বশুর বাড়িতে সারাক্ষণ শাশুড়ির কথা শুনতে হয়। কাজ নিয়ে আমার কোনো অলসতা ছিলো না কখনোই।তারপরেও আমাকে কথা শুনতে হচ্ছিলো শুভ মারা যাওয়ার পর থেকে। ও চলে যাওয়ার কিছুদিন পর বাচ্চাদের নিয়ে শ্বশুর বাড়ি থেকে চলে আসলাম বাবার বাড়িতে।আমি বরাবরই হাত গুটিয়ে বসে না থাকা টাইপ একজন মানুষ।কিন্তু এই এক মাস আমার কিছুই করতে ইচ্ছে করছিলো না।তারপরেও মায়ের কাজে অনেক হ্যাল্প করেছি বা করছি।
বাবার বাড়িতে থাকার পর এক মাসের মাথায় আশ্চর্যজনকভাবে জানতে পারি এই ঘরে অর্থাৎ আমার বাবার ঘরে আমি আর আমার বাচ্চাদের জায়গা হচ্ছে না।আমরা মানুষ বেশি হয়ে গেছি।তাই আমার বাবা উনার ঘরের পাশে আমার জন্য ছোট্ট করে একটা আলাদা ঘর তৈরির বন্দোবস্ত করছেন! আহা জীবন আমার! বিয়ের পর মেয়েরা সত্যি বাবা মায়ের কাছে অন্য কেউ হয়ে যায়! শ্বশুর শাশুড়ির কাছে আমি পরের বাড়ির মেয়ে বা পর সেটা মানা যায়, কিন্তু বাবা মায়ের কাছেও যে একই হয়ে গেলাম!
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত