মাতৃত্বের প্রতিদান

শুক্রবার, সকাল ১০.০০টা। পঁয়ষট্টি বছরের বৃদ্ধা সালেহা বেগম তার জায়নামাজে বসে ফজরের ক্বাজা নামাজ আদায় করে তাসবিহ গুণছেন। বুড়ো হয়ে গেছেন, এখন আর আগের মতো ভোরে আজানের সময় তাঁর ঘুম ভাঙে না। ঘরে অনেক মানুষ থাকলেও তাঁকে ঘুম থেকে ডেকে তুলবার মতো কেউ নেই। তাই প্রায়ই ক্বাজা নামাজ আদায় করতে হয় তাঁকে। মনে মনে বিড়বিড় করে তাসবিহ গুণছেন আর টের পাচ্ছেন পেটের ভিতর ক্ষুধা বারবার নড়াচড়া করে উঠছে। নাশতার আশায় বসে থেকে লাভ নেই। আজ শুক্রবার, ছুটির দিন। রাকিবের আজ অফিস বন্ধ, রিশার স্কুল ছুটি, বৌমারও আজ সংসারের সব কাজ থেকে ছুটি। তারা তাদের ঘরে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। বেলা ১২.০০টার আগে আজ তাদের ঘুম ভাঙবে না। তখন বৌমা ঘুম থেকে উঠে রান্নাবান্না করতে করতে দুপুর গড়িয়ে বিকাল এনে দিবে। সেই তখন একবারে দুপুরের ভাত খেতে হবে তাঁকে। বুড়ো বয়সে ক্ষুধা সহ্য করা দায়। সালেহা বেগম জায়নামাজ গুটিয়ে তাসবিহ গুছিয়ে খাট থেকে নেমে মেঝেতে উবু হয়ে বসলেন। রোগাক্রান্ত, হাড় জিড়জিড়ে হাত দিয়ে খাটের নিচ থেকে বের করলেন কয়েকটা টিনের কৌটো। কোনো কৌটায় চালভাজা, কোনোটাতে মুড়ি, চিড়া, কিছু শুকনো খাবার সযত্নে রেখে দিয়েছেন তিনি। ক্ষুধা পেলে সেগুলোই পানিতে ভিজিয়ে নয়ত হামানদিস্তায় পিষে গুঁড়ো করে খান। বৃদ্ধবয়সে সব চলে যায়, ছোটবেলার সাথী দাঁতগুলোও যেন নিষ্ঠুরের মতো ছেড়ে চলে যায়। কিছু গুড়-মুড়ি হামানদিস্তায় পিষে দন্তহীন মাঁড়ির মাঝে ফেলে তিনি ভাবতে থাকেন সেই পঁচিশ বছর আগের কথা। ছয় বছরের ছোট্ট রাকিবের কত পছন্দ ছিলো ইলিশ মাছের তরকারি। অথচ সেই অভাবের সংসারে দু’মুঠো ভাতের জোগাড় করাই ছিল কষ্টকর, সেখানে ইলিশ মাছ ছিলো বিলাসিতা। একমাত্র আদুরে ছেলের আবদার শুনে রাকিবের বাবা কত কষ্ট করেই না ইলিশ মাছ আর পোলাওয়ের চাল কিনে এনেছিলেন তা মনে পড়তেই চোখে পানি চলে এলো সালেহার বেগমের। নিজে না খেয়ে সবসময় ছেলের পাতে ভালো খাবারটা তুলে দিয়েছেন। আর সেই একমাত্র ছেলেই এখন তার মা খেয়েছে কিনা তা খোঁজ করার প্রয়োজনও মনে করে না।

গায়ের ছেঁড়া কম্বলটা আরো ভালো করে জড়িয়ে বসলেন সালেহা বেগম। এতোদিন অযত্নে কম্বলটা খাটের নিচে পড়ে থাকায় ইঁদুর খেয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় করে রেখেছে। সেই ফুঁটো দিয়ে হু হু করে বাতাস ঢুকছে। সুঁই-সুতো নিয়ে যে একটু সেলাই করে পড়বেন তার উপায় নেই, বার্ধক্য তার চোখের সূক্ষ্ম শক্তিও কেড়ে নিয়েছে। সুঁইয়ে আর সুতো পরাতে পারেন না, সেলাই করতে গেলে হাত অবিরত কাঁপতে থাকে, অজান্তে গুঁতো লেগে যায় হাতের আঙুলে। একটা ছোট্ট ট্রাংকে একসময় অনেকগুলো কাপড় জমিয়েছিলেন কাঁথা বানাবেন বলে, সেগুলো সেভাবেই পড়ে আছে। একটা সময় ছিলো যখন চোখের দৃষ্টি ভালো ছিলো, কিন্তু পরিধানেরই ভালো কোনো কাপড় ছিলো না। আর এখন অজস্র পুরোনো কাপড় ট্রাংকে পড়ে আছে কিন্তু নেই আগের মতো চোখের দৃষ্টি। গত তিনদিন ধরে প্রচণ্ড জ্বরে ভুগছেন তিনি। ঘনঘন কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসছে। গতরাতে জ্বর বেড়ে বমি হওয়ার উপক্রম। অভুক্ত থেকেই ঘুমিয়েছেন। আজ সকালে শরীরটা ভালোই ছিলো, এখন বুঝি জ্বরটা আবার চড়ছে। কম্বল জড়িয়ে গুঁটিসুটি হয়ে শুয়ে বৃদ্ধা সালেহা বেগম মনে করলেন অতীতের এক রাতের কথা। সেদিন রাতে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছিল। ভাঙা টিনের চালের ফুঁটো দিয়ে ঘরের মেঝেতে টুপটুপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। চার বছরের রাকিব দুইদিনের জ্বরের ঘোরে বিছানায় শুয়ে প্রলাপ বকছিল। সালেহা বেগম পুরো রাত পুত্রের শিয়রের পাশে জেগে মাথার পট্টি পাল্টে দিচ্ছিলেন আর একইসাথে মেঝেতে ছড়িয়ে রাখা পাতিলগুলো বৃষ্টির পানিতে ভরে গেলে ঘনঘন পাতিল বদল করে দিচ্ছিলেন। কতরাত যে তিনি দু’চোখের পাতা এক করেন নি তার হিসেব নেই। রাকিবের বাবা এই ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করেই রাতে বের হয়েছিলেন সদর থেকে ডাক্তার আনতে। আর এখন তাদের রাকিব তো একবারো এলো না তার বৃদ্ধা অসুস্থ মাকে একটিবারো দেখতে। অবশ্য সে জানলে তো আসবে। সে কেনো, এবাড়ির কেউই জানে না তিনি জ্বরে পড়ে আছেন। শুধু ছয় বছরের নাতনী রিশা একবার তাঁর গায়ে হাত দিয়ে বলেছিল, “দাদুনী, তোমার শরীর এতো গরম কেন?” তিনি দন্তহীন মুখে ম্লান হেসে বলেছেন, “ও কিছু না, শরীরটা ভালো না দাদুনী।” রিশা মেয়েটা খুবই ভালো, দাদীর পাগল। সারাক্ষণ পারলে দাদীর কাছেই পড়ে থাকে সে, পারে না শুধু তার মায়ের জন্য। এঘরে এলেই তার মা শুধু “রিশা, রিশা,” বলে চেঁচাতে থাকে। তার মা কেন যেন তাঁকে সহ্যই করতে পারে না। অবশ্য বৌমার দোষ কি এতে, তাঁর নিজের ছেলেই তো কোনো খোঁজ নেয় না।

বেলা ১২.৩০টা। ওপাশের ঘরে সবাই জেগে উঠেছে। রিশা হাতমুখ ধুয়ে তার দাদীর পাশে এসে বসল। তিনি কম্বলমুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছিলেন। রাকিব গোসল সেরে জুম্মার নামাজ পড়তে মসজিদে চলে গেল। সপ্তাহে পাঁচওয়াক্ত নামাজ না পড়লেও শুক্রবারের জুম্মার নামাজ পড়তে সে মসজিদে ছুটে যায়। রিশার মা তড়িঘড়ি করে চূলায় রান্না বসিয়ে দিলো। বিকেলবেলা খাবার খেতে বসে সে এক প্লেট ভাত নিয়ে গেল শাশুড়ির কাছে। তিনি তখনো কম্বলমুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছেন। তাঁর গায়ে হাত দিয়ে ডেকে উঠানোর সময় লক্ষ্য করল জ্বরে তাঁর গা পুড়ে যাচ্ছে। সালেহা বেগম ঘুম থেকে উঠে হাত ধুয়ে খেতে বসলেন। জ্বরে মুখে অরুচি ধরে গেছে, কোনোকিছুতেই স্বাদ পাচ্ছেন না। রিশার মা নিচু কণ্ঠে বলল, “আম্মা, আজ সন্ধ্যায় আমরা একটু বাইরে বের হবো। রিশার ছুটি, আপনার ছেলেরও অফিস বন্ধ। তাই আজ রিশা জেদ ধরেছে রেস্টুরেন্টে যাবে। আমরা বেশিক্ষণ বাইরে থাকবো না। চলে আসবো তাড়াতাড়ি। আপনি দু’ঘন্টার মতো বাসায় একা থাকতে পারবেন না?” সালেহা বেগম তার কথা শুনে ধাক্কার মতো খেলেন। এই অসুস্থ অবস্থায়ও তারা তাকে বাসায় একা রেখে যাবার কথা ভাবছে কি করে! কাঁপা কাঁপা স্বরে তিনি হাসিমুখে বললেন, “পারবো না কেন? বেশ পারবো।” মুহূর্তেই রিশার মায়ের মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল। তাঁর খাওয়া শেষ হলে এঁটো প্লেট নিয়ে খুশিমনে চলে গেল।

সন্ধ্যা ৭.০০টা। একটু আগে রাকিব তার পরিবারকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে বের হয়েছে। যাওয়ার আগে রিশা এসেছিল তার দাদুর কাছে। গোলাপী রঙের ফ্রকে কি সুন্দর লাগছিল রিশাকে! ঠিক যেনো ছোট্ট একটা পরী। ছোট্ট হাত দু’টি দিয়ে তার জরাজীর্ণ, রোগাটে হাত ধরে বলেছিল, “দাদুনী, তুমিও চলো আমাদের সাথে।” মিষ্টি হেসে তিনি তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, “নারে দাদু, আমি কি আর হাঁটতে পারি? আজ তুমি যাও। পরেরবার আমাকে নিয়ে যেও।” সালেহা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কেইবা কাবাবের মাঝে হাড় পছন্দ করে? এই বুড়োকে নিয়ে টানাটানি করার চেয়ে ঘরের কোণায় ফেলে তারা পরিবার নিয়ে তাদের মতো একটু সময় কাটাতেই পারে। এখন এতো ব্যস্ততার মাঝে সময় পাওয়াই মুশকিল।

রাত ৯.৩০টা। প্রায় তিন ঘন্টা হতে চলল। এখনো ওরা বাসায় ফেরে নি। জ্বরে প্রচণ্ড কাঁপছেন তিনি। মাথা ব্যথায় ফেটে যাচ্ছে। বালিশে মাথা রেখেছেন অথচ মনে হচ্ছে ভারী পাথর দিয়ে মাথায় কেউ আঘাত করছে। প্রচুর পানি পিপাসা পেয়েছে। রিশার মা যাওয়ার আগে তাঁর বিছানার পাশে টেবিলে পানিভর্তি জগ রেখে গেছে। হাত বাড়ালেই পানি পাওয়া যাবে কিন্ত জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে খাওয়ার মতো শক্তিটুকুও যে তাঁর নেই। তিনি হাতড়াতে হাতড়াতে টেবিল থেকে গ্লাস নিতে গিয়ে সেটা মেঝেতে পড়ে গেল। পাশে তাকাতেই তিনি দেখলেন, রাকিবের বাবা খাটে বসে আছেন। প্রচণ্ড জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকতে শুরু করলেন তিনি। জ্বরে কাতরাতে কাতরাতে বললেন, “তুমি আমাকে ছেড়ে ওভাবে চলে গেলে কেনো বলো তো? আমাকে এই দুনিয়ায় একা রেখে চলে গেলে, আমি এখন মানুষের কাঁধে বোঝা হয়ে বেঁচে আছি। যে ছেলেকে শেষ সম্বল ভিটেমাটি বিক্রি করে পড়াশোনা করিয়েছ, গায়ের রক্ত পানি করে বড় করেছ সে তো তার মায়ের দিকে ফিরেও তাকায় না। বৌমা পরের ঝি, তাকে কী দোষ দিবো?” সালেহা বেগমের চোখে একের পর এক ভাসতে লাগলো সেই টিনের চালের ছাপড়া ঘর, তাঁর ছোট্ট রাকিবের কচি মুখ, তাঁর স্বামীর হাস্যময়ী চেহারা, তাঁর অতীতের সুখ-দুঃখের অনেক দৃশ্য। তিনি চোখ বন্ধ করলেন। বুকে ভীষণ ব্যথা হচ্ছে। পানি পিপাসায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। অস্ফুট কণ্ঠে তিনি “পানি, পানি” বলে মৃদু চিৎকার করলেন। অতিকষ্টে তার দুর্বল বুকের খাঁচা থেকে নীরবে প্রাণপাখি বেরিয়ে গেল। চোখ থেকে শুধু গড়িয়ে পড়ল দু’ফোঁটা জল।

রাত ১০.৩০টা। রাকিব ক্লান্ত দেহে তার মায়ের ঘরে ঢুকল। রিশার মায়ের অনেক জোরাজুরিতে আজ সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয়া হবে। রিশার মা সংসার সামলে, সবকিছু গুছিয়ে একা হাতে মায়ের যত্ন নিতে পারছে না, তাঁকে সময় দিতে পারছে না। বৃদ্ধাশ্রমে সঙ্গও পাবেন, যত্নও পাবেন। একথা জানাতেই আজ সে মায়ের ঘরে ঢুকেছে। এই গরমেও গায়ে কম্বল জড়িয়ে মাকে শুয়ে থাকতে দেখে অবাক হলো রাকিব। কম্বল সরিয়ে তাঁর গায়ে হাত রাখতেই চমকে উঠল রাকিব। বরফের মতো শীতল তাঁর শরীর! অথচ আধঘণ্টা আগেও তাঁর শরীর আগুনের মতো গরম ছিল।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত