সিংগেল মাদার

সিংগেল মাদার
২বছর পরে আজ আবার লগ ইন করলাম।একটা দরকারি কাজে মেইল বক্স চেক করার সময় ফেসবুকের নোটিফিকেশন দেখে মনে পড়লো আমিও আগে এই নীল সাদার দুনিয়ার বাসিন্দা ছিলাম! রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস টাও আজই বদলালাম..”Married ” থেকে এই “divorced” হওয়ার রাস্তাটা কতো রঙেই না রঞ্জিত!বিয়ের পরের সব ছবি প্রথমে “only me” করলেও পরে মনে পড়লো প্রতিবছর একদিনে কারোর কথা মনে করে দিন খারাপ করতে চাইনা।স্বপ্নের মত সেসব দিনের শেষ ডিলিট অপশন দিয়েই শুরু হোক! ইনবক্স ভর্তি হাজারটা পরিচিত-অপরিচিত মানুষের ম্যাসেজ!সবারই প্রায় কমন প্রশ্ন!কমন নিউজ পোর্টালের সেই বিধস্ত আমার ছবি সেদিন যখন আমায় বারান্দার দরজা কেটে বের করে,প্রতিবেশীদের পাশাপাশি সামনের বিল্ডিং এর সাংবাদিক ভাইটাও ছিল।তার ক্যামেরায় তোলা একটা ছবি সাথে “স্বামীর হাতে নির্যাতিত গৃহবন্দী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে উদ্ধার” -শিরোনামই তো চেনালো আমায়!
শুরুটা অনেক আগে থেকেই!ভাইয়ের বন্ধুর সাথে এরেঞ্জ ম্যারেজ আমার।বিয়ের ২মাস পরই এমএস করতে জার্মান উড়াল দেয় সে..আমি তখনো হলে থেকেই ক্লাস করি!মাঝে মাঝেমধ্যে যাই আম্মার কাছে!সেও চাইতেন তার বউমা পড়ুক।সে দেশে আসে প্রতি উইন্টারে!স্বপ্ন ভাঙা শুরু অনার্স ফাইনালের মাস দেড়েক আগে..আম্মা চলে গেলেন আমায় একা করে দিয়ে!তার মা মারা যাওয়ার পরে বদল শুরু হলো তারও!একটা সময় গিয়ে বুঝলাম সে শুধু ভাল সন্তানই ছিল..ভাল স্বামী আর হতে পারেনি! কিছুদিন পরে সেটেল হলো দেশে..সব তো চল্লো চোখের সামনেই!ভাইয়ার বন্ধু সাথে আমার বাসার সকলের প্রিয় জামাই।
আমিই বা কোন মুখে আবার বৃদ্ধ মা-বাবার ঘাড়ের বোঝা হই! মাস্টার্সে ভর্তি হওয়ার পরে জানলাম আমার অস্তিত্বের কথা!৪ মাস তার বয়স তখন..তাকে বল্লাম “এবার একটু এসব বাদ দাও..ভাল বাবা হয়ে দেখাও একবার!” তার হুংকার “বাচ্চা কালই নষ্ট করবি..নয়তো তোর একদিন কি আমার” পাশে দাঁড়ানো তার শততম প্রেমিকা,যার হাতে আবার লাল রঙের বোতল! হাজার চেষ্টা করেও যখন সে হসপিটাল পর্যন্ত নিতে পারলো না,একটা ঘরে বন্দি করে ফেল্লো আমায়!মেইন গেইট লাগানোর আগে আরেকবার হুংকার দিয়ে বলে গেলো “খাবার আর পানি ছাড়া কয়দিন বাঁচিস দেখবো আমি!যেদিন তোর বাচ্চাটা নষ্ট হবে,সেদিন এই দরজা খোলা পাবি” ২টা দিন ট্যাপের পানি আর এই আশায় বসে ছিলাম সে আসবে!ভালবাসার এতো কথাও বুঝি মিথ্যে হয়!!!
যেদিন বুঝলাম মিথ্যে ছিল তার ভালবাসা আর সত্যি ছিল তার হুংকার কাগজের টুকরো ছিড়ে জানালা দিয়ে ফেলতে লাগলাম..একদিন-দুইদিন..চিৎকার করার শক্তি ছিল না!কোন এক আসুরী শক্তি দিয়ে শুধু পৃষ্টার পর পৃষ্টা “হেল্প” সাথে ফ্লাট নাম্বার লিখে জানালা দিয়ে ফেলে দিলাম দরজা ভেঙে যেদিন আমায় উদ্ধার করে কোন সেন্স আমার ছিল না!অস্ফুট আলোয় শুধু দরজা ভাঙার শব্দ আর কতোগুলা পায়ের আওয়াজ শুনেছি!সেন্স যেদিন ফিরলো সেদিন পাশে বসে কাঁদছে আমার ভাই আর ভাবী!কত শত অভিযোগের মাঝে ভাইয়া বলেছিল “তোর চেয়ে বেশি বিশ্বাস আর কাউকে কক্ষনো করিনি বোন..ভাবলি কি করে তোর উপরে আমি ওই জানোয়ারটাকে বিশ্বাস করবো!” মাস্টার্স পরীক্ষা দিলাম ক্যারিয়ারে আমার ৬ মাসের মৃন্ময়ী!সেওও তো এক যোদ্ধা!৯মাসে জন্ম তার আন্ডার ওয়েট..আশা ছেড়ে দিয়েছিল ডাক্তারও..তবু সে তার মায়ের মতোই হয়ছে!মেয়ে আমার বড্ড শান্ত..এই যে পরীক্ষা দিলাম তাকে কোলে বসায়, ঘুম ভাঙার পরে একবারও চিৎকার দিয়ে কাঁদেনি সে মা বলেছিল এক্সামের কয়েক ঘন্টা মৃন্ময়ী কে তার কাছে দিতে..সাহসে কুলায়নি পাশ থেকে কেউ টান দিলে আমার বৃদ্ধা মা যদি না পারে আকড়ে ধরতে?
মৃন্ময়ী এখন ১১ মাসের..এই কয় মাসে সবচেয়ে বেশি কাছে পেয়েছি আমার মা-বাবা, ভাই আর ভাবীকে..এই ৪জন না থাকলে হয়তো মৃন্ময়ীর মাইই হইয়ে উঠতে পারতাম না! ওহহ হ্যা!আমার চাকরি হয়েছে পার্বত্য এক জেলার ছোটখাটো স্কুলে..সেই মেইল পেয়েই তো মেইল বক্স চেক করা! এখন থেকে ফেসবুকে নিয়মিত হবো!মেয়ে আর মায়ের হাসিমাখা যুদ্ধের ছবি দিবো তবে রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস টা “ডিভোর্সি ” নয়, “সিংগেল” ই দিলাম! আজ থেকে আমার একমাত্র পরিচয়, আমি মৃন্ময়ীর “সিংগেল মাদার”

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত