অযাচিত এক দুপুরে

কতক্ষণ ধরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি খেয়াল নেই। ভরদুপুরে মাথার উপর গনগনে সূর্যের তাপে পুরো শার্ট ঘামে ভিজে একাকার হয়ে গেছে। রাস্তার ফুটপাতে এক আম বিক্রেতা ভ্যানে আম বিক্রি করছে। ক্রেতা তাকে ভালো ভালো আমগুলো বেছে দিচ্ছে, সে সেগুলো ঠোঙায় মুড়িয়ে দিচ্ছে। ক্রেতা একটু অন্যদিকে তাকালেই সে চট করে নিচে আগে থেকেই রেডি করে রাখা কিছু আজেবাজের ঠোঙার সাথে তা পাল্টে ক্রেতার কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে। কি চমৎকার বুদ্ধি! এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে তাই দেখছিলাম। সম্বিৎ ফিরল গাড়ির পুঁ পুঁ হর্নে।

-“নাবিল, এই নাবিল।”

পিছন ফিরে তাকালাম। রাহেলা ফুপু বিশাল এক ধূসর রঙের গাড়িতে বসে আমাকে ইশারা করে ডাকছেন। কি বিপদে পড়লাম! এখন ফুপুর খপ্পরে পড়লে আমার সারাদিন মাটি হয়ে যাবে। তাঁকে না দেখার ভান করে চট করে আমি আম বিক্রেতার দিকে চোখ ফেরালাম। ফুপুর ড্রাইভার আবার বিকট শব্দে হর্ন বাজাতে লাগল। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। এখন আর কিছু করার নেই আমার। রাহেলা ফুপু জোঁকের মত কাউকে একবার ধরলে সহজে ছাড়ে না। খানিকটা বিরক্তি  নিয়েই গাড়ির সামনে গিয়ে মাথা নামিয়ে বললাম, “বলো ফুপু কি হয়েছে?”

ফুপু অবাক হয়ে বললেন, “তুই দেখি দিনদিন আদব কায়দা সব ভুলে যাচ্ছিস। তোকে কতবার ফোন দিয়েছি। ফোন ধরিস না কেনো?”

-“মোবাইল হারিয়ে ফেলেছি ফুপু।”

-“আচ্ছা বাদ দে, আয় গাড়িতে ওঠ। তোকে এক জায়গায় নিয়ে যাব।”

-“আমি আজ যেতে পারব না ফুপু। জরুরি কাজ আছে।”

-“তোর মতো ভবঘুরের আবার জরুরি কাজ কিসের! রোদের মধ্যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কি করছিস?”

-“একটা চোরা বুদ্ধি দেখছিলাম।”

-“তোর মাথাটা না দিনদিন যাচ্ছে। কি বলিস কিছুই বুঝি না। আর কথা বাড়াবি না। গাড়িতে ওঠ।”

বাঁচার আর কোনো উপায় নেই। অগত্যা উঠে বসলাম গাড়িতে। এসির ঠান্ডা বাতাসে প্রাণ জুড়িয়ে এলো। ফুপু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আহা রোদে ঘুরে ফর্সা মুখটা কেমন লাল করেছিস। শার্টও ভিজিয়ে একাকার করেছিস। দে আমি মুছে দেই।” ফুপু সত্যি সত্যি আমার মুখ তার দামি শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে দিলেন। ইনি আমার আপন ফুপু নন, বহু দূর সম্পর্কের ফুপু। ছোটবেলা থেকেই ফুপু আমাকে প্রচন্ড আদর করেন। এর কারণ সম্ভবত দুইটা। প্রথমত একসময় আমার বাবার সাথে উনার বিয়ের কথা পাকা হয়েছিল, কোনো এক কারণে তা ভেঙে যায়। দ্বিতীয়ত ফুপু তাঁর বর্তমান সংসারে নিঃসন্তান। তাই আমার মাঝেই যেনো সন্তানের ছায়া দেখতে পান।

ফুপু বললেন, “তুই জিজ্ঞেস করলি না আমরা কোথায় যাচ্ছি?”

-“কোথায় যাচ্ছি ফুপু?” গলায় আলগা উৎসাহ এনে বললাম।

-“পাত্রী দেখতে।”

এক্ষেত্রে আমার কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করা উচিৎ কার জন্য পাত্রী দেখতে যাচ্ছি। তবে জিজ্ঞেস করলাম না। ফুপুই নিজে থেকে সব গড়গড় করে বলবেন।

ফুপু অবাক হয়ে বললেন, “কার জন্য পাত্রী দেখতে যাচ্ছি জিজ্ঞেস করবি না? তোর জন্য যাচ্ছি রে। একটা বিয়ে দিলে তোর মাথাটা ঠিক হয়ে যাবে।”

-“এখনই যাচ্ছি?”

-“আরেহ না! কিসের এখন যাব? তোকে এই অবস্থায় নিয়ে গেলে আমাকে ঝেটিয়ে বিদায় করে দিবে না? এখন আমরা বার্বার শপে যাবে। তার পাশেই মেনস পার্লার। তোর চুলের যেই বাহার করেছিস, ক’দিন পর কাক এসে ডিম পেরে যাবে। তোর মুখের অবস্থাও তো রোদে পুড়ে বারোটা বেজেছে। পার্লারে গিয়ে তোর চেহারাও ঘষামাজা করতে হবে।”

আমি আতঙ্কে ঘোৎ করে শব্দ করলাম। ফুপু বললেন, “রোবটের মতো বসে থাক। নো পটরপটর, নো নড়াচড়া।”

আমি রোবটের মতো বসে রইলাম।

বার্বার শপে ঢুকে মনে হল আমি বাঁদড়ের খাঁচায় ঢুকে পড়েছি। বিভিন্ন হেয়ার স্টাইলের বাঁদড় আশেপাশে ঘুরাঘুরি করছে। এক বাঁদড়ের চুলে রঙধনুর খেলা, কারো চুল কাঁটাতারের মতো খাঁড়া খাঁড়া, আবার কারো মাথার মাঝের একখাবলা চুল জড়ো করে মাঝে মিনার তৈরি করা। একজন এসে আমাকে সিটে বসিয়ে সাদা কাপড়ে পুরো শরীর ঢেকে দিলো। শুধু মাথা কচ্ছপের মতো বেরিয়ে রইল। ভনভন শব্দ করে মেশিন, কাঁচি কিসব চলতে লাগল। মনে হচ্ছে যেনো অস্ত্রপাচার হচ্ছে। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। কিছুক্ষণ পর সে বলল, “হয়ে গেছে স্যার, উঠে পড়ুন।” আমি চোখ মেলে প্রথমেই নিজেকে আয়বায় দেখলাম। হায় হায়! আমার মাথার ঝাকড়া চুলের দুইপাশ খাবলা দিয়ে যেনো তুলে ফেলেছে। চাঁদির মাঝে যেটুকু চুল আছে সেটুকু ব্রাশের মতো খাড়া হয়ে আছে। আমি অসহায় চোখে ফুপুর সাথে বেরিয়ে এলাম। ফুপু আনন্দিত গলায় বললেন, “এইতো আমার স্মার্ট বয়, চল পার্লারে যাই।”

পার্লারের অত্যাচার আরো ভয়াবহ ও নির্মম। কয়েকজন আমার গালে-মুখে কি যেনো মাখিয়ে শুইয়ে রাখলো। এমন সময় এলো হাঁচি। বহু কষ্টে তা চেপে রাখলাম। এরপর মুখ ধুয়ে তারা আমার গায়ের উপর তবলার মত থপাথপ হাত চালাতে লাগল। একে নাকি “স্পা” বলে। কয়েক মিনিট কি হলো কিছুই বুঝলাম না। শুধু আয়নার দিকে তাকিয়ে বুঝলাম এই এক ঘন্টা পরিশ্রম করে এরা শুধু আমার মুখটা একটু উজ্জ্বল করেছে, যেই কাজ বাসায় বসে সাবান দিয়ে মুখ ধুলেই হয়ে যায়। এরা শুধু মুখেরই অত্যাচার করলো না, আমার হাত-পা নিয়েও টানাটানি শুরু করে দিলো। এমনকি নখ পর্যন্ত ছাড় দিলো না। বাকি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কথা আর নাইবা বলি।

ফুপু এখানেই ক্ষান্ত হন নি। আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেলেন শপিংমলে। বললেন, “এই ঘামে ভেজা শার্ট পড়লে মেয়ে গন্ধে এমনিই অজ্ঞান হয়ে যাবে। আয় একটা সুন্দর পাঞ্জাবি কিনে দেই।”

-“ফুপু, পাঞ্জাবি পড়ে এদের বাসায় গেলে বলবে ছেলে বিয়ে করতে এসেছে। তার চেয়ে বরং শার্টই ভালো।” আমি কাতর কণ্ঠে বললাম।

-“তোর এই সাজের সাথে শার্ট একবারে হনুমানের মতো লাগছে। টি-শার্ট কিনি, আয়।” ফুপু আমার হাতে কয়েকটা টি-শার্ট দিয়ে বললেন, “যা ট্রায়াল রুমে গিয়ে এগুলো পড়ে দেখ কোনটা ভালো লাগে।” আমি হতাশ হয়ে ট্রায়াল রুমে গেলাম। একটাও পছন্দ না আমার। কিন্তু জোঁকের মুখে পড়েছি। ট্রাই না করেও উপায় নেই। পাঁচটার মধ্যে একটা পড়ে নিজেকে একটু মানুষ মনে হলো, বাকিগুলোতে শিপ্পাঞ্জির দাদা বা নানা মনে হচ্ছিল। কালো রঙের সেই টি-শার্টটার মাঝ বরাবর একটা বাঘের ছবি। এক পা এগিয়ে রেখেছে সামনে। মনে হচ্ছে এখুনি বুক থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে পড়বে। ফুপু আমাকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “জানতাম তুই এটাই পছন্দ করবি। ইচ্ছা করেই দিয়েছিলাম। তোর যত উদ্ভট কাজ! এই নে, সব কিনেছি জুতো কিনি নি। এটা দেখ তো পরে কেমন হয় তোর পায়ে? আমি পছন্দ করলাম।” ফুপুর সেই পছন্দ করা জুতোতে কিছুতেই পা গলাতে পারলাম না। ভীষণ টাইট। আরো কতগুলো জুতো আনা হলো। কোনোটাই পায়ের মাপে হয় না। কোনোটায় চাপাচাপি করেও পা গলানো যায় না, কোনোটা পা থেকেই খুলে পড়ে যায়। ফুপু এবার রেগে বললেন, “বদমাইশ ছেলে। দিনরাত রাস্তায় ঘুরে ঘুরে পা বেসাইজ বানিয়ে ফেলেছিস।” আমি অসহায়ের মতো বললাম, “ফুপু আমি তো আর সিনডারেলা না!” অবশেষে আমার পায়ের মাপে চমৎকার একজোড়া জুতা পাওয়া গেলো। আম শান্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, “একবারে খাপে খাপ, আক্কাসের বাপ!”

এখনও ঝামেলা শেষ হয় নি। “পাত্রী দেখতে যাবো, খালি হাতে তো আর যেতে পারি না। মিষ্টি টিষ্টি এসব তো নিবোই। মেয়েটার জন্য একটা শাড়ি নিয়ে গেলে কেমন হয়? দেখি একটা শাড়ি পছন্দ কর তো।” শাড়ির দোকানে ঢুকে ফুপু বিগলিত কণ্ঠে বললেন। পড়লাম আরেক ফ্যাসাদে। একটা হলুদ রঙের শাড়ি ফুপুর হাতে তুলে বললাম, “এটা প্যাক করে দিতে বলো।” ফুপু ধমক দিয়ে বললেন, “তোর যা পছন্দ! মেয়ের কি গায়ে হলুদ লেগেছে নাকি ফাল্গুন এসেছে? কি ক্যাটক্যাটে রঙ!” এই বলে শেষে নিজেই অনেক ঘেটেঘুটে একটা বেগুনী রঙের শাড়ি পছন্দ করে কিনে নিলেন। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

কিন্তু এখানেই বাঁচাবাঁচির শেষ নয়। পুরোদস্তুর জোকার সেজে লাঞ্চ করে আমি ফুপুর সাথে গাড়িতে উঠে বসলাম। ফুপু আনন্দিত গলায় বললেন, “শোন মেয়ে দেখতে গেলে বেশি পকরপকর করবি না, লজ্জা লজ্জা ভাব দেখাবি। তুইতো আবার কথা বেশি বলিস। আচ্ছা, মেয়ের নাম কি জানিস? মেয়ের নাম বিন্দু। ভারী মিষ্টি দেখতে। গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেছে। একমাত্র মেয়ে তো, তাই বাবা মায়ের আদরের। চোখের আড়াল করতে চায় না। তাই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে ঘরজামাই রেখে দিবে ছেলেকে। এরজন্য তারা ভবঘুরে এমনকি ভিখারীর সাথে পর্যন্ত বিয়ে দিতে রাজী। বড়লোক মানুষ তো, টাকার ছড়াছড়ি। ছেলে পেলেই হলো। বাকি দিক দিয়ে তেমন চিন্তা নেই। আমার মনে হয়েছে, মেয়েটার জন্য তুই পার্ফেক্ট। তার চেয়েও বেশি। তোর বাবারও তো টাকার অভাব নেই।” বাবার প্রসঙ্গ আসতেই চুপ হয়ে গেলেন ফুপু। কি যেনো ভাবতে লাগলেন। আমি এতো নিস্তব্ধতায় চোখ বন্ধ করতেই ঘুমিয়ে পড়লাম।

ঘুম ভাঙল ফুপুর ডাকে, “দেখো কি কেলেংকারি! যেই ছেলে পাত্র দেখতে এসেছে সেইই ঘুমিয়ে সাড়া। ওরে গাধা চোখ খোল, মেয়ের বাবা দাঁড়িয়ে আছেন।” আমি চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি একজন মধ্যবয়স্ক লোক অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। আমি হুড়মুড় করে গাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। কোলে রাখা মিষ্টির প্যাকেটগুলো থপ করে পড়ে গেলো। তাড়াতাড়ি সেগুলো তুলে নিয়ে ফুপুর সাথে বাড়ির ভেতর ঢুকলাম।

ছবির মতো সাজানো বাড়িটির প্রতিটি অংশ। বাবা এইবাড়ি দেখলে আর নিশ্চয়ই দাবী করতে পারতেন না, তার বাড়িই ঢাকার সবচেয়ে আনকোরা বাড়ি। বসার ঘরে ক’জন বসে আছে। এরা বোধহয় আমাদের অপেক্ষায়ই বসে ছিল। আমরা ঘরে ঢুকতেই একটা বাচ্চা ছেলে উঠে ভিতরের রুমে চলে গেলো। বুঝতে পারলাম এই পিচ্চি ইনফরমার হিসেবে আছে। এখানের খবর অন্তর্মহলে দিচ্ছে। বিন্দুর বাবা আমাদের বেশ আন্তরিকতার সাথে বসালেন। ভদ্রলোক হাসিখুশি ধরনের মানুষ। ঠোঁটের কোণায় হাসি লেগেই থাকে। ফুপু ওনাদের সাথে গল্প করছেন। মাঝে মাঝে বিন্দর বাবা আমার ইন্টারভিউ নিচ্ছেন। তাঁর চোখে তাচ্ছিল্যের প্রকাশ। যেই ছেলে ঘরজামাই থাকতে স্বেচ্ছায় চলে আসে তার আবার গুরুত্ব কি? তার আবার কোনো আত্মসম্মান থাকে নাকি? তারা হয় গরু ছাগলের মতো। ভদ্রলোক আমাকে খানিকটা পাত্তা দিচ্ছেন না বললেই চলে। কথাবার্তার মাঝে বিশাল এক ট্রে তে করে নাশতা চলে এলো। দুপুরে ফুপুর তাড়াহুড়ায় কি লাঞ্চ করেছি তাতে পেটের একবিন্দুও ভরে নি। আবার পেটে ক্ষিদেটা নড়েচড়ে উঠল। আমিও সবকিছু ভুলে রীতিমত ঝাঁপিয়ে পড়লাম। ফুপুর কড়া চাহনিতে আবার সেই ভদ্রতার কাছে আমার ক্ষিদেটা হার মানল। এর কিছুক্ষণ পরেই মেয়েকে নিয়ে আসলেন তার এক ভাবী। দু’জনেরই জমকালো সাজ। আমি ধাঁধায় পড়ে গেলাম কোনটা পাত্রী। নেহাতই তার বাবা বিন্দুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো বলে বুঝতে পারলাম। আমি মেয়েটাকে দেখে সত্যিই মুগ্ধ হলাম। মিষ্টির চেয়েও মিষ্টি চেহারা। রাজা বাদশা, কবিগণ তাকে দেখলে যুদ্ধ লাগিয়ে, কবিতা লিখে হুলস্থুল কাণ্ড ঘটিয়ে বসত। ফুপু তাকে কিছু প্রশ্ন করলেন। মেয়েটি স্পষ্ট কণ্ঠে সব উত্তর দিলো। এবার আমার পালা। কিন্তু আমি প্রশ্ন করার কোনো আগ্রহ বোধ করলাম না। চুপ করে রইলাম। ফুপু মৃদু হেসে বললেন, “এরা বোধহয় লজ্জা পাচ্ছে। একটু আলাদা কথা বলুক না হয়। কি বলেন ভাই?” বিন্দুর বাবা ইতস্তত হেসে বললেন, “হ্যাঁ মানে—” বিন্দু তড়িঘড়ি করে আমাকে বলে উঠল, “চলুন বাগানে যাই।” আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকে অনুসরণ করে বাগানে গেলাম। চমৎকার একটা বাগান, পাশে রূপবতী একটি মেয়ে, সন্ধ্যার আবছা আলো, সব মিলিয়ে যেনো অপরূপ একটা পরিবেশ। বিন্দু এপর্যন্ত একবারো আমার দিকে তাকায় নি, সারাক্ষণ মাথা নিচু করে ছিলো। এখন চোখের উপর চোখ রেখে কটমট করে আমার দিকে তাকালো। তারপরেই খিলখিল করে হেসে উঠল। আমি অবাক হয়ে তাকালাম ওর দিকে। কি সুন্দর হাসি মেয়েটার! ও মুখে ওড়না চেপে হাসতে হাসতে বলল,”আচ্ছা আপনি এমন জোকার সেজে এসেছেন কএএনো বলুন তো?” পরক্ষণেই হাসি থামিয়ে গম্ভীর মুখে বলল, “শুনুন আপনাকে আমি এখন কিছু কথা বলব। আপনি মনযোগ দিয়ে শুনবেন। আমি ছোটবেলা থেকেই বাবা মায়ের অতি আদরে মানুষ হয়েছি ঠিকই। কিন্তু অতি আদর মাঝেমাঝে অত্যাচারেরও সীমা ছাড়িয়ে যায়। বাবা মা প্রতিটা কাজই আমার মতের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। যেনো ইচ্ছা করেই তারা এমনটা করতেন। বড় হলেও সবসময় তারা তাদের মতামত আমার উপর চাপিয়ে দেয়। এখনও দিচ্ছে। ইচ্ছা ছিলো দেশের বাইরে কোথাও পড়াশোনা করবো, ডাক্তার হবো। কোনোটাই দিলেন না। তাদেরকে আমার একটি পছন্দের ছেলের কথা জানিয়েছিলাম। কি নেই তার? রূপ, গুণ, ঐশ্বর্য কি নেই তার? কিন্তু বাবা-মায়ের তো আমার মতের বিরুদ্ধে যেতেই হবে। দু’দিনের মধ্যে বিয়ে দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। এখন একটা ভবঘুরে উটকো ছেলের সাথে আমাকে বিয়ে দিতে চাচ্ছে। মাইন্ড করবেন না, স্যরি। আমার এইজীবনটা এভাবে কেনো নষ্ট হবে? আমি কি গরু ছাগল? জানেন, বাবা আজ আমাকে ঘরে তালাবদ্ধ করে রেখেছে সারাদিন। আমি ভুবনের সাথে যোগাযোগ করে ঠিক করেছি আজই আমরা পালিয়ে যাব। ও দারোয়ানের চোখ ফাঁকি দিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে এসে বাগানে লুকিয়ে আছে। ওকে ডাকলেই ও গাছের আড়াল হতে বেরিয়ে আসবে। এতক্ষণ আপনার উপর রাগ হচ্ছিল, এখন ভালোই লাগছে। আপনার জন্যই এতোবড় সুযোগটা হাতে পেলাম।” এই বলেই বিন্দু ভুবন ভুবন বলে ডাকতেই গাছের পেছন থেকে বেশ সুদর্শন একটি ছেলে মুচকি হেসে বেরিয়ে এলো। এর হাসিও বিন্দুর মতই প্রাণবন্ত। তার হাতে একটি ব্যাগ, সম্ভবত প্রয়োজনীয় জিনিস আছে এতে।

আমি ওকে দেখে বললাম, “খাপে খাপ, আক্কাসের বাপ।”

চট করে ভুবন আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি কিছু বললেন?”

আমি তার জবাব না দিয়ে বললাম, “বিন্দু তোমার জন্য এনেছিলাম। এটা নিলে খুবই খুশি হতাম।”

বিন্দু অবলীলায় আমার হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে শাড়ি বের করল। অবাক হয়ে বলল, “আশ্চর্য পার্পল আমার ফেভারিট কালার। আপনি জানলেন কিভাবে?”

আমি হাসলাম। বিন্দু আর ভুবন বিদায় নিয়ে একে অপরের হাত ধরে হাসতে হাসতে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। সেই অযাচিত দুপুরের জন্যই আজ এ অপূর্ব দৃশ্য দেখতে পাচ্ছি।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত