দুঃখ অতঃপর

দুঃখ অতঃপর
আজ আমার গার্লফ্রেন্ডের বিয়ে! ওহ ভুল বলা হলো, বলতে হবে প্রাক্তনের বিয়ে ৷ তার বাসা আর আমার বাসা কাছাকাছি ৷ একটি রাস্তার ব্যবধান মাত্র ৷ আমার রুম থেকে প্রাক্তনের বিয়ের অনুষ্ঠানের আভাস পাওয়া যাচ্ছে ৷ ডিজে গান ভেসে আসছে আমার কানে, এটা আমাকে কষ্ট দিচ্ছে, কতটা কষ্ট তা বর্ণনা করার মত নয় ৷ লোকজনের হৈ-হুল্লোর, উচ্ছ্বাস- উদ্দীপনা ও বিয়ের অন্যরকম আমেজ আমাকে উত্তপ্ত অগ্নিতে দহন করছে ৷ আমার প্রাক্তন বউ সেজে ফেসবুক আইডিতে তার হাসি-খুশিময় পিকচারগুলো ইতোঃমধ্যেই আপলোড করেছে ৷ পিকচার দেখে বুঝতে পারছি যে সে বেশ আনন্দেই আছে ৷ তার সুখানন্দে থাকারই কথা ৷ যে মানুষটি দীর্ঘ ৩টা বছর ধরে সম্পর্ক করে একনিমিষে আমাকে ভুলে গেলো বিসিএস ক্যাডার পাত্রের কারণে, সে সুখে থাকবেনা তো কে থাকবে? কতই না কষ্ট পেয়েছিলাম যেদিন হিমা ব্রেকআপ করে চলে গেলো ৷ আকুতি, মিনতি,হাতজোর করা সত্বেও তাকে ফিরাতে পারিনি৷ শুধু যে আকুতি মিনতি ভালোবাসার ভিক্ষা চেয়েছিলাম তা নয়, তার পা পর্যন্ত ধরেছিলাম যাতে আমাকে ছেড়ে না যায়৷
পুরুষ মানুষের চোখের পানি সহজে ঝরেনা অধিক শোক না পাওয়া পর্যন্ত, আমি সেদিন অধিক শোকই পেয়েছিলাম ৷ অথচ সেটা হিমার নজরে পরেনি ৷ হিমাকে হারাতে যাচ্ছি বুঝার পর থেকে অঝোর ধারায় কান্না শুরু করেছিলাম এবং কেঁদে কেঁদে তাকে বুঝানোর চেষ্টা করেছিলাম যে আমি তাকে ঠিক কতটা ভালোবাসি! তাকে ছাড়া আমি কতটা অসহায় ও অস্তিত্বহীন! হিমাকে সঙ্গে নিয়ে সারাজীবন কাটাতে চাই এই চাওয়াটা সেদিন নিছক তুচ্ছ আবদার মনে হয়েছিলো তার নিকট ৷ তাকে হারাতে চাইনা, তাকে আগের মত করে পেতে চাই,এই আবদার ও আমার আর্তনাত আহাজারী সেদিন তার থেকে অপমানিত হয়েছিলো ৷ চোখ বিদীর্ণকর অজস্র অশ্রুজলের ক্ষুদ্র বিন্দুকণাকেও হিমা এতোটুকু মূল্য দেয়নি ৷ আমাকে আগাছা মনে করে পা-পিষ্ট করে চলে গিয়েছিলো!
হিমা পরম আনন্দের সহিত তার বিয়ের আয়োজনের প্রতিটা মুহূর্ত উদযাপন করলেও আমি আমার রুমের এককোণে জুবুথুব হয়ে বসে আছি ৷ বিষন্নতায় ঘেরা ও বিষাদে ভরা মন নিয়ে কপাল চাপড়াচ্ছি ৷ চোখের জল গড়গড়িয়ে পরছে ৷ কষ্টের মাত্রা এতোটাই যে চোখদ্বয় পারছেনা অশ্রু বিয়োগ না করে থাকতে! জগতের প্রতিটি ভালোবাসা পাগল মানুষটি জানে প্রেমিকার বিয়ে হবার সংবাদ কতটা বেদনাদায়ক! প্রতি মুহূর্তে মরন হয় প্রাক্তনের বিয়ে হচ্ছে কথাটি শোনার পর থেকে! আমিও বারংবার মরছি আবার জীবিত হচ্ছি শুধুমাত্র কষ্টগুলো উপভোগ করতে ৷ প্রেম করার আসল স্বাদটা আজ থেকে পাবো আমি, তাই কষ্টকে আপন করে নিতেই হবে!
হিমা বরের সঙ্গে ছোট্ট একটি কাপল ড্যান্সে যোগ দিবে— এটা সে ফেসবুকে পোস্ট করে দিয়েছে অনেক আগে! তার বিয়ের সবকিছু ভিডিও আকারে ধারণ হবে ৷ বরযাত্রী এখনো আসেনি ৷ বর আসলে হয়তো হিমার বিয়ের অনুষ্ঠানের মূল পর্ব শুরু হবে! আমার পক্ষে সম্ভব নয় হিমার বিয়ের অনুষ্ঠানের কোনো ভিডিও দেখা ৷ দেখতে গেলে নিশ্চিত জানপাখিটা আমার দেহ ছেড়ে চলে যাবে ৷ ভাঙ্গা হ্নদয় ও সীমাহীন কষ্ট বুকে জমা রেখে প্রাক্তনের বিয়ের অনুষ্ঠান দেখবো এমন ধৈর্য্যশক্তি কই পাবো? বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে চোখের জল নির্গত করছি আর ঘুমকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি ৷ হয়তো ঘুমিয়ে গেলে জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত পার করতে পারবো ৷ কিন্তু ঘুম কি এত সহজে আসবে? মনে হয়না!
ঘুমের ট্যাবলেট খেতে হলো! নির্দিষ্ট সময় পর ঘুম আমাকে তার বুকের জমিনে আঁকড়ে নিলো ৷ শীতল পরশ পেলাম যেনো ৷ ঘুমে কাতর হয়ে গেলাম! ঘুম ভাঙ্গার পর ফোন খুঁজতে লাগলাম ৷ ফোন বন্ধ হয়ে আছে ৷ ফোনটা অন করার পর স্কিনে নজর পরতেই দেখি সকাল ১০টা বেজে গেছে ৷ হায় আল্লাহ! তারমানে পুরো ১৩ ঘন্টা ঘুমিয়েছি? রাতের খাবারও খাইনি ৷ একসাথে দুটা হাই-পাওয়ারের ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে এই অবস্থা! কেন যেনো মনে হচ্ছিল বিশেষ কিছু একটা ভুলে গেছি আমি ৷ তবে, আমার প্রতিদিন সকালের রুটিনটা মনে আছে ৷ ঘুম থেকে জেগে হিমাকে ফোন দিই আমি ৷ আজকেও হিমাকে ফোন দিলাম ৷ দু-বার রিং হবার পর অকস্মাৎ মনে পরলো হিমা ও আমার মধ্যকার বর্তমান রিলেশনের কথা ৷ বুকটা ধারাক করে উঠলো ৷
একরাত্রের ঘুমে আমি অনেককিছু সাময়িক সময়ের জন্য ভুলে গিয়েছিলাম, তবে এখন মনে পরছে ৷ হিমার সঙ্গে আমার তো আর সম্পর্ক নেই, গতরাতে তার বিয়ে হচ্ছিল এবং সম্পন্ন হয়েও গেছে ৷ অথচ এটা আমার মাথাতেই ছিলোনা ৷ মনে পরতেই কষ্টে বুকটা ফেঁটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে ৷ যেনো রক্তক্ষরণ হচ্ছে আমার ৷ দম নিতে পারছিনা ঠিকভাবে ৷ কিছু করার নেই আর, কষ্ট পাওয়া ছাড়া ৷ হঠাৎ খেয়াল হলো আমি তো হিমাকে ফোন দিয়েছি ৷ স্কিনে নজর দিয়ে দেখি ফোন রিসিভ করেনি সে ৷ ধাঁই করে মনে পরলো হিমা তো আমার নম্বর ব্লকলিস্টে রেখেছিলো ৷ তাকে ফোন দিতে পারতাম না ৷ কিন্তু আজকে কল রিং হচ্ছে কেন? তারমানে হিমা আমাকে আনব্লক করেছে? কিন্তু কেন? কিসের কারণে? সেটা জেনে আর কি হবে? আর হিমাকে ফোনই বা দিচ্ছি কেন? সে তো এখন অন্যজনের স্ত্রী ৷ আমার সঙ্গে তো হিমার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে, কিচ্ছু নেই আমাদের মধ্যে ৷ তাকে নিয়ে এতোকিছু ভেবে আর কি হবে?
মন থেকে মুছে ফেলতে পারবোনা তাকে এটা সত্য ৷ কিন্তু বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে ৷ জগতের অনেকেই ভালোবাসার মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পায়না, এরমানে এই নয় যে তারা সকলেই ছন্নছাড়া জীবন বেছে নিয়েছে, তারা অবশ্যই অতীত ভুলে সামনের দিকে এগিয়ে গেছে ৷ আমাকেও সেটাই করতে হবে ৷ যে আমার নয়, তাকে নিয়ে চিন্তা করে কখনই সে আমার হবেনা ৷ তাকে নিয়ে চিন্তা করে নিজের সময়কে নষ্ট করে ব্যক্তিত্বের পরিচয় ধারণ করা সম্ভব নয় ৷ তারচেয়ে উত্তম হবে অন্য কাউকে নিয়ে ভাবা ৷ যে হবে সামনের দিনের পথচলার সঙ্গী ৷ মনে মনে সিদ্ধান্ত নেওয়া শেষ ৷ শাওয়ার নিয়ে, রেডি হয়ে বের হলাম বাসা থেকে ৷ নিজস্ব গাড়ি থাকায় চললাম গন্তব্যের দিকে ৷ আমার ছোট মামার বাসাতে গিয়ে উঠলাম ৷ ৪ ঘন্টা জার্নি করার পর ক্লান্ত হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম!
মামার বাসাতে থেকে নিজের অনলাইন বিজনেসের কাজটা করে যেতে লাগলাম ৷ এভাবে দেখতে দেখতে কয়েক মাস কেটে গেলো ৷ মামাকে নিজেই বললাম আমার জন্য পাত্রী দেখো ৷ মামা ঘটকের নিকট দায়িত্ব দিলো!
পনের দিন পর,
পাত্রী দেখতে আসছি ৷ পাত্রীর নাম রুমালী ৷ উচ্চবিত্ত ও অভিজাত পরিবারের এই মেয়ের সঙ্গে বিয়ের কথা চলছিলো এতোদিন ৷ পাত্রীর বাসায় এসে এটার চাক্ষুস প্রমাণ পেলাম ৷ পাত্রীকে এখনো দেখা হয়নি ৷ আমি, মামী মামা ও ঘটক সাহেব বসে আছি ৷ অকস্মাৎ, যা দেখতে পেলাম সেটার জন্য আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না ৷ বুকটা অস্বাভাবিকভাবে ঝাঁকি মেরে উঠলো ৷ হিমা পাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে ৷ বুঝতে পারছিনা হিমা পাত্রীর কি হয়? তবে ধারণা করতে পারছি যে এই বাড়ির কারো সাথে তার বিয়ে হয়েছে ৷ হিমার দিকে হতভম্বের চোখে তাকিয়ে রইলাম ৷ তবে আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে, চাপা কষ্টও অনুভূত হচ্ছে ৷ হিমার চোখে, মুখে বিষন্নতার ছাঁপ লক্ষ্য করছি ৷ তার এমন অভিব্যক্তির ঠিক কারণ খুঁজে পাচ্ছিনা! সে কি উপলদ্ধি করতে পারছে যে আমাকে ঠকিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করে ভালো কাজ করেনি সে? না কি তার শ্বশুর বাড়ির কারো সঙ্গে আমি সম্পর্ক করতে যাচ্ছি বলে সে মেনে নিতে পারছেনা? কোনটা?
স্বাভাবিক হয়ে পাত্রীর দিকে নজর দিলাম ৷ হ্যাঁ, সে অনেক সুন্দরী ৷ অনিন্দ্য ৷ তবে হিমাকে দেখার পর ভালোলাগাটা আমার হ্নদয়কে স্পর্শ করতে পারলোনা ৷ যদি হিমা এখানে না থাকতো তবে হয়তো পাত্রীকে পছন্দ করে আজকেই বিয়ে করে নিয়ে যেতে পারতাম ৷ বাবা, মা জীবিত নেই বিধায় মামাই বিয়ে দায়িত্বে আছে, আজকে বিয়ের উদ্দেশ্যেই এসেছিলাম ৷ কিন্তু না বিয়েটা সম্ভব না ৷ আমার মন বলছে এই বাসা ছেড়ে চলে যেতে ৷ কিন্তু সেটা করতে পারছিনা ৷ করলে হয়তো ভালোই হতো, কারণ হিমা যেখানে আছে সেই বাসার কাউকে বিয়ে করা সম্ভব না কোনোক্রমে ৷ পাত্রীর মা এবং আমার মামী বলে উঠলো তোমরা চাইলে দুজনে একত্র হয়ে কথা বলতে পারো ৷ যাও তোমরা! বাধ্য হয়ে বাসার ছাদে যেতে হলো ৷ ছাদে গিয়ে দাঁড়াতেই পাত্রী তীক্ষ্ণকন্ঠে বললো,
-সরি ভাইয়া, আমি আপনাকে বিয়ে করতে পারবোনা ৷ আমি খুব ভালো করে জানি যে হিমাকে আপনি ভালোবাসেন ৷ হিমা আমার ফুফাতো বোন ৷ সে আজও আপনার পথ চেয়ে আছে! আঁতকে উঠে তোড়জোর কন্ঠে বললাম,
-হিমা আমাকে এখনো চাই মানে? তার না বিয়ে হয়ে গেছে?
-ভুল জানেন, তার বিয়েটা হয়নি ৷ ভেঙ্গে গেছে ৷ স্তম্ভিত হয়ে কৌতূহলের সুরে জিজ্ঞেসা করলাম,
-কেমনে? কেমনে ভাঙ্গলো বিয়ে? পাত্রী বললো,
-সব বলছি আমি, শুনুন- আমরা এতোবছর কানাডা ছিলাম ৷ হিমার বিয়ের সময়েও কানাডাতে ছিলাম ৷ দেড় মাস হলো দেশে এসেছি শুধুমাত্র আমার বিয়ের জন্য ৷ যেদিন হিমার বিয়ের দিন ছিলো, সেদিন আমি সারাদিন হিমার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি ফোনে ৷ হিমা শুধু বলছিলো তার প্ল্যানটা সফল হবে কি না ৷
-কিসের প্ল্যান?
-বলছি ৷ হিমা অনেক আগে থেকে প্ল্যান করছিলো ৷ তাকে ফুফা ফুফু বিয়ের জন্য জোর দিচ্ছিলো ১বছর ধরে ৷ কিন্তু সে আপনার জন্য বিয়েতে রাজি হয়নি ৷ হিমা ফুফা ফুফুকে আপনার কথা বললে তারা তাকে খুব অপমানকর কথা বলে ৷ হিমা এতে আরো রেগে যায় এবং তার জিদ হয়; বিয়ে না করার জন্য জিদ ধরে ৷ কিন্তু ফুফা ফুফু হাল ছাড়েনা ৷ বিয়ের জন্য জোর দিতে থাকে ৷ যখন তারা বিসিএস ক্যাডার পাত্রের সন্ধান পায় তখন হিমার মতামত ছাড়াই বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করে ফেলে ৷ এবং হিমাকে বিয়ের জন্য আরো জোর দিতে থাকে ৷ হিমার আর সহ্য হয়না ৷ সে সিদ্ধান্ত নেয় এমন কিছু করবে যাতে ফুফা ফুফু লজ্জিত হয় এবং কখনই তারা আর বিয়ের কথা না তোলে ৷ হিমা বিয়েতে মিছামিছি রাজি হয়ে যায় ৷ এবং আপনার সঙ্গে ব্রেকআপের নাটক করে ৷ ব্রেকআপ করার বিশেষ কারণও ছিলো ৷ আপনার ভালোবাসাটা আরো গভীরভাবে পরীক্ষা করে নিয়েছে ব্রেকআপ করে ৷ এটা করার দরকার পরতোনা যদি হিমার বাবা মা বিয়ে ঠিক করে না রাখতো! হিমা শেষ গেমটা খেলেছে বিয়ের দিন বিকেলে ৷ ঐসময় সে বরের সঙ্গে ফোনে কন্টাক্ট করে বলেছিলো,
-আপনি যদি আমাকে বিয়ে করেন তবে কখনই আমার থেকে স্ত্রীর মর্যাদা পাবেন না ৷ এবং পরের দিনই আমি আপনার বাসা থেকে পালিয়ে যাবো ৷ ভাববেন না যে আমি নারী এবং এসব পারবোনা, জি না; এতোটা অবলা নারী আমি নই ৷ আমার যথেষ্ঠ সাহস রয়েছে ৷ আর আমার একজনের সঙ্গে ৩ বছরের সম্পর্ক রয়েছে, মূলত তার জন্যই আমি এই বিয়েটা করতে পারবোনা ৷ আসলে সম্ভবও না তাকে ছাড়া অন্য কাউকে বেছে নেওয়া ৷ এখন আপনি যদি আমাকে একান্তই বিয়ে করতে চান, তবে আসুন ৷ বিয়ে করে নিয়ে যান আমাকে ৷ তবে মনে রাখবেন পাথরের মূর্তি ছাড়া কিছুই নিয়ে যেতে পারবেন না, আমার মন পরে থাকবে অর্ণবের মনের গহীনে ৷ হ্যাঁ, অর্ণব আমার বয়ফ্রেন্ড!
হিমার কাজিন থামলো ৷ আমি তার কথাগুলো শুনে স্তম্ভিত এবং আবেগাপ্লুত! বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে ৷ তবে আনন্দে চোখের কোণে জলধারা এসে গেছে ৷ হিমার কাজিনকে বললাম,
-এরপর কি হলো? জবাবে বললো,
– হিমার সেই হবু বর জানতে চাইলো যে হিমা কেন বিয়ের দিন এতোকিছু জানালো, বিয়ের আগের দিন বললেও তো হতো ৷ তখন হিমার জবাব ছিলো,
-আসলে আমার বাবা, মা আমার বিয়ের জন্য এতোটাই জোর দিচ্ছিলো যে তাদের জব্দ না করে পারছিলাম না ৷ তারা হয়তো ভুলে গিয়েছিলো যে মেয়ের আপত্তি সত্বেও জোরপূর্বক বিয়ের ব্যবস্থা করা আইন বিরোধী কাজ, এটা অধিকার হরন করে ৷ সংসার করতে হবে আমাকে তাহলে আমার অমতে কেন বিয়ে হবে? এই জিনিসটা আমি বাবা, মাকে বুঝাতে পারছিলাম না,তবে আজ রাতে তারা বুঝতে পারবে যখন জানতে পারবে আপনি বিয়েতে আসছেন না ৷ দয়া করে আপনি আমার কথা রাখুন প্লিজ! আপনি অনেক ভালো মেয়ে পাবেন ৷ কিন্তু আমাকে বিয়ে করলে আপনার যেমন জীবন নষ্ট হবে সেইসাথে আমার ও বয়ফ্রেন্ডের জীবনও নষ্ট হবে! রুমালী থামলো! কথার মধ্যে হিমা আমাদের কাছে চলে এলো ৷ সে আমার দিকে এগিয়ে আসলো রাগান্বিত চেহারায় ৷ এবং এসেই আমার বুকে কয়েকটা ঘুষি মারলো মৃদ্যুভাবে ৷ অতঃপর, জরিয়ে ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,
-তোমার এতো সাহস কি করে হলো আমার নম্বর ব্লকলিস্টে রাখার? জানো বিয়ে ভাঙ্গার পর দিন থেকে কতবার ফোন দিয়েছিলাম তোমাকে? ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ফোন দিয়েছি, ফোন বন্ধ ছিলো ৷ এর ১ঘন্টা পর দেখতে পাই তুমি আমার ফোনে কল দিয়েছিলে যখন ফোনটা আমার কাছে ছিলোনা ৷ কিন্তু আমি ফের যখন তোমাকে ফোন দিই তখন দেখি তোমার ফোনে কল যায়না, এরমানে তুমি ব্লক করে রেখেছিলে ৷ কিন্তু কেন? হিমা কথাগুলো বলে আমাকে ছেড়ে দিলো ৷ আমি হিমার দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে চাপা অভিমানের গলায় বললাম,
-তুমি কেন ব্রেকআপ করেছিলে? এবং আমার নম্বরও কেন ব্লকলিস্টে রেখেছিলে?
-কেন এসব করেছিলাম সেসব নিশ্চয় রুমালী তোমাকে বলেছে!
-তুমি আমাকে পুরো বিষয়টা আগে বললেও পারতে ৷ তাহলে আমাকে এতোদিন কষ্টে থাকতে হতোনা ৷
-আমি যেটা করেছি সেটাতে ভুল ছিলোনা ৷ তুমি সাময়িক সময় কষ্ট পেলেও আমি পরিকল্পনায় সফল হয়েছি ৷
যদি তোমার সঙ্গে ব্রেকআপ না করতাম তাহলে তুমি হয়তো বিয়ের দিন উল্টাপাল্টা কিছু ঘটিয়ে ফেলতে, তাছাড়া আমি কোনো কাজ মন দিয়ে করতে পারতাম না ৷ আর তাছাড়া ব্রেকআপ করার পর তোমার ভালোবাসা যাচাই করে নিয়েছি ৷ পরীক্ষায় যদিও তুমি ব্যর্থ, তবে এটাই স্বাভাবিক যে প্রেমিকার বিয়ে হয়ে গেছে জানার পর যে কেউ তাকে ঘৃণা করে অন্যকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিবে ৷ তুমিও সেটাই করেছো, কারণ তুমি তো জানতেনা আমার বিয়ে ভেঙ্গে গিয়েছিলো কি না! আমার বিয়ে হয়ে গেছে ভেবে তুমি আজকে এই পর্যন্ত এসেছো! আমার কষ্ট হচ্ছে এজন্য যে তুমি কেন আমার কোনো যোগাযোগ রাখলেনা?
-আমি আর ঢাকাতে থাকিনা সেটা তুমি হয়তো জানতে ৷ ঢাকাই থাকিনা বলে তোমার দেখা পাইনি ৷ তাছাড়া, তোমার প্রতি ঘৃণা তৈরি হওয়ায় আমি ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, টুইটার ব্যবহার বাদ দিয়েছি, বন্ধুদের সঙ্গেও কন্টাক্ট রাখিনি ৷ শুধুমাত্র ব্যবসার কাজে মনোযোগ ছিলো আমার!
-তো, তুমি কি চাও এখন? রুমালীকে পছন্দ হয়েছে? বিয়ে করতে চাও তাকে? রুমালী ধেয়ে এসে চেঁচিয়ে বললো,
-হিমা আপু, বোকার মত কি কথা বলছো? তোমার জিনিসে আমি ভাগ বসাতে যাবো কোন দুঃখে? তুমি বোধহয় জানোনা আমি সেকেন্ডহ্যান্ড ইউস করিনা! হিমা হেসে উঠলো ৷ পাগল করা হাসি ৷ তার এই ভুবনভুলানো হাসি অনেক দিন পর দেখলাম ৷ তার হাসিটা আমার হ্নদয়ের গহীন কোণে সুখের পরশ বুলিয়ে দিয়ে গেলো ৷ হিমার হাতের কনিষ্ট আঙ্গুলে পরশ বুলিয়ে দিয়ে বললাম,
-তোমাকে ফিরে পাবো, এতদিন স্বপ্নের মত ছিলো এটা ৷ বুঝতে পারছিনা এখনো তোমাকে নিয়ে স্বপ্নের মধ্যে আছি কি না! হিমা আমার হাতের তালুতে জোরেসোরে চিমটি কেটে বললো,
-ব্যথা পেলে? না কি জায়গামত দিবো? আমি খিলখিলিয়ে হেসে উঠলাম ৷ অনেক দিন পর তৃপ্তির হাসি হাসলাম ৷ আমি চাই সারাজীবন এভাবে হাসতে!
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত