বড় পাপ হে

বড় পাপ হে
অবশেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা নিয়ে নিলাম। মিলিকে খুন করার সিদ্ধান্ত। প্রতিদিন ঝগড়াফ্যাসাদ কখনো হাতাহাতি, মাসের দশ-পনের দিনই কথা বলা বন্ধ–এসব আর ভাল লাগছিল না । এভাবে কোন সংসার চলতে পারে না।
তিন বছরের সম্পর্কের পর আমরা পালিয়ে বিয়ে করি। মিলি সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ে। আর আমি গ্রামের সাধারন ছেলে। মরে গেলেও মিলির বাবা বিয়েতে রাজি নয়। শেষে আমরা পালিয়ে বিয়ে করি। মাত্র দু’বছরের সংসার আমাদের। এরই মধ্যে আমাদের মাঝে প্রচন্ড দূরত্ব,তিক্ততা তৈরি হয়ে গেছে। বিয়ের আগে যে আমরা একদিনের জন্যও পরস্পরকে না দেখে থাকতে পারতাম না আর এখন কেউ কারো ছায়া পর্যন্ত সহ্য করতে পারি না। বিয়ের আগে যেগুলো গুন মনে হত এখন সেগুলো দোষ মনে হয়। ওর রুচির সাথে কোন কিছু না গেলেই সারাক্ষণ বলে আমি নাকি একটা গেয়ো ভুত। ওকে– ভুত আর মানুষের মধ্যে কোন সংসার হতে পারে না। তাই অনেক ভেবে চিন্তে এই সিদ্ধান্তটা নিতে হল। চাইলেই আমি ডিভোর্সে যেতে পারতাম। কিন্তু যাব না। অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার পর ওকে আমি পেয়েছি। ও অন্যকারো হোক আমি তা চাইনা। হয় আমাকে ভালবাসো, নয় আমার হাতে মরো।
গত এক সপ্তাহ ধরে মিলিকে খুন করার ছক কেটেছি। এটাকে ঠিক খুন বলা যাবেনা। ইন্ডারেক হত্যাকান্ড। কাজটা করতে হবে খুব ঠাণ্ডা মাথায়। যাতে কেউ ঘুণাক্ষরেও বুঝতে না পারে। কারন স্ত্রী খুন হলে প্রাইম সাসপেক্ট হয় স্বামী।
বিয়ের পর আমরা মাত্র একবারই কক্সবাজার হানিমুনে গিয়েছিলাম। অনেক দিন থেকেই মিলি ফের কক্সবাজার যাবার জন্য পীড়াপীড়ি করছিল। সময় আর অর্থাভাবে সম্ভব হচ্ছিল না। অনেক ভেবেচিন্তে কক্সবাজারে যাবার সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেললাম। ঘটনা যা ঘটাতে হবে সি বিচেই। সমুদ্রের জলরাশি এসে আছড়ে পরে তীরে। ফেরার সময় যা পায় মুহুর্তে টেনে নিয়ে যায়। কেবল সময়মত ওর হাতটা ছেড়ে দিলেই হল। কেউ কোন রকম সন্দেহ করতে পারবে না। এক সময় সমুদ্রের কোথাও মিলির মৃত লাশ ভেসে উঠবে। কোস্টগার্ড সেই লাশ উদ্ধার করবে। আর তখনি করতে হবে পারফেক্ট অভিনয়টা। অবশ্য অভিনয়ে আমি বরাবরি ভাল।কারন ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে প্রথম দুবছর মঞ্চনাটকে কাজ করেছি। সবাই বলত আমার অভিনয় দুর্দান্ত। বিভিন্ন ব্যস্থতায় পরে আর মঞ্চনাটকে কাজ করা হয়নি।
পরদিন সন্ধ্যায় যথাসময়ে অফিস থেকে ফিরলাম। রাতে খাবার খেতে খেতে মিলিকে শুনিয়ে বললাম, “শালার এই মুহুর্তে এসব একদম ভাল্লাগে না। এতদিন কক্সবাজার যাওয়ার জন্য কতবার ছুটি চেয়েছি। কিছুতে দিলনা। অথচ এখন কোম্পানি বলছে বিমানের রিটার্ন টিকেট দিয়ে দিচ্ছি তিনদিনের জন্য ঘুরে আসুন। সাথে অফিসের কাজটাও সেরে আসুন। যত্তসব!” কয়দিন থেকেই রাতে মিলি আমার সাথে ঘুমায় না। আমি খাটে শুলে ও ফ্লোরে শোয়। আমি ফ্লোরে গেলে ও খাটে যায়। আজ মধ্যে রাতে হটাত মিলির অস্তিত্ব টের পেলাম। চুলে আঙ্গুল ঢুকিয়ে পুরাতন কায়দায় আদর করতে করতে বলল,
“তুমি কি সত্যি কক্সবাজার যাচ্ছ?” আমি অভিমানে চুপ থাকি।
“বিমানে যাচ্ছ?”
“হুম।”
“আমি কি সঙ্গে যেতে পারব ?”
“হুম।”
“ওয়াও! বিমানে জার্নি। দারুন এক্সসাইটিং একটা জার্নি হবে।.. একটা কথা বলব?”
“হুম।”
“যাওয়ার আগে চলো একবার বাবা-মার সাথে দেখা করে যাই।”
যদি ওর বা-মা আমাকে পছন্দ করেনা। কিন্তু এটাই হতে পারে ওর বাবা-মার সাথে শেষ দেখা। বললাম, ” আচ্ছা। “
কক্সবাজার যাওয়ার আনন্দে সে রাতে মিলি আমার উপর ঝাপিয়ে পরল। পরদিন সন্ধ্যায় বাজারে যত ধরনের ফল পেলাম সবই নিলাম। শশুড়-শাশুড়ির জন্য পাঞ্জাবি,শাড়ি কিনলাম। একমাত্র শালার জন্য দুটো টি শার্ট নিলাম। আমি চাই সবার কাছে সন্দেহের উর্ধে থাকতে। বাড়িতে ঢোকেই শাশুড়ি মাকে সালাম করলাম। বিমানে কক্সবাজার যাচ্ছি শোনে উনার চেহারায় হাস্যেজ্জ্বল ভাব লক্ষ্য করলাম।
মিলি আমাকে ওর বাবার ঘরে নিয়ে গেল। ওর বাবা স্ট্রোকের রুগী। ডান হাত-পা প্যারালাইজড। দু’বছর ধরে বিছানায় পরে আছে। মিলির মা ওর বাবাকে ডাকল, ” শুনছ মিলিরা পরশু বিমানে কক্সবাজার যাচ্ছে। তোমাকে বলতে এসছে-” মিলির বাবা যে আমাকে পছন্দ করেনা সেটা আরেকবার প্রমাণ করল। আমাকে একবার অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আবার চোখ বন্ধ করে ফেলল।তারপর পাশ ফিরে শোল। আমি তার পা ছুয়ে সালাম করলাম। মিলি চিৎকার করে বলল, “তুমি কি বোকা নাকি?বাবার ডান পা প্যারালাইজড না? ” তাইত! আমি এবার বা’পা ছুয়ে সালাম করলাম। খেয়েদেয়ে গল্প করে সেদিন প্রায় রাত বারোটায় বাসায় ফিরলাম। মিলিকে খুব ফুরফুরে লাগছিল। মৃত্যর আগে ফুরফুরে থাকাটা বড় জরুরি।
দু’দিন পর বিমানে যথাসময়ে কক্সবাজার পৌঁছলাম। মিলির খুব আক্ষেপ হচ্ছিল বিমান জার্নিটা এত ছোট হাওয়ায়।
সমুদ্রের কাছাকাছি আমরা একটা লাক্সারিয়াস হোটেলে উঠলাম। রাতে ওর পছন্দে বুফে খাবার খেলাম। হতে পারে এটাই ওর জীবনের শেষ খাবার। তাই বার বার বললাম, “তুমি চাইলে আরো কিছু খেতে পার।” “ঘটনা কি তুমি দেখি হটাত দিলদরিয়া হয়ে গেলে।” চাপা হেসে বললাম, ” তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে বলো? ” পরদিন দুপুর বারোটার দিকে আমরা সমুদ্র স্নানে বের হলাম। কেন যেন ওর চেহারায় তাকিয়ে খুব মায়া হচ্ছিল। না এই মুহুর্তে কোন রকম দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। আমি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম। সমুদ্রে নেমে মিলির বাঁধভাঙ্গা খুশি লক্ষ্য করলাম । কতক্ষন পর পর মিলি আমাকে জড়িয়ে ধরে সেল্ফি তুলছিল। একটু পর পর একে-ওকে মোবাইল এগিয়ে দিচ্ছিল “এক্সকিউজ মি– কয়েকটি ছবি তুলে দিবেন? প্লিজ আর কয়েকটা।”
সমুদ্রের সফেন ঢেউ তীরে আছড়ে পরে আবার ফিরে যাচ্ছিল। মিলি ঢেউয়ের ফেনা হাত পেতে নিচ্ছিল। কখনো ঝিনুক কুড়োচ্ছিল। কখনো কাকড়াদের পেছন পেছন ছুটছিল। দৌড়ে ওদের ধরার চেষ্টা করছিল। আমিও চাচ্ছিলাম বেচারি মৃত্যর আগে তার জীবনের শেষ ইচ্ছেগুলো পুরন করে নিক। আমি সমুদ্রের তীর থেকে খানিকটা গভীরে এগুতে লাগলাম। মিলিকে উচু গলায় ডাকলাম- “মিলি আসো–” মিলি বলল “ওমা! কি বড় বড় সাংঘাতিক ঢেউ! আমার খুব ভয় করে।” “ভয় কিসের? সমুদ্রের এত শক্তি নাই আমার কাছ থেকে তোমাকে ছিনিয়ে নিবে।” বলেই এগিয়ে এসে ওর হাতটা ধরলাম। তারপর সমুদ্রের তীর থেকে গভীরে এগোতে লাগলাম। পর পর দুটো ঢেউ আছড়ে পরল। দুজন ঝাপটে ধরে এক সাথে বসে পরলাম। ঢেউ আমাদের উপর দিয়ে চলে গেল। মিলি সমুদ্রের খানিকটা লবণাক্ত পানি খেয়ে খুক খুক করে কাশতে লাগল। আদুরে গলায় বললাম, “দ্যাটস নট এ ম্যাটার মাই বেবি।”
আস্তে আস্তে ওকে নিয়ে কোমর পানিতে চলে আসলাম। ভেবে খুব ভাল লাগছিল আমি আমার পরিকল্পনার দ্বারপ্রান্তে।এখন কেবল ওর হাতটা ছেড়ে দিলেই হলো। হটাত খেয়াল করলাম বিশাল একটা ঢেউ ক্ষুধার্ত বাঘের মত ছুটে আসছে। এটাই দারুন সু্যোগ- কেবল ওর হাতটা..কেবল ওর হাতটা এবং তাই করলাম.. তারপর তারপর..আমার আর কিছুই খেয়াল নেই জ্ঞান যখন ফিরল তখন হাসপাতালের বেডে নিজেকে আবিষ্কার করলাম। নড়বার বিন্দুমাত্র শক্তি ছিল না আমার। মাথার উপর স্যালাইন চলছে। ঝাপসা চোখে দেখলাম একজন ডাক্তার একজন নার্স আমার পাশে দাঁড়িয়ে। ডাক্তার বলল,”আপনি কি এখন ঠিক আছেন?” প্রতিউত্তর করার শক্তি ছিলনা আমার। ডাক্তার ফের জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি এখন ঠিক আছেন?” আমি হ্যা সুচক মাথা নাড়লাম। “বুঝিনা শিক্ষিত মানুষ হয়ে আপনারা কিভাবে এমন একটা কাজ করলেন? আরেকটু হলেই মরতে বসেছিলেন। ভাগ্য ভাল কোস্টগার্ড উদ্ধার করতে পেরেছে -তাই বেচে গেছেন।” ততোক্ষনে আমি কিছুটা বোধশক্তি ফিরে পেয়েছি। মিলিকে খোজছিল আমার চোখ। কোথাও ওকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। তার মানে- শি হেজ গন ফরএভার । আমি মনে মনে বললাম, যাক্ গেম ইজ ওভার। শিউর হওয়ার জন্য ডাক্তারকে বললাম, “আমার স্ত্রী কি মারা গেছেন?”
হটাত দরজার কাছে নার্সের গলা শুনলাম, “আপনার হাসব্যন্ডের জ্ঞান ফিরেছে। আপনি ভিতরে আসতে পারেন..”
অমনি আমার চোখ ছানাবড়া। বিধধস্ত, মলিন চেহারা নিয়ে মিলি ভিতরে ঢুকলো। ঢুকেই আমার কপালে পাগলের মত পর পর কয়েকবার চুমু খেয়ে কেদে ফেলল- “কেন তুমি এমন ছেলেমানুষি করতে গেলে,কেন? আজকে তোমার কিছু হয়ে গেলে আমার কি হত? বাবা-মা সবার অবাধ্য হয়ে তোমাকে বিয়ে করেছি। কেন করেছি,শুধু তোমাকে ভালবাসি বলে।” বলতে বলতে মিলি হাউমাউ করে কেদে ফেলল। আমি চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেলাম। আমার সমস্ত আয়োজন ছিল ওকে হত্যা করার। আর ওর সমস্ত চিন্তা আমাক বাঁচিয়ে তুলার। এ যেন রবীন্দ্রনাথের কথার উল্টো – ‘আমি ভাঙ্গি তার ঘর,যে বাধে আমার ঘর।’ কোন বুদ্ধি কাজ করছিল না আমার। ওকে মারতে গিয়ে আমি নিজেই কি মরতে বসে ছিলাম!
নিজেকে আমার অমানুষ মনে হল। জানোয়ার মনে হল। প্রচন্ড ঘৃনায় নিজের প্রতি ধিক্কার আসছিল। এ আমি কি করেছি! কেন আমি এই ভয়ানক খেলা খেলতে গেলাম? ভাবতে ভাবতে আমার চোখ ফেটে পানি বেরোচ্ছিল। নিজেকে আমি সামলাতে পারছিলাম না। মিলি ডান হাতে আমার চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলল, “কেন কান্না করছ? আল্লাহ আমাদের নিশ্চিত মৃত্যর পথ থেকে বাঁচিয়েছেন। আমি আর কখনোই সমুদ্র দেখতে চাইব না। এই তোমার হাত ধরে বলছি।” প্রচন্ড অনুশোচনায় আমি জানলা দিয়ে দূরের আকাশে তাকিয়ে রইলাম । কেবলি মনে হচ্ছিল এ আমার বড় পাপ হে…
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত