মায়ের আবর্তন

মায়ের আবর্তন
আজ আমার জম্মদিন। সেই রাত ১২ টা থেকে উইশ আসা শুরু হয়ছে। ফেন্ডরা মিলে নানা প্লান করছে কেক কাটবে। অনেক সারপ্রাইজ ও আছে। আমি রাত ২ টা অবধি রিপ্লে করতে করতে ক্লান্ত। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে দেড়িতে ঘুম ভাঙ্গল। মায়ের চিল্লাচিল্লিতে।আজ ও শান্তি দেয় না।
-উঠ রিয়া। স্নান করে আয়। প্রর্থনা কর। আমি পায়েস বানাইছি, খাবি ।
-এত সকালে আমি স্নান করতে পারব না।আর তোমাকে বলছি না আমি মিষ্টি খেলে বমি আসে।
-একটু খেলে কিছু হয় না।
-হবে। যাও। ঘুমাব। আমি বের হব। ফেন্ডরা প্লান করছে। অনেক ছবি তুলব এখন ঘুমায়।
-আজ কেন বাইরে যাবি? বাসায় থাক।
-বল্লে হলো নাকি? ;
কাথা মুড়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ল রিয়া। তুবা অনেকক্ষন ধরে ফোন দিচ্ছে। উঠে ফ্রেস হয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম। রেস্তুরাই যেতেই সবাই এমনন ভাবে চিল্লাই উঠল। অনেক মজা হল। কেক মেখে আমাকে এক অবস্তা । হারামী গুলো বিল ও নিলো। বাসায় ফিরতে ফিরতে ৩ টা। মা ধরল দরজায়।
-কিরে এতক্ষন কোথায় ছিলি? কখন থেকে খাবার নিয়ে বসে আছি।
-আমি খেয়ে এসেছি।
-আজ তোর জন্য রান্না করলাম। আর তুই?
-আমি ফেন্ডদের সাথে ঘুরতে পারব না আজব?
-আমার চেয়ে ফ্রেন্ড বেশি? ওরা জম্ম দিসে?
-মা? বেশি প্যানপ্যান করিও না,যাও।
এই আমার মা। সারাক্ষন ঘ্যানঘ্যান। রাতুলের সাথে কথা বলতে গিয়ে একদিন ধরে ফেলেছে। কি বকা? যেন আমি ছোট মেয়ে। কিছুদিন পর দেখি বাসায় তোড়জোড় আজ আমায় দেখতে আসবে। কেমন লাগে? বের হতে দিলো না। বিকালে ওরা আসে। সবাই পছন্দ করে খুব। খুব তারাতাড়ি বিয়েও ঠিক হয় আমি রাতুলের সাথে পালিয়ে যাব ঠিক করি। বিয়ের জন্য ব্যাংক থেকে টাকা এনেছিল। ১ লাখ টাকা নিয়ে বের হয়ে যায়।
রাতুল আসে কিন্তু আমাকে বাসে ঘুমন্ত রেখে টাকা নিয়ে নেমে যায়। আমি আবার বাসায় ফিরে আসি। জানি না কি হয়েছিল। মা ওইদিন আমাকে কিছু বলে নি। আমি ভেবেছি মা কিছু বুঝে নি। আমি যখন কাদছিলাম মা মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল -সব মানুষ সবার জন্য না। মহিনের সাথে আমার বিয়ে হল। মা খুব কেঁদেছে। কিন্তু আমার অত খারাপ লাগে নি। মায়ের এইসব অত্যচার থেকে বাচঁতে পারলে ভালো। মহিন খুব ভাল। কক্সবাজার গেলাম হানিমুনে। বাসায় ফিরে দাওয়াত এই সেই কোন দিকে মাস গেলো খেয়াল নাই। মা ফোন দে মাঝে মাঝে ধরি মাঝে মাঝে ধরি না। কি বলব এত? কিন্তু আস্তে আস্তে সব যেনো কেমন হতে লাগল। সকালে উঠতে হয়। রান্নাঘরে কাজ করতে হয়। সবাইকে দেওয়ার পর নিজেকে খেতে হয়। খেতে বসলে এটা ওটা আনতে হয় আবার উঠে ।
মহিন অফিস যাওয়া শুরু করলে বাসায় যেন একা একা লাগত। মা কে ফোন দিয়। অনেক বার। কি কর? কি রাঁধছ?
ফ্রেন্ডদের সাথে এখন বের হওয়া হয় না। অনেক পারমিশন জবাব দিতে হয়। রান্না ঘরে আস্তে আস্তে আমার কাজ বাড়ে। আমি কেমন করে যেন সব পারতে শুরু করি কাজ গুলো। এত গুলো বছরে যেন কাজ গুলো কখনো আমি খেয়াল ও করি নি, এখন পারি। রান্না যেন এখন সহজ লাগছে। মা কে বলি। মা শিখিয়ে দেয় কিভাবে করব। আমাদের বাসা থেকে আমার নেওয়ার জন্য অনেকে আসে। আমি রান্না করি। প্রথমে ছেলেরা খায়। এরপর মা রা বসে আমার তখন খিদায় পেট ব্যাথা শুরু হয় মা বলে- বিয়াও বসে যাক না। শাশুড়ি কিছু বলে না। অন্য বউরা তো এখনো খায় নি। আমি বলি- না মা, আমি ওদের সাথে খাব। তাও মা মায়ের থাল থেকে আমাকে কিছুটা খাইয়ে দেয় । আর বলে-
-অনেক দিন খাওয়াই নাই তো মেয়েকে একটু খাওয়ালাম আর কি। মহিনের সাথে ঝগড়া হয় মাঝে মধ্যে। আমার ছেলেমানুষি গুলো নাকি অসহ্য লাগে। কিন্তু রাতে কি অদ্ভুত ভাবে পাল্টে যায়। আমিও ভুলে যায়। দিনের বেলায় সব অসহ্য লাগে তার। আমি বাসায় গিয়ে চুপ করে থাকি কিছু বলতে পারি না মাকে। মাও জানতে চায় না।
৬ মাস পর আমি প্রেগন্যান্ট হয়। কি খুশি সবাই। আমার কত যত্ন, কি খাবো? কি খাবো না? আমার কত জল্পনা কল্পনা? কি হবে ছেলে নাকি মেয়ে? কি নাম দিব? কেমন হবে? পেট বাড়লে কেমন লাগবে? ইসস আর তর সয় না।
আস্তে আস্তে পেট বাড়তে থাকে মহিনের যত্ন ফিকে হয়, তবে করে। রাতে কাছে আসে না যদি আমি ব্যাথা পায়। আমার যেন সব খালি খালি লাগা শুরু হয়। মুড সুইং হয়। আমার ড্রেস গুলো আর হয় না। ড্রেস খুজে পায় না। মহিন দিব্যি বন্ধুদের দাওয়াতে যায়। আমাকে নিতে পারে না। যদি বলি তুমিও যেও না। হাসে, যেন মজা করছি। আমি চুপ থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলি। সারারাত কষ্টের পরে এক ভোরে এক পাখি এসে বসে আমার কোলে। মেয়েকে দেখে আমার এত দিনের কষ্ট অভিমান সব মুছে যায়। সবাই ভীষণ খুশি বাচ্চা নিয়ে। নতুন নতুন জামা আর বাহারী সব কাপড়ে যেন পুতুল আমার মেয়ে। মেয়েকে খাওয়াতে গেলে যেন এক অদ্ভুত শিহরণ।
মায়ের কাছে থাকি মাস দুই। তখন মনে হতো না আমি মা হয়েছি। আমি শুধু খাইয়ে দিতাম বাকি সব মায়ের কাছে। রাতে বার বার তুলে খাওয়াতে হত।ঘুম টা ঠিক মত হত না। বিরক্ত হতাম। এক রাত সারারাত ঘুমালাম মেয়েকে দুধ দিলাম না। সকালে উঠে কি যে খারাপ লাগছিল। তখন ভাবলাম সামান্য ঘুমের জন্য আমি সারারাত না খাওয়াই রাখলাম আমার মানিক টাকে। আমি বুঝলাম আমি মা হতে শুরু করলাম। শুরু করলাম তার আর শেষ নেই। মেয়ের জ্বর হলো সারা দিন রাত কান্না। আমি কোলে নিয়ে হাটলে চুপ। বসলে কান্না। আমি যাতে মেয়ে কান্না না করে তাই সামান্য ঘুম বিসর্জন দিলাম আর কি। আমি যে মা হতে শুরু করেছি। মাকে প্রশ্ন করতাম -মা তোমরা এত কষ্ট করেছ? মা বলত- এমনে কি বড় হয়েছ? সবে তো শুরু। ঠিক বলেছিল মা সবে শুরু হয় শেষ হয় না মা হয়ে উঠা। একদিন মেয়ে ঘুম পাড়িয়ে সবে কাজ শেষ করে নিজে খাওয়ার জন্য ভাত নিলাম। অমনি মেয়ের কান্না। আমার প্রচন্ড খিদা লেগেছিল। মেয়ে কাঁদছে তাও একটু খেতে চাইলাম। মহিন বলে উঠল-
– মেয়ের চেয়ে খাওয়া বেশী হলো?
আমি এক গ্লাস পানি খেয়ে কোন মতে বাচ্চা খাওয়াতে বসলাম। গলা শুকিয়ে আসছিল কিন্তু মেয়ে কি সুন্দর করে হাসছে। আমি ভুলে যায় খিদা। আমি যে মা হয়ে উঠছি। এখন আর আমার জম্মদিন নিয়ে কোন বাড়াবাড়ি নেই। ফ্রেন্ডরা আর প্লান করে না। কোন মাথা ব্যাথা নেই। দুইটা উইশ। মহিন গিফট একটা দিলে দে। মা পায়েস বানিয়ে ঘুম থেকে তুলে না। মা ফোন দিতে ভুলে না। ফ্রেন্ডদের সাথে গেলে ওদের সাথে তাল মিলিয়ে কথা খুজে পায় না। কেমন যেন হয়ে যায়। বাচ্চার পিছনে ঘুড়তে ঘুড়তে নিজের শীরর যে ভারি হচ্ছে তা কমানোর উপায় নেই। ব্যায়াম করার টাইম নেই খাওয়া কমানোর উপায় নেই। আমি না খেলে মেয়ে খাবে কোথেকে? অনেকে অনেক কথা বলে। শুনি। হেসে উত্তর দি। আমি কেমন যেন মায়েদের মত হতে থাকি। বাচ্চা দোষ করলে ধুম করে মারধর করি না। আমাকে সবাই কথা শুনায়। আমিও সংসারে সমালোচনায়, খোটা কথা হজম করে পাল্টা জবাব দেওয়া শিখে যায়। আগে যা কেমন জগন্য লাগত।
কিন্তু মিষ্টু যখন ছোট হাত দিয়ে আমায় জড়িয়ে ধরে। আমি মুখে মুখ লাগায় সব যেন খুশিতে পূর্ণ লাগে। নিজে সাজগোজ, রূপচর্চা করারা চেয়ে মেয়ের সাথে খেলতেই ভাল লাগে। দেখতে দেখতে আমার আদরের দুলালি সবার চোখের মণি বড় হতে থাকে।ওর কিছু হলে সবাই যেন হুলুস্থুল কান্ড করে।আমার হাত কাটা হাত পোড়া যেন কাজের মধ্যে পড়ে গেছে ততদিনে। মেয়ের কিছু হলে যেন অনেক কিছু হয়ে যায়। মিষ্টুকে স্কুলে দিয়।মেয়ে আমার বড় হতে শুরু করে। তার সব কিছুতেই আনন্দ। নতুন আনন্দ। মেয়ে বই খাতা নতুন নতুন শেখা বুলি সব যেন নিজের অর্জন লাগে। স্বপ্ন দেখতে শুরু করি মেয়ে খুব লক্ষীমন্ত বানাব। ভালো একটা পেশায় পড়াব। যেন সংসারে রান্না করে কাটাতে না হয়। মেয়ের পরীক্ষার সময় নিজে রাত জাগি। পড়া ধরি পড়ায়। ওর রেজাল্ট যেন নিজের লাগে। আস্তে আস্তে মেয়ে একাই পড়তে পারে তখন আমি ছেলের পিছনে ব্যস্ত। মিষ্টু এখন একাই ঘুমাতে পারে আমার গা ঘেসে ঘুমাতে হয় না।
কখন যে এত বড় হয়ে গেল। বাসায় অনেক গেস্ট আসল। আমি মেয়ের পাশে গিয়ে ঘুমালাম। মেয়েকে কাছে নিতে চাইলে মেয়ে বিরক্ত হয়। ওর একা ঘুমাতেই কমফরটেবল লাগে। আমি কিছু বলি না চুপ করে অন্য পাশ ফিরি।
মেয়ে যখন ক্লাস টেনে। তখন ওর ফ্রেন্ড অনেক বেড়ে যায়। ক্লাস পাংক করে ঘুরতে যায়। ফ্রেন্ডরা অনেক ইম্পটেন্ট। কিছু বললে রেগে যায়। আমি বুঝাতে পারি না। মেয়ে বলে আমি যত্তসব বলি। মেয়ে ভাল রেজাল্ট করে। ভাল কলেজে ভর্তি যেন আরেক যুদ্ধ। আমি সব দিকে খোজ নিয়ে ভাল কলেজে ভর্তি করায়। কিন্তু মেয়ে ওখানে পড়বে না কারণ ওর ফ্রেন্ডরা অন্য কলেজে। মেয়ের জেদের কাছে হেরে যায়। সে কলেজে পড়া কম আড্ডা বেশি। মেয়ে আরো বন্ধুদের সাথে বেশি ঘুরতে থাকে। কলেজে ভাল রেজাল্ট করে না মেয়ে। গোল্ডেন প্লাস আসে না। তাও আমি নিজের সেইভিং থেকে নিয়ে মেয়েকে মেডিকেল কোচিং এর ভর্তি করায়। মেয়ে ওখানেও ক্লাস পাংক করে। আজ এই ফ্রেন্ড এর বার্থডে কাল ওর। আরো কত কি। সারাক্ষন মোবাইল চ্যাটিং এর বিজি। আমি বুঝি। তাও বলি-
-মিষ্টু এই কয়েকটা মাস কষ্ট কর না মা। নাহলে সারাজীবন কষ্ট।
-মা তুমি কি বুঝ আমার পড়ার? আমার সব শেষ। তুমি কাল টাকা দিও বই কেনার।
মেয়ে মেডিকেলে আসে না। ওর কোন হেলদুল নেই। পাবলিক ভার্সিটিতে আসে বান্ধবীদের সাথে নিজেই ভর্তি হয়ে আসে। আমি খেয়াল করি মেয়ে কেমন যেন চুপচাপ হতে থাকে। আমি জানতে চাইলে এড়িয়ে যায়। ও ওর মত থাকে। বাবা মারা যাওয়ারে মা একা হয়ে যায়। আমি মা কে কাছে এনে রাখি। আমি বুঝি মা কতটা একা এখন। মিষ্টুর হাবভাব দেখে আমি ওকে বুঝিয়ে দিয় ও যদি কাউকে পছন্দ করে আমরা তাকে মেনে নেব। আমরা ফ্যমিলিরা মিকে সব করব। আমি মহিনকে রাজি করায়। ছেলেটার নাম অনিল। ওর ফ্যমিলির সবাইও রাজি ছিল। ঠিক করা হয় বছর দুই পর বিয়ে। আমি চাইছিল মেয়ে যাতে পড়ালেখার শেষে পরে চাকরির পরে বিয়েটা হোক। কিন্তু মিষ্টু রাজি।
দেখতে দেখতে বিয়ের সময় চলে আসছে। কিন্তু আমার যে ভীষন কষ্ট লাগছে। কেমন করে দিবো মেয়েকে অন্য ঘরে। যেখানে তার আপন কেউ থাকবে না। ভীষণ একা। কেউ বুঝবে না ওকে কাউকে বুঝাতে পারবে না। মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেল। আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল। কান্নায়। মেয়ে ফটোসেশনে বিজি। সারাঘর যেন খালি খালি। কিছু ভাল লাগে না। বার বার ফোন দি। খেয়েছে কিনা? কি করে? মেয়ে বিরক্ত হয়। এতবার ফোন দাও কেন? অনিল বিরক্ত হয় আমি ফোন দেওয়া কমিয়ে দিয়। তাও মায়ের মন।আবার দি ফোন। মেয়ে মাস দুয়েক পরে বাসায় আসে। দেখি এখন আমার সাথে ঘুমাতে চায়। মাঝে মধ্যে রান্না ঘরে যায়। কাজ করতে চাই। আমি করতে দিয় না। বলি- ওখানে করতে হয়। এখানে রেস্ট নেয়। মেয়ে যেন এখন আমার সাথে বেশী কথা বলতে চায়। বছর দুই পর মেয়ের ও একটা মেয়ে হলো। মেয়ে এখন অনেক বিজি। এক বিকালে ফোন দিলো,-
-মেয়ের জন্য ড্রেস কিনতে এসেছি।নিজের জন্য ও কিনব টাকা নিয়েছি অনিলের থেকে। আমি একটু কম দাম দিয়ে নিয়ে তোমার জন্য নিব। কি কালারের নিবে? আমি বললাম- আমার জন্য লাগবে না। তুই বরং তোর দিদিমার জন্য একটা নিয়ে আয়। খুশি হবে। মেয়ে সবার জন্য শাড়ি কাপড় নিয়ে এলো। তখন মা আমায় এক জোড়া ঝুমকা আর এক জোড়া বালা দিলো। বলল- তোর শাড়ির সাথে ভালো যাব। আমার কাছে পড়ে আছে শুধু।
-দূর। আমি ওসব পড়ি নাকি? এই নেয় মিষ্টু তুই নিয়ে নেয়। মেয়ে খুব খুশি হলো। ও ওর ৬ মাসের মেয়ের কানে ঝুমকা গুলো লাগিয়ে বলছে তুই বড় হলে পড়তে পারবি। এই যেন মেয়েদের মা আবর্তন চক্র।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত