সময়টা বাস্তবতার

সময়টা বাস্তবতার
অফিসে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বেরিয়েছি। তখনি এক বন্ধু কল দিয়ে বলল যে কার যেন রক্ত লাগবে। আমার সাথে রক্তের গ্রুপ মিলে বলেই আমাকে কল দেয়া। রোগীর জন্য নাকি যত দ্রুত সম্ভব রক্তের প্রয়োজন। আমি রোগীর বাবার মোবাইল নাম্বার আর হাসপাতালের নাম জেনে অফিসে আসলাম। বসের কাছ থেকে অর্ধদিবসের ছুটি নিয়ে হাসপাতালে চলে গেলাম। রোগীর বাবাকে কল দিয়ে কেবিন নাম্বার জেনে কেবিনের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। কিন্তু এখানে যাদেরকে দেখছি তাদেরকে আমি এখানে আশা করিনি। মিলির বাবা মাকে এখানে আশা করিনি। আমাকে দেখে তারাও বেশ অবাক হয়েছে। আমি বললাম,
-“আঙ্কেল আপনারা এখানে? কারো কি কিছু হয়েছে?” আঙ্কেল মৃদু গলায় বলল,
-“হ্যাঁ। মিলি অসুস্থ। ওর জন্য রক্তের দরকার। রক্তদাতার জন্যই এখানে অপেক্ষা করছি।” আমি কিছুটা সময় চুপ থেকে বললাম,
-“আঙ্কেল আমিই আপনাকে কল করেছিলাম। আপনারা আমার জন্যই অপেক্ষা করছেন।”
আঙ্কেল বেশ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন। আমি আর কিছু না বলে চুপ করে রইলাম। আমি কেবিনে উকি দিয়ে দেখি মিলি বেডে ঘুমিয়ে আছে। ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে ও ভালো নেই। কিন্তু মিলি তো আমায় ছেড়ে গিয়েছিল ভালো থাকার জন্য! তাহলে ওর এই অবস্থা কেন?! কিছুক্ষন পরে আমি আবার বলে উঠলাম,
-“আঙ্কেল, আমি অফিস থেকে কিছু সময়ের জন্য ছুটি নিয়ে এসেছি। আমাকে তাড়াতাড়ি চলে যেতে হবে। রক্ত নেয়ার ব্যবস্থা করলে ভালো হয়।” রক্ত দেয়ার পর আমি একটু রেস্ট নিচ্ছি। পাশে আঙ্কেল বসে আছে।
-“আঙ্কেল, মিলির এই অবস্থা কেন? কি হয়েছে ওর? ওর হাজবেন্ড কোথায়? ওনাকে তো দেখলাম না।” আঙ্কেল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
-“ওর হাজবেন্ড আরেকটা বিয়ে করেছে।” আমি বেশ অবাক হলাম। কিছু সময় চুপ থেকে বললাম,
“আঙ্কেল, কি হয়েছে আমাকে সব খুলে বলা যাবে?”
আঙ্কেল একটু চুপ করে থেকে বলা শুরু করলেন। আমি স্থির হয়ে বসে আছি। এমন কিছু শুনব আশা করিনি। কথাগুলো হজম করতে কষ্ট হচ্ছে। বিয়ের পর মিলি বেশ সুখেই ছিল। ওর হাজবেন্ড আসিফের বেশ ভালো ব্যবসা ছিল। স্বামী সংসার নিয়ে ভালোই কাটছিল তার। কিন্তু হঠাৎ করেই আসিফের ব্যবসায় মন্দা দেখা দেয়। ভেবেছিল সবকিছু কাটিয়ে উঠতে পারবে। কিন্তু তা হয়নি। সব টাকা বরবাদ হয়ে যায়। আসিফ তখন মিলির কাছে বলে তার বাবার কাছ থেকে টাকা এনে দিতে। মিলিও এনে দেয়। ভাবে নিজের স্বামীকেই তো দিচ্ছে। কিন্তু আসিফ বারবার মিলির কাছে টাকা চাইতে থাকে। একসময় মিলি বাবার কাছ থেকে আর টাকা আনতে পারে না। তার বাবাও যে টাকা দিতে দিতে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। তখন থেকে মিলির উপর অত্যাচার শুরু হয়।
এসব সহ্য করতে না পেরে একদিন মিলি রাগ করে বাবার বাসায় চলে আসে। ভাবে আসিফ হয়ত ওর কাছে মাফ চেয়ে ওকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু ঘটনা ঘটে তার উল্টো। কিছুদিন পর মিলি জানতে পারে আসিফ অনেক যৌতুক নিয়ে আরেকটা বিয়ে করেছে। মিলি ব্যাপারটা কিছুতেই বিশ্বাস করে না। কিন্তু শ্বশুরবাড়ি গিয়ে দেখে ব্যাপারটা আসলেই সত্যি। আসিফ ওকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। আর বলে দেয় কিছুদিনের মধ্যেই ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দিবে। এসব শুনে মিলি আর সহ্য করতে পারে না। বাসায় এসে শুধু কান্নাকাটি করে। একসময় ডিপ্রেশনে পড়ে হাত কেটে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। হায়রে মানুষ! সুখের সন্ধানে যাকে আকড়ে ধরতে চাইল সে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গেল। মিলি আমাকে ভালোবেসেছিল কিনা জানিনা। কিন্তু সুখে থাকতেই আসিফকে বিয়ে করেছিল। দুই বছর আগের কথা। মিলি আমাকে ফোন করে পার্কে আসতে বলেছিল। কি যেন জরুরি কথা আছে। পার্কে গিয়ে দেখি আমার আগেই এসে বসে আছে। যা আগে কোনোদিনও হয়নি। ওর পাশে বসতে বসতে বলেছিলাম,
-“কি ব্যাপার? এতো জরুরি তলব?”
-“ইবু, বাবা আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে।”
-“কি বলো! হঠাৎ করে কীভাবে এসব হলো? আমাকে আগে জানাওনি কেন?” মিলি তখন রেগে গিয়ে বলেছিল,
-“আগে জানালে কি হতো? তুমি তো কোনো চাকরি খুঁজে পাচ্ছোনা। আব্বু তো আমাকে বেকার ছেলের কাছে বিয়ে দেবে না।” আমি অস্থির কণ্ঠে বলেছিলাম,
-“দেখো মিলি। তুমি আমাকে আর ২ মাস সময় দাও। এর মাঝে আমি ছোটখাটো হলেও একটা জবের ব্যবস্থা করে ফেলব। তাছাড়া তোমার বাবা মা তো আমাকে চিনেই। তাদেরকে আমাদের সম্পর্কের কথা বললেই তো হয়।”
মিলি কেমন যেন একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলেছিল,
-“ছোটখাটো জব! বাবা যে ছেলের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছে সেই ছেলের বিশাল ব্যবসা আছে। তোমার কি মনে হয়? সেই ছেলেকে বিয়ে করে আমি রানীর মতো থাকবো নাকি তোমাকে বিয়ে করে ফকিরের মতো থাকবো?” আমি তখন বেশ রাগি গলায় বলেছিলাম,
-“প্রেম করার আগে এসব মনে ছিলোনা? তুমি তো আমার পরিবার সম্পর্কে জানতেই।”
-“দেখো, যখন প্রেম শুরু করেছিলাম তখন এতোসব ভাবিনি। কিন্তু এখনতো আমার ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে। আমি নিশ্চিত সুখকে রেখে তোমার পেছনে কি করে পড়ে থাকি? তোমার কোনো চাকরি নাই। কবে চাকরি পাবে সেটাও তুমি জানোনা। এমনভাবে তো আমি থাকতে পারবো না।” আমি অসহায়ের মতো বলেছিলাম,
-“তারমানে কি তুমি এতোদিন আমার সাথে শুধুই টাইম পাস করেছো!”
-“তুমি যদি তাই ভাবো তাহলে তাই। নিজের মাপের কাউকে খুঁজে নিও। আশা করি আমার সাথে আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে না। আর যদি আমাকে ডিস্টার্ব করো তাহলে তো জানোই আমি কি করতে পারি। প্রয়োজন হলে জেলেও পাঠাতে পারি। ভালো থেকো। আমাদের আর দেখা হবে না।”
আমি সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার তখন মনে হচ্ছিল আমি ঘুমের মধ্যে খারাপ কোনো স্বপ্ন দেখছি। এখুনি আমার ঘুমটা ভেঙ্গে যাবে আর আমি এই দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পাবো। কিন্তু না। তেমন কিছুই হয়নি। সেদিন পার্কের সেই বেঞ্চটাতে আমি অনেক রাত পর্যন্ত বসে ছিলাম। আশায় ছিলাম যে মিলি আমার কাছে এসে বলবে এটা শুধু মজা ছিল আর কিছুই না। কিন্তু না। ও আসে নি। সুখে থাকার জন্য আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। আর আজ সুখ বলতে ওর জীবনে কিছু নেই! মিলির কেবিনে বসে আছি। ওকে রক্ত দেয়া হচ্ছে। ও আধশোয়া হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ কিছু বলছি না। কিছুক্ষন পর নিরবতা ভেঙ্গে আমিই বললাম,
-“তোমার বাবার কাছ থেকে আমি সব জেনেছি। দেখো মিলি, তোমাকে সহানুভূতি দেখানোর ভাষা আমার জানা নেই। শুধু এতটুকুই বলবো যে আজ তোমার জীবন তোমাকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। এই বাস্তবতা থেকেই তোমাকে শিক্ষা নিতে হবে। মানুষের জীবনে এরকম সময় আসবেই। তাই বলে নিজেকে শেষ করে নয়, বরং এই সময় থেকে শিক্ষা নিয়েই জীবনটা সাজাতে হবে।”
মিলি কিছু বলছে না। কিছুটা সময় পর আমি আবারো বললাম, “তোমার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে একটা কথা বলি। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি। যে মানুষটা তোমাকে ছেড়ে চলে গেছে তার জন্য নিজের জীবন শেষ করে নয়, বরং নিজে ভালোভাবে বেঁচে থেকে তাকে দেখিয়ে দাও তাকে ছাড়াও তুমি চলতে পারো। তাকে ছাড়াও তুমি ভালো থাকতে পারো। ঘুরে দাঁড়াতে পারো।” আমার শেষ কথাগুলো শুনে ওর চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল। ও হয়ত বুঝতে পেরেছে শেষ কথাগুলো দিয়ে আমি কি বোঝাতে চেয়েছি। আমি একটা ম্লান হাসি দিয়ে বললাম, “ভালো থেকো মিলি। আমি আসি।” আমি কেবিন থেকে বেরিয়ে আসলাম। পেছন থেকে মিলি আমাকে অনেকবার ডেকেছিল। কিন্তু আমি ফিরেও তাকাইনি।
রাস্তায় হাঁটছি। আজ কথাগুলো বলতে পেরে নিজেকে খুব হালকা লাগছে। শেষের কথাগুলো বলায় মিলি হয়ত নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। এই বাস্তবতা থেকে হয়ত বুঝতে পেরেছে কাছের মানুষ ছেড়ে গেলে কতোটা কষ্ট হয়। সেদিন আমারো কষ্ট হয়েছিল। আত্মহত্যা করার কথাও ভেবেছিলাম। পরক্ষনে মা বাবা, বন্ধু-বান্ধবদের কথা মনে পড়ে যায়। পরে ভেবেছি একটা মেয়ের জন্য আমি কেন সবাইকে ছেড়ে চলে যাবো? তারা তো কোনো অপরাধ করেনি। আমিতো কোনো অপরাধ করিনি। তখন থেকে নিজেকে নতুন করে গড়তে শুরু করি। আজ নিজেকে খুব স্বার্থক মনে হচ্ছে। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে আম্মুকে ফোন দিলাম।
-“আম্মু, আমি বিয়েতে রাজি। তোমরা মেয়ে দেখা শুরু করো।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত