বাস স্টপের অতিথি

বাস স্টপের অতিথি
রোজ সকাল পৌঁনে আট’টায় বাস স্টপে দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করা, তারপর বাস এলে অফিসে কাজের জন্য ছোটে হিমানী। সারাদিন অফিস শেষে সন্ধ্যায় ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরা হিমানীর মুখে তবুও হাসি লেগে থাকে। দেখে মনে হয়, কেউ যেন তার মুখে হাসিটা এঁটে দিয়েছে। পরিস্থিতি যেমনই হোক, হাসি ঠিক থাকে। হিমানীর পরিবার বলতে তার মা আর ছোট দুই ভাই-বোন।
বাবা মারা যাওয়ার পরে পরিবারের দায়িত্ব তার মাথায়ই এসে পড়ে। নিজের কথা ভুলে হিমানী দিনরাত খেটে চলে পরিবারকে ভালো রাখতে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরলে ছোট বোন হেনা এসে পাশে দাঁড়ায়। নরম স্বরে ডাক দেয়, ‘আপা?’ হেনার ডাক শুনেই হিমানীর মনে পড়ে, আগামীকাল কলেজে ওর পরিক্ষার ফি দেওয়ার শেষ তারিখ। হিমানীর জুতাটা ছিড়ে গিয়েছে। সেলাই করে এতদিন চালিয়ে দেওয়া গেলেও এখন আর হচ্ছে না। ব্যাগটার অবস্থাও খারাপ। নতুন এক জোড়া জুতা আর একটা ব্যাগ কেনার জন্যই বেতন থেকে কিছু টাকা আলাদা করে রেখে দিয়েছিল হিমানী।
সেই টাকাগুলো হেনার হাতে দিয়ে হেসে বললো, ‘এই নে টাকা। কাল জমা দিয়ে দিস।’ চোখে মুখে আনন্দের রেখা ছড়িয়ে যায় হেনার। টাকাগুলো হাতে নিয়ে দেখে ফি থেকে দুইশত টাকা বেশি আছে। ‘আপা, এখানে দুইশত টাকা বেশি রয়েছে।’ হিমানী এক গাল হাসি দিয়ে বলে, ‘ওটা তুই রেখে দে। কিছু কেনার দরকার হলে কিনিস কিংবা কিছু খেতেও পারিস।’ হেনা খুশি হয়ে হিমানীকে জাপটে ধরে। হিমানীর চোখে জল জমে। আনন্দের জল। নতুন জুতা আর ব্যাগে এই আনন্দ সে পেত না, ভাবতে খুশি আরও বেড়ে গেল। এই খুশির জন্য ছেড়া জুতা আর ব্যাগ ব্যবহার করেও কাটিয়ে দিতে পারবে সারাজীবন, হিমানী চোখ মুছতে মুছতে ভাবছে এসব।
শহর জুড়ে বেজায় বৃষ্টি। বর্ষাকাল ছাড়াও যখন তখন ঝুম করে ঝরে পড়ে ঘন বরষা। এমনও বরষার মাঝে বিপদে পড়ে এহসান আশ্রয় নিয়েছে বাস স্টপে। লেখাপড়া শেষ করে দেশে ফিরে বাবার ব্যবসা দেখাশোনার দায়ভার গ্রহণ করেছে সে। ব্যবসার কাজের জন্যই চট্টগ্রাম এসেছে এহসান। কপাল খারাপ বলেই হঠাৎ গাড়িটা নষ্ট হয়ে যায়।
ড্রাইভার রাস্তার কয়েকজনকে নিয়ে গাড়ি ঠেলতে ঠেলতে গ্যারেজে গিয়েছে। বাস স্টপে যাত্রী ছাওনিতে চুপচাপ বসে আছে এহসান। কিছুক্ষণ বাদেই তার পাশে এসে বসে এক মেয়ে। দেখতে অনিন্দ্য সুন্দরী নয়, পোশাক দেখে বোঝাই যায় নিশ্চিত খুব সাধারণ পরিবারের মেয়ে। কেন যেন ওই মুখটাতেই দৃষ্টি আটকালো এহসানের। মেয়েটির দুই কানের পাশ দখল করে কিছু কোঁকড়া চুল বেয়ে নামছে ঘাড় অব্দি, কাজল লেপ্টে যাওয়া চোখ ভরা মায়া, ঠোঁট জুড়ে অস্পষ্ট হাসির রেখা খেলা করে, সরু নাকটায় সিলভার রঙের সুন্দর একটা নাকফুল। এহসান মনে মনে ভাবছে, ‘মেয়েটার কি নাম হতে পারে? অনিন্দিতা নাকি মায়াবতী?’ এমন সময় অন্য এক মেয়ের আগমন। কথোপকথন শুরু হলো সদ্য আগত মেয়েটির আর নাম না জানা মেয়েটির মাঝে।
‘হিমানী, তুই কখন এলি? আজ যা বৃষ্টি। ছাতা আনতেই ভুলে গিয়েছিলাম। ভাগ্যিস এক ভদ্রলোক তার ছাতার নিতে আশ্রয় দিলেন।’ ‘ওহ্! আজকাল তাহলে ভদ্রলোকদের ছাতার নিচে আশ্রয় খোঁজা হয় বুঝি?’ দুষ্টমি মিশ্রিত হাসি হেসে বললো হিমানী। ‘ধুর! কিসব বলিস না তুই!’ আট’টা বাজতে এখনও দশ মিনিট বাকি৷ হিমানী পনেরো মিনিট আগেই এখানে এসে বসে থাকে। বাস স্টপে বসে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে তার বেশ ভালো লাগে। বাড়ির মত বাস স্টপটাও তার আপন মনে হয়।
এহসান ‘হিমানী’ নামটা মস্তিষ্কে ভালেভাবে এঁটে নেয়। কিন্তু এত বড় শহরে শুধু নাম দিয়ে একটা মানুষকে তো পরবর্তীতে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়৷ প্রয়োজন আরও কিছু জানার। সেই জানার আগ্রহ থেকেই এহসান হিমানীর সঙ্গে আলাপ জমানোর প্রচেষ্টা চালায়। ‘আপনারা কি দয়া করে বলতে পারবেন আশে পাশে কোথায় গ্যারেজ আছে?’ হিমানীর পাশের মেয়েটাই উত্তর দিলো, ‘মিনিট দশেক সামনে হেটে গেলেই একটা গ্যারেজ পাবেন।’ ‘ধন্যবাদ। আমি আসলে এই শহরে প্রথমবার এসেছি তাই রাস্তাঘাট সম্পর্কে ধারণা নেই। গাড়িটাও নষ্ট হয়ে গেল, ড্রাইভার সম্ভবত ওখানেই গিয়েছে।’ কথায় কথায় দশ মিনিট শেষ হয়ে গেল। কিন্তু হিমানীর সঙ্গে একটা কথাও এহসানের হলো না। বাস এলে তারা দু’জন উঠে পড়লো। আফসোস নিয়ে বসে রইলো এহসান। তবে একটা তথ্য সে জানতে পেরেছে, এখান থেকেই ওই মেয়েটার সঙ্গে হিমানীও রোজ বাসে যাতায়াত করে। আপাতত এটাই সান্ত্বনা।
গাড়ি চলে এলে এহসানও চলে যায়। কিন্তু পরদিন ঠিক একই সময়ে বাস স্টপে সে ফিরে আসে। বসে অপেক্ষা করতেই দেখে হিমানী চলে এসেছে। কথা বলার নানা বাহানা বের করেও কাজে লাগাতে পারেনি একটাও সে।
পরদিন আবার এলো। চুপচাপ হিমানীর দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছুই বলার মত খুঁজে পায় না সে। হিমানীর সাথের মেয়েটার চোখ এড়ায় না বিষয়টা। কিন্তু হিমানী এসবে একদম পাত্তা দেয় না। পরদিনও একই ঘটনা। চুপচাপ এসে চলে যাওয়া। দশ দিনের জন্য চট্টগ্রামে আসা এহসানের। তাকে এই দশদিনের মধ্যেই যা কিছু করতে হবে। এমন চিন্তা নিয়েই তৎপর হয় এহসান। এইকয়দিনে এহসান বেশ বুঝেছে, সে হিমানীর প্রেমে পড়েছে। ক্লান্ত হিমানী বাড়ি ফিরে দেখে ছোট ভাইটা মুখ গোমড়া করে বসে আছে। তার মাকে জিজ্ঞেস করলে জানায়, আলুভাজি আর ডাল দিয়ে ভাত খাবে না বলে রাগ করে বসে আছে। হাসি মুখ নিয়ে ছোট ভাইয়ের কাছে এগিয়ে যায় হিমানী।
‘আমারও না আলুভাজি আর ডাল একদম পছন্দ নয়। তবে একটা বিষয় কি জানিস ছোটু? আলুভাজি আর ডাল দু’টো ভাতের সাথে একসঙ্গে মাখিয়ে খেতে কিন্তু দারুন লাগে। আমার কাছে তো বেশ লাগে।’ ছলছল চোখে হিমানীর ছোট ভাই বলে, ‘রোজ রোজ এসব দিয়ে খেতে আমার একদম ভালো লাগে না।’ কথাটা হিমানীর বুকের ভেতরটায় গিয়ে লাগে। চোখ জোড়া ছলছলিয়ে ওঠে তার। নিজেকে সামলে হাসি মুখে বললো, ‘ছোটু, কাল আমরা খিচুড়ি আর মুরগির গোশত খাব। আজ সবাই মিলে মজা করে আলুভাজি আর ডাল খেয়ে নিই কেমন?’ মাথা নাড়ে হিমানীর ছোট ভাই। তারপর সবাই মিলে খেতে বসে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে হিমানী। পরদিন সকালে আবার বাস স্টপে আসে এহসান।
হিমানী আজ একটু তাড়াতাড়ি চলে এসেছে। এহসানের দিকে চোখ পড়তেই চোখ সরিয়ে নিয়ে না দেখার অভিনয় করে অন্যদিকে তাকায় হিমানী। এহসানকে তার বেশ ভদ্রলোক বলেই মনে হয়৷ একটু অগোছালো কিন্তু মানুষটাকে তার খারাপ মানুষ বলে মনে হয় না। এহসান এগিয়ে আসে হিমানীর দিকে। ‘আপনার সঙ্গে পরিচিত হতে পারি?’ হিমানী ভ্রু উঁচু করে বললো, ‘আমার সঙ্গে কেন?’ ‘ভেবেছি, এই শহরে একজন বন্ধু করে যাব। যে বন্ধুর টানে হলেও শহরটাকে দেখতে মাঝেমধ্যে ছুটে আসবো। আসলে শাহরটাকে এ’কদিনে ভালোবেসে ফেলেছি। ভালোবাসাটা ধরে রাখতে চাই।’ হিমানী বেশ বুদ্ধিমতী মেয়ে। হেসে প্রশ্ন করলো, ‘বন্ধুর টানেই কেন আসতে হবে, শহরের টানে কেন নয়?’
‘শহরের যে সঙ্গ দেওয়ার ক্ষমতা নেই। তাই।’
‘ভালোবেসেছেন, এটাই তো যথেষ্ট কারণ। সঙ্গের প্রয়োজন কেন?’
‘তাড়া অনুভব করার জন্য।’
‘আপনার সঙ্গে কথায় পারা মুশকিল।’
‘হার মেনে নিলে, পরিচিত হতে হবে।’
‘আমার সময়ও নেই অত, আপনার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার।’ হিমানীর হাসিমুখের উওর।
‘তাহলে শুরু করা যাক। আমি এহসান। ঢাকার মানুষ। ব্যবসার কাজে আপনার এই সুন্দর শহরে পদার্পণ।’
‘হিমানী। সামান্য একটা চাকুরি করি।’
‘তাহলে আমরা একে অপরকে বন্ধু বলে ভাবতে পারি?’
‘বন্ধুর ক্ষেত্রে আমাকেই কেন নির্বাচন করলেন?’
‘এই শহরে প্রথম দেখা তো আপনার সঙ্গেই। আর কেন যেন আপনাকে আপন মনে হয়।’
‘বুঝলাম।’
‘তাহলে কী আমরা বন্ধু?’
‘এত তাড়াহুড়ো কেন?’
‘আমি মনে করি, যা হওয়ার তা একদিনেও হতে পারে। আর না হলে হাজার দিনেও হবে না।’
‘ভালো বলেছেন। ভেবে দেখবো বাস স্টপের অতিথি।’
‘বাস স্টপের অতিথি! দারুণ নাম দিলেন আমার। তবে ভাবতে বেশি সময় না নিলে ভীষণ খুশি হবো।’ হেসে ওঠে এহসান। বাস চলে এলে উঠে পড়ে হিমানী। পরদিন আবার দেখা দু’জনের। আলাপের পর আলাপ জমে। বাস এলে হিমানীর সঙ্গে এহসানও উঠে পড়ে। এভাবেই চলছে দিন। দশদিন ফুরিয়ে এলে এ শহর ছেড়ে বিদায় হয় এহসান। যাওয়ার সময় হিমানী’কে কথা দিয়ে যায়, সে ফিরবে খুব শীঘ্রই। কয়দিনে বেশ ভালো সম্পর্ক গড়ে দু’জনের। সম্পর্কের নাম বন্ধু।
বাস স্টপে শূণ্যতা অনুভব করে হিমানী। অথচ এর আগে কখনও সে ভাবেও নি, আপন মনে হওয়া এই বাস স্টপ’টা একদিন খালি খালি লাগবে। মন বসবে না এখানে, ভেতরটা ছটফট করবে। এই অস্থিরতা এহসানের জন্য নাকি অন্য কোনো কারণ! খুঁজে পায় না হিমানী। কথা রাখে এহসান, ফিরে আসে সে আবার এই শহরে। অস্থিরতা কাটে হিমানীর। মুখে হাসি ফুটে তার, প্রশান্তির সে হাসি। ‘আমাকে ভালোবাসবে হিমানী? যেমন এই বাস স্টপ’টাকে বাসো।’ চুপ করে থাকে হিমানী। ভেতরে সেও টের পায় এহসানের প্রতি তার গভীর অনুভূতি। গম্ভীর কণ্ঠে বলে, ‘বামন আর চাঁদের গল্প তৈরি করাটা বড্ড অনুচিত হবে।’
‘আমরা সবাই মানুষ হিমানী।’
‘তবুও মানুষে মানুষে ঢের পার্থক্য।’
‘ভালোবাসায় এতো হিশেব কষতে নেই।’
‘শেষে যদি গড়মিল হয়?’
‘এতসব একা ভেবো না। আমার জন্যও কিছু তুলে রাখ। একটু তো বিশ্বাস করতেই পারো।’
কথায় হেরে যায় হিমানী৷ ভালোবাসার জালে আঁটকে যায় সে। নিজেকে নতুন এক হাসিখুশি মানুষে আবিষ্কার করে। হিমানীর দুর্গম পথে সঙ্গী হয়ে আসে এহসান। ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখে তাকে। দিন ফুরায়, নতুন দিন আসে। এহসানও সময় ফুরালে শহর ছাড়ে আবার ফিরে আসে। এ শহরের বিভিন্ন অলিতে গলিতে জমে ওঠে দু’জনের প্রেম। অতিথি থেকে আপনজনে রূপান্তর হয় এহসানের।
‘তোমার দুঃখগুলো আজীবনের জন্য আমায় দিবে? আমি ওগুলো নিশ্চিহ্ন করতে চাই।’ বুঝে উঠতে পারে না হিমানী। দৃষ্টি স্থীর করে তাকায় এহসানের চোখে। ‘আমায় তুমি বিয়ে করবে হিমানী?’ চুপ হয়ে যায় হিমানী। আনন্দে বাকরোধ হয়ে যায় তার। চোখে খুশির জল জমে। হিমানীর বাড়িতে হিমানীর মা প্রতিদিন বিয়ের কথা তোলেন। নানা বাহানায় তা এড়িয়ে যেতে হয় হিমানীকে। এখন সে প্রশান্তি পাচ্ছে, ভরষার এই শক্ত হাতের জন্যই হিমানী এতদিন অপেক্ষায় ছিল৷ অবশেষে বিয়ের কথা ওঠে দুই পরিবারে। হিমানীর মা তার মেয়ের চিন্তা আর বুদ্ধির উপর আস্থা রাখেন। মেয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিবে না তিনি জানেন। তবুও এহসানের বিষয়ে ভালোভাবে আরও একবার চিন্তা করার পরামর্শ দেন হিমানীকে।
এহসানের পরিবার কড়া স্বরে তাদের অমতের কথা জানিয়ে দিলেও এহসান কথা দেয় হিমানীকে, দুইদিন বাদেই তাকে নিয়ে যেতে বাস স্টপে আসবে এহসান। হিমানীর আনন্দ ধরে না। এত সুখের কথা কখনও কল্পনা করার সাহসও তার হয়নি। দুই দিন শেষে কাঙ্ক্ষিত সেই দিন চলে এলো। বাস স্টপে হিমানীর অপেক্ষার প্রহর শুরু। আজ আর বাসের জন্য নয়, এহসানের জন্য অপেক্ষা তার। প্রতি মুহুর্তে মনে হয়, এই বুঝি এহসান চলে এলো। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গাড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। এহসান আসে না। মুঠোফোনেও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। অতঃপর রাত নেমে এলো। বাস স্টপ ছেড়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ায় হিমানী৷ বারবার মনে হয় তার, কেউ যেন এক্ষুণি তাকে পেছন থেকে ডাক পাড়বে। কিন্তু না, কেউ ডাকে না৷
রোজ হিমানীর অপেক্ষায় কাটে, একটা ফোনকল কিংবা একটা মানুষের আগমন বার্তার। কিন্তু কেউ আসে না, আসে না ফোনকল অথবা কোনো খবর। বাস স্টপে বাসের থেকে এহসান আসার অপেক্ষাটাই যেন বেশি থাকে হিমানীর। তারপর নয় বছর। নয় বছরে পরিবর্তন হয় অনেক কিছুর৷ কিন্তু বাস স্টপ’টা সেই একই রয়ে যায়। হিমানী চুপচাপ বসে আসে সেখানে। পরনে দামি শাড়ি, চোখে চশমা, হাতে স্বর্ণের বালা, দামি মুঠোফোন। কিন্তু মুখে সেই এঁটে থাকা হাসিটা নেই। পাশে তার পাঁচ বছরের মেয়ে বসে চিপস খাচ্ছে। প্রায়ই মেয়েকে নিয়ে এখানে ঘুরতে আসে সে। হঠাৎ বৃষ্টি। ঝুম বৃষ্টি। মেয়েকে কাছে টেনে নিতেই মুঠোফোনে রিংটোন বেজে ওঠে। ফোনের দিকে তাকাতেই দেখে তার মায়ের ফোনকল।
‘কোথায় তোরা? কখন আসবি? বৃষ্টি হচ্ছে তো।’ ওপাশ থেকে হিমানীর মায়ের চিন্তিত প্রশ্ন।
‘এই তো তোমার জামাই গাড়ি নিয়ে এলেই চলে যাব। তুমি চিন্তা করো না। হেনা আর ছোটু বাড়ি ফিরেছে তো?’
‘হ্যাঁ ওরা ফিরেছে। তোরা চলে আয়।’
মুঠোফোন রাখতেই হিমানীর মেয়েটা চেচিয়ে বলে উঠলো, ‘বাবা এসেছে। ওই যে ওখানে সাদা গাড়িটা থেমেছে।’
হিমানী গাড়ির দিকে তাকাতেই দেখে, এক ভদ্রলোক গাড়ি থেকে নেমে দৌঁড়ে বাস স্টপেই আসছে। ভদ্রলোক এসে দাঁড়ান তার পাশেই। মুখটা খুব চেনা হিমানীর৷ একটু পরিবর্তন হয়েছে অবশ্য। দাড়ি, গোফ যোগ হয়েছে আর বয়সের ছাপও কিছুটা লেগে আছে মুখে। ভদ্রলোক পাশ ফিরে তাকাতেই চোখে চোখ আটকায় দু’জনের। হিমানীর মেয়েটার মুখটা মলিন হয়ে গেল। তার প্রত্যাশিত ব্যক্তি আসেনি বলে।
‘কেমন আছো হিমানী?’ এহসানের প্রশ্নটা গিয়ে তীরের মত বিধলো হিমানীর হৃদপিণ্ডে। ঝাপসা হয়ে এলো চোখ। এত বছর যাবৎ খুঁজে বেড়ানো প্রশ্নটার উত্তর জানার জন্য অস্থির হয়ে উঠলো সে। ‘সেদিন এলে না কেন? হারিয়ে যাওয়ার কারণ কি ছিল?’ নিশ্চুপ হয়ে রইলো এহসান। চোখেমুখে তার অপরাধবোধ ছেয়ে আছে। খানিকক্ষণ চুপ করে থাকার পরে উত্তর দিল, ‘সেদিন যদি মা দাঁড়িপাল্লার এক পাশে তোমাকে আর অন্যপাশে তার আয়ুকে উঠিয়ে না দিত, তবে জীবনটা এই বাস স্টপের মত সুন্দর হতে পারতো। যদি সবকিছু মাড়িয়ে তোমার কাছে ছুটে আসতে পারতাম সেদিন, তবে হয়তো সময়গুলো আজ অন্যরকম হত।’ বলতে বলতে চোখ জোড়া টলমল করে উঠলো এহসানের। কথার স্বরও নিচু হতে লাগলো।
চোখ বেয়ে জল গড়ায় হিমানীর। জল মুছে বললো, ‘তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি। খুঁজেছি। ফলাফলে শূণ্যতা পেয়েছি কেবলই। মা ভাবলেন বিফলে যাচ্ছে সময়, সংসারের বোঝা চাপিয়ে দিলেন। ফেলতে পারি নি মায়ের কথা। আমার দরকার না হোক, মা আর ভাই বোন দু’টোর তো একটু শান্তির ছোঁয়া পাওয়ার অধিকার আছে। তবে বাস স্টপ’টাকে এখনও ভালোবাসি আগেরই মত।’ ‘মাফ চাওয়ার জন্য তোমাকে যখন খুঁজেছি তখন তোমাকে আর পাইনি। তাই সুযোগ হলে এই বাস স্টপে চলে আসি। যদি তোমার সঙ্গে কখনও দেখা হয়ে যায়, এই প্রত্যাশায়।’ হিমানী তার মেয়ের দিকে ইঙ্গিত করে বললো, ‘আমার মেয়ে।’ এহসান টলমল চোখে কান্না জড়ানো কন্ঠে হেসে বললো, ‘তোমার মতই দেখতে হয়েছে। ভীষণ মিষ্টি।’ গাড়ি চলে এসেছে। হিমানীর মেয়ে হেসে উঠে বললো, ‘ওই দেখ, বাবা আমাদের নিতে চলে এসেছে।’
হিমানী মলিন হাসি হেসে এহসানের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘তুমি আমার জীবনে এই বাস স্টপের অতিথি হয়েই রয়ে গেলে এহসান।’ এহসান চুপ করে তাকিয়ে রইলো। চেহারায় হাসির মুখোশ জড়িয়ে মেয়েকে সাথে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ে হিমানী। গাড়ি চলছে। বাস স্টপে দাঁড়িয়ে আছে এহসান। চোখ বেয়ে জল নামছে তার। নিজেকে একজন বাস স্টপের অতিথি হিশেবে মানতে খুব কষ্ট হচ্ছে তার।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত