অদৃষ্ট

প্রত্যেক দিনের মত আজও সন্ধেবেলায় বিশাল সুসজ্জিত হলঘরটায় ক্রুশবিদ্ধ যীশুক্রিস্টের বিরাট প্রতিকৃতির সামনে উপাসনা অনেক আগে শেষ হয়েছে । শান্ত , স্নিগ্ধ , সুন্দর এই পরিবেশে উপাসনার সময় মনটা একেবারে পবিত্রে ভরে ওঠে । মনে হয় মানুষের সমস্ত দুঃখ , কষ্টের ভার বিশ্বের এই পিতা তাঁর নিজের কাঁধে নিয়ে সমগ্র বিশ্বজাতিকে আনন্দ বিতরণ করে চলেছেন । সন্ধেবেলায় এই জায়গায় উপাসনায় যোগদান করে দিবাকর আর কনকলতা তাদের জীবনের দুঃখ , কষ্ট , গ্লানির থেকে বেশ হালকা বোধ করেন ।

জায়গাটা কলকাতা শহর থেকে অনেক দূরে । উড়িষ্যার জাজপুর স্টেশনে নেমে সড়কপথে আর ঘন্টা সাতেক । পাহাড় আর জঙ্গলে ঘেরা শান্ত এক ছোট্ট মনোরম জায়গা । আশেপাশে বিভিন্ন আদিবাসীর বাস । চারিদিকে শাল , পিয়াশাল , মহানিম , শিশু , শিমুল বিভিন্ন গাছ গাছালিতে ভরা । চারিদিকটা বেশ ফাঁকা বললেই চলে । একটু দূরে সারি দেওয়া সবুজ পাহাড়ের কোল ঘেঁষে একেবেঁকে রেল লাইন চলে গিয়েছে অন্য এক প্রান্তে । পাহাড়ের লাগোয়া বিশাল এক চত্বর প্রাচীর দিয়ে ঘেরা । এই চত্বরের মধ্যে শান্ত , সুন্দর এক পরিবেশে মহিলাদের এই বৃদ্ধা আশ্রমটি । সর্বভারতীয় এক ক্রিস্টান সংস্থা এই আশ্রমটিকে পরিচালনা করে । দিবাকর সেন আর তাঁর স্ত্রী কনকলতা অল্প কিছুদিন হোল এই বৃদ্ধা আশ্রমে যোগদান করেছেন । আশ্রমের বিভিন্ন কাজের মধ্যে নিজেদের নিয়োজিত করে এই অসহায় , লাঞ্ছিতা, সহায় – সম্বলহীন বৃদ্ধাদের নিজেদের মায়ের মত করে সেবাযত্ন করেন আর এই কাজ করে এক পরম তৃপ্তি লাভ করেন । সারাদিন এই বৃদ্ধা মাতৃস্থানীয় মহিলাদের দেখ ভাল করে যখন রাত্রি বেলা নিজেদের ছোট ঘরটিতে আসেন তখন মনটা বেশ হালকা লাগে ।
এই বিশাল আশ্রমের মধ্যে একটি বাড়ীর দোতলায় তাঁরা থাকেন । সামনে একচিলতে ছোট একটা বারান্দা । বারান্দা থেকে একটু দূরের পাহাড়গুলিকে ভারী সুন্দর লাগে দেখতে । এখন রাত হয়েছে । অন্ধকার এই ছোট বারান্দায় দিবাকর একটা চেয়ারে বসে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে অনেক কথাই ভাবছিলেন । সারাটা দিন কাজকর্মের পর কনকলতাও তাঁর পাশে এসে বসলেন । আবাসিক সব বৃদ্ধা মহিলারা এখন হয়ত ঘুমিয়ে পরেছেন । সবুজ পাহাড়গুলিকে রাতের চাঁদের আলোয় আজ খুব সুন্দর লাগছে । চারিদিক নিস্তব্ধ । দূরে একটা ছোট আলোর বিন্দু দেখা যাচ্ছে । কোন একটা ট্রেন আসছে । ক্রমশ ট্রেনের সামনের আলোর বিন্দুটা বড় হতে হতে এগিয়ে এসে একটা সময় বিকট শব্দ করে তার কোন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছুটে চলছিল । ট্রেনের শেষের লাল আলোর বিন্দুটা একটা সময় চোখের দৃষ্টি থেকে আস্তে আস্তে হারিয়ে গেল । দিবাকর একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে কনকলতাকে বললেন
— রাত অনেক হয়েছে , এবার শুতে চল । কাল আবার খুব ভোরে উঠতে হবে । একটু চিন্তা করে হটাৎই বললেন
— জানতো কনকলতা , আমাদের জীবনটাই এই ট্রেন যাত্রার মত । কখনো থামা আবার কখনো চলা । কখনো দুরন্ত গতিতে আবার কখনো ধীরে আর একটা সময় ….একেবারের জন্য থেমে যাওয়া । বুঝলে কনকলতা , এখানে এসেও আমি ভুলতে পারছি না সেই ঘটনার কথা । সারাদিন কাজে ব্যস্ত থাকি কিন্তু সন্ধেবেলা বাড়ীতে ঢুকে একাকি হলেই আমার মনের মধ্যে ভেসে ওঠে সেই ভয়ংকর দিনটার কথা । বলতে পার কনকলতা , আমি কি এতই পাপী, যে নাকি তার ……….কথা শেষ করতে দিলেন না কনকলতা ।
দিবাকরকে থামিয়ে বললেন
— সবই বিধাতার বিধান , তুমি আর কি করবে বল ? তুমি যদি সারাক্ষণ এই নিয়ে ভাব তবে তোমার শরীর খারাপ হবে । চলো , এবার শুতে চলো , রাত অনেক হয়েছে ।
দিবাকর যেতে যেতে বললো
— হ্যাঁ , চলো । এত দূরে এই সুন্দর আশ্রমে এসেও আমাকে একটাই চিন্তা সবসময় ঘিরে রাখছে ।
কনকলতার খুবই চিন্তা হচ্ছিলো । দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চললো অথচ দিবাকর এখনো বাড়ীতে ফেরেন নি । তিনি বলে গিয়েছিলেন ভোরবেলা কাজটা হয়ে যাবার পর দুপুরের মধ্যেই তিনি বাড়ীতে চলে আসবেন । অবশ্য ভোরবেলা রেডিওর সমস্ত চ্যানেল থেকে খবরটা এতক্ষণে সমস্ত মানুষের শোনা হয়ে গেছে । ভোরবেলা নির্দিষ্ট সময়ে কাজটা ঠিক মত হয়ে গিয়েছে । প্রথম যেদিন কনকলতা এই খবরটা তাঁর স্বামীর মুখ থেকে শুনেছেন , সেদিন থেকেই তাঁরও মনটা খুব খারাপ আর আজ সকালের রেডিও মারফত খবরটা শোনার পর মনটা তাঁর বড়ই ব্যাথিত ।
এরইমধ্যে বাহিরে গাড়ীর আওয়াজ শুনে বিরাট সাজানো গোছানো সরকারি বাংলোর দোতলার বারান্দা থেকে কনকলতা দেখলেন
— বাড়ীর ড্রাইভার বিপুল , দিবাকর সেনকে ধরে ধরে গাড়ী থেকে নামাচ্ছে । মুহুর্তের মধ্যে খবর পেয়ে বাড়ীর আর্দলী , চাকর – বাকরেরা নীচে গিয়ে দিবাকর সেনকে আগলে নিয়ে উপরে তাঁর শোবার ঘরে নিয়ে এলো । কনকলতা বুঝতে পারলেন তাঁর স্বামী অসুস্থ হয়ে পরেছেন । তিনি আর দেরি না করে ডাক্তার মাইতিকে টেলিফোনে যত তাড়াতাড়ি সম্বব বাড়ীতে আসতে বললেন । সবাই মিলে দিবাকরকে খাটে শুইয়ে দিয়ে , ড্রাইভার বিপুল বললো
— সকালের কাজটা হয়ে যাবার পর তিনি নিজের চেম্বারে আসেন আর তারপরেই তিনি গুরুতর ভাবে অসুস্থ হয়ে পরেন । সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার ডাকা হয় । ডাক্তার এসে তাঁকে পরীক্ষা করে দু-একটি ইনজেকশন দেন আর তাঁকে সেখানেই বিশ্রাম নিতে বলেন । বিকেলের দিকে একটু সুস্থ বোধ করলে , ডাক্তারের অনুমতি নিয়ে তাঁকে বাড়ীতে নিয়ে এসেছে আর এও বলে দেওয়া হয়েছে বাড়ীতে গিয়ে তিনি যেন পুরোপুরি বিশ্রামে থাকেন ।
ইতিমধ্যে ডাক্তার মাইতি ও চলে এসেছেন । তিনি ভালোভাবে দিবাকরকে পরীক্ষা করে বললেন
— এখন আর ভয়ের কিছু নেই , উনি ভাল আছেন । আমি কতগুলি ঔষধ লিখে দিচ্ছি , এগুলি আনিয়ে ওনাকে খাওয়াতে শুরু করুন । আর যদি দরকার হয় আমাকে ফোন করবেন ।
ডাক্তার মাইতি যাবার সময় কনকলতাকে বললেন,
— দেখুন মিসেস সেন , আসলে আজ সকালে যে ঘটনার উনি সাক্ষী হলেন , উনি হয়তো মন থেকে সহ্য বা মেনে নিতে পারেন নি । তাই হয়তো উনি অসুস্থ হয়ে পরেছেন , any way , no tension , আপনি একদম চিন্তা করবেন না । আমি ওষুধ দিয়ে দিয়েছি । ওনাকে এবার পুরোপুরি বিশ্রাম নিতে দিন , আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে । ঘর ফাঁকা হতে কনকলতা দিবাকরকে জিজ্ঞাসা করলেন
— এখন তোমার শরীর কেমন লাগছে ? দিবাকর ইশারায় জানাল এখন তিনি আগের তুলনায় কিছুটা ভাল বোধ করছেন । দিবাকর জামার পকেট থেকে একটা চিঠি বার করে কনকলতার হাতে দিয়ে পড়তে বললেন আর নিজে বিছানায় শরীরটাকে এলিয়ে দিয়ে দু হাত দিয়ে মাথাটাকে চেপে ধরে চোখ দুটি বন্ধ করলেন ।
কনকলতার চিঠিটা পড়া শেষ হলে
– নিজের অজান্তেই দু চোখ দিয়ে অঝোরে জলের ধারা বইতে লাগল । কোনক্রমে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন — এ আমি কি পড়লাম ? আর এই চিঠিতে যা লেখা আছে , তা কি সব সত্যি ? আর এই চিঠিকি সত্যি তাঁরই লেখা ? মানে ….. দিবাকর কোন রকমে হাতটা উঠিয়ে কনকলতাকে চুপ করতে বললেন । বোঝাতে চাইলেন তাঁর ভিতরে খুব কষ্ট হচ্ছে ।
কলকাতার এই জেলখানায় কয়েকদিন ধরে একটা চাপা উত্তেজনা । জেলার থেকে শুরু করে জেলের প্রত্যেক কর্মীই খবরটা পেয়ে গেছেন । অনেক দিন পর এই জেলে আবার একজনের ফাঁসী হতে চলেছে । আবার ফাঁসী হচ্ছে একজন মহিলার । কোন এক মফস্বলের জেলে বন্ধী ছিলেন মহিলাটি কিন্তু সেই জেলে ফাঁসীর ব্যবস্হা নেই বলে , দিন কয়েক আগে কলকাতার এই জেলখানায় তাঁকে নিয়ে আসা হয়েছে । আগামীকাল ভোরবেলায় তাঁর ফাঁসী হবে । সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী এই জেলের নতুন অল্পবয়সী জেলার দিবাকর সেন সব ব্যবস্থা ঠিকঠাক আছে কিনা , সেটা দেখে নিয়েছেন । তিনি তাঁর উপরওয়ালাদের কাছে জানিয়ে দিয়েছেন — ফাঁসী কার্যকর করতে যা যা প্রয়োজন , সেই সব কাজ সম্পূর্ণ হয়ে গেছে ।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী , দুপুর বেলা জেলার সাহেব জেলের কয়েকজন উচ্চপদস্থ অফিসারকে সঙ্গে নিয়ে মহিলাটিকে জেলের ভিতরে ফাঁসীর আসামীদের জন্য নির্দিষ্ট যে সেলে রাখা হয়েছে , সেখানে উপস্থিত হলেন । খুব ছোট একটি ঘর আর সামনে মোটা লোহার গরাদের দরজা । গরাদের বাহিরে থেকে দেখলেন — ঘরের এক কোনে মহিলাটি বসে রয়েছেন । চোখেমুখে এক আতঙ্কের ছাপ । অতি শীর্ণকায় দেহ , চুল গুলো প্রায় সব সাদা । দেখে মনে হচ্ছে কি যেন চিন্তা করছেন । সরকারি প্রথা অনুযায়ী জেলারই মহিলাটিকে আস্থে আস্থে বললেন — আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন মহামান্য আদালতের রায় মেনে আগামীকাল ভোরবেলা আপনার ফাঁসী হতে চলেছে …….। আপনার যদি কোন শেষ ইচ্ছে থাকে , তাহলে আপনি আমাদের বলতে পারেন , আমরা সেটি পূরণ করার চেষ্টা করব । মহিলা একেবারে চুপ , কোন কথাই বললেন না । আবার তাঁকে জিগ্যেস করায় শুধু মাথা নেড়ে ” না ” বললেন । একবার জেলার সাহেবের দিকে এক করুণ দৃষ্টি মেলে কিছু একটা বলতে চাইলেন কিন্তু মুখ দিয়ে কোন কথাই বার করতে পারলেন না ।
আগামীকালের সকালের আয়োজন সব ঠিকঠাক জেনে , সন্ধের দিকে দিবাকর সেন এবার বাড়ী যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন । কাল খুব ভোরবেলা তাঁকে জেলে আসতে হবে । এমন সময় জেলের একজন জুনিয়র অফিসার জেলার সাহেবকে বললেন — স্যার , আজ বিকেলবেলা যখন আপনি একটি জরুরী মিটিংয়ে ব্যাস্ত ছিলেন , তখন অল্পসময়ের জন্য ফাঁসীর আসামি মহিলাটির সঙ্গে একজন বয়স্ক মহিলা আর একজন বয়স্ক ভদ্রলোক দেখা করতে এসেছিলেন । আমাদের প্রশ্নের উত্তরে তাঁরা প্রথমেই আপনার কথা জিজ্ঞাসা করে আর আপনি মিটিংয়ে ব্যাস্ত জেনে , তাঁরা বলেন যে তাঁরা কলকাতার বাহিরে থাকেন আর যে মহিলার ফাঁসী হচ্ছে – তিঁনি তাঁদের বিশেষ পরিচিতা । অল্পক্ষণ তাঁরা মহিলার সঙ্গে গরাদের বাহিরে থেকে একান্তে কথা বলে চলে যান । আর তাঁরা চলে যাবার পর ফাঁসীর আসামি মহিলাটি আমাদের জানিয়েছেন যে তাঁর একটি শেষ ইচ্ছে আছে — সেটা হচ্ছে একটি ” চিঠি ” আর সেটি তিঁনি দেবেন কাল ভোরে আর তাঁর লেখা চিঠিটি শুধু আপনার হাতে পৌঁছে দিতে বলেছেন । তিঁনি আর একটি বিশেষ অনুরোধ করেছেন — তাঁর মৃত্যুর পরেই যেন চিঠিটা খোলা হয় । জেলার সাহেব সব শুনে বললেন — ঠিক আছে , তাঁর মৃত্যুর পরই চিঠিটি আমি যথা স্থানে পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করব । কিছু প্রয়োজনীয় কাজ সেরে তিঁনি বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন ।
এখন সবে ভোর হচ্ছে । জেলার আর অন্যান্য পদস্থ অফিসার সবাই ফাঁসীর মঞ্চের কাছে উপস্থিত হয়েছেন । একটু পরেই ফাঁসীর আসামীকে নিয়ে আসা হবে । জেলারের নির্দেশ পেলেই ফাঁসুরে দড়িতে শেষ টান দেবে আর তারপরই সব শেষ । একটা মৃদু গুঞ্জনের মধ্যে দুজন মহিলা পুলিশ অতি শীর্ণকায় সদ্য স্নানারত মহিলাকে ধরে ফাঁসী মঞ্চের দিকে আস্তে আস্তে নিয়ে আসছে । মহিলার সারা মুখে একটা ভয়ের ছাপ । মনে হলো — কাকে তিঁনি যেন খুঁজছেন । এরমধ্যে একজন মহিলা পুলিশ এসে জেলার সাহেবকে একটা বন্ধ খাম দিয়ে গেল । জেলারের তখন মহিলাটির শেষ ইচ্ছেটির কথা মনে পড়ে গেল । ধীরে ধীরে তাঁকে মঞ্চের উপর তোলা হলো । যতক্ষণ কালো কাপড়ে তাঁর মুখটা ঢাকা না হচ্ছে , ততক্ষণ তিঁনি জেলারের দিকে এক করুণ দৃষ্টি মেলে নিজের মনে মনে বিড়বিড় করছিলেন । একটা সময় ফাঁসুরে এসে কালো কাপড় দিয়ে তাঁর মুখটাকে ঢেকে দিলো । জেলার সাহেব ঘড়ির সময় দেখে হাত তুললেন । জেলারের নির্দেশ পেয়ে ফাঁসুরে লিভারটায় টান দিতেই ….. , একটা অন্ধকার গহ্বরে দেহটা ঢুকে গেল আর নিমেষের মধ্যে সব শেষ হয়ে গেল ……। জেলার ধীর পায়ে নিজের চেম্বারের দিকে পা বাড়ালেন । এবার তাঁর মনটা খুব খারাপ লাগছে । বিশেষ করে যার ফাঁসী হলো তিনি একজন বৃদ্ধা মহিলা । মৃত্যুর আগে পর্য্যন্ত তাঁর করুণ চাহুনিটা বার বার মনে পরে যাচ্ছে । আবার নিজের মনকে বোঝালেন — তিনি আর কি করবেন ? তিনি তো শুধু সরকারি কর্তব্য পালন করেছেন । কিন্তু বারে বারেই মহিলার অসহায় মুখটাই চোখের সামনে ভেসে উঠছে । এসব ভাবতে ভাবতে হটাৎই তাঁর মহিলার দেওয়া চিঠিটার কথা মনে পড়লো । চিঠিটা যার উদ্দেশ্যে লেখা তাঁকে এটি পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করতে হবে । খামের মুখটা ছিড়ে চিঠিটি বার করলেন । চিঠিটি চোখের সামনে ধরেই একেবারে চমকে উঠলেন । চিঠিটি তাঁকেই উদ্দেশ্য করে লেখা । পুরো চিঠিটি পড়বার পর , দিবাকর সেনের সারাটা শরীর যেন একেবারে অবস হয়ে এলো । শরীরের মধ্যে দিয়ে যেন বিদ্যুতের কারেন্ট বয়ে যাচ্ছে । সারাটা শরীর ঘামছে আর চোখের সামনে সব যেন অন্ধকার দেখছেন । তীব্র একটা অজানা ব্যাথায় কখন যে অজ্ঞান হয়ে পরলেন , সেটা বোঝার অবকাশই পেলেন না । যখন জ্ঞান ফিরল , তখন দেখলেন তাঁর সামনে ডাক্তার আর চারপাশে জেলের অনেক লোকজন ।
খুলনা জেলার বাগেরহাটে মঘিয়া গ্রাম ।  গাছ-গাছালি , পুকুর , খাল-বিল দিয়ে ঘেরা শান্ত , সুন্দর একটি ছবির মতন গ্রাম । গ্রামের সবাই মিলে যেন একটাই পরিবার । প্রত্যেকের সুখে-দুঃখে সবাই একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সামিল হন । গ্রামের কোন পরিবারের আনন্দ উৎসব মানে সব পরিবারেরই আনন্দের উৎসব । প্রায় প্রতিদিন সন্ধেবেলা বয়স্ক লোকেরা গ্রামের হরিসভায় জড়ো হয়ে একসঙ্গে নাম-সংকীর্তন করেন । দুর্গা পূজার সময় এই হরিসভার মাঠে বেশ বড় করে পূজোর আয়োজন করা হয় । গ্রামের লোকেরা ছাড়াও যাঁরা কাজের সূত্রে কলকাতা বা অন্য জায়গায় থাকে , তাঁরাও এই সময় নিজের গ্রামে এসে এই আনন্দে একেবারে মেতে ওঠে । আর এই আনন্দের রেশ চলে বেশ কয়েকদিন ধরে ।
গ্রামের প্রত্যেক পরিবারেরই কম-বেশি জমিজমা আছে । সেখানে বারোমাসই না না ধরণের ফসল ফলে । ধানের সময় যখন গাছগুলিতে ধান পাকে , তখন মনে হয় সারা গ্রামটায় যেন সোনা ছড়ানো রয়েছে । গ্রামের লোকজনদের সারা বছরের খাওয়া , থাকার চিন্তা নেই বললেই চলে । এই গ্রামের শেষ প্রান্তে মিত্র পরিবারের বাস । গ্রামের অন্যান্য পরিবারের তুলনায় এদের অবস্থাটা একটু খারাপ । সামান্য যা জমি ছিল , অভাবের তাড়নায় আর চিকিৎসার খরচে সেটা বেচে বেচে এখন তাদের জমিজমা নেই বললেই চলে । মিত্র পরিবার বলতে , রাখাল মিত্র , তাঁর স্ত্রী পারুললতা আর তাঁদের একমাত্র মেয়ে সুলোচনা । পারুললতা খুবই কঠিন অসুখে আক্রান্ত । গ্রামের ডাক্তারের ওষুধে তাঁর অসুখ না সারায় কলকাতার বড় ডাক্তারদের দেখানো হয়েছিল কিন্তু তাতেও কিছুতেই তিনি আর সুস্থ হতে পারছেন না । মেয়ে সুলোচনা বড় হয়েছে । দেখতে সুন্দরী আর বুদ্ধিমতী । গ্রামের সবার সঙ্গেই এদের খুবই সদ্ভাব । ভাল মন্দ মিলে গ্রামের অন্যান্য পরিবারের মতো এদের জীবন একরকম ভাবে চলে যাচ্ছিল ।
মে মাসের শেষের দিককার সময় । প্রচন্ড গরম । আকাশে বিন্দু মাত্র বৃষ্টির মেঘের দেখা নেই। চারিদিকে একটা গুমোট থমথমে ভাব । আবার এদিকে গ্রামের লোকেদের চোখেও ভাল ভাবে ঘুম নেই । সবার মনের ভিতরে একটা গভীর চিন্তার ছাপ । সারাটা গ্রামে একটা ঘুমোট আবহাওয়া । কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে — গ্রামে নাকি আর থাকা যাবে না । দেশটা নাকি ভাগ হয়ে যাবে । এদের এই প্রিয় গ্রাম , জমিজমা , এতদিনের পূর্বপুরুষদের স্মৃতি বিজড়িত ঘর-বাড়ী ছেড়ে নাকি চলে যেতে হবে । কিন্তু কোথায় যাবে , কোথায় থাকবে , কি ভাবে সংসার চলবে , সেটা কেউ জানে না । একটা অজানা আতঙ্কে দিনগুলো কাটছে । সন্ধেবেলায় হরিসভার মাঠে আজ এই নিয়েই জরুরী এক আলোচনা হলো । কেউ কেউ বললেন — এগুলি সব গুজব , আমরা আমাদের গ্রামেই থাকব , আমাদের কোথায় এই ভিটে ছেড়ে চলে যেতে হবে না । আবার কিছু লোক বললেন — তাঁরা নাকি শুনে এসেছে , তাঁদের গ্রামের কয়েকটা গ্রাম পরে যে গ্রামটা আছে , সেখানকার লোকেরা প্রায় তৈরী হয়ে রয়েছে তাঁদের গ্রাম থেকে চলে যাবার জন্য কারণ দেশ নাকি ভাগ হচ্ছেই । গ্রামের হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক বেশ চিন্তিত ভাবে বললেন — দেখুন , একটা কথা শোনা যাচ্ছে , আমরা হয়তো খুব শীঘ্রই স্বাধীনতা লাভ করতে চলেছি । ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এই দেশ ছেড়ে যাবার আগে ভারত সরকারকে হয়ত দুটি প্রস্তাব দিতে পারেন । একটি অখণ্ড ভারত এবং খণ্ডিত ভারত । যদি খণ্ডিত ভারত আমাদের রাজনৈতিক দল বা আমাদের দেশ মেনে নেয় , তবে এই দেশে আমরা আর কোন দিনও বাস করতে পারবো না । তখন সত্যি সত্যি আমাদের দেশটা ভেঙ্গে দুটুকরো হয়ে যাবে । আর সেটাই হবে আমাদের কাছে সবথেকে বেদনার , সব থেকে দুঃখের।
অবশেষে একদিন সত্যি সত্যি এলো সেই চরম দুঃখের দিন । ভারতবর্ষ খণ্ডিত হলো । ভারতবর্ষ খণ্ডিত হওয়ার দরুন , ভারতের একটা অংশ পাকিস্তানে চলে গেল । এই সুযোগে শুরু হলো দাঙ্গা , এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায় বাঙালিদের উপর । আর এর ফলে লক্ষ লক্ষ বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তু পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিতাড়িত হয়ে , ঘরবাড়ী , জমিজমা ছেড়ে পশ্চিম বাংলায় শরণার্থী হয়ে প্রবেশ করলো । জমি হারিয়ে , পূর্ব পুরুষের ভিটে হারিয়ে , সহায় সম্বলহীন হয়ে জমিদার থেকে গরিবলোক , বড়লোক থেকে অতি সাধারণ লোক স্ত্রী , পুত্ৰ , কন্যার হাত ধরে ভারতবর্ষে এসে প্রবেশ করলো । যে যা পারলো তাঁদের শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় জিনিসগুলিকে কোন রকমে বেঁধেছেদে সঙ্গে নিয়ে তাদের প্রিয় , আদরের গ্রামকে ছেড়ে এক অজানার উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পরলো । কোথায় যাবে , কোথায় থাকবে কিছুই জানে না । শুধুই মানুষদের ভীড় গ্রামগুলি থেকে চলে যাবার । কেউ বা যাচ্ছে কলকাতার দিকে আবার কেউ অন্য কোন জায়গায় । ট্রেনে , বাসে কোথাও জায়গা নেই । জীবন হাতে করে প্রয়োজনীয় মালপত্র নিয়ে সবাই বেড়িয়ে পরেছে । মিত্র পরিবারের রাখাল মিত্র তাঁর অসুস্থ স্ত্রী আর অল্পবয়সী সুন্দরী কন্যাকে নিয়ে অনেক কষ্টে ট্রেনে উঠেছে কলকাতা যাবার জন্য । ট্রেনের কামড়াগুলিতে একেবারে তিল ধরার জায়গা নেই । একই রকম অবস্থা ট্রেনের কামড়াগুলির ছাদে। সেখানেও মানুষজন গাদাগাদি করে বসে রয়েছে তাঁদের ঘটিবাটি আগলে ধরে । রাখাল মিত্র শুনেছেন , কলকাতায় শিয়ালদহ স্টেশন থেকে দমদমের দিকে যেতে রেল লাইনের পাশে একটা ফাঁকা জলা মাঠে তাঁদের গ্রামের কিছু পরিবার সেখানে থাকছেন । আপাতত রাখাল মিত্র পরিবার নিয়ে সেখানেই যাচ্ছেন ।
জায়গাটা শিয়ালদহ আর দমদম স্টেশনের মাঝখানে রেল লাইনের ধারে বড় একটা জলা মাঠে । চারিদিকে নোংরা আর দুর্গন্ধ । মাঝে মাঝে কালো দৈত্যের মত কয়লা ইঞ্জিনের রেলগাড়ী কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে গাড়ী ভর্তি করে শরণার্থীর ঢলকে এই কলকাতা শহরে ঢেলে দিয়ে যাচ্ছে । যার যেরকম সম্বল , সেই অনুযায়ী বেড়া , হোগলা পাতা , প্লাস্টিক সিট আর বাঁশের খুঁটি গেড়ে মোটামুটি থাকবার জন্য একটা ঘরের মত করে নিয়েছে । এই মাঠটাতে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ঘর পরিবার রয়েছে । এযেন এক অন্য জীবন । বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হয়েছে রিফিউজি ক্যাম্প । সেখানে উদ্বাস্তুরা থালা – বাটি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন । সরকারি তরফে দয়া করে কিছু চাল – ডাল দেওয়া হতো । সেটাই ছিল তাঁদের সারাদিনের খোরাক । সব মানুষের তখন প্রায় ভিখারির দশা । সবাই এখন যে যার ধান্দায় ব্যস্ত । কি ভাবে রোজগার করা যায় সেটাই তাঁদের একমাত্র চিন্তা । গ্রামে থাকাকালীন প্রত্যেক পরিবারের মধ্যে যে ভালবাসা , আন্তরিকতা ছিল , সেটা আর একদম এখানে নেই বললেই চলে । সবাই যে যার স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত । শুধু অনিশ্চয়তা আর অভাবের মধ্যে এ এক নূতন জীবনের মধ্যে দিয়ে চলা ।
রাখাল মিত্রের কয়েকদিন ধরে খুব জ্বর । কোন ওষুধে জ্বর আর কমছে না । বিশেষ করে জ্বরটা আসে রাত্রিবেলায় । রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে ডাক্তার বললেন — এটা এক মারাত্মক ধরণের ম্যালেরিয়া । সাবধানে থাকতে হবে , নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে আর পরিপূর্ণ বিশ্রাম । অভাবের সংসারে ওষুধ কেনার পয়সা নেই আর বাড়ীতে বসে থাকলে কাজের সন্ধান পাওয়া যাবে না । এই জ্বর নিয়েই দিনের বেলায় কিছু কিছু জায়গায় কাজের সন্ধানে বেরোতে থাকেন । কিন্তু শরীর আর চলে না । একদিন ঝড় জলের রাতে তাঁর পথে বসা পরিবারটিকে একেবারে অকুল সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়ে তিনি ইহলোকের মায়া ত্যাগ করলেন ।
পারুললতার ভবিষ্যৎ একেবারে অন্ধকার হয়ে গেল । নিজে অসুস্থ তারউপর ঘরে সুন্দরী বিবাহযোগ্য কন্যা । একদিন এই উদ্বাস্তু কলোনির একজন লোক পারুললতার কাছে তাঁর মেয়ে সুলোচনার বিয়ের জন্য এক পাত্রের সন্ধান নিয়ে এলো । যিনি এই খবরটি নিয়ে এলেন , তাকে পারুললতা চেনেন । তিনিও পরিবার নিয়ে এই কলোনিতে থাকেন । কদিনের আলাপে লোকটাকে খারাপ মনে হয় নি । মৃগাঙ্ক বাবুর কথায় যেটা জানলেন — পাত্রটি তারই এক দূরসম্পর্কের চেনাজানা কাকার ছেলে । পাত্ররা এদেশী । কলকাতায় কয়েক পুরুষের এদের বাস । শ্যামবাজারের দিকে যৌথ পরিবার । পাত্রের একটি ছোট মুদি দোকান আছে । স্বাস্থ্য ভাল তবে বয়স প্রায় ৪০ এর কাছাকাছি । পাত্রপক্ষের অবশ্য কোন দাবি-দাওয়া নেই । মৃগাঙ্কবাবু আর বললেন — দেখুন দিদি , দাদাও বেঁচে নেই আর আপনার শরীরও ভাল নয় , তাই বলছিলাম আপনার মেয়ের সঙ্গে এই ছেলের বিয়ে হলে সুখেই থাকবে । এবার আপনারা চিন্তা করে আমাকে জানাবেন ।
একটা ভাল দিন দেখে সুলোচনার বিয়ে হয়ে গেল শ্যামবাজার অঞ্চলের ভবেশ দত্তর সঙ্গে । একেই যৌথ পরিবার তারউপর এদেশের লোকেদের সঙ্গে কিছুতেই যেন খাপ খাওয়াতে পারছিল না গ্রামের সরল সাদাসিধে মেয়েটি । বিয়ের কয়েকদিন পর থেকেই অশান্তি আর ক্রমে তা যেন এক বৃহত্তর আকারে গিয়ে পৌছাল । এরইমধ্যে একদিন সকালে খবর এলো মার শরীর খুবই খারাপ এখুনি তাকে সেখানে যেতে হবে । মার কাছে পৌঁছে দেখল প্রায় শেষ অবস্থা , বোধহয় মেয়েকে দেখার জন্যই প্রাণটা এতক্ষণ ছিল । কোনক্রমে মেয়ের হাতটাকে নিজের বুকের উপর রেখে , তিনি যেন ঘুমিয়ে পরলেন । সুলোচনা বুঝলো তার সব শেষ হয়ে গেল । তার বাবাও নেই আর মাও চলে গেল । মুহুর্তে সারা পৃথিবীটা যেন অন্ধকার হয়ে গেল ।
এদিকে ভবেশ দত্তর সঙ্গে তার চুড়ান্ত অশান্তি । একদিকে ভবেশের বাড়ীর লোকজনদের অসম্ভব দুর্ব্যবহার , আর এদিকে তার স্বামীর চরিত্রের দিকগুলি আস্তে আস্তে তার কাছে প্রকাশ হতে লাগল । ভবেশ দত্ত রোজ গভীর রাতে মদ খেয়ে একেবারে মাতাল হয়ে বাড়ীতে ঢোকে । অসভ্য ভাষায় সুলোচনাকে গালিগালাজ করে আবার অকারণে তাঁকে বেধরক মারধোর ও করে । সুলোচনা জানতে পেরেছে রোজ রাতে কলকাতার কোনো এক খারাপ জায়গায় খারাপ মেয়েদের সঙ্গে ভবেশ দত্ত রাত কাটায় । চুড়ান্ত অশান্তির মধ্যে দিন কাটতে লাগলো আর এরই মধ্যে সুলোচনা একদিন বুঝতে পারলো সে অন্তঃসত্ত্বা ।
মাঝেমধ্যে সুলোচনাদের গ্রামের এক পরিচিত পরিবার , তারাও একই সঙ্গে দমদমের পাশে সেই উদ্বাস্তু কলোনিতে এসে উঠেছিল । তারা মাঝে মাঝে সুলোচনার কাছে এসে তার খবরাখবর নিয়ে
যায় আর সাধ্যমত তাকে বিভিন্ন সময়ে সবরকম সাহায্য করে । পরিবারের ছোট মেয়েটি – শেফালী প্রায় তারই বয়সী । গ্রামে তারা একসঙ্গে মিলে কত আনন্দ করতো । সুলোচনার বিয়ের কিছুদিন পরে শেফালীর বিয়ে হয় । শেফালীর বিয়েটা খুব ভালো হয়েছে । শেফালীর স্বামী নির্মল খুব ভাল ছেলে । স্থানীয় একটি স্কুলে মাস্টারি করে । শেফালী আর নির্মল সুখেই আছে ।
সুলোচনার ইতিমধ্যে একটি পুত্র সন্তান হয়েছে । বয়স সবে মাত্র দুমাস । সুলোচনা ভেবেছিল এবার হয়তো তার স্বামীর পরিবর্তন হবে অন্তত নিজের ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে । পরিবর্তনতো দূরের কথা , অত্যাচারের মাত্রা বাড়তেই থাকলো । রোজ রাতে খারাপ মেয়েদের সঙ্গে কাটিয়ে গলা অবধি মদ্যপান করে গভীর রাতে বাড়ীতে ঢুকে অযথা গালিগালাজ করে ক্লান্ত হয়ে অসার শরীরটাকে বিছানায় এলিয়ে দিত । সুলোচনা খেয়াল করছিল ভবেশ এতটাই অমানুষ যে তার নিজের ছেলের প্রতি কোন টানই নেই , উল্টে একদিন সে সুলোচনাকে বললো — এই ছেলের বাবা আমি নই । আমি সারাদিন বাড়ীতে থাকি না । শুনেছি তোমার দেশের লোকজন আমার বাড়ীতে আসে । কার সঙ্গে কি করেছো কে জানে ! হয়তো , এই বাচ্চাটার বাবা তোমাদের গ্রামেরই কোন লোক । সুলোচনার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পরলো । রাগে , দুঃখে , অপমানে বলার কোন ভাষা খুঁজে পেল না । শুধু একরাশ চোখের জল নিয়ে বললো — তুমি এতই নিষ্ঠুর , এতটাই অমানবিক !! তুমি তোমার নিজের ছোট ফুলের মতো শিশুটিকে ও স্বীকার করতে চাও না । সারাটা দিন বাড়ীতে থাকো না । দোকানটা ও খোল না । দিনরাত খারাপ মেয়েদের কাছে পরে থাকো । বাড়ীতে পাওনাদাররা এসে হামলা করে । একবার জন্য কি খবর রাখ আমি কি ভাবে থাকি ? কি খাই ? ভবেশ দত্ত মদ্যপ অবস্থায় গলা চড়িয়ে বললো — তুমি কি ভাবে থাকবে আর কি খাবে , তানিয়ে আমার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই । আমি আগেও বলেছি , আবারও বলছি এই ছেলেটাকে আমি আমার নিজের ছেলে বলে স্বীকার করি না । আর একটা কথা পরিষ্কার করে শুনে রাখ — এরপরে যদি আর একটা কথা বল , তবে আমি অন্য মেয়ে নিয়ে এসে এই বাড়ীতেই থাকবো আর তোমার চোখের সামনে তাকে নিয়ে ফুর্তি করবো । আজকে আমার মেজাজ একদম ভাল নেই । আমার চোখের সামনে থেকে সরে যাও । আমাকে এখন ঘুমতে দাও । টলতে টলতে বিছানায় গিয়ে অসার শরীরটাকে কোন রকমে রেখে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পরলো ।
সুলোচনার মুখ থেকে সমস্ত ঘটনা শুনে নির্মল আর শেফালী বড়ই ব্যাথিত । ভবেশের চরিত্রের আর তার সুলোচনার উপর অত্যাচারের কথা তারা জানতো । বাবা হয়ে যে নিজের শিশুটিকে পর্যন্ত স্বীকার করে না , সে যে কতবড় অমানুষ , এবার সেটা তারা পরিষ্কার বুঝতে পারলো । সুলোচনা নিজে ভাল করে খেতে পায় না , শিশুটিকে সে কি খাওয়াবে , কি ভাবে মানুষ করবে এই পরিবেশের মধ্যে , এসব নিয়ে তাদের সঙ্গে কথাবার্তা হচ্ছিলো । একটা সময় শেফালী সুলোচনাকে বললো — তুই তো জানিস আমাদের কোন ছেলে-মেয়ে নেই । তোর যদি কোন আপত্তি না থাকে , আমরা বরং তোর ছেলেকে আমাদের কাছে রেখে ভালোভাবে মানুষ করি । তুই দেখিস — তোর ছেলের কোন অযত্ন হবে না । আমরা ওকে সত্যি করের মানুষ হিসেবে বড়ো করব । সুলোচনার দুচোখ দিয়ে শুধু জল গড়িয়ে পরছে । কাঁদতে কাঁদতে বললো — তাই কর , তোরা ওকে ভাল ভাবে মানুষ কর । তোদের কাছে থাকলে আমার শিশুটা একটু ভাল ভাবে খেতে পারবে । আমি যে ওকে ভাল ভাবে খেতে দিতে পারি না । তবে একটা কথা তোদের আমাকে দিতে হবে । ও যেন কোন দিনও জানতে না পারে ওর প্রকৃত বাবা মায়ের পরিচয় । আমি চাই না — একটা লম্পট , দুঃশ্চরিত্র , অমানবিক বাবার পরিচয় নিয়ে ও সমাজে বড়ো হোক । সবচেয়ে বড়ো কথা , এই পাশবিক লোকটা তার নিজের ছেলেকেই ছেলে হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না । আমি চাই ও ভাল ভাবে মানুষ হোক আর ও জানুক তোরাই ওর বাবা মা । শেফালী আর নির্মল সুলোচনাকে বাঁধা দিয়ে বললো — এ তুই কি বলছিস ? ছেলে তার নিজের বাবা- মার পরিচয় জানবে না ? আর তাছাড়া …, সুলোচনা তাদেরকে থামিয়ে বললো — আমি ঠিকই বলছি আর আমি অনেক ভেবে চিন্তেই কথাটা বলেছি । আমার খুবই কষ্ট হবে , কিন্তু তবুতো জানব — আমার ছেলেটা ভাল আছে , সুখে আছে । সে ভালোভাবে পড়াশুনা করে সমাজে ভাল মানুষ হিসাবে প্রতিষ্টিত হবে ।
দুগ্ধ পোষ্য শিশুটি চলে যাবার পর সুলোচনা মানষিক ভাবে খুবই ভেঙ্গে পরলো । শিশুটিকে আঁকড়ে ধরে তাঁর স্বপ্নগুলি আস্থে আস্থে চুরমাচুর হয়ে গেল । নিজের শিশুটিকে কাছে না পাওয়ার যন্ত্রনা তাঁকে দিবারাত্রি খুঁড়ে খুঁড়ে খেতে লাগল । তারউপর ভবেশের অমানুষিক নির্যাতন । ভবেশের কোন হেলদোল নেই তাদের নিজেদের শিশুটির সম্বন্ধে । ভাবখানা এমন — অপরের কোন শিশু বাড়ী থেকে বিদেয় হয়ে ভালোই হয়েছে ।
দিন যায় , বছর যায় , সুলোচনার সঙ্গে নির্মল আর শেফালীর এখন প্রায় দেখাই হয় না । নির্মল এখানকার স্কুলের চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে ভাল সরকারি চাকরি পেয়ে এখন নর্থবেঙ্গলের আলিপুরদুয়ারে রয়েছে । সুলোচনা অবশ্য ছেলের সব খবরই পায় তাঁদের থেকে । ছেলে এখন বেশ বড়ো হয়েছে আর পড়াশুনাতে ও অত্যন্ত মেধাবী । তারপরে জানতে পারে তাঁর ছেলে পড়াশুনা শেষ করে খুব ভালো চাকরী পেয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত হবার পর নির্মল , শেফালী ভালো ঘর দেখে খুব সুন্দরী এক মেয়ের সঙ্গে ছেলের বিয়ে দিয়েছে । তারা বেশ সুখেই আছে। অবশ্য ছেলের বিয়েতে উপস্থিত থাকবার জন্য সুলোচনাকে বহুবার অনুরোধ করা হয়েছিল কিন্তু তিঁনি রাজি হননি । সুলোচনার কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে নির্মল , শেফালী আজ পর্যন্ত তার বাবা , মার আসল পরিচয় ও ছেলেকে জানাতে পারে নি ।
সুলোচনার শরীরটা কয়েকদিন ধরে বেশ খারাপ । ওষুধ নেই , পেট ভরে খাবার নেই , সবসময় একটা মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে তাকে  দিন কাটাতে হয় । রাত অনেক হয়েছে । ভবেশ এখনও বাড়ীতে ফেরেনি । আদৌও ফিরবে কিনা , তাও সে জানে না । রাত আরো গভীর হলে পুরোপুরি মদ্যপ অবস্থায় ভবেশ ঘরে ঢুকে অকারণে সুলোচনার সাথে কথা কাটাকাটি শুরু করে বেধড়ক মারতে শুরু করল । সুলোচনাও তার প্রতি অকারণে প্রতিদিনের এই দীর্ঘ অত্যাচার , গঞ্জনা সইতে পারছিল না । এই বদমাইশ লোকটার জন্য সে তার নিজের আদরের সন্তানকে কাছে রাখতে পারে নি , জীবনে যে সুখ বলে একটা কথা আছে , সেটাও সে কোনদিন বুঝতেই পারলো না । আজ সমস্ত ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে ফেলে ছুটে গিয়ে রান্নাঘরের থেকে ধারালো বটিটি নিয়ে এসে উন্মাদের মত ভবেশের ঘাড়ে সজোরে আঘাত করলো । মূহুর্তে রক্তাক্ত দেহটা হাতে নিয়ে দেখলো সারাটা ঘর রক্তে ভেসে যাচ্ছে । ভবেশ দু-একবার হাত-পা নাড়িয়ে একেবারে নিথর হয়ে গেল । মূহুর্তের মধ্যে এতদিনের সীমাহীন অত্যাচারের সমাপ্তি ঘটলো ।
দীর্ঘ সময় ধরে বিচার পর্ব চলার পর সব আদালতই একই রায় বহাল রেখেছেন । সেটা হলো — সুলোচনার ফাঁসির হুকুম । বিচারপর্ব চলাকালীন তাঁকে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন জেলে থাকতে হয়েছে । একমাত্র নির্মল আর শেফালী সুলোচনার সঙ্গে জেলেতে তাঁর সঙ্গে দেখা করে যোগাযোগ রেখেছে । তাঁরা এও জেনেছে উচ্চ আদালত ও সুলোচনার ফাঁসির হুকুম বহাল রেখেছেন । তাঁরা জানতে পেরেছে — সুলোচনাকে কলকাতার জেলে আনা হবে আর সেখানেই তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হবে ।
দিবাকর সেনকে লেখা ফাঁসির আসামীর শেষ ইচ্ছে অনুসারে চিঠিটা কনকলতা আবার পড়লেন আর একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলেন । বলার কোন ভাষা খুঁজে পেলেন না শুধু চোখের জল ছাড়া ।
আমার প্রাণের থেকে প্রিয় দিবাকর ,
এখন গভীর রাত । সবাই ঘুমাচ্ছে । আমার চোখে ঘুম নেই । নির্জন ফাঁসীর সেলের কুঠুরিতে বসে আমি শুধু প্রহর গুনে যাচ্ছি । আর কিছুক্ষণ পরে এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে আমাকে চলে যেতে হবে । কাল খুব ভোরে আমার ফাঁসী হবে । তুমিই বল আর কয়েক ঘন্টা পরে যাকে এই সুন্দর পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নিতে হবে , তার কি চোখে কখনও ঘুম আসে ? কিন্তু আমি তো মরতে চাই নি । আমিতো সুখেই বাঁচতে চেয়েছিলাম আমার স্বামী আর আমার একমাত্র খুব আদরের ছেলেকে নিয়ে । সুখ চাইলেই কি সুখ পাওয়া যায় ? ভগবান বোধহয় আমার কপালে কোনদিনও সুখ-শান্তি কিছুই দিলেন না । দেশ ভাগের পর সব ছেড়ে এক চরম অনিশ্চয়তায় এই দেশে এলাম । শুরু হোল আমাদের দারিদ্রের জীবন আর এক কঠিন সংগ্রাম । একদিন হারালাম বাবাকে তারপরে যাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচেছিলাম , সেই মা আমাকে একদিন এই পৃথিবীতে একলা রেখে চলে গেলেন । এক শুভদিন দেখে আমার বিয়ে হোল । কত আশা ছিল — সুখে , শান্তিতে ঘর সংসার করবো । ভগবানের এমনই লিখন , যার সঙ্গে আমার বিয়ে হোল সে একটা মদ্যপ , লম্পট আর চরিত্রহীন । সুখতো পেলামই না বরং পেলাম শুধু অত্যাচার আর চরম লাঞ্ছনা । একদিন আমাদের মধ্যে এলো খুব সুন্দর এক ফুটফুটে বাচ্চা । কিন্তু তার লম্পট বাবা বললো — এ আমার সন্তান নয় । তুমিই বল , কতখানি নিষ্ঠুর হলে সে তার নিজের সন্তানকে স্বীকার করে না ! একদিন সেই ছেলে নিজের মায়ের কাছে না থেকে অন্যের কাছে মানুষ হতে লাগল । তার মা চাইলো যাতে ছেলেটা ভাল করে খেয়ে পরে থাকতে পারে আর যাতে সত্যিকারের মানুষ হতে পারে । আজকে সেই ছেলে মস্ত বড় মানুষ । সমাজের সবাই তাকে কত সম্মান করে । সরকারি দপ্তরে আজ সে একজন মস্তবড় অফিসার । তার নির্দেশে আজ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয় । আজ তার বিশাল সরকারি বাংলো । কত দাসদাসী , আর্দলী তাকে দেখভাল করে । আর এই ছেলের বড় হওয়ার আনন্দে মনটা আমার ভরে ওঠে । তুমি নিশ্চয় ভাবছো আমি এতক্ষণ কার কথা বলছি ! এবার আমি তোমাকে সব কথাই বলবো কারন আমার তো আর বলার সময় হবে না , কাল খুব ভোরেই তো আমার ফাঁসি হয়ে যাবে ।
আজ বিকেলবেলা , যখন তুমি একটা জরুরী মিটিংয়ে ব্যস্ত ছিলে , তোমার বাবা , মা তোমাকে না জানিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল । আমি ঠিক করেছিলাম সত্যি কথাটা আমি কাউকেই এমনকি তোমাকেও বলবো না । তোমার বাবা , মাকেও এই বলে দিব্বি করেছিলাম তোমাকে না বলার জন্য । তোমার বাবা , মা আমাকে অনেক সান্তনা দেয় আর বার বার অনুরোধ করে আর বোঝায় এবার যেন আমি নিজে তোমার প্রকৃত পরিচয়টা জানাই । আমি এই নিয়ে অনেক চিন্তা করি তারপরে সাব্যস্ত করি , এতোদিন যেটা গোপন ছিল আজ সেটা তোমাকে আমি বলে যেতে চাই …….হ্যাঁ , তুমি হচ্ছো আমারই নিজের সন্তান। আমি জানি তুমি হয়তো অবাক হবে আর অবাক হবারই কথা । তুমি বিশ্বাস কর , তোমার বাবার চরিত্রের কথা আর আমাদের চরম দারিদ্রের , দুরঅবস্থার কথা ভেবে আর তুমি যাতে ভালভাবে মানুষ হতে পার , এসব বিবেচনা করেই আমি বাধ্য হয়েই এই কাজ করেছিলাম । নিজের শিশুপুত্র অন্যের কাছে থেকে বড় হওয়া এযে কত যন্ত্রণার একজন মায়ের কাছে , তা আমি প্রতিটি মুহুর্তে অনুভব করেছি । তবে আমি নির্মল আর শেফালীর কাছে চিরকৃতজ্ঞ এবং ঋণী । তারা তোমাকে নিজের ছেলের মত মানুষ করে আজ এতবড় করেছে । তুমি আজ তাদের জন্যই সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত । ইচ্ছে ছিল তোমার সঙ্গে একটি বার কথা বলার কিন্তু সে ইচ্ছে আমার আর পূরণ হলো না । সবশেষে একটা অনুরোধ তোমাকে করে যাই — নির্মল আর শেফালীকে শ্রদ্ধা করো , ভালবেসো —
তুমি আর বৌমা আমার অনেক অনেক আদর , ভালবাসা আর প্রাণভরা আশীর্বাদ নিও । ভাল থেকো ।
ইতি  — তোমাদের অভাগিনী  “মা”
পুনশ্চঃ – ছোটবেলায় বাবার থেকে শুনতাম, গীতায় লেখা আছে মানুষের দেহটার মৃত্যু হয় কিন্তু তার আত্মার মৃত্যু হয় না । তাই বলছি — আমি সবসময় তোমাদের সঙ্গেই থাকব । ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি যদি পর জন্ম বলে কিছু থাকে , তবে আমি যেন তোমাকেই ছেলে হিসেবেই পাই আর আমার নিজের কাছে রেখে মনের মত করে মানুষ করতে পারি । এই গভীর রাতে মন অস্থির থাকায় হয়তো গুছিয়ে চিঠিটা লিখতে পারলাম না । নিজের মত করে গুছিয়ে নিও ।
কনকলতা চিঠিটা বেশ কয়েকবার পড়লেন। কখন নিজের অজান্তে চোখের জলে গাল ভেসে গিয়েছে খেয়াল করেন নি । আপনমনে বললেন – আজ সকালে যাঁর ফাঁসী হলো , তিনি আমাদের মা !! দিবাকর এবার উদাসমনে বললেন — জান কনকলতা , যখন ওনাকে ফাঁসীর মঞ্চে তোলা হয় আর যতক্ষণ না পর্যন্ত মুখটাকে কালো কাপড়ে ঢাকা হচ্ছে , উনি শুধু এক করুণ দৃষ্টি দিয়ে আমার দিকেই তাকিয়ে ছিলেন । আর ভগবানের কি রকম বিচার দেখ – আমারই নির্দেশ পেয়ে ফাঁসুরে ফাঁসীর দড়িতে টান দিতেই সব শেষ হয়ে গেল । এই বলে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন । কাঁদতে কাঁদতে বললেন —আসলে আমি পাপী , নইলে কেউ নিজের মাকে ফাঁসীতে ঝোলাবার নির্দেশ দিতে পারে ?
এখন রাত হয়েছে । জেলার সাহেবের বিশাল সরকারি বাংলোটাকে একটা নিঝুম পুরি মনে হচ্ছে । দাস-দাসী , চাকর-বাকর সবাই ঘটনাটি জেনে গিয়েছে , সবাই একেবারে চুপচাপ । কনকলতা ট্যাবলেট আর জলের গ্লাসটা দিবাকরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন — এটা খেয়ে নিয়ে শুতে চল , রাত অনেক হয়েছে । ঘুম আমার আসছে না কনকলতা , বারে বারে মার মুখটাই আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে । একটু চিন্তা করে হটাৎ করে বললেন — আমি জেলারের চাকরি আর করব না । জেলের কথা ভাবলেই আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে — সেই ফাঁসীর আসামীর ছোট সেল , সেই শীর্ণকায় করুণ মুখ , ফাঁসীর মঞ্চ আর সেই ফাঁসীর দৃশটাই বারে বারে মনে পরছে । কনকলতা ও চোখের জল ফেলে স্বামীর কথাতেই সায় দিয়ে বললেন — তাই কর। আমারও আর এখানে থাকতে ভাল লাগছে না । চলো , আমরা দূরে কোথায় চলে যাই। যেখানে আমরা মানুষের সেবার কাজ করবো আর ভগবানকে স্মরণ করবো ।
ওড়িশার পাহাড় লাগোয়া এই আশ্রমের ঘরে মায়ের কথা ভাবতে ভাবতে দিবাকর ক্লান্ত হয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছেন সেটা বুঝতেই পারেন নি । সকালে ট্রেন যাওয়ার আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে দেখলেন সকাল ৬টা বেজে গেছে । কনকলতা ঘুমাচ্ছেন । আস্থে আস্থে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন । উজ্জ্বল সকাল দিয়ে শুরু হোল আবার একটা নতুন দিন । কিন্তু এখন তাঁর জীবনে সব সকালই যেন এক হতাশার সকাল , এক করুণ দুঃখের সকাল । ভগবানের নিষ্ঠুর বিধানে এই রকম কোন এক সকালে তাঁরই নির্দেশ পেয়ে ফাঁসুরে তাঁর নিজের মাকে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে দিয়েছিল । সবই তাঁর কপাল , সবই তাঁর অদৃষ্ট ।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত