ভিন্ন ভাবনা

ভিন্ন ভাবনা
রাজন যেদিন অফিসে যাওয়ার সময় শার্ট আয়রন নেই বলে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে আমার চুলের মুঠি ধরল সেদিন ও বের হয়ে যেতেই আমি আয়নার সামনে গিয়ে চুলের গোড়া ধরে কাইচি দিয়ে এক পোঁচ দিয়ে আমার দেড়হাত লম্বা চুল গুলো কেটে ফেলেছিলাম। কেন জানি চুল গুলো কেটে ফেলার পরেই হঠাৎ করে আমার ভেতরের রাগটা পানি হয়ে গেল। আমার সাত বছরের মেয়েটা আয়নার সামনে এভাবে আমাকে দেখে কয়েক সেকেন্ড অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ করেই হেসে দিয়ে বলল,মাম ইউ আর লুকিং সো কিউট।
আমি সোজা শাওয়ার নিতে চলে গেলাম৷ বের হবার পর নিজেকে ভীষণ হালকা লাগছিল। বাসায় ফিরে আমাকে দেখে রাজন বিস্ময় মিশ্রিত ক্ষোভ নিয়ে দেখল। জানি বিয়ের ন’বছরের মাথায় আমার হঠাৎ এতটা রিয়াকশন দেখে এতটা অবাক হয়েছিল যে এ ব্যাপারে কথা বলার সাহস করেনি। আমার ননাস দেখে বলল, মৌরী চুল কেটেছ কেন তাও এমন বিশ্রি করে, ছোট করতে চাইলে পার্লারে যেতে। যা পারনা তা যে কেন করতে যাও। আমি হেসে বলেছিলাম যে চুল সৌন্দর্য বর্ধনের চাইতে তার মালিককে আঘাত করতে দূর্বলতা হিসেবে কেউ ব্যবহার করে তা থাকার চাইতে না থাকাই শ্রেয় আপু। রাজন রক্ত চক্ষু নিয়ে তাকিয়ে থাকলেও কোন উত্তর করেননি আর আমার ননাস সবটা বুঝেও ভাইয়ের দোষটা খুব কৌশলে এড়িয়ে গেলেন।
রাজনের চাচাতো বোনের বিয়েতে যাব বলে যেদিন শাড়ী পড়ার পর রাজন বলল, শাড়ী কেন পরেছ? নিজের শরীরটা দেখেছ? পেটেতো দু মন চর্বি। এটা বদলে একটা সালোয়ার কামিজ পরে নাও জলদী,হাতে সময় খুব কম। চোখ মুছতে মুছতে বিয়ে তে পরব বলে এত দিন ধরে পছন্দ করে রাখা শাড়ী টা বদলে সালোয়ার কামিজ পরে এলাম। তবে শুধু বিয়ে বাড়ীতেই গেলাম যেন কিছুই উপভোগ করতে পারলামনা। বাসায় ফিরে পরদিন বিয়ের শাড়ী বাদে গুনে গুনে বাইশটা শাড়ী বিলিয়ে দিয়েছিলাম। দিয়ে দেবার পর ভীষণ তৃপ্তি পেয়েছিলাম। রাজন যখন জানতে পারল মেয়ের কাছ থেকে খবরটা বলেছিল, বাড়াবাড়ি করেছ কিন্তু মৌরী। আমি হেসে বলেছিলাম, বরং যে কাপড় পরার মত সৌন্দর্য আমার নাই সেগুলো জমিয়ে রাখাটাই আমার কাছে বাড়াবাড়ি রকমের অপচয় মনে হয়।
ইলিশ মাছটা আমি ঠিক আমার শাশুড়ির মত ভাল রাঁধতে পারিনা শুনতে শুনতে যখন দশ বছরের মাথায় আমি ইলিশ মাছ পাকাপোক্ত ভাবে নিজে রাঁধা বন্ধ করে দেই , বুয়া কে দিয়ে রাঁধাই সেদিন আমার শাশুড়ী মা বলেছিলেন, বৌ মা মেয়ে মানুষের এত তেজ ভাল না। আমি শান্ত স্বরে জবাব দিয়েছিলাম তেজ আর কই দেখাতে পারলাম মা বরং আমিতো আমার অপরাগতা মেনে নিলাম। রাজন বলেছিল মুখে মুখে তর্ক করছ কেন মৌরী? ভাল না লাগলে রেঁধনা কে খেতে চাইছে।
সেই থেকে আজ পনের বছর ইলিশ মাছ রাঁধিনা। আমার মায়ের বয়স হয়েছে মা একা হাতে সবটা করে উঠতে পারে না দেখে রাজন কে বললাম মাকে একটা ওয়াশিং মেশিন কিনে দিব। বাবা মা আপত্তি করা সত্ত্বেও রাজন ভাল দেখে একটা ওয়াশিং মেশিন কিনে দিল। বাড়িতে সেটা সেট করিয়ে দিয়ে হাসিমুখে বলল, মানুষ শশুর বাড়ী থেকে গিফট পায় আর আমাকে শশুর বাড়ীতে গিফট করতে হয়। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। বললাম, বেশতো তাহলে আগেই না করে দিতে খামখা তোমার পয়সা খরচা হত না। রাজন বলেছিল আমি ছোটলোক বলেই পয়সার কথা তুলেছি। হয়তবা, তবে সেই শেষ, এত বছরের সংসারে আর কখনো মন চাইলেও বাবা মায়ের জন্য কিছু কিনে দিতে বলিনি নিজ থেকে।
বিয়ের তৃতীয় দিনে যখন আমার মেয়ে মাইশা বিশাল ট্রলি ব্যাগটা সহ রাত নটা নাগাদ বাড়িতে এসে হাজির হল তাও আবার একা আমাদের বিস্ময়ের সীমা রইলা সেদিন। এভাবে একা হুট করে চলে আসার কারণ জানতে চাইলে মাইশা বলেছিল,শশুর বাড়ীতে ফুফু শাশুড়ীদের পায়ে হাত দিয়ে সালাম না করার কারণে তাকে বেয়াদব বলে সম্বোধন করেছে তার শাশুড়ী। তার স্বামী সাম্য ও তাদের পক্ষ নিয়ে বলেছে, উনারা যখন চাইছে তো করলেই পারতে খামখা আগ বাড়িয়ে নিজেকে শিক্ষিত বেয়াদব প্রমাণ না করলেই কি হতনা? উত্তরে মাইশা বলেছে যে, যারা এটা জানে না যে পায়ে হাত না দিয়েও সম্মান করা যায় তারা সম্মান পাওয়ারই যোগ্যইনা। এ কথা বলে সে ও বাড়ীতে এক মুহূর্ত ও দাঁড়ায়নি। যে বাড়ীতে যেতে না যেতেই তারা সে কতটা আদব আর কতটা বেয়াদব সেটা যাচাই করে ফেলেছে তাদের সাথে ভদ্রতা দেখানোর কিছু নেই বলেই সে চলে এসেছে।
রাজন তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে, যেমন মা তেমন তার মেয়ে হয়েছে। মাইশা ফুঁসে ওঠে, ভুল বললে বাবা আমি না মায়ের মত না,আর হতেও চাইনা। বরং মায়ের উচিত ছিল আমার মত হওয়া। সেদিন মায়ের উচিৎ ছিল নিজের চুল না কেটে ফেলে তোমার হাতটা ভেঙ্গে দেওয়া কারন চুলেরতো কোন দোষ ছিলনা বল দোষ যা ছিল সবটাই তোমার হাতের,শাড়ীগুলা বিলিয়ে না দিয়ে ওগুলা আরো বেশী করে পরা উচিত ছিল কারন মা তো আর ফিল্মে নামতে যাচ্ছিল না যে বাতাসে শাড়ী উড়লে তার পেটটাও দেখতে সুস্মিতা সেনের মত দেখতে লাগতে হবে, মায়ের উচিত ছিল সারাটা জীবন ইলিশ মাছ নিজ হাতে নিজের মন মত করে রাধা কারন সে তোমার মা না সে তোমার বৌ মৌরী, তাকে কেন তোমার মায়ের মত করেই সব রান্না পারতে হবে সে তো আমার মা আমি তো আমার মায়ের হাতের রান্নাটাই বেশ উপভোগ করতাম। আর শোন বাবা তুমি সেদিন তোমার শাশুড়ী কে ওয়াশিং মেশিন কিনে দাওনি দিয়েছে এক মেয়ে তার মাকে। মাকে দিয়ে সংসার করিয়ে, আমার সব কিছুই তোমার,আমার টাকাই তোমার টাকা,তোমাকে কেন বাইরে কাজ করতে হবে বলে ভাল মানুষটাকে ভুল বুঝিয়ে তার মাকে দু পয়সার জিনিস দিয়ে সেটা নিয়ে গর্ব করে সেদিন মা না তুমিই ছোটলোকির পরিচয় দিয়েছিলে।
ভাবছ মা আমাকে এসব শিখিয়ে বড় করেছে? না বাবা ভুল ভাবছ বরং আমি তোমার এসব আচরন দেখে দেখে নিজেকে তোমাদের মত পুরুষদের যোগ্য করে গড়ে তুলেছি। যেন আমাকেও মায়ের মত একটার পর একটা স্যাক্রিফাইস করে পুরো একটা জীবন কাটাতে না হয়। আর আমি সেটা কাটাবো ও না আর তাই চলে এসেছি জানি আমাকে তুমি তাড়িয়ে দিবেনা। কেন জানো বাবা? কারন তুমি আমার বাবা আর বাবারা পরের মেয়েকে যত সহজে আঘাত করতে পারে নিজের মেয়েকে তত সহজে পারেনা।
আমি মাইশার কথায় ভেতরে ভেতরে কাঁপতে থাকি, কিন্তু কেন জানি আমার চোখে জল আসেনা,আমি ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলিনা। কোন এক অদৃশ্য শক্তি যেন আমাকে শক্ত করে ধরে রাখে। আমি মাইশাকে দেখি, ‘মাম ইউ আর লুকিং সো কিউট’ বলা মেয়েটাকে দেখি যেন আমার সামনে এক অপরিচিতা দাঁড়িয়ে আমি তাকে চিনেও চিনতে পারছিনা বুঝেও বুঝতে পারছিনা। রাজন ঝট্ করে বসা থেকে উঠে পকেট থেকে সিগারেট বের করে সেটাতে আগুন ধরিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। মা টেবিলে খাবার দাও খুব ক্ষুধা পেয়েছে বলে নির্লিপ্ত ভাবে মাইশা ওর রুমে গিয়ে গান ছেড়ে কাপড় বদলাতে বদলাতে গুনগুনিয়ে নিজেও গান ধরে, আমার দুঃখ গুলো কাছিমের মত গুটি গুটি পায়ে আর এগোতে পারেনা আমার দুঃখ গুলো কাছিমের মত আমাকে ছাড়িয়ে আর এগোতে পারেনা..…
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত