জীবন পাল্টায়

জীবন পাল্টায়
আমাকে বদনাম দিয়ে টাকার লোভের জন্য, আঠারো বছর বয়সে মামি বিয়ে দিয়ে দেয় আমার পছন্দ করা ছেলের সাথে। মাত্র দুই মাসের পরিচয় ছিলো। খুব কেঁদেছি, মামা মামির হাতে পায়ে পড়েছি যেনো আমাকে বিয়ে দেওয়া না হয় কিন্তু কেউ শুনে নি আমার কথা। আমি বিয়ে করতে চাই নি কারন আমার স্বামী মামির পরিচিত ছিলো। বিয়ের আগের দিন আড়াল থেকে শুনতে পাই,
“ওর মায়ের জমি বিক্রি করে পাঁচ লাখ টাকা পেয়েছি। দুই লাখ টাকা তোকে দিলাম আর দুই লাখ আমার, বাকি একলাখ দিয়ে বিয়ের আয়োজন করবো “
“মামি তুমি যা বলবে তাই হবে “
“হ্যাঁ তুই নূরী আপদটাকে নিয়ে বিদেয় হ্ বাপু, আমার আর এসব ঝামেলা ভালো লাগে না “
“আমার একটা শর্ত আছে তোমার কেউ তাহিয়ার সাথে যোগাযোগ রাখবে না”
“এটা আবার কোনো শর্ত মধ্যে পড়ে নাকি? এমনিতেও যোগাযোগ করবো না “
“না করলেই ভালো ” মামী আর পলাশের কথা শুনে মামাকে বলেছিলাম বিয়ে করবো না কিন্তু মামা বললো,
“বিয়ের পরে তুই মরে যাস তাতে আমাদের কিছু হবে না কিন্তু আমাদের বাড়িতে থাকলে তোর বিয়ে করতেই হবে “
মামার কথা শুনে আমি ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলাম আর ভাবছি বাবা মা বড্ড নিষ্ঠুর। তারা চলে গেছে তখন আমাকে কেনো নিয়ে যায় নি। আল্লাহ সেদিন আমাকে কেনো বাঁচিয়ে দিয়েছে? তিন বছর বয়সে বাবা মা এক্সিডেন্টে মারা যায়। আমি ভাগ্য ক্রমে বেঁচে থাকি। আমার জন্মের কিছু দিন পরে বাবার চাকরি চলে যায় তাই আমি নাকি অলক্ষ্মী। তারপর আবার বাবা মা’কে খেয়ে ফেলেছি সেজন্য কাকা কাকিরা আমার দায় ভার নেয় নি। সবাই ঠিক করে অনাথ আশ্রমে আমাকে দিয়ে আসবে তখন মামা মামি বলে তাদের কাজে আমাকে রাখবে। তেরো বছর বয়স হবে তখন একদিন মামি একটা কাগজে স্বাক্ষর দিতে বলে। আমিও কিছু না বুঝে স্বাক্ষর দিয়ে দেই। এখন বুঝি সেই কাগজটা ছিলো আমার মায়ের সম্পত্তি, নানা আমার মায়ের নামে লিখে দিয়েছিলো।
আমি স্কুলে একটু কম যেতাম, মামি সারাদিন কাজে ব্যস্ত রাখতো কিন্তু আমি রাতে সময় করে বই পড়তাম। পড়ালেখার প্রতি খুব আগ্রহ ছিলো। পাঁচ বছর বয়সে স্কুলে যাওয়া শুরু করি। আমার তেমন কোনো বন্ধুবান্ধব ছিলো না কারণ আমার পোশাক নাকি ময়লা। নতুন জামা -জুতা থাকতো না তবে আমার ক্লাস রোল বরাবর এক দুইয়ের মধ্যে থাকতো। মাধ্যমিক পরীক্ষা এবং উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় খুব ভালো রেজাল্ট করি। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার সময় আমার স্বামী পলাশের সাথে পরিচয় হয়।খুব বেশি পলাশকে চিনতাম না তেমন কোনো কথাবার্তাও হয় নি তবে যতোটুকু কথা বলেছি তখন মনে হয়েছিলো ও খুব ভালো মানুষ কিন্তু আমার বিশ্বাস ভেঙ্গে যায় সেদিন যখন ও বাড়িতে আসে। মামা মামি বাড়িতে ছিলো না। পলাশ এসে দরজায় কড়া নেড়ে বলে,
“নূরী আমি অনেক দূর থেকে হেঁটে এসেছি তোমাকে দেখবো বলে, এখন খুব ক্লান্ত লাগছে এক গ্লাস পানি দেও”
“জ্বি পানি এনে দিচ্ছি কিন্তু আপনি দরজার বাইরে দাঁড়ান। বাড়িতে মামা মামি নেই “
আমি পানি এনে দেখি আশেপাশের লোকজন সবাই বাড়ির ভেতর। সবাই আমাকে খারাপ মেয়ে বলে গালাগালি দিয়েছে। পলাশ বলেছে আমি ওকে বাড়িতে ডেকেছি ব্যস্ আমাকে বদনাম দিয়ে পশালের সাথে বিয়ে ঠিক করে।
বিয়ে করে পশাল আমাকে শহরে নিয়ে আসে। সারাদিন রাত আড্ডা মহলে থাকতো আর বাড়ি ফিরে আমাকে খুব মারতো। সংসার চালানোর মতো টাকা পয়সা ছিলো না, জমি বিক্রি করে যা টাকা পেয়েছে সব নেশা করে শেষ করে দিয়েছে। আমাকে একদিন বললো,
“তুই বাঁচতে চাইলে আমাকে টাকা এনে দে “
“আমি কোথা থেকে টাকা এনে দিবো? “
“তুই চাকরি কর নয়তো শরীর বেঁচে দে”
আমি প্রতিবাদ করতে গেলে আমাকে প্রচুর মারতো তাই নিরবে সহ্য করে চাকরি খুঁজতে থাকি। উচ্চমাধ্যমিক পাসে আমাকে কে বা চাকরি দিবে তাও আবার চেনো লোক ছাড়া? অনেক ইন্টারভিউ দিতে দিতে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি হয়। টানা একমাস একটা জামা পড়ে অফিসে যাই। কেউ কেউ পাগল বলতো আবার কেউ আমার পাশে বসতো না। অফিস শেষে বাড়ি ফিরে ডাল ভাত খুব কম খেয়েছি তারথেকে মার বেশি খেয়েছি। ব্যাথা যন্ত্রণায় ছটফট করতাম তাও অফিসে যাওয়া বাদ দিতাম না যদি চাকরি চলে যায় সেই ভয়ে। অফিসে যাওয়ার পথে ব্যাথার ওষুধ খেয়ে নিতাম। দুমাসে একহাজার টাকা জমিয়ে দুটো জামা কিনি। মাস শেষ বেতনের সব টাকা পলাশ নিয়ে যেতো। খাওয়ার জন্য সামান্য চাল ডাল আলু কিনতো আর ঘর ভাড়া দিয়ে বাকি টাকা ওর নেশায় খরচ করতো। টানা দু বছর পলাশের অত্যাচার সহ্য করে ডিভোর্স দেই।
অফিসে একজনের সাথে পরিচয় হয় তাকে আমার অতীত বলি। সে অবশ্য আমার অতীত জানতে চায় নি নিজেই একপ্রকার জোর করে অতীতের কথা খুলে বলি। আমার বর্তমান স্বামী রণকের সঙ্গে দশবছর ধরে সংসার করছি। আমার এক ছেলেও হয়েছে। আমাকে একটা মশায় কামড় দিলে ও বলবে, “কোন মশায় আমার বৌকে কামড় দিলো রে ওটা মেরে ফেলবো ” জীবনের সব সুখ রণক আমাকে দিয়েছে। ওর জন্য আমার জীবন পাল্টে গেছে।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত