প্রাপ্তি

প্রাপ্তি
– ডাক্তার রায়হান কি আছেন?
পাশেই পরিচিত একটা মহিলার গলা শুনে চমকে উঠলাম। এই কণ্ঠটা আমার খুবই পরিচিত যাকে বলে অন্তরের খুব কাছের। মহিলাটিকে দেখার জন্য পাশ ফিরে তাকালাম ,তখনি জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খেলাম। আমার ফেলে আসা অতীত আমার পাশেই দাঁড়ানো। আমাদের শারীরিক দূরত্ব ১ সে.মি. হলেও মনের দূরত্ব কয়েক’শ কিলোমিটারেরও বেশি। কথা বলব কি বলব না এমন একটা দোটানায় পড়ে গেলাম। শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিলাম যা হয় হবে কথা বলি।
“আরে মিলা না? কেমন আছো?” আমার কথা শুনে আমার পাশে থাকা মেয়েটি ফিরে তাকালো। অনেকটা ভূত দেখার মতো মুখের অবয়ব তৈরি করে নিরব কণ্ঠে ছোট্ট করে উত্তর দিল ” ভাল “। কথার মধ্যে কোন প্রাণ নেই ,আসলে আমায় ঠিক এভাবে দেখতে পাবে সেটা হয়তো আশা করে নি। পরিবেশটা এতোক্ষণ জমজমাট ছিল,আসলে হাসপাতালের পরিবেশটা তো সবসময় ভিড় লেগেই থাকবে। আমি নিরবতা ভেঙে বললাম ,”তুমি ও কি ডাক্তার রায়হানের কাছে এসেছো?” মিলা প্রতিউত্তরে জবাব দিল ” হ্যাঁ”। আমি বললাম চলো তবে ওখানটায় গিয়ে বসি। মিলা কোন উত্তর না দিয়ে সোজা হাসপাতালের চেয়ারগুলোর একটাতে গিয়ে বসল। আমি মিলার পাশে গিয়ে বসলাম। দু’জনেই চুপচাপ। হঠাৎ করে মা চলে এলো। এসে বলল,”হ্যাঁ রে তাফসির বৌমা কি ডাক্তারের কাছে গেছে ? কি বলল ডাক্তার ?” কথাটা বলতে বলতে মা আমার পাশে থাকা মিলার দিকে তাকালো। জিঙ্গেস করল ,”মিলা এখানে কেন?”। আমি বললাম ,
-ডাক্তার রায়হানের কাছে এসেছে।
– দেখেছিস তোকে বলেছিলাম না এ মেয়েকে বিয়ে করিস না,
তখন তো তুই প্রথমে মানতে চাস নি পরে অবশ্য ঠিকই বুঝতে পেরেছিস। আমি কোন কথা না বলে চুপ করে রইলাম। মিলা মা’কে সালাম করে জিঙ্গেস করল ” ভাল আছেন আপনি?” মা অপ্রত্যাশিতভাবে উত্তর দিল হ্যাঁ।” তা বাচ্চা হচ্ছে না বুঝি। হবেই কি করে যে বয়স। ভাগ্যিস আমি তাফসিরের বিয়ে দেই নি তোমার সাথে। খুব বাঁচা বেঁচেছি। তা বিয়ে হয়েছে তো ? নাকি কোন ছেলে বয়স বেশি বলে বিয়ে করে নি ?” ডাক্তার রায়হান আমাদের পরিচিত ,আমরা বলে দিল একটু কম ভিজিট নেবে। সাহায্য লাগলে বলো কেমন? মিলা প্রতিউত্তর না করে ,মুচকি হাসলো।
আমি মায়ের কথাগুলোকে ইগনোর করার জন্য বললাম ,” আমরাও এসেছি রিমাকে নিয়ে,ও ছোট তো তাই অল্প কিছু সমস্যা আছে ,ডাক্তার বলেছে ঠিক হয়ে যাবে। ” “ওহ” বলে উত্তর দিল মিলা। আমার খুব খারাপ লাগছিল মিলার জন্য। মিলার সাথে আমার সেই ক্লাশ ৯ থেকে সম্পর্ক। আমি যখন ক্লাশ ৯ এ মিলা তখন ক্লাশ ৮ এ পড়ে। সেই থেকে আমাদের সম্পর্কটা পুরো ৯ বছর চলেছিল। এরপর আমরা আলাদা হয়ে যাই। আমি মিলাকে স্বান্তনা দিলাম ,”চিন্তা করো না সব ঠিক হয়ে যাবে।আমার কথা শুনে মিলা মুচকি হেসে বলল ,”হুম”। এমন সময় একটা নার্স এসে মিলাকে বলল,”ম্যাম নিশাত মামুণিকে নিন ,খুব দুষ্ট হয়েছে। মনে হয় ক্ষুধা লেগেছে ,যাও আম্মুর কাছে যাও। ” মিলা বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে আমার পাশ থেকে উঠে চলে গেলো। বাচ্চাটা খুবই মিষ্টি ,ওর হাসি,চোখ পুরোটা মিলার মতো। নার্সকে ডেকে জিঙ্গেস করলাম ,
-“বাচ্চাটা কার?”
– মিলা ম্যামের।
– নিজের বাচ্চা নাকি দত্তক নিয়েছে?
– দত্তক কেন নেবে ম্যাম এর বাচ্চা।
মেয়ে,নাম নিশাত। খুব মিষ্টি আর দুষ্টু। এই বলে নার্সটা চলে গেল। আমি আর মা একে অপরের দিকে হা করে তাকিয়ে রইলাম।৩ বছর আগের স্মৃতিগুলো মনে পড়ে গেল। যেদিন আমি মিলাকে ত্যাগ করেছিলাম। মা বলেছিল এতো বয়সী মেয়ে বিয়ে করতে হবে না। তোর সাথে যায়না,গায়ের রংটাও চাপা। পরে দেখবি বাচ্চা হবে না। সেদিন মায়ের কথাশুনে আমি মিলাকে ত্যাগ করেছিলাম। আমি যখন অনার্স ৩য় বর্ষে পড়ি তখন মিলা আমাকে বলেছিল “তাফসির বাসা থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। আমি কি করব?” সেদিন আমি বলেছিলাম ” আমার জন্য অপেক্ষা করো প্লিজ।
উত্তরে মিলা বলেছিল অপেক্ষা করার পর মেনে নেবে তো তুমি?তোমার পরিবার মানবে তো?” সেদিন আমি মিলাকে আশ্বাস দিয়েছিলাম। আর্থিক সমস্যার কারণে আমার পড়াশোনা প্রায় বন্ধের পথে। মিলা আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। ওর টিউশনের ৮০% টাকাই আমায় দিত। মাস্টারস শেষ হবারও ২ বছর পর আমি চাকরি পাই। ততোদিনে মিলা প্রায় ৫০ টা প্রোপোজাল রিজেক্ট করেছে শুধুমাত্র আমার জন্য । ভাল বেতনের চাকরি পাওয়ার পর ,আমরা বিয়ে করতে চেয়েছি। কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠে নি। আলাদা হয়ে গেলাম আমি। আমার ভাবনার ছেদ ঘটল মায়ের ডাকে। মা আমায় বলল,” মিলা এখানে কেন? দেখ ওর মেয়েটা কি মিষ্টি। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম মেয়েটির দিকে। এমন সময় মিলার সামনে এসে ডাক্তার রায়হান বলল,
– সরি,সরি মহারাণী। আমার একটু দেরি হয়ে গেল ,রাগ করো না প্লিজ। আমি খানিকটা অবাক হয়ে গেলাম। ডাক্তার
রায়হান কেন মিলার সাথে এমন করে কথা বলছে। মনে হচ্ছে যেন নিজের স্ত্রী আর ভুল করেছে তাই ক্ষমা চাচ্ছে। আমি একটা নার্সকে ডেকে জিঙ্গেস করলাম
– ডাক্তার রায়হানের সাথে মিলার সম্পর্ক কি? আর ডাক্তার কেন এমন করে কথা বলছে ?
– আরে মিলা ম্যাম তো ডাক্তারের স্ত্রী। স্যার খুব ভালবাসে ম্যামকে। খুব সন্মানও করে। আর ওদের মেয়েটা ওদের প্রাণ। ম্যাম খুব ভাগ্যবতী আর স্যারও ভাগ্যবান। আল্লাহ সৃষ্টি করে পাঠিয়েছে এদেরকে একে অপরের জন্য। আজ নিশাত মামুণির ২য় জন্মবার্ষিকী ,তাই বের হচ্ছেন। কথাগুলো শুনে কেন জানি নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে। এই আমি কিনা এই মেয়েটাকে ত্যাগ করেছি । যে আমার জন্য অপেক্ষা করল তাকেই আমি বুড়ি বলে ত্যাগ করলাম ,আমার পাশে বেমানান বলে তাড়িয়ে দিলাম। সেদিন মিলার একটা কথাও শুনি নি বড্ড স্বার্থপর হয়ে গেছিলাম।
” ধন্যবাদ আপনাকে ” একটা পুরুষের কণ্ঠে কথাটা শুনে তাকালাম। তাকিয়ে দেখি ডাক্তার রায়হান হাসিমুখে আমার সামনে দাড়িয়ে আছেন। আমি বললাম ,” আমায় কেন ধন্যবাদ দিচ্ছেন?” । ” আপনি যদি সেদিন এই বুড়িটাকে ত্যাগ না করতেন তবে এতো সুন্দরী আর বুদ্ধিমতী মেয়েটাকে আমার পাওয়া হতো না,আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ” বলে ডাক্তার রায়হান চলে গেল। আমি শুধু দু ‘চোখে তাকিয়ে ওদের চলে যাওয়া দেখলাম। হিসেব করে দেখলাম আমার প্রাপ্তির খাতাটা শূণ্য। নির্বাক আমার মুখে কোন কথা নেই শুধু দু’চোখ বেয়ে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত