ওরই সব দোষ

ওরই সব দোষ
-আমি এই সম্পর্ক আর সামনে এগিয়ে নিতে পারছি না। আমি কোন প্রশ্ন করতে পারলাম না ওকে। কেমন যেনো সব স্বপ্ন মনে হচ্ছিলো। যেনো এখনই ভেঙ্গে যাবে। আর আমি ৩ বছর আগে ফিরে যাবো আমার স্বাভাবিক জীবনে। কিন্তু তেমনটা হলো না। সে আবার বলল
– তুমি কি আমাকে শুনতে পারছো? আমি তোমার সাথে কোনও বেঈমানি করবো না। দেনমোহরের টাকা , তোমাকে বিয়েতে যা গহনা দিয়েছি সবই তুমি সাথে নিতে পারবে। আমি কিছুতে বাধা দিবো না। আমার কান দিয়ে ধোয়া বের হচ্ছিলো। আমার বুকের ধুকধুকটা আরো তীব্র হয়ে গেলো। চোখ দিয়ে না চাইতেও পানি বেয়ে পরছে। এবার মুখ দিয়ে বের হলো
– কারণটা জানতে পারি?
– আমাদের কোন মিল নাই। আন্ডারস্ট্যান্ডিং থেকে শুরু করে যা যা লাগে সম্পর্ক টিকাতে তার কিছুই নাই। তাই আমি পারছি না। অযথা তোমার গায়ে হাত উঠে যায়। গালাগালি করতেও এখন আর ভালো লাগেনা।
– আচ্ছা।
– আমরা জিনিসটা একেবারে সিম্পলভাবে শেষ করবো। এখানে প্লিজ আমার বাবা মাকে টেনো না।
সেরাতে এটাই ছিলো তার শেষ কথা। পরদিন আমি আমার বোনের বাসায় চলে গেলাম। বাবা মা নাই আমার। এতিম মেয়ে। বোন আর দুলাভাইই বিয়ে দিয়েছিলো আমাকে … আজ আবার তাদের কাছে ফেরত আসলাম। এতটা বছরে আমি কখনো আমার স্বামীর কাছে বলি নাই তার প্রতি আমার কতটা অভিযোগ … সে আমাকে কতটা অবহেলা করে ,তার দেওয়া অপমান অথবা গায়ে তোলা কোনটাতেই আমি গলা উচুঁ করতে পারি নাই। আমি তাকে ছেড়ে আসতে
পারি নাই। অথচ কি একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং হাবিজাবির উসিলা দিয়ে সে আমাকে আজ ডিভোর্স দিতে চায়।
খুব মন খারাপ থাকা মানুষের চেহারায় একটা ছাপ পরে। আমারো পরেছিলো হয়ত। আপা দুলাভাই বুঝতে পারছে হয়ত। বারবার জিজ্ঞাসা করলো – একা কেন তুই? জামাই কই? আমি তার ব্যস্ততার মিথ্যা নাটক বানিয়ে সবাইকে শুনালাম। জানতাম দু তিনদিনের মধ্যে এ বাসায় ডিভোর্স নোটিশ চলে আসবে। তখনের কথা ভাবতেই আমার ভয় হচ্ছে। কি হবে কি হবে ভেবে সারাটা দিন পার হয়ে গেলো। পরের দিন আপার বাসার বুয়াও বাসায় এসে বলা শুরু করলো – আরে আফা এমন অবস্থা কেন আফনের? বাইজান কেমন আছে? হেয় আয় নাই? কবে নিতে আইবো?
মাত্র একদিনের মাথায় টের পেলাম আমি এখন এ বাসার একজন অতিথি মাত্র। এখানে আমি বর ছাড়া আসতে পারবো না … আপাও দুপুরে বলল – কয়দিন থাকবি? তোকে কবে নিতে আসবে বলছে কিছু? আমি কারো উত্তর দিতে পারছিলাম না। ভাবছিলাম আপাকে সব বলে দিবো। আবার কেন যেনো বলতে পারলাম না। বললেই তারা আমার বরের বাবা মায়ের সাথে বসতে চাইবে। যেটা সে চায়না। আগেই বলে দিয়েছে। তো কি করবো? ডিভোর্স লেটার চলে আসলে সবাই আমাকে কিভাবে নিবে? এই ভেবে ভেবে আরেকটা রাত পার হয়ে গেলো।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠার পর ভাবলাম আজ আপাকে সব বলবো। এমন সময় নাস্তার টেবিলে দুলাভাই খবরের কাগজ হাতে নিয়ে বলল – এখনকার মেয়েগুলা এক একটা অসভ্য। কিছু হতে না হতেই ডিভোর্স মোবাইলে কি যেনো এপস টেপ্স এসে মেয়েগুলারে বাজে বানায়া দিসে। এগুলা ব্যবহার করলে মেয়েরা ১০০ বেটার সাথে কথা বলতে পারে। যত্তসব ফালতু মেয়েরা। সব ডিভোর্স এর পেছনে এই মেয়ে মানুষই দায়ী। আমার মুখ দিয়ে আর কথা বের হলো না। আপাও দেখলাম সাথে তাল দিচ্ছে। অথচ তাদেরও একটা ১৪ বছরের মেয়ে আছে। তবুও মেয়েদের প্রতি তার ধারণা এমন। আমার হাত পা কাঁপা শুরু করলো। আমার তো বাবামা নাই। তাহলে আমি যাবো কার কাছে? থাকলেই বা তারা কি আমাকে বুঝতো? বুঝতো যে আমি চেষ্টা করেছিলাম। হয়ত বুঝতো না। ডিভোর্সি মেয়েরা শুধু মাত্র কলঙ্ক আর কিছুনা। কিসের জন্য ডিভোর্স হলো সেটা কেউ দেখতে যায় না। এই ভাবনায় আমি মাথা ঘুরিয়ে পরে যাই।
জ্ঞান আসার পর দেখলাম আপা কান্না করছে। আমি চোখ খোলার সাথেসাথে আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করলো। – আহারে আমার বোনটার কপাল কি খারাপ রে আল্লাহ। কত ভালো একটা জামাই ছিলো রে। আল্লাহ তারেও নিয়া গেলো রে। আমি একটু চমকে উঠলাম। মানে কি এর? আমি আপাকে জিজ্ঞাসা করলাম- কি হইসে? আপা বলল – অফিস থেকে বাসায় ফেরার সময় কোন কুত্তারবাচ্চা যেনো গাড়ি দিয়ে চাপা দিয়ে গেছে রে তোর বরকে। আল্লাহ ওর বিচার করুক। আমার বোনকে বিধবা বানাইসে। আমি কেন যেনো কাঁদতে পারলাম না। অপরিচিত মানুষ মারা গেলেও আফসোস লাগে। কিন্তু আজ লাগছে না। আপা আমাকে বলল
– তুই চিন্তা করিস না। আমরা আছি তো। তুই শুধু মাথায় ওরনা দিয়া নে। আমরা লাশ দেখতে যাবো।
আমি এতক্ষণে বুঝতে পারলাম আমার কেন আফসোস হচ্ছে না। আমার আফসোস এজন্য হচ্ছে না যে এই সমাজে অসভ্য কারো সংসার ছেড়ে আসলে মেয়েরা খারাপ। ওই একই সমাজে অসভ্য স্বামী মারা গেলে বিধবা মেয়েটাকে খুব সহমর্মিতা দেখানো হয়। এই অসভ্য সমাজ আজ আমাকে এতটাই নিথর করেছে যে আমার স্বামী মারা যাওয়াতেও আমার কোন কষ্ট হচ্ছে না। আমাকে অন্তত দুদিন পর ডিভোর্স লেটার হাতে পাওয়ার পর শুনতে হবে না “ওরই সব দোষ”

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত