মায়া

মায়া
আমার পাশে আটান্ন বছরের একজন লোক শুয়ে ঘুমোচ্ছে।এই মধ্য বয়স্ক লোকটাই আমার স্বামী।মানুষের ঘুমন্ত মুখটা যে কতো মায়াবী হয়ে থাকে তা কখনো না দেখলে বোঝার উপায় নেই।আমারও তাকে দেখে মায়া হচ্ছে।অথচ একসময় এই লোকটাকেই আমি খুব অপছন্দ করতাম।আমার যখন বিয়ে হয়েছিলো তখন আমার বয়স ছিলো ষোল আর তার বয়স আটত্রিশ।লোকটাকে আমার মোটেও সহ্য হতো না।ভাবতাম দুনিয়াতে এতো পুরুষমানুষ থাকতে এই বুড়া লোকের পাল্লাতেই নিয়তি কেন আমাকে বেধে দিলো!অবশ্য এই লোকের সাথে আমার বিয়ে দেয়ার কারনটা ছিলো একটাই।এই লোকের নিজের বাড়ি আছে,ব্যবসা আছে।মেয়ের সুখের কথা ভেবে কোনো মা বাবাই চাইবেন না মেয়ের জন্য আসা এমন উচ্চ একটা সম্বন্ধ ফিরিয়ে দিতে।তাই আমার বেলায়ও এর কোনো ব্যাতিক্রম হয় নি।আমার সুখের কথা ভেবেই এই লোকের সাথে আমার বিয়ের কাজটাও হয়ে গেলো।
বিয়ের প্রথম জীবনটা আমার জন্য খুব বাজে একটা সময় ছিলো।আমার চেয়ে বেশী বয়সী একটা লোককে সারাক্ষণ চোখের সামনে স্বামী হিসেবে দেখতেও যেমন বিরক্ত লাগতো তেমনি স্বামী হিসেবে মানতেও ঘেন্না হতো।কিন্তু আমার খারাপ লাগার মতো কোনো আচরণ সে কখনো করে নি।আমি তার বয়সে অনেক ছোট বলে আমাকে যত্ন আর খেয়াল রাখায় সে কখনো কোনো কমতি রাখে নি। বাবার বাড়িতে গেলে একাধারে দুই চার সপ্তাহ ইচ্ছে করেই কাটিয়ে আসতাম।এক কথায় নিজের স্বামীকেই স্বামী ভাবাটা আমার জন্য খুবই অসহ্যকর ব্যাপার ছিলো।একবার ইচ্ছে করেই ছোটখাটো একটা কান্ড করে ফেললাম।রাত দুইটা বাজে জেগে উঠে তাকে বললাম-
-“আপনি এখান থেকে যান।আমি একা ঘুমাবো।আমার একা ঘুমাতে ইচ্ছে করছে।এখন থেকে একা একা ঘুমাতে অভ্যাস করবেন।” সে ঘুম থেকে উঠে হকচকিয়ে বললো-
-“কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখেছো?” আমি আরও বিরক্ত কন্ঠে জবাব দিলাম-
-“আমি খারাপ স্বপ্ন দেখলে আপনার কি!আপনাকে আমার ভালো লাগে না।”
কখনো বুঝতেই চেষ্টা করতাম না যে আমি এসব বললে সে মনে কষ্টও পেতে পারে।নিতান্ত সহজসরল মানুষদের মন খুব নরম হয়।এরা সামান্য কঠিন কথা সহজে সহ্য করতে পারে না।সেদিন লোকটা ঠিকই আমার কথা শুনে বালিশ নিয়ে বারান্দায় পাটি বিছিয়ে শুয়েছিলো।সকালে আমার শাশুড়ি তার বারান্দায় ঘুমানোর দৃশ্যটা দেখে অনেকবারই আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করেছিলো কিন্তু সে আমার বলার কোনো সুযোগ না দিয়ে একটা ওজুহাত দেখিয়ে বানিয়ে বানিয়ে শাশুড়ি মা কে বলেছিলো রুমের মধ্যে প্রচন্ড গরম।তাই বারান্দায় শুয়ে পরেছে হাওয়া খেয়ে আরাম করে ঘুমানোর জন্য।
বিয়ের কয়েকবছর পর তার মাথায় চুল পাকার বিষয়টা লক্ষ্য করেছিলাম।জিনিসটা দেখে এতোই মেজাজ খারাপ হয়েছিলো যে মনে হচ্ছিলো এই লোকের সংসার ফেলে আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পরি।আমার বান্ধুবীদের বিয়ে হয়েছে কতো সুন্দর যুবক ছেলেদের সাথে।দেখতে প্রচুর হ্যান্ডসাম।ওরা নিজেরাই প্রশংসা করে বলতো ওদের বরকে শার্ট প্যান্ট পরলেই নাকি নায়ক নায়ক লাগে।এসব আমার শুনতে ভালো লাগতো না।মাঝেমাঝে মনে হতো ওরা এসব ইচ্ছে করে আমাকে শোনায় যেন আমি ওদের সাথে হিংসে করি।কিন্তু মজার ব্যাপার হলো,যাদের বরের কথা এতোক্ষণ বলে যাচ্ছিলাম ওদের মধ্যে দুইজনের স্বামী নিয়ে ঝামেলা বেধেছে।একজন বললো তার স্বামী অন্য একটি মেয়ের সাথে সময় কাটায় আর অন্যজনের বিয়ে প্রায় ভাঙা ভাঙা অবস্থা।আর আমি যার সাথে সংসার করছি এই লোকের খারাপ কিছু আজ পর্যন্ত আমার চোখে পরে নি।
শুধু চোখে পরেছিলো তার বয়সটাই।শুধু বয়সটাই ছিলো তার অপরাধ।কিন্তু এখন ভাবি লোকটা আমাকে কতোটা ভালোবেসেই না আমাকে সুখে রেখে এসেছে আর আমি বান্ধুবীদের হ্যান্ডসাম স্বামী নিয়ে তার সাথে কারনে অকারনে চেঁচিয়ে উঠে কতোই না অপমান করে বেড়িয়েছি।তার জায়গায় অন্য একজন পুরুষ হলে হয়তো আমাকে সঙ্গে সঙ্গে তালাক দিতো।কিন্তু এই লোক এক বিন্দু আওয়াজ পর্যন্ত করে নি।যতোই মাথা হেট করে একটা অতৃপ্তির নিশ্বাস ফেলতো তাকে অপমানিত করতে পেরে আমি ততোই আনন্দ পেতে থাকতাম। কি আশ্চর্য! বিয়ের এতো বছরভর পর এসব পুরোনো কথা মনে করছি।এর আগে কেন এসব কথাগুলো মনে পরে নি বুঝতে পারছি না।
আমার বিয়ের অনেকটা বছর কেটে গিয়েছে।প্রায় ছয় মাসের মতো হবে আমার স্বামী অসুস্থ হয়ে বিছানায় পরে আছে।আর আমিই এই অসুস্থ মানুষটার সেই বদমেজাজি বউ যে সারাক্ষণ অসুস্থ স্বামীর দেখভাল করছি।কোনো কোনো দিন রাতও জাগতে হয়েছে তাকে ওষুধ খাওয়ানোর জন্য।চোখের নিচে কালি পরে অনেকটা শুকিয়ে গিয়েছি।এটা আমি না বুঝতে পারলেও আমার মেয়ে দুটো বুঝতে পারে।ওরা আমার সেবা করে আর আমি সেবা করি ওদের বাবার।ওদের বাবার সেবা যত্ন করতে করতে এটা আমার একটা অভ্যাস হয়ে গেছে।মাঝে মাঝে ভাবি তার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে আমি কি নিয়ে থাকার অভ্যাস করে বাঁচবো! পৃথিবীতে মেয়েদের সবচেয়ে সুখের স্থান বুঝি তার সংসার।আর সেই সংসার নামক স্থানে স্বামী আর সন্তানের মতো সুন্দর কিছু পৃথিবীতে বুঝি আর দ্বিতীয়টা হয় না।আর পৃথিবীতে অদ্ভুত জিনিসগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে মানুষের বদলে যাওয়া।আমার মধ্যে যেই যেই পরিবর্তন এসেছে আমি সেগুলো ধরে ফেলতে পারি।
আমার স্বামী সারাক্ষন বিছানায় পরে থাকে।হাটতে পারে না।কথা বলতে পারে না।শুধু চোখের ইশারায় অনুভূতি প্রকাশ করতে চায়।আর আমি ওর এই অসহায় চেহারাটার দিকে তাকিয়ে মায়ায় পরে যাই।মাঝে মাঝে এই অসুস্থ মানুষটার উপর হাত রেখে তার দিকে তাকিয়ে বলি “আমি অনেক বদলে গিয়েছি।তাই না!” কয়েক বছর আগে হয়তো সে এই ভালোবাসাটাই আমার মাঝে খুঁজেছিলো যা আমি তাকে মন থেকে কখনোই দেই নি।আজ সেই ভালোবাসাটা সে আমার চোখে দেখতে পেরে চোখের পানি ফেলে।আর আমি আমার আঁচল দিয়ে সেই পানি মুছে দেই।তার চোখে তাকিয়ে আমার মায়া হয়।আর আমি বার বার এই মায়ার প্রেমে পরে যাই।আর এই প্রেমটাই আমাকে নতুন করে ভালোবাসায় বেধে দেয়।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত