মধ্যবিত্ত সংসার

মধ্যবিত্ত সংসার
বাড়ির অমতে বিয়ে হয়েছিল বাবাই দা আর নাসরিনের, মুসলিম মেয়েকে বাবাই দার মা বরণ করতে চায়নি নাসরিনের পরিবারও বাবাই দাকে নিজেদের ঘরে কখনোই প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। তাই দুজনকেই নিজেদের বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছে টিনের চালওয়ালা ঘরে ওরা দুজনে ভাড়া থাকতো, বাবাই দা ঘরে টিউশন পড়াতো, নাইন টেনের ছেলে মেয়েরা পড়তে আসতো বাবাই দার কাছে….
নাসরিন কলেজে যেতো, তারপর সেখান থেকে সেলাই স্কুলে সেলাই শিখতে যেতো, বাবাই দা জোর করে নাসরিনকে সেলাই স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল বাবাই দা নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে হলেও, নাসরিনের বাবা মেয়েকে অত্যন্ত যত্নে মানুষ করেছিলেন, কোনোদিন নাসরিনকে রান্নাঘরে ঢুকতে দেননি খাওয়ার অভাব কি! নাসরিন জানতো না, খিদের পেটে গামছা বেঁধে থাকার যন্ত্রণা নাসরিন জানতো না, চড়চড়ে রোদে পুড়ে কলেজে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নাসরিনের ছিল না, রান্না করতে গিয়ে পুড়ে যাওয়া হাতের ঘা কেমন দেখতে হয়, নাসরিন জানতো না কিন্তু বিয়ের পর নাসরিন আর বাবাই দা সকালের রান্নাটা একসাথে সেরে বাবাই দা নাসরিনকে কলেজে দিতে যেতো। বাবাই দা শাক সবজি কেটে গুছিয়ে দিতো, নাসরিন খুন্তি নাড়তো। নাসরিনের কপাল বেয়ে ঘাম চুঁইয়ে পড়তো, হাতে গরম তেলের ছ্যাকা লাগতো, বাবাই দা যত্ন করে ফুঁ দিয়ে দিয়ে বোরোলিন লাগিয়ে দিতো প্রায়দিন যেদিন ভাত হাঁড়িতে অল্প থাকতো, সেদিন বাবাই দা আর নাসরিন একথালায় ভাত কাঁচা লঙ্কা আর মুড়ি সর্ষের তেল দিয়ে মেখে খেয়ে নিতো…
নাসরিন খুব চেষ্টা করতো, কিন্তু কিছুতেই জামাকাপড়টা ভালোভাবে কাচতে পারতো না, বাবাই দা কেচে দিতো, নাসরিন গনগনে দুপুরে উঠোনের তারে কাপড় মেলতে বেরোতো শুধু নাসরিনের চুলে রাতের বেলায় ভালোভাবে নারকেল তেল মাখিয়ে বিনুনি করে দিতো বাবাই দা, নাসরিন তখন কলেজের পড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকতো লেকিন হর লভ স্টোরিমে এক ভিলেন হোতা হে প্রতিটা প্রেমের গল্পে একটা ধাক্কা মারা আঘাত থাকে, একটা ভিলেন থাকে, একটা শত্রু থাকে। বাবাই দা ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছিল, চোখের তলায় কালি পড়ছিল, ঠোঁটের চামড়া ফেটে গিয়েছিল, কিছু খেতে পারতো না, বমি করতো, ঝিমিয়ে থাকতো সারাদিন তা সত্ত্বেও কিন্তু বাবাই দা বড় আগলে রেখেছিল নাসরিনকে। সকালের সবজি কাটা থেকে রাতের রুটি বেলে দেওয়া বাবাই দা করে দিতো। দুজনে একসঙ্গে সিনেমা দেখতে যেতো, টিভির রিমোট নিয়ে ঝগড়া হতো প্রায়দিনই। আর ঠিক রাত আটটা নটার সময় একটা লম্বা উঠোনে মাদুর পেতে শুয়ে থাকতো আকাশের দিকে মুখ করে ওরা।
নাসরিন বাবাই দার জামার কলারটা একটু জোরে চেপে ধরতো সেসব সময়ে, কাঁদতে চাইতো, কিন্তু সবসময় বুক ফেটে কান্না আসতো না, শুধু চোখ খচখচ করতো খুব বৃষ্টি হলে নাসরিন বাবাই দা একসঙ্গে কাপড় আনতে যেতো খোলা উঠোনে। কাপড়গুলোর সাথে তারা নিজেরাও ভিজে যেতো, ইচ্ছে করেই ভিজতো মাথা ফাটা রোদে নাসরিন সেলাই স্কুল থেকে বাড়ি ফিরলে বাবাই দা গ্লাস ভর্তি ঠান্ডা জল নিয়ে বসে থাকতো ডাইনিংয়ে ঠিক পুজোর আগে একসঙ্গে শাড়ি আর পাঞ্জাবি কিনতে বেরোতো ওরা। বাবাই দার টিউশনির টাকায় নাসরিনকে সবচেয়ে দামি শাড়িটা কিনে দিতে চাইতো, কিন্তু নাসরিন ওই টাকা দিয়ে ভালো পাঞ্জাবি কিনতে বলতো। এই নিয়ে পুজো শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঝামেলা চলতো দুজনের এ বছর সামনেই পুজো আসছে তাইনা! নাসরিন একই রকম আছে, লম্বা চুল বিনুনি করে বাঁধা, সেলাই স্কুলে নাসরিন এখন সেলাই শেখায়।
এখন শুধু একটু ফিকে রঙের শাড়ি পরে নাসরিন, চোখে আর কাজল দেয় না আগের মতো, ঠোঁটে লাল টকটকে লিপস্টিক মাখে না, চুল আঁচড়াতে ভুলে যায় অর্ধেক দিন নাসরিন পুজোয় আর নতুন পাঞ্জাবি কেনে না বাবাইদার জন্য। নাসরিনকে শাড়ি কিনে দেওয়ার লোকটাও আর নেই, গোটা রাত ঘুরে ঠাকুর দেখার পর পায়ের ফোস্কায় মলম লাগিয়ে দেওয়ার লোকটা নেই, ঝামেলা করার লোকটাও নেই সিনেমা দেখতে যাওয়ার, এক থালায় ভাত মেখে খাওয়ার লোকটা হারিয়ে গেছে শুধু, কোথাও আর কিচ্ছু বদলায়নি কিচ্ছু না বাবাই দার ক্যানসার ধরা পড়েছিল থার্ড স্টেজে। বাবাই দা যেদিন মারা যায় তার আগের দিনও নাসরিনকে বলেছিল,
“তুমি আমার কাছে যখন থাকতে না, কলেজে যেতে, কিংবা সেলাই স্কুলে! আমি একটা করে কবিতা লিখতাম তোমায় ভেবে ভেবে তুমি ঠিক কিভাবে শাড়ি পরো, কিভাবে ঠোঁটে ঘষে ঘষে ভেসলিন লাগাও, কিভাবে হাঁটা চলা করো পা থপথপ করে ফেলে বাড়িতে, স্নানের পর মেঝেয় ছড়িয়ে যাওয়া তোমার চুলের জল, রান্নার সময় খুন্তি নাড়ার আওয়াজ আমায় প্রতিটা মুহূর্তে বাধ্য করেছে কবিতার কাছে ফিরিয়ে আনতে শোনো যদি হুট করে মরে যাই, তুমি আমায় কথা দাও ওই বইয়ের টেবিলের পাশে রাখা খাতাটায় একটা করে কবিতা লিখবে আমায় যত্ন করে ভেবে। আমি যেমন করে তোমায় ভেবেছি, তুমিও আমায় তেমন ভাবেই ভাববে! এই ধরো তুমি ভাববে, আমি কিভাবে জল খাই, ভাত কিভাবে তরকারির সাথে চটকে মাখি।
জুতোটা কোথায় খুলে রাখি, বিছানার চাদরটা কিভাবে ভাঁজ করি! তুমি আমায় ফটোফ্রেমে নয়, কবিতার খাতায় সাজিয়ে রেখো নাসরিন, আর পুজোর সময় শাড়ি কিনতে ভুলো না যেন, তোমার পাগল বর মরে যাওয়ার পরেও তোমায় নতুন শাড়িতে দেখলে বড্ড খুশি হবে গো তোমার স্বপ্নে এসে আমি রোজ একবার করে তোমার মাথায় বুকে পিঠে হাত বুলিয়ে যাবো নাসরিন এই জন্মে হয়তো আমাদের একসঙ্গে থাকা এটুকুই ছিল, পরের জন্মে দেখা হবে আবার, অপেক্ষা করবে তো নাসরিন”….
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত