ফাঁকা পকেটের যাত্রী

ফাঁকা পকেটের যাত্রী
লোকাল বাসে মুক্তারকে কোনদিনও ভাড়া দিতে দেখিনি। কনট্রাক্টরকে ফাঁকি দেয়া ওর কাছে ডালভাত। কেন ভাড়া দিস না? প্রশ্ন করলে উত্তরে বলে, আরে ব্যাটা এটা একটা চ্যালেঞ্জ। এই ধর আমি শনির আখরা থেকে মোহাম্মদপুর যাব। ভাড়া ছাড়াই যাব, এটা আমার কাছে চ্যালেঞ্জ। যখন চ্যালেঞ্জ জয় করে মোহাম্মদপুর নেমে পড়ব, নিজেকে গরীবের আলেকজান্ডার ভাববো। পুরা লাইফটাই তো চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া ওরা কত জনের কাছেই তো ফাঁপরবাজি করে বেশি ভাড়া নেয়। আমি ফাঁকি দিয়ে ব্যালান্স করছি বুঝলি।
– কিন্তু এটাতো অবৈধ কাজ। পাপ কাজ।
– ধুর, পাপ পূণ্য দেখে লাভ আছে? আমি চ্যালেঞ্জে বিশ্বাসী।
– তোর কী মনে হয় কোনদিনও ধরা খাবি না?
– এতদিনেও যখন পড়িনি, আর পড়বোও না।
ওর সাথে তর্ক করে লাভ নাই ভেবে চুপ হয়ে গেলাম। শুধু আমি না, আমার সার্কেলের সব ফ্রেন্ডই ওর ভাড়া মেরে দেয়ার সাক্ষী। চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী। একদিন মুক্তারের এই অকৃত্রিম প্রতিভা নিয়ে গল্প হচ্ছিল। সবার চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা ছিল এমন- কনট্রাক্টর ভাড়া চাইতে এলে সে কানে হেডফোন লাগিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে জানালার দিকে তাকায়। ভাড়া হইছে? ভাড়া দ্যান। এমন প্রশ্নের উত্তরে সে হালকা হাত অথবা মাথা নাড়ায়। এর মাঝে হ্যাঁ, না দুটোই বোঝায়। কনট্রাক্টর কনফিউজড হয়ে চলে যায়।
কাছে হেডফোন না থাকলে মোবাইলটা কানে ধরে নিজের সাথে কথা বলতে থাকে আর মাথা ও হাতের সিগন্যাল দেয়। বেশিরভাগ সময় সিট চেঞ্জ করে করে বসে। ভাড়া চাইলে বলে, ওই পেছনের সিটটাতে বসেই তো ভাড়া দিলাম একটু আগে। কোন জায়গা থেকে কোন জায়গার ভাড়া কত, এটি ওর ঠোটস্থ। তাই কনট্রাক্টর যদি বলে, কয় টাকা ভাড়া দিছেন, ধরার উপায় নাই। মাঝে মাঝে স্টাফ পরিচয় দেয়। বাস কোম্পানীর মালিক সমিতির নেতা কাঁথাদের বিভিন্ন ভিজিটিং কার্ড দেখিয়েও বেঁচে যায়। কখনো কখনো বেশি লোক বাসে উঠলে কনট্রাক্টরকে বলে, পঞ্চাশ টাকা দিলাম, দশ টাকা ফেরত দাওনি তো, দাও দশ টাকা দাও, ইত্যাদি বলে উল্টা ভাড়া আদায় করে।
কনট্রাক্টরের স্মৃতিশক্তি প্রখর হলে সে বলে দেয়, লাস্ট স্টপেজে নামবো, পরে দিচ্ছি। এই বলে মাঝপথে সটকে পড়ে।
কিছু কিছু কনট্রাক্টর ও হেল্পার খুব নাছোড়বান্দা। এদের সাথে যুদ্ধ না করে, টাকা নাই বলে বাস থেকে নেমে যায়। এরপর আবার অন্য বাসে ওঠে। কখনো বলে টাকা এক হাজার টাকা নোট। অন্যদের ভাড়া তোলো, পড়ে দিচ্ছি। সেই পরে আর আসে না। মাঝপথে সটকে পড়ে। কখনো কখনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাসে উঠে সেই প্রতিষ্ঠানের ছাত্রের ভান ধরে ফ্রিতে যায়। কোন দাওয়াতের অনুষ্ঠানে যেতে পরনে ফরমাল ড্রেসে থাকলে সাহস করে স্টাফদের বাসেই উঠে পড়ে। মাঝে মাঝে পুলিশ অথবা বড় নেতার ছোট ভাই পরিচয় দিতেও দ্বিধাবোধ করে না।
এখন আবার করোনাভাইরাস এর বদৌলতে মাস্কের পুরা সুবিধা নিচ্ছে সে। একটু কনফিডেন্টলি ‘ভাড়া! দিছি তো’ বললেই কনট্রাক্টর ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সরে যায়। তার ধ্যান জ্ঞান হল যত যাই হোক ভাড়া সে দিবে না। কেন জানি তাকে দেখে কেউ সন্দেহই করে না। দুনিয়ায় এমন অনেক মানুষ আছে যারা বহু অপকর্ম করে তবুও ধরা পড়ে না। মুক্তার হয়ত তাদেরই একজন। কারো অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে আলোচনা করার মত মজা আর নাই। আমি হঠাৎ বলে উঠলাম, মুক্তার কই? আরেক বন্ধু বলল, ফোন দে। ফোন দিলাম। রিসিভ করল অন্য কেউ। অচেনা কণ্ঠ বলে উঠল, আপনি মুক্তারের কে হোন? আমি বললাম, কে আপনি? আমি ওর ফ্রেন্ড, ও কই? অচেনা কণ্ঠ বলল, বাটপারটা পিলারের সাথে হাত পা বাঁধা অবস্থায় আছে। জরিমানা দিয়ে খুলে নিয়ে যান।
– কেন? কী করেছে সে?
আগে আসুন, গাবতলী টার্মিনালে। এই বলে লাইনটা কেটে দিল। আর রিসিভ করল না। আমি বন্ধুদের বললাম ব্যাপারটা। বুঝলাম শালা নিশ্চয়ই এবার ধরা খাইছে। খারাপ হলেও কী করার। হাজার হলেও বন্ধু তো। আমরা গেলাম দুইটা সিএনজি ভাড়া করে। ফোনে লোকেশন নিয়ে জায়গামত হাজির হলাম। গিয়ে দেখি সে পিলারের পাশে বসে একটা বেঞ্চে বসে দিব্যি সিগারেট টানছে আর আকাশমুখে ধোঁয়া ছাড়ছে। তার পাশে বসা অচেনা এক লোক। সম্ভবত এই লোকই ফোনে কথা বলেছে। আমি মুক্তারকে জিজ্ঞেস করলাম, ঘটনা কী? মুক্তার অচেনা লোকটির দিকে তাকিয়ে বলল, দেখলেন ভাই? প্ল্যান সাকসেসফুল।
আমরা ওদের কথার আগা মাথা কিছুই বুঝলাম না। মুক্তার বলতে লাগল, আজকের দিনটি আমার কাছে বিশেষ দিন অনলি দুইটি কারণে। প্রথমতঃ আজ আমার ভাড়া মেরে দেবার এক হাজার তম দিন। দ্বিতীয়তঃ আজ আমার মতাদর্শেরই নতুন একজনকে বাসের মধ্যে আবিষ্কার করেছি। ইনি হলেন তিনি। আজ তারও নাকি এক হাজার তম দিন। অল্প পরিচয়েই আমরা প্ল্যান করলাম, আমাদের এত বড় একটা অর্জন, সো সেলিব্রেশন করব না তাই কী হয়! কিন্তু কীভাবে করব মাথায় আসছিল না। এরই মধ্যে তুই ফোন দিলি। কেন যেন রিসিভ করে মিলি সেকেন্ডেই অটো প্ল্যান হয়ে গেল! আর তোদেরকে সিস্টেমে নিয়ে এলাম এখানে। কথাগুলো শুনে আমাদের মেজাজ তো গরম হয়ে গেল। রাকিব তো রেগে অস্থির, পারলে মুক্তারকে ধরে সত্যিকারভাবেই পিলারের সাথে বেঁধে রাখে। শালা তুই আমাদের দুইটা সিএনজি ভাড়া করাইতে বাধ্য করছস। আর এহন ফাইজলামি করতাছোস? মুখে যা আসে তাই বলতে লাগল রাকিব।
আমি রাকিবকে নিবৃত্ত করে মুক্তারকে বললাম, ওকে। তো এত বড় অর্জন তোর। কী আয়োজন করেছিস? দাওয়াত দিয়ে আনলি আমাদের। কি খাওয়াবি বল? মুক্তারের চোখে মুখে কোন রাগ নেই। আমাদের মেজাজ মেশানো কথা মনে হয় ওর খুব ভাল লাগছে। সিগারেটে শেষ টান দিয়ে মুচকি হেসে ভ্রাম্যমান চা বিক্রেতাকে বলল, চা। এই মামা চারটা চা আটটা কাপে দাও। আজ আমি শপথ নিয়েছি আজ শুধু চা খাবো, আর কিছু খাবোও না, খাওয়াবোও না। বলা শেষ করে অচেনা লোকটির কাঁধে হাত রেখে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, আরেকটা ভাল শপথ নিয়েছি, আজকের পর থেকে যাওয়া অথবা আসা, যেকোন একটার ভাড়া দেবো।
এই বলে হাহা করে হাসতে লাগল। আমি বললাম, দুটোর ভাড়া দিবি কবে থেকে? মুক্তার বলে উঠল, দুই হাজার তম দিনে। আমার মনের কথা রাকিবই বলে দিল, ক্যান যে এত দূর পড়ালেখা করলাম! আরেকবার জন্ম নিলে তোরে সাইজ করার জন্য আমি বাসের কনট্রাক্টর হয়েই জন্ম নিতাম। ওর কান্ডজ্ঞান দেখে রাগ করতেও বিরক্ত লাগছে। মানুষ এতটা সাইকো হয় কী করে!
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত