আলোকের ঝর্ণাধারা

আলোকের ঝর্ণাধারা
“দাদার চিঠি এলো সকালবেলা। গতরাতে সারারাত কার্ড খেলে আমার চোখদুটো রক্তজবার মতো লাল। চিঠি খুললাম। না, দাদা হুমকি ধামকি দেয়নি। শুধু বুঝিয়েছে। চিঠিজুড়ে মধ্যবিত্ত জীবনের হাহাকার আর আমার অধঃপতনের আসন্ন পরিণতির বর্ননা। এবার পরীক্ষায় ফেল করেছি। দাদার কাছে রিপোর্ট গেছে। মনটা খারাপ হলো আমার। সকালে খাওয়া হলো না। ভাবলাম পড়তে বসি। বই খুলে পাতা উল্টে সব কেমন বিস্বাদ লাগল। কাচা ঘাস চিবুতে যেমন লাগে, ঠিক তেমন। পড়া হলো না। এদিকে আড্ডায় যেতেও পা চলছে না। সুমন, পলাশরা বলে কয়ে নিয়ে গেল। আড্ডা দিলাম, বিস্তর চা সিগারেট চলল। মন ভালো হয়ে গেল। পরের পরীক্ষায় আবার ফেল। আবার দাদার চিঠি। এবারও হুমকি নয়, উপদেশ। এবার অতটা গায়ে মাখলাম না। চিঠি ড্রয়েরে ফেলে রতনের বাইকটা দু’ঘন্টার জন্য ধার করে সদ্য হওয়া প্রেমিকাকে নিয়ে ঘুরতে বের হলাম। দিন কাটতে লাগল এমনি করেই।
দেখতে দেখতে বোর্ড পরীক্ষা চলে এলো৷ মাত্র একটা মাস বাকি। ভয়ে বুক কাঁপে। আড্ডা, সিগারেট, প্রেমিকা কিচ্ছু টানে না। প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষায় পুনরায় আমি অকৃতকার্য! এবার চিঠি নয়, সশরীরে দাদা এলেন। পাশে বসে মাথা হাত বুলিয়ে অনেক কথা বললেন। আমি আবার বইটা খুলে পড়তে বসলাম। এতদিনে জং ধরা মাথা খুলল না সহজে। তবু দাদার জোরে চেষ্টা চালিয়ে গেলান। চার ঘন্টা লাগিয়ে একটা চ্যাপ্টার যখন শেষ করলাম, বহুদিন পর পড়াশুনার তৃপ্তি পেলাম, মনে পড়ল এককালে আমি স্কুলের প্রথম সারির ছাত্র ছিলাম! শুরু করলাম জোরেশোরে প্রস্তুতি। সাথে রইল দাদা। এক মাসে কি আর হয়? দাদা ভরসা দিয়ে গেলেন। আমি চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। রাত জাগতে কষ্ট হয়। আবার মনে হয় দাদা আমার জন্য জেগে আছে। নতুন উদ্যমে তখন পড়ি। সময়ে অসময়ে সিগারেটের তৃষ্ণা পায়। শুধু দাদার মুখ চেয়ে দাঁত কামড়ে পড়ে থাকি।
রেজাল্ট খারাপ হয় না। মোটামুটি ভালোই হয়। এরপর এডমিশন, হায়ার স্টাডিজ…আর ঢিল দেইনি নিজেকে। এই পর্যন্ত আসতে পেরেছি সেজন্যই। সেদিন যদি দাদা না থাকত, স্রোতে ভেসে কোথায় গিয়ে ঠেকতাম, কে জানে!”
মাধুরির কানের কাছ থেকে মুখ সরিয়ে দেখি ও কাঁদছে। ফরসা গায়ের রঙ ওর। লজ্জা পেলে, কাঁদলে চোখেমুখে গোলাপী আভা ছড়িয়ে বেশ লাগে দেখতে! আজই বলছিল, “আলাদা হয়ে যাই। দিদির এত গিন্নিপনা সহ্য হয় না।”
ওকে জানিয়ে দিলাম নিজের ঋণের কথা। তারপর আবার ওর হাত চেপে ধরে বললাম, “তোমাকে বিয়ে করে এনেছি কষ্ট দিতে নয়। চাই না আমার জন্য তুমি কম্প্রোমাইজ করে চলো। তবুও একটু নাহয় ছাড় দিও। আমার বাব মা নেই, দাদাই যে সব। যে বৌদি আমায় সন্তানের মতো মানুষ করেছে, কোনোদিন আমায় ছেড়ে একটা ভালো জিনিস মুখে দেয়নি, সে আমার বউকে কষ্ট দেবে সেটা আমার বিশ্বাস হয় না।”
মাধুরী মেনে নিল৷ ঠিক দুই মাস পর সে জানালো, সে আর পারছে না। এবার একটা বিহিত করতে হয়। আমি মাথা হেট করে দাদাকে কথাটা জানালাম। দাদাকে যেমন কষ্ট দিতে পারি না, অর্ধাঙ্গিনীকেও তো পারি না। দায়িত্ব নিয়েছি যে, তার সুখ দুঃখের খেয়াল রাখব! সে বুঝতে পারছে না, দাদা নিশ্চয়ই বুঝবে! দাদা তেমন কিছু বলল না। ভালো ফ্ল্যাটের সন্ধান দাদাই এনে দিল। আমাদের যাওয়ার দিন ঠিকঠাক হয়ো গেল। বাঁধাছাঁদা শেষ। আমার কয়েক রাত ঘুম হয় না। বুকের ভেতর দলা পাকানো কষ্ট আগ্নেয়গিরির মতো বের হয়ে আসতে চায়। আজ সারারাত বিছানায় গড়াগড়ি খেয়ে ভোরের দিকে চোখদুটো লেগে এসেছিল৷ সেই ঘুম ভাঙতে একেবারে বেলা হয়ে গেল। আমাদের সকাল সকাল বের হওয়ার কথা! লাফিয়ে উঠে বসলাম। দেখি মাধুরী সবুজ রঙের সুন্দর একটা শাড়ি পরেছে। হাতে একগাছা রেশমী চুড়ি।
“এই শাড়িটা…”
“দিদি দিয়েছে।”
“হঠাৎ?”
“বা রে..নতুন জীবন শুরু হচ্ছে, তাই উপহার।”
বেশ ঘুরে ঘুরে শাড়িটা দেখালো আমায়। বাচ্চা মেয়ের মতো হাসছে ও। প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করছে। কিন্তু মন যে ভালো নেই! মাধুরী হাত ধরে টেনে বলল, “ওঠো, স্নান করে নাও জলদি। খিচুড়ি রান্ন হয়েছে। খাবে না?”
“নয়টা বাজে। গাড়ি কি চলে এসেছে?”
“নাহ, সে আর আসবে না।”
“কেন?” ঘরের চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখি পেটমোটা স্যুটকেসগুলোর কয়েকটা নেই।
আমার প্রশ্নের জবাবে সে পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে হাত দিয়ে আমার চোখ ঢেকে বলল, “তুমি তো জানোই আমি একদম বাচ্চা সামলাতে পারি না। দিদি বলেছে, যে আসছে তাকে পেলে বড় করে দেবে৷ এত বড় লোভ কী করে ছাড়ি বলো তো? আর তুমি আমার জন্য এতবড় কম্প্রোমাইজ করছিলে, আর আমি একটু করতে পারব না? নাও এখন উঠে পড়ো তো চটপট!”
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত