কাজীপাড়া রোড নং ৪১৩

কাজীপাড়া রোড নং ৪১৩
বাড়ির বউ হয়ে প্রতিদিন বাজারে যাই বলে আমার প্রতিবেশী আন্টি-সমাজের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। সকালবেলা পাটের তৈরি বাজারের ব্যাগটা হাতে নিয়ে যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাই তখন পাশের বিল্ডিংয়ের চারতলার আন্টি বেলকনিতে দাঁড়িয়ে স্থির দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন৷ দুপুরে তার রান্নাঘরের চুলোয় ক’টা হাড়ি বসবে সে চিন্তার জায়গা দখল করে নেয় আমার সংসারের হাড়ির খবরের চিন্তা।
আমিও কম যাই না। বাজারে যাওয়ার আগে ফ্ল্যাট থেকে বেরোনোর সময় গলা উঁচিয়ে শাশুড়িকে বলে যাই “মা, বাজারে যাচ্ছি”। এতে করে আমার প্রতিবেশী আন্টিদের ঠিক সময়ে বেলকনিতে উপস্থিত হতে সুবিধে হয়। তাদের বদ্ধমূল ধারণা, স্বামীর অনুপস্থিতিতে শ্বশুরবাড়িতে আমি একদমই ভালো নেই। সারাদিন হয়তো আমার শাশুড়ি আমার সাথে খিটখিট করতে থাকেন। আর শ্বশুরের মন জুগিয়ে চলতে পারছি না বলে প্রায়ই হয়তো বাপের বাড়ি নিয়ে খোঁটা শুনতে হয় আমাকে। মানে তাদের চোখে আমার অবস্থা সমাজের অন্য দশটা নির্যাতিত বাঙালি বউয়ের মতোই। অথচ তারা এটা জানে না যে প্রতিদিনই একবার করে আমি আল্লাহর দরবারে মন থেকে শুকরিয়া আদায় করি এমন একটা শ্বশুরবাড়ি পেয়েছি বলে।
আমার হাজবেন্ডের সরকারি চাকরি। একেক সময় একেক জায়গায় পোস্টিং থাকে। এখন আছে বগুড়ায়। আগে প্রতি সপ্তাহে একবার এসে আমাদের দেখে যেতো৷ এখন কাজের প্রেশার বেশি থাকায় ওভাবে নিয়ম করে আসতে পারে না। এ বয়সে ছেলের সাথে ঘুরে ঘুরে বিশ্ব ভ্রমণ করতে আমার শ্বশুর রাজি নন। তিনি এক কথার মানুষ। একবার কোনো বিষয়ে তিনি অসম্মতি জানালে পরে তাকে রাজি করানো কঠিন কাজ। এই কঠিন কাজটা আমার ননদের সাধ্যের মধ্যে থাকলেও আমার হাজবেন্ডের সাধ্যের বাইরে। তাই বিয়ের পর আমার শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি তাদের ছেলের দায়িত্বটা আমাকেই পালন করতে হচ্ছে। যদিও এ দায়িত্বগুলোর বেশিরভাগই আমার নিজের তৈরি করা, কারো চাপিয়ে দেয়া নয়। যেমন- এই করোনাকালীন দুঃসময়ে আমার শ্বশুরকে আমি বাজারে যেতে দিচ্ছি না। নিজেই বাজারে গিয়ে ভীড় ঠেলে মাছ-তরকারি কিনে নিয়ে আসছি। চাইলে আমি এসব অনলাইন থেকে আনিয়ে নিতে পারতাম। কিন্তু আমার শ্বশুর এটা পছন্দ করতেন না৷ তিনি এখনো প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধেয় অভ্যস্ত বা বিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারেন নি। তো যা বলছিলাম, সেদিন ভরদুপুরে দু’হাতভর্তি বাজার নিয়ে যখন সিঁড়ি বেয়ে উঠছিলাম তখন দেখা হয়ে গেল দু’তলার রেণু আন্টির সাথে। আমার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরতে দেখে আন্টি আলগা মায়া দেখিয়ে জানতে চাইলেন,
– আহারে নাজিফা, এই কাঠফাটা রোদে আজও বাজারে যেতে হল? ঠোঁটে প্লাস্টিকের হাসি ঝুলিয়ে উত্তর দিয়েছিলাম,
– হ্যাঁ আন্টি। বাবা টাটকা শাক-সবজি ছাড়া খেতে পারেন না। আমার কথা শুনে রেণু আন্টি দু’টান সুর দিলেন,
– সেএএ ঘরে বউ আসলে সব শ্বশুর শাশুড়িরই খাদ্যাভ্যাস পাল্টে যায়।
– ঠিকই বলেছেন আন্টি৷ আর শুধু শ্বশুর-শাশুড়ি কেন, বউদেরও কিন্তু তার ব্যতিক্রম হয় না। এই দেখুন না, বিয়ের আগে আমি মূলার তরকারি খেতে পারতাম না। আর এখন শাশুড়ির হাতের মূলার তরকারি ছাড়া আমার একদিনও চলে না৷ আমি ঠিক জানি, এই রেণু আন্টিই বিকেলে আমি ছাদে চলে গেলে আমাদের বাসায় এসে আমার শাশুড়ির সাথে খোশগল্প করার ছলে আমার নামে তার কান ভারী করবেন। গত সপ্তাহে এসে কি বলেছিলো জানেন? আমি নাকি তার মেয়ের হুজুরের সাথে বেহায়াপনা করেছি। সেই বেহায়াপনার নমুনা শুনুন। রিংকি মানে রেণু আন্টির ৯বছরের মেয়েটাকে এক মধ্যবয়স্ক লাল দাঁড়িওয়ালা হুজুর কুরআন শিক্ষা দেয়। যতবার আমি এই হুজুরের সামনে পড়েছি ততবার আমি তার লালসার স্বীকার হয়েছি। মনে হত যেন চোখ দিয়ে আমাকে গিলে খাচ্ছে। প্রথম দু’একদিন কিছু বলিনি। তৃতীয়দিনের বেলায় আর ছাড়তে পারিনি। সামনে গিয়ে চোখে চোখে রেখে কঠিন গলায় শুনিয়ে দিয়েছিলাম,
– আরেকদিন আমার উপর এরকম জানোয়ারের দৃষ্টি নিয়ে তাকালে রিংকির নতুন কাটা কম্পাসটা দিয়ে চোখ উপড়ে ফেলবো একদম৷ পরবর্তীতে সে হুজুর রেণু আন্টির কাছে আমার নামে বিচার দিয়েছিলো, আমার নাকি শিষ্টাচার নেই। আমি তার সাথে বেয়াদবি করেছি। আর রেণু আন্টি আমার শাশুড়ির কাছে এসে এতে আবার একটু লেজ লাগিয়েছিলেন। বলেছেন, শুধু শিষ্টাচার নয়। আমার লাজলজ্জারও বালাই নেই। নয়তো বাপের বয়সী হুজুরের সাথে এমন বেহায়াপনা করি! আমার শাশুড়ি এ বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করতে আসলে আমি পুরো ঘটনা বলে দিয়েছিলাম। তিনি অবিশ্বাস করেন নি আমাকে। বরং সরল মনে রেণু আন্টিকে গিয়ে সতর্ক করে দিয়ে এসেছিলেন,
– ভাবী, রিংকি যখন হুজুরের কাছে পড়ে তখন আপনি আড়াল থেকে ওর খেয়াল রাখবেন। ওকে চোখের আড়াল করবেন না একদম।
রেণু আন্টি আমার শাশুড়ির কথাটা আমলে নিলেন না। উল্টো বলে দিলেন, এসব নিয়ে যেন উনি মাথা না ঘামান।
পরে দেখলাম, রিংকির হুজুর বদলানো হয়েছে। এখনের হুজুরটা আবার খুব ভালো এবং ভদ্র স্বভাবের। কিছুদিন ধরে দেখছি, বিকেলবেলা বাবা(শ্বশুর) আমাকে ছাদে যেতে দিচ্ছেন না। রিংকি, মুনা, তিতলি, অনি, অমি ওরা’ও এসে ডেকে যাচ্ছে না আমাকে। হয়তো ওদেরও ঘরবন্দি করে রাখা হয়েছে। কারণটা আমি জানি। গত ২৭শে আগস্ট আমার বড় ভাবীর হঠাৎ করে শরীর খারাপ হয়ে যাওয়ায় তাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে হয়। ভাইয়া তখন অফিসের কাজে ঢাকার বাহিরে ছিল।
তাই বড় ভাবীকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে আমাকেই যেতে হয়েছিলো। সেখান থেকে ফেরার সময় গলিতে ঢুকে দেখি কয়েকটা বখাটে মিলে পাশের বিল্ডিংয়ের স্নেহাকে বাজেভাবে উত্যক্ত করছে। তখন প্রায় সন্ধ্যে। চারপাশে মানুষজন যারা ছিল, তারা প্রতিবাদ করার বদলে তামাশা দেখছিলো। উঠতি বয়সে ক্যারাটে শিখেছিলাম৷ তার সব কৌশল ঢেলে দিলাম বখাটে ছেলেগুলোর উপর। পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে গেল। আমি মাঠে নামার পর কয়েকজন এসে গোল দেয়ার চেষ্টা করলে তাদেরও কয়েকহাত দেখে নিলাম। এ ঘটনায় স্নেহার মা আমার উপর খুব চটে ছিলেন, হতে পারে এখনো আছেন। তার কথায়, বখাটেগুলোকে না মেরে স্নেহাকে সেখান থেকে নিয়ে আসলেই তো ঝামেলা চুকে যেতো। এত কাহিনী করে অযথা লোক হাসানোর কি দরকার ছিল? এখন যদি ওই বখাটেগুলো তার মেয়ের উপর আমার মারের প্রতিশোধ তুলতে আসে তখনকার পরিস্থিতি কে সামাল দিবে? এরপর থেকে আমার শ্বশুর আমাকে বাইরে বের হতে দিচ্ছেন না। এমনকি বাজারেও না। স্নেহার মা এসে আমার নিরাপত্তার প্রসঙ্গ তুলে আমার শ্বশুরের ভেতরেও ভয় ঢুকিয়ে দিয়ে গেছেন।
কিন্তু এভাবে ঘরবন্দি হয়ে কতদিন আর থাকা যায়! এরচেয়ে দম আটকে মরে যাওয়া ভালো৷ তাছাড়া অন্যায় দেখে চুপ করে থাকা, সময় মতো কথার জবার না দেয়া, নিজের আত্নসম্মান বা নিজস্বতার কথা ভুলে গিয়ে পাড়া প্রতিবেশীদের কথায় কান দেয়া, মিথ্যে সমাজ বাঁচিয়ে চলা এসব একেবারেই আমার ধাঁচে নেই৷ আমি যা, তাই’ই৷ অন্য কারো জন্য আমি নিজেকে পরিবর্তন করতে পারবো না। পারতাম যদি আমি ভুল হতাম৷ অন্যায় কিছু তো হচ্ছে না আমার দ্বারা। তাহলে সমস্যা কোথায়? যাই হোক, আজকেও ঘরবন্দি হয়ে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বিকেলে ছাদে যেতেই হবে৷ কতদিন হল বাচ্চাগুলোর সাথে দেখা হয় না। ওদের সাথে আড্ডা দেয়া হয় না৷ তাই একটা ছোট্ট প্ল্যান সাজিয়েছি। বাবার সাথে দাবা খেলবো আজ। শর্ত হচ্ছে যে জিতবে তার সব আবদার রাখতে হবে। বাবা এতোই কনফিডেন্ট যে তিনি খেলা শুরুর আগেই আবদার সাজিয়ে রেখেছেন। বিকেলে তাকে হাঁটতে যেতে দিতে হবে৷ দাবা খেলা পেলে বাবা দুনিয়াদারী সব ভুলে যান। আর এ সুযোগটাই আমি কাজে লাগাচ্ছি। বাবা জানতেন না, কলেজ লাইফে দাবা খেলায় আমি চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। যার ফলস্বরূপ আজ বিকেলে আমি ছাদে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছি।
রিংকি, মুনা, তিতলি, অনি, অমি ওরা কিন্তু সমবয়সী নয়। একেকজনের বয়স একেকরকম। রিংকির ৯, মুনার ১৪, তিতলির ১৫, অনির ১১ আর অমির ১৭। অমি আমাকে ভাবী বলে ডাকে দেখে বাকি সবার ভাবী হয়ে গেছি আমি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রয়োজনীয় দূরত্ব বজায় রেখে গল্পের ফাঁকে ফাঁকে ছাদে আমি ওদের ক্যারাটে শেখাই। ওদের বয়সী থাকতে আমি কি করে এবং ক’টা বাজে ছেলের প্যান্ট ভিজিয়ে দিয়েছি সেই গল্পগুলো তাদের মুখস্থ হয়ে যাওয়ার পরও বারবার শুধু সে গল্পই শুনতে চায় তারা। গল্প শোনার খায়েশ মিটে গেলে ওরা আবদার শুরু করে ক্যারাটে শেখার জন্যে। ছাদে ক্যারাটে শেখানো হচ্ছে- খবর পেয়ে পাশের আর সামনের বাড়ির ১৪ বছর বয়সী শুভ আর সামিও দৌড়ে চলে আসে আমাদের সাথে যোগ দিতে।
ওরা বেশ আগ্রহ নিয়ে শেখে, মজা পায়। সুতি ওড়নাটা কোমরে বেঁধে নিয়ে হাত-পা ছুঁড়ে ছুঁড়ে নিজের আয়ত্ত্ব করা সব কৌশল এই ছোট ছেলেমেয়েগুলোকে রপ্ত করাতে দারুণ লাগে আমার। বুঝতে পারি, আমার সঙ্গ ওরা উপভোগ করে। কিন্তু ওদের মায়েরা আমাকে একদমই পছন্দ করে না বলে প্রায়দিনই ওদের ছাদে আসতে বাঁধা দেয়৷ আমার সাথে মিশতেও বারণ করে। সবদিন যে আটকে রাখতে পারে, তেমনটা নয়৷ তবে আমিও ওদের বুঝাই, মায়েদের অবাধ্য হতে নেই। প্রতিউত্তরে ওরা কি বলে জানেন? আম্মুও তো দাদুর অবাধ্য হয় সবসময়। আম্মু তো দাদুকে মা বলেই ডাকে। তাহলে? তার বেলায় বুঝি কিছু না? ওদের এ প্রশ্নে আমি চুপ হয়ে যাই। কোনো উত্তর দিতে পারি না। ভার্সিটি বন্ধ বলে ঘরে বসে নতুন নতুন কাজ শুরু করেছি। অনলাইনে মেকআপের ক্লাস নিই। লাইভে গিয়ে মেকআপ করি। মেকআপ লাইভে আবার ফ্রেন্ডদের বিজনেস পেইজগুলোও প্রমোট করে দিই।
মানে যখন যেটা ভালো লাগে তাই করি। আমার ক্লোজ ফ্রেন্ড রুমানার একটা বিউটি পার্লার আছে। বেশ ভালো চলে। রুমানা এখন অনলাইনে বিউটি ব্লগার হিসেবেও কাজ করছে। একসময় ওর সাথে থেকে থেকে মেকআপে অনেকটা দক্ষতা অর্জন করেছিলাম। তবে এটাতেও আমার প্রতিবেশী আন্টি-সমাজের সমস্যার শেষ নেই। এখানেও তাদের নাক গলাতে হবে। একজন আরেকজনের কাছে গিয়ে আমাকে নিয়ে টিটকিরি করে। বলে, আমি নাকি নিজেকে বিশাল বড় মেকআপ আর্টিস্ট মনে করছি৷ অথচ আমার মেকআপ লাইভে ১ হাজার ভিউয়ার্সের মধ্যে তারাও একটা ছোটখাটো জায়গা দখল করে রাখে সবসময়। এমনকি আমাকে ফলোও করে! এইতো সেদিন অনি বলছিলো, ওর মামার ঘরোয়া বিয়ের আয়োজনে ওর আম্মু আমার মেকআপ লাইভ দেখে দেখে সেজেছিলো। কি সুন্দর লাগছিলো দেখতে! আমি এসব শুনি আর মিটমিট করে হাসি। এছাড়া আর কিইবা করার আছে বলুন?
ওদের আচরণে আমার যে একদমই খারাপ লাগে না, তা না। খারাপ লাগে কিন্তু প্রকাশ করি না। তবে শেয়ার করি শুধু একজনের সাথে। সে হচ্ছে রিয়াদ, আমার হাজবেন্ড। দিনশেষে রাতেরবেলা সারাদিনের জমানো গল্পের ঝুলি নিয়ে বসি তার সাথে। ফোনের ওপাশ থেকে মনোযোগী শ্রোতা হয়ে কান পেতে রাখে সে৷ আমার যদি কিছু ভুল হয়ে থাকে, যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে সংশোধন করে দেয়। আর যেটা ঠিক, সেটায় আমার পাশে থেকে সাপোর্ট করে যায়। কেবল এই একজনের কাছেই আমি নত স্বীকার করি। আমাদের এরেঞ্জ ম্যারেজ। হ্যাঁ, বয়সের পার্থক্যটা একটু বেশি, ৮ বছরের। তাতে কি? বেশ তো আছি। রিয়াদ পরশু এসেছিলো। আজ চলে যাবে আবার। মন খারাপ হচ্ছে অনেক কিন্তু বুঝতে দিচ্ছি না। যাবার বেলায় মন খারাপ দেখাতে নেই৷ ওকে বাস স্টেশন পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসতে চাচ্ছি আমি। এই বাহানায় ওর সাথে আরো কিছু সময় কাটানো যাবে অন্তত। সকালে নাস্তা সেরে ওর ব্যাগ গুছিয়ে দিচ্ছিলাম৷ এমন সময় ও আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
– কিছু বলবে?
– এ পাড়ায় থাকতে তোমার সমস্যা হচ্ছে না?
– এ আবার কেমন কথা, সমস্যা হবে কেন? আর তুমি তোমার বউকে চেনো না? সমস্যা শুরু হওয়ার আগেই সমাধানে পটু সে। রিয়াদ মুচকি হাসে। বিছানায় বসতে বসতে বলে,
– তা তো জানিই। বাবা বলছিলেন, তোমার জন্য নাকি এ পাড়ায় কোনো বখাটে ছেলেপেলে ঢুকতে পারে না। মেয়েরা খুব শান্তিতে চলাফেরা করতে পারে।
– শুধু বখাটেদের কথা বলছো কেন? আজকালকার মেয়েগুলোও কি কম যায় নাকি৷ নিজেরাই ফিডার ছেড়েছে কয়েকদিন আগে, এরমধ্যেই বয়ফ্রেন্ড বানিয়ে বাবু বাবু খেলা শুরু করে দিচ্ছে। এদেরও রেহাই দেই না। ওইতো কবে যেন নীলুকে দেখলাম কোচিং শেষ করে একটা ছেলের হাত ধরে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। সোজা গিয়ে সতর্ক করে দিয়ে আসলাম। ব্যস, এখন আর এসব করে না।
– করে কি করে না, সে তুমি নিশ্চিত হয়ে কি করে বলছো? তুমি কি সবসময় ওকে পাহারা দিয়ে রাখো? আমি চিন্তিত গলায় জানতে চাইলাম,
– মানে? করে বলছো?
– এখনকার ছেলেমেয়েরা অনেক এডভান্স বুঝলে নাজিফা? তুমি একা ওদের কন্ট্রোলে আনতে পারবে না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার কাজে মন দিলাম,
– জানি। তবুও যতটুকু পারা যায় করি। নিজের বিবেকের কাছে অন্তত কোনো দায় রইলো না৷ আচ্ছা, বাবা কি আমার উপর রেগে আছেন?
– না তো। কেন?
– আমার এসব কাজের জন্য কয়েকদিন পরপর তো আমার নামে অনেক ধরনের বাঁকা কথা হজম করতে হয় বাবাকে তাই বললাম।
– তুমি হয়তো জানো না, বাইরে বাবা তোমার প্রতি রাগ বা অসন্তুষ্টি দেখালেও ভিতরে ভিতরে তিনি তোমাকে খুব পছন্দ করেন৷ আজ যেভাবে বুক ফুলিয়ে তোমার প্রশংসা করলেন আমার কাছে, মনে হচ্ছিলো গর্বে তার বুক ভরে যাচ্ছে। সাথে সাথে আমি রিয়াদের পাশে গিয়ে বসে ওর একটা হাত জড়িয়ে ধরে ওর কাঁধের উপর মাথা রাখলাম।
রিয়াদকে বাসে উঠিয়ে দিয়ে স্টেশনে থেকে বাসে করে বাসায় ফিরছি। রিয়াদ বলেছিলো সি.এন.জি ধরে চলে যেতে। কিন্তু আমার বাসে চড়তে ইচ্ছে করছিলো। তৃতীয় সারির মহিলা সিটে জানালার পাশে বসেছি। আজকের ওয়েদার ভালো। রোদ নেই আবার আকাশ মেঘলাও না। রিয়াদকে মিস করতে করতে সিটে হেলান দিয়ে আনমনে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম, আমার পাশে বসে থাকা বোরখা পরা মেয়েটা একটু পরপর নড়ে উঠছে। মনে হচ্ছে ওর খুব অস্বস্তি লাগছে। আমি নিচু স্বরে প্রশ্ন করলাম,
– কোনো সমস্যা? মেয়েটা আরো নিচু গলায় মিনমিন করে উত্তর দিলো,
– পেছনের লোকটা বারবার সিটের ফাঁক দিয়ে আমার বুকে হাত দিচ্ছে৷ আড়চোখে লক্ষ্য করে দেখলাম ঘটনা সত্যি। মাথা গরম হয়ে গেল আমার। লাফ দিয়ে সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম৷ তারপরের ২০মিনিট সময় ছিল পেছনের মাঝবয়সী জানোয়ারটার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর ২০মিনিট। নিজে তো মেরেছি, মেরেছি। সাথে পাবলিকদের দিয়েও মার খাইয়েছি। জানোয়ারটাকে আধমরা অবস্থায় বাস থেকে নামিয়ে দেয়া হল। মেয়েটার মুখটা নিকাব দিয়ে ঢাকা ছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর নিকাব খুলে মেয়েটা হাসিমুখে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
– বাহ্ আপু, আপনার তো হেব্বি সাহস!
মেয়েটার সাথে কথা বলে জানতে পারলাম, ও আমাদের পাড়াতেই থাকে। এমনকি আমাদের বিল্ডিং এর ছয়তলায়! গতমাসে এসেছে বলে তেমন করে কারো সাথে পরিচয় হয় নি। ওর নাম ইরা। আর আমি চারতলায় থাকি বলার পর বেশ ভাব হয়ে গেল আমাদের মধ্যে। জ্যামের কারণে বাসায় ফিরতে দেরি হয়ে গিয়েছিলো। বাস থেকে নেমে ইরা আর আমি একসাথেই ফিরছিলাম। ইরা ছয়তলায় উঠে যেতে নিচ্ছিলো। থমকে দাঁড়ালো আমার বাসার ভেতরের কোলাহল শুনে। সদর দরজার কাছে যেতেই দেখি, দরজা খোলা। ভেতর থেকে কোলাহল শোনা যাচ্ছে। আতংকিত হয়ে পড়লাম৷ বাবা মা’র কিছু হয় নি তো? দ্রুত পায়ে বাসার ভেতরে ঢুকলাম। আমার পিছু পিছু ইরাও ঢুকলো। পাড়ার প্রায় সব মহিলারাই একত্রে জড় হয়েছে এখানে। আমাকে দেখে এক মহিলা গলা উঁচিয়ে বলতে লাগলো,
– এই যে সর্বনাশী নষ্ট মেয়েছেলে কোথাকার, দেখো আমার হাজবেন্ডের কি অবস্থা করেছো তুমি? ও তোমার কি ক্ষতি করেছিলো? পাবলিক বাসে পুরুষ সিটে বসতে দিয়ে বেলাল্লাপনা করতে দেয় নি তোমাকে, এই তো? সেজন্য তুমি ওকে এভাবে মারবে? ছিঃ ছিঃ ছিঃ। মহিলার হাজবেন্ডকে দেখার উদ্দেশ্যে ঘাড় ঘুরাতেই দেখতে পেলাম বাসের সেই আধমরা জানোয়ারটাকে৷ এ যে এ পাড়ায় থাকে জানতাম না৷ জানলে আরো দু’একটা চড় বেশি দিতাম। কিন্তু ও আমাকে নিশ্চয়ই চিনে। পাড়ার বাজারে দেখেছে হয়তো। নাহলে বউকে দিয়ে নালিশ জানাতে চলে আসতো না। আমি কিছু বলার আগেই অমি’র আম্মু বলে উঠলো,
– ভাবী তো জানেন না, এই মেয়ে অনেক উশৃঙ্খল, বদমেজাজি। নিজেকে যে কি ভাবে! ওর দ্বারা কিছুই অসম্ভব না।
পাশ ফিরে দেখি, আমার শ্বশুর শাশুড়ি অসহায় মুখ করে বসে আছেন। আমি বলতে নিলাম,
– শুনুন, আপনারা আমাকে ভুল বুঝছেন। আপনার হাজবেন্ড বাসে একটা মেয়েকে…
– বাহ্, এরই মধ্যে গল্প বানানোও হয়ে গেছে দেখছি! আমি আর একটা কথাও শুনবো না। পুলিশে দিবো তোমাকে। কমপ্লেইন করবো থানায়।
থানা-পুলিশের নাম শুনেই ইরা আমার পাশ থেকে পিছিয়ে গিয়ে ওদের দলে ভীড়ে গেল। উপস্থিত সবাই আমার নামে একটার পর একটা বাজে বানোয়াট কথা বলে যাচ্ছে। আর আমি কোনো প্রতিবাদ করতে পারছি না। ইরার নির্লিপ্ততা দেখে আজ কেন জানি প্রতিবাদ করতে ইচ্ছেই করছে না। আমার শ্বশুর আমার হয়ে সবার কাছে মাফ চাইলেন। আর অনুরোধ করলেন, থানা-পুলিশ না করতে। কিন্তু তারা এতটুকুতেই ক্ষান্ত হল না। আমাকে দিয়েও মাফ চাওয়ালো জানোয়ারটার কাছে। ইরা তখনো নিশ্চুপ! সবাই যার যার মত কথা শুনিয়ে, ধিক্কার জানিয়ে চলে যাওয়ার পর আমাকে উদ্দেশ্য করে বাবা শুধু বললেন,
– তোমাকে আসলে বেশি প্রশ্রয় দিয়ে ফেলেছিলাম। যার শাস্তি এখন ভোগ করছি। আর আমি? আমার তখন কোনো অনুভূতিশক্তি ছিল না। এতক্ষণ ধরে যা চলেছে এখানে, এসবই আমার কাছে দুঃস্বপ্ন মনে হচ্ছিলো শুধু।
পরদিন সকালেই আমরা এ বাড়ি ছেড়ে, এ পাড়া ছেড়ে চলে গেলাম। তৎক্ষণাত নতুন বাসার ব্যবস্থা করা যায় নি বলে কয়েকদিনের জন্য আমার ননদের বাসায় গিয়ে উঠলাম। ওখানে শুধু আমার ননদ আর ওর হাজবেন্ড থাকে। তারা অত্যন্ত ভালো মনের মানুষ৷ নতুন বাসা না পাওয়া পর্যন্ত আমরা ওখানেই থাকবো বলে সিদ্ধান্ত হল। সেসময় সবার সাথে সাথে রিয়াদও আমায় ভুল বুঝেছিলো৷ তবে সেটা সাময়িক। ক্রমশ সব স্বাভাবিক হতে থাকলেও সেই কাজীপাড়ার মায়া আমি কিছুতেই ছাড়তে পারছিলাম না। সকালের ব্যস্ত কাঁচাবাজার, দুপুরের পিনপতন নীরবতা, পাড়ার রাস্তায় বিকেলবেলা ছোট ছেলেদের ক্রিকেট খেলার হৈচৈ কিংবা ছাদে পাটি বিছিয়ে বসে রিংকিদের সাথে আড্ডা এসবকিছু যেন আমাকে চুম্বকের মত টানছিলো৷ তারপর থেকে আমি খুব চুপচাপ হয়ে গেলাম। আগের মত চঞ্চলতা কাজ করে না আমার মধ্যে। বাইরের জগতে কম বিচরণ করি বলে বাড়তি ঝামেলাগুলো এড়িয়ে চলা সহজ হয়। ৬ বছর পর… হঠাৎ একদিন টিএসসির মোড়ে সেই ছোট্ট শুভ’র সাথে দেখা। শুভ এখন আর ছোট নেই। চোখে পাওয়ারের চশমা উঠেছে। হালকা দাঁড়ি গজিয়েছে গালে। তবুও আমার ওকে চিনতে অসুবিধে হল না। সামনে গিয়ে “শুভ” বলে ডাকার সাথে সাথে ও বিস্মিত স্বরে বলে উঠলো,
– নাজিফা আপু! কুশলাদি বিনিময় শেষে জানতে চাইলাম,
– কাজীপাড়াতেই আছিস এখনো?
– হ্যাঁ গো৷ আর কোথায় যাব! এ পাড়ার সাথে কতদিনের সম্পর্ক বলো তো। আর শুধু আমি কেন। সবাই আছে। রিংকি, অনি, অমি, তিতলি আপু, মুনা ওরা সবাই কত বড় হয়ে গেছে জানো?
– তা তো হবেই। কতগুলো বছর পেরিয়ে গেল। তা পাড়ার সবাই ভালো আছে? শুভ একগাল হেসে বলে,
– ভালো আছে কি বলছো! বলো, জমিয়ে আছে। তুমি চলে আসার পর কিচ্ছু পরিবর্তন হয় নি। বলা ভালো, তিতলি আপুরাই পরিবর্তন হতে দেয় নি। পাড়ায় এখনো কোনো বখাটে আসতে পারে না। কার ভয়ে জানো? তিতলি আপুর ভয়ে। আর অমি তো ক্যারাটেতে ভর্তি হয়েছে৷ পাড়ার সব ছেলেরা ওকে ভয় পায়। ওদিকে উল্টাপাল্টা কিছু দেখলেই অনি ছুটে যায় সেখানে। পরিস্থিতি এমন যে, মেয়েরাই মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। আমাদের ধার ধারছে না।
আমি কিছু একটা ভাবলাম। তারপর ঠোঁট চেপে হেসে শুভকে জিজ্ঞেস করলাম,
– ফুচকা খাবি?
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত