বন্ধন

“ছুরিটা কালকে হাতের কাছে রেখো। কাজের সময় প্রায়ই ছুরি হাতের কাছে পাওয়া যায় না।” সিফাতের মোবাইলে অবনীর মেসেজটা দেখেই আমার মাথাটা ঘুরে উঠল! তবে কি এতোদিন আমি যা ভেবেছি সবই সত্যি?

অবনী সিফাতের অফিসের কলিগ। তাদের বন্ধুত্ব অফিস থেকে নয়, বরং একেবারে ছোটবেলা থেকে। সিফাতের সাথে একই স্কুলে পড়ত অবনী। কলেজ জীবনে এসে দুইজন দুই প্রান্তে সরে গেলেও তাদের বন্ধুত্ব মোটেও অক্ষুণ্ণ হয়নি। বছর দুয়েক আগে ক্যান্সারে মারা যান অবনীর বাবা। সংসারের একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তিটি চলে যাওয়ায় মা’কে নিয়ে অবনী পড়ে অকুল দরিয়ায়। এই দুঃসময়ে তাকে অফিসে চাকরীর ব্যবস্থা করে সাহায্য করেছে সিফাত। এরপর থেকে তাদের বন্ধুত্বের বন্ধন যেন আরও দৃঢ় হয়ে গেল। সেই থেকেই গলায় গলায় ভাব তাদের। তাদের এই বন্ধুত্বতে আমার কখনওই কোন আপত্তি ছিল না। যখন থেকে বুঝতে পারলাম এই বন্ধুত্ব মাত্রা অতিক্রম করে যাচ্ছে, ঠিক তখন থেকেই আমার আপত্তির মাত্রাও অতিক্রম করতে লাগল।

বেশ কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করছি, সিফাত গভীর রাতে বারান্দায় আড়াল হয়ে ফিসফিস করে ফোনে কথা বলে। আমি ঘুম ভাঙলেই দেখি সিফাত বিছানায় আমার পাশে নেই। বারান্দার ওপাশে দাঁত কেলিয়ে গল্প করছে। বুঝতে বাকি থাকে ফোনের ওপাশে আর কেউ না, তার প্রাণপ্রিয় বান্ধবী অবনী! মনে সন্দেহের বীজ আসলেও কখনও সিফাতকে এব্যপারে প্রশ্ন করিনি, ও মনে কষ্ট পাবে ভেবে। ও আমাকে ভালো না বাসুক, হাজার হোক আমি তো ওকে ভালোবেসেছি? আমি ওকে কষ্ট দেই কীভাবে?

এইতো কিছুদিন আগে পাশের বাসার লুনাভাবীও বলেছে, সিফাত আর অবনীকে সে শপিং মলে দেখেছে একসাথে। হাত ভরে গিফট আর শাড়ি শপিং করে দিয়েছে সিফাত! সেগুলো পেয়ে নাকি অবনীর খুশি বাঁধ মানছিলো না। চোখ ফেটে সেদিন পানি আসতে চেয়েছিলো আমার। কোনদিন তো ভালোবাসা ছাড়া কোন শাড়ি গয়নারও আবদার করিনি সিফাতের কাছে। আমি কি এতোই অধম যে ওর ভালোবাসাটুকু পাওয়ারও যোগ্য না?

আর আজ! আজ তো নিজের চোখেই সিফাতের মোবাইলে অবনীর মেসেজটা দেখলাম। অবনী সিফাতকে ছুরি চাকু হাতের কাছেই রাখতে বলছে যেন ঠিক সময়মতো তাদের পথের কাঁটা সরিয়ে ফেলতে পারে! ওদের সম্পর্ক এতোটাই এগিয়েছে যে আমাকে সরিয়ে ওরা নিজেদের সংসার গুছিয়ে নেওয়ার প্ল্যান করছে? আমার গা দিয়ে ঘাম ছেড়ে দিল। সিফাত ফ্রেশ হয়ে এসে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে আমার সামনে এসে অবাক হয়ে বলল, “স্নেহা! কী হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ করেনি তো?” আমি বিদ্রুপাত্মক হাসি হাসলাম। জানি এই দুশ্চিন্তা তোমার অভিনয় ছাড়া আর কিছুই না। কাল খুন করে ফেলবে বলে আজ আমায় মিথ্যে ভালোবাসা দেখিয়ে মন জিততে চাইছো?

ওকে কোন জবাব না দিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। রাতের আকাশে আজ মরা চাঁদ। সেই চাঁদের আলো রাতের গভীর অন্ধকারকে আরো গভীর করে তুলেছে, ঠিক আমার মনটার মতোই।

ঘরে এসে ক্লান্ত দেহটা এলিয়ে দিলাম বিছানায়। সত্যিই এখন আর মনের কষ্ট বাঁধ মানছে না। “এতো ভালোবাসলাম, তাও মূল্য দিলে না আমায়? কি অপরাধ ছিল আমার? তিনবছরের সাজানো সংসারে কী কমতি ছিল যে তুমি আমাকে সরিয়ে অন্যকে স্থান দিতে চাইছো?” মন থেকে কথাগুলো চিৎকার করে বের হতে চাইলেও ভালোবাসা তাকে বের হতে দিল না, রেখে দিল মনের গহীনে যত্নে।

ক্লান্তিতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম খেয়াল নেই। যখন চোখ খুলল, তখন বেলা হয়ে গেছে। পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখি সিফাত পাশে নেই। হয়তো চলে গেছে অফিসে তার প্রিয়তমাকে দেখতে। যাওয়ার আগে একটা চিরকুট বালিশের পাশে রেখে গেছে, “স্নেহা, আজ খুব সুন্দর করে শাড়ি পরে আমার জন্য সেজে থাকবে প্লিজ। আজ বিশেষ একটা দিন।”

আমি আবারও হেসে বললাম, মিথ্যে অভিনয়! আজ পথের কাঁটা সরাবে, তা তো বিশেষ দিন বটেই তোমার জন্যে!

সিফাত এখন বাসায় নেই। প্রাণে বাঁচার খুব বড় একটা সুযোগ অপেক্ষা করছে আমার জন্য। চটপট একটা ব্যাগ গুছিয়ে চলে এলাম খালার বাসায়। আজকের দিনটা কোনরকমে খালার বাসায় কাটিয়ে প্রাণে বাঁচতে পারলেই হয়।

খালার বাসায় আসার পর থেকেই মন ছটফট করতে লাগলো। আমার তিনবছরের ভালোবাসা কি এতোই নড়বড়ে যে প্রাণের ভয়ে আমি পালিয়ে চলে এলাম? এমন ভীতু আমি? আমি এতো সহজেই পারবো ওকে অন্যের হাতে তুলে দিতে? না! যদি এতো সহজেই সে অন্যের হয়ে যেতে পারে তবে কী মূল্য রইলো আমার ভালোবাসার! ওকে জবাব দিতেই হবে ও কেন আমার সাথে প্রতারণা করলো। আর যাই হোক, আমার স্বামীকে আমি বেঁচে থাকতে অন্য কারো হতে দিতে পারি না।

সন্ধ্যা পড়ে এসেছে। যেখানে জীবনটাই অন্ধকারে ঘিরে গেছে সেখানে সন্ধ্যার অন্ধকারকে আমার ভয় কী? খালার বাসা থেকে আবার আমি চলে এসেছি আমাদের বাসায়। গুটি গুটি পায়ে আমি ঘরের দিকে এগোলাম। ড্রয়িংরুমের দরজা ভেতর থেকে ভেড়ানো। ওপ্রান্ত থেকে সিফাত আর একটা নারীকন্ঠের খিলখিলিয়ে হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে। বুঝতে বাকি রইলো না মেয়েটি অবনী ছাড়া আর কেউ না। চোখ ছাপিয়ে পানি চলে এলো আমার। সিফাত বলছে, “অবনী, আজকের দিনটা আমার জন্য খুবই বিশেষ দিন। তোমার জন্যই এই দিনটা বিশেষ হলো।” আমি চমকে উঠলাম। ওরা তবে আজ বিয়ে করে নিয়েছে! সিফাতের কন্ঠ শোনা গেল আবারও, “অবনী, বলো তো কীভাবে স্ত্রীকে খুশি করা যায়?” অবনী হেসে বলল, “শুধু তার দু’টো হাত চেপে ধরে বলতে হবে ‘ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি’।” না! একথা শুনে আমি সহ্য করতে পারলাম না। আমার ভালোবাসার মানুষকে কেউ আমারই সাজানো সংসারে আমার থেকে কেড়ে নিবে তা হতে পারে না। আমি চিৎকার করে দরজা ধাক্কা দিয়ে ঢুকে গেলাম ভিতরে। এরপর যা দেখলাম তাতে অবাক হয়ে গেলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না!

আমাদের ড্রয়িংরুম ফুল আর বেলুন দিয়ে খুব সুন্দর করে সাজানো। মাঝের টেবিলে বেশ সুন্দর একটা চকলেট কেক। তাতে মোমবাতি রাখা। এখনও প্রজ্বলিত হয়নি। কেকের পাশেই দেয়াশলাই আর চকচকে একটা চাকু রাখা। আমাকে ঢুকতে দেখেই সিফাত অবাক হয়ে বলল, “কোথায় গিয়েছিলে স্নেহা? তোমাকে সারপ্রাইজ দিব বলে আজ তাড়াতাড়ি অফিস থেকে এলাম, অথচ তোমাকেই পেলাম না!” সারপ্রাইজ? কিসের সারপ্রাইজ? কেকের দিকে তাকাতেই দেখি খুব সুন্দর করে তাতে লেখা, ‘হ্যাপি বার্থডে স্নেহা।’ ঠিক তখনই আমার মনে পড়ল, আজ আমার জন্মদিন!

দারুণভাবে ভড়কে গেলাম। সিফাতের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাতেই ও বলল, “স্নেহা, এতোদিন অবনীর সাথে তোমার জন্মদিনটার জন্যই প্ল্যান করতাম। তুমি জানতে পারলে সব ভেস্তে যাবে তাই ওর সাথে রাত জেগে ফোনে কথা বলে প্ল্যান করতাম। সেদিন ওর সাথে শপিং মলে গিয়ে তোমার জন্য গিফট আর শাড়ি কিনে এনেছি। এবার ছুড়িটা নাও, কেকটা কাটো স্নেহা।”

আমি ধরা গলায় সিফাতকে বললাম, “কোনদিন তোমার কাছে কিছু চাইনি। আজ চাইবো। দিবে?”

-অবশ্যই! বলো তুমি কী চাও?

-একটাবার বলবে ‘ভালোবাসি”?

সিফাত আমার দুহাত চেপে ধরে মিষ্টি হেসে বলল, “ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি।”

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত