কান্নাবতী

কান্নাবতী
ঘরের ভেতর মিমিকে দেখে খানিক টা অবাকই হলাম। কখন এসেছে ও? অবশ্য যে ঘুমে ছিলাম তাতে বোঝার উপায় ছিল না! ইদানিং মরার মত ঘুমাই! ফোনের শব্দও সামান্য টের পাইনা! আমার ঘুম ভেঙেছে দেখে মিমি বলল,
-তুই রাতে দরজা বন্ধ করিস না কেন?
-এমনি মনে ছিল না!
-চুরি হলে বুঝবি? আমি বিছানায় উঠে বসে বললাম,
-ঘরে কি এমন আছে,কি নিবে?
-মোবাইল ল্যাপটপ নিবে,এগুলা কি নেওয়ার মত জিনিষ নয়?
-হ্যাঁ, জিনিষ তো!তুই কেন আসছিস?
-এমনি, তোকে দেখতে আসছি!
টেবিলের উপর রাখা টিফিন ক্যারিয়ার টা আমি এতক্ষন লক্ষ্যই করিনি! মিমি এমনি আসার মেয়ে না! অবশ্যই ও আমার জন্য কিছু নিয়েই আসবে!প্রতিবার এমন টাই হয়! তবে এবার এসেছে ও অনেক দিন বাদে! গতকাল রাতেও মনে হয়েছিল কয়েক দিনের জন্য বাসায় চলে যাই,হোটেলের খাবার খেতে খেতে যেন মুখ বিষিয়ে উঠেছে! অবশ্য মিমিকে বললে একটা ব্যাবস্থা হতো! ও আগেও কয়েক বার আমার জন্য রান্না করে এনেছিল! তবে এখানে ওর আসা একটু ঝামেলারই,এই বাড়ি ওয়ালা জানে মিমি আমার হবু বউ! এই বাসায় বান্ধুবী নিয়ে আসা নিষেধ! বাড়ি ওয়ালাকে অনেক কষ্টেই ম্যানেজ করেছিলাম,বলেছিলাম জব পাচ্ছিনা বলেই বিয়ে করছিনা! এই ঝামেলা গুলোর কারণেই মিমিকে বলিনি,তবে ও আজ হাজির! আমি ওর স্বপ্নে গিয়েছিলাম নাকি কে জানে?
-নিচে বাড়িওয়ালা ছিল না?
-ছিল তো!
-কিছু বলে নাই?
-বলছে!
-কি?
-এই যে তুই সারাদিন ঘুমাস তাই বলল!
-হাহাহা, তোকে যে ছেলে দেখতে এলো সেটার কি হলো?
-কাল আসছিল!
-পছন্দ করছে?
-করবেনা কেন?
-তা ঠিক! তুই তো সুন্দরী!
-হুম! যা মুখ ধুয়ে আয়! খাবার গরম করছি!
ফ্রেশ হয়ে ঘরে এসে দেখি সব কিছু রেডি! শুধু যে খাবার রেডী তা না। ঘর ও রেডী! কাপড় চোপড় বিছানা সব গোছানো! মিমি আসলে প্রতিবারই এমন করে! মিমির মতে এমন ঘরে মোটেও মানুষ থাকতে পারেনা। আমি মাননুষ না অন্য কিছু এ ব্যাপারে মিমির দ্বিধা আছে! খাবার থেকে বেশ ভাল গন্ধ আসছে!প্রথমে মনে হয়েছিল এগুলো গত রাত্রের! হয়ত মিমি আমার জন্য কিছু বাঁচিয়ে রেখেছিল! তবে গন্ধ শুনে ফ্রেশই মনে হচ্ছে! তবুও মজা করে বললাম,
-এগুলা কি কালকের বেঁচে যাওয়া খাবার?
-তোর কি মনে হয়?
-পজিটিভ কিছুই মনে হচ্ছে!
কালকে যেগুলা তোর বর খেতে পারেনি সেগুলাই আমার জন্য আনছিস! মিমি আমার কথা শুনে কেঁদে ফেললো! হুট করেই যেন ও কেঁদে উঠলো! আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই! কি করবো বুঝলাম না, ব্যাপার টা পুরো বাজে দেখাচ্ছিল! আমি মোটেই এমন কিছু চাইনি বা এমন কিছু হলে এমন টা বলতামই না! মিমি খানিক টা কান্না থামিয়ে দিয়ে বলল,
-রোস্ট শুধু কাল রাত্রের! তাছাড়া সব আমি মাত্র রান্না করে আনছি!
-আচ্ছা,
-তুই এমন কিছু বলবি ভাবতে পারিনি!
-তুই এমন ভাবে কান্না করবি আমিও ভাবিনি!
মিমি চুপ করে খাবার বাড়তে লাগলো! এই মেয়েটাকে মাঝেই মাঝেই অদ্ভুত লাগে! মাঝে মাঝে সে কতই অদ্ভুত কান্ড করে! আমার জীবনের কিছু অদ্ভুত কর্মকান্ডে মিমি জড়িত আছে! সেবার তৃষার সাথে আমার প্রেম টা হয়েই গেছিল,সেটা শুনেই মিমি না না করতে লাগলো! আমি ওর মতের বাইরেই গেলাম! তখনি শুরু ওর কান্না কাঁটি! শোনা গেল এ কারণে ও নাকি খাওয়া দাওয়াও ছেড়ে দিয়েছে! নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে তৃষাকে না বলতে হলো। পরে গিয়ে যখন মিমি কে জিজ্ঞেস করলাম,
-,ও এমন করলো কেন?
ও আমাকে পছন্দ করে কিনা? তখন আবার মিমি হেসে উড়িয়ে দিল। হাসতে হাসতে সে জানালো,ওই মেয়ে খারাপ ছিল! তাই এমন করছে! ভাল একটা মেয়ে মিমিই আমার জন্য খুঁজে দিবে! তবে সেই দিন এখনো আসেনি!হয়ত মিমি এখনো খুঁজছে! আমার জন্য খুঁজতে গিয়ে কবে যে ওর নিজেরই বিয়ে হয়ে যায় কে জানে? সব চাইতে বেশি ভাল লাগলো মুরগীর রোস্ট টাই। একবার বলতে চাইলাম, কিন্তু বলা হলো না। পরে আবার কান্না কাঁটি শুরু করুক! খাবার খেতে এতই মনোযোগী ছিলাম যে মিমির দিকে একবারো তাকাইনি! একবার মনে হলো,ওকেও খেতে বলি! যখনি মুখ তুলে তাকিয়েছি দেখি ও কাঁদছে! মিমি যে কাঁদছে আমি টেরই পাইনি, আগে তো শব্দ করে কাঁদতো এখন সে কাঁদে নিঃশব্দে। এই মেয়ে এত কিভাবে কাঁদে মাথায় আসেনা! ভার্সিটি তে ওর নাম ও হয়েছিল কান্নাবতী!সেই নামের মান সে এখনো রেখে যাচ্ছে! খাওয়া থামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
-তুই আবার কাঁদছিস কেন?
-তোর খাওয়া দেখে!
-আগেও তো দেখতি!
-আর দেখতে পারব না তাই!
-মানে!
-আমার বিয়ে জলদিই ঠিক হবে! তারপর আর তোকে খাওয়াতে পারব না!
-সমস্যা নাই,ভাবতেছি বাসায় চলে যাবো। তোকে এতো চিন্তা করতে হবেনা! কান্না বন্ধ কর তো! ভাল্লাগেনা! মিমির কান্না বন্ধ হলো না। উলটা নিঃশব্দের কান্নার সাথে শব্দ জুড়ে গেল! আমি আশ্চর্য হলাম। কান্না কাঁটিতে কোন পুরষ্কার থাকলে নিশ্চয় এই মেয়ে পেয়ে যেতো! আমি আবার বললাম,
-মিমি,চল আমরা বিয়ে করি!
-বাসায় রাজী হবেনা!
-কেন?
-তুই তো কিছুই করিস না!
-তাহলে সারাজীবন এভাবে কান্নাই করবি!
-হুম!
-আচ্ছা, কর! তবে আগের মতো কাঁদ যেন শব্দ না হয় শব্দ হলে খেতে অসুবিধা হয়! মিমির কান্নার শব্দ আরো বেড়ে গেলো। এবার খুব বিরক্ত লাগলো আমার!খাওয়াও যাচ্ছিল না ঠিকমত! আমি বিরক্ত হয়ে বললাম,
-একটা কলেজে জয়েন করার কথা আছে কাল, ভাবছিলাম করব না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে করতেই হবে!
-মানে? আমি বালিশের নিচে থেকে কলেজের জয়েনিং লেটার টা বের করে মিমির হাতে দিলাম! কিছুক্ষনের জন্য ওর কান্না বন্ধ হলো! আমি দ্রুত খাওয়া শেষ করতে লাগলাম।আমি জানি কিছুক্ষন বাদে ওর কান্না আবার শুরু হবে! খাওয়া শেষ হতেই আমি বললাম,
-আমি ঘুমাবো, তুই এখন মোটেও কাঁদবিনা! এমন ছিঁচ কাঁদুনে মেয়ে আমি মোটেও বিয়ে করব না। আমি জানি এতে কোন লাভ হবেনা! মিমি আবার কাঁদবে, এবার খুব জোরে শব্দ করে কাঁদবে! আমি কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম।এই মেয়ের কান্না আমার মোটেও ভাল লাগে না।আমি নিশ্চিত করতে চাই এটাই ওর জীবনের শেষ কান্না হোক! ভবিষ্যৎকালে আমি কখনোই ওকে কাঁদতে দিবো না,আমার জন্য যতটুকু কান্না করার ছিল তার চাইতে এই মেয়ে অধিক কেঁদে ফেলেছে, আর নয়!
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত