সাহসী তনু

সাহসী তনু
-আম্মু তোমার বিয়ের শাড়িটা আলমাড়ি থেকে বের করে লন্ড্রীতে দিও… বিয়ের প্রোগ্রামে আমি ঐটা পড়বো।
-মানে? তুই বিয়েতে যাবি?
-হুম আমি যাবো। দুইদিনে লন্ড্রী থেকে শাড়ি দিবে তো?
-না গেলে হয় না।
-না আম্মু হয় না।
আমি বিয়ের কার্ডটা নিয়ে আমার রুমে চলে আসলাম। নীল সোনালী রঙ্গের কার্ড। ভিতরের নামটা খুব বেশি পরিচিত। একটু পর প্রিয় বান্ধবী ফোন করলো।
-হ্যলো তনু।
-কি দোস্ত? কেমন আছিস?
-আমি ভালো আছি। তুই বিয়েতে যাবি কেন?
-দাওয়াত পাইছি। যাওয়া উচিৎ না?
-না উচিৎ না। তুই যাবি না। বলে দিলাম।
-ধুর পাগল।
-দোস্ত আমি তোকে শক্ত দেখতে চাই। তুই ভেঙ্গে যাবি এটা মেনে নিতে কষ্ট হবে।
-আসলেও ভেঙ্গে পড়বো?
-হ্যাঁ …আমি চিনি তোকে।
-আচ্ছা দেখি কি করা যায়।
-কিছু দেখা দেখির নাই। তুই যাবি না বাস।
-হুম আচ্ছা আমার একটু কাজ আছে পরে কথা বলবো।
দুইদিন খুব ভাবলাম… যাবো নাকি যাবো না। গতকাল আমাকে কয়েকজন আদেশ উপদেশ ও দিলো। আমি যাতে বিয়েতে না যাই। আজ আমারো ইচ্ছা করছে না বিয়েতে যেতে। কয় রাত একেবারেই ঘুম হচ্ছে না।
না না কোন কষ্টে না। বরং এ ভেবে বিয়েতে গেলে কোন পার্লারে সাজবো। আমি তো আবার একা একা মেকআপ করতে পারি না। গেলে ধুমায়া একটা সাজ দিতে হবে। রাত পার হলে আগামীকাল রাতে বিয়ের দাওয়াত। রাতে হুট করে প্ল্যান হলো পরিবারের সবাই পিকনিকে যাবো ঢাকার বাহিরে। আমি জানি এই প্ল্যানটা আমার বাসার সবার… ইচ্ছা করেই করেছে যাতে আমি বিয়ের দাওয়াত খেতে না যাই অথবা আমার যেন কোন কারণে মন খারাপ না হয়। আচ্ছা কেউ কি বুঝতে পারছে না আমি ঠিক আছি। তেমন কষ্ট হচ্ছে না আমার। গতপরশু একটু বুকের বাম পাশটায় চিন চিন করছিলো। সে যাই হোক। সকাল সকাল সবাই মিলে ধরে বেঁধে নিয়ে গেলো পিকনিকে। সারারাত ঘুমাই নাই। ভোর বেলা উঠেই পিকনিকের জন্য রেডি হওয়া।
কি জ্বালারে বাবা। সম্পূর্ণ রাস্তা ঘুমাতে ঘুমাতে কাটলো। পিকনিক স্পটে গিয়ে সবাই আমার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। যেন পিকনিক করতে আসে নাই তারা এসেছে আমাকে মনোরঞ্জোন করতে। ফেরার পথে রাস্তায় এক এক্সিডেন্ট এর দেখা মিলল। এক বাইকে ছিলো একজন ছেলে আর একজন মেয়ে। আমরা গাড়ি থামিয়ে দেখলাম তাদের কি অবস্থা। ছেলেটার মাথা দিয়ে রক্ত ঝরছে। আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। রক্ত টক্ত আবার আমি দেখতে পারি না। তখন আব্বু আমার হাত ধরে বললেন “এই মেয়ে তুই না অনেক সাহসী? তুই ভয় পাচ্ছিস কেন?” আব্বুর কথাটা শুনে আমার গত দুইদিনে হারিয়ে যাওয়া সাহস টা একটু ফিরে পেলাম। আমি বললাম
-আব্বু আমি বিয়েতে যাই প্লিজ?
-তুই গেলে ঠিক থাকতে পারবি তো?
-ইন শা আল্লাহ পারবো। যদি ভয় পেয়ে যাই তাহলে আমার জন্য তুমি বাসায় থেকে দোয়া কইরো।
-“ভয় পাবি “এই ভয় থাকে তাহলে যাওয়াটা ঠিক হবে না।
-না আব্বু ভয় নাই।
আমাদের ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। বাসায় ঢুকে আম্মুর বিয়ের শাড়ি নিয়ে বের হয়ে গেলাম পার্লারের উদ্দেশ্যে। আম্মু মন খারাপ করেছিলো আসার সময়। কান্না করে আমার মাথায় হাত রেখে বলল “তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস। আমি মুচকি হাসি দিয়ে বের হয়ে গেলাম। এর মধ্যে কাছের যে কজন জেনে গেলো আমি বিয়েতে যাচ্ছি সবাই নিজের সাধ্য মত আমাকে আটকানোর চেষ্টা করলো। নাহ আজ আর কেউ বাঁধা দিলে শুনবো না। আর একটা দিন আজ কারো কথা শুনবো না। একদম না। একজনকে খুব দেখতে ইচ্ছা করলো। কিন্তু সে আজ ব্যস্ত। দেখা হওয়ার সুযোগ আজ নাই। থাক ব্যাপার না।
পার্লারে শাড়ি পড়ে ধুমধারাক্কা একটা মেকআপ করিয়ে নিলাম। উদ্দেশ্য বিয়ে বাড়িতে যেতে হবে। ইয়া আল্লাহ আমি তো কোন উপহারই নেই নাই। এটা কেমন বেজ্জতি মার্কা কাজ করলাম বলো তো? যাওয়ার সময় নেমে গেলাম মার্কেটে। উপহার আগে থেকে নির্বাচন করা উচিৎ ছিলো। কিন্তু আমি যে অবশেষে যাবো এটাই তো নিশ্চিত ছিলাম না আমি। যাক সেসব কথা। কি নেওয়া যায়? একটা বই এর দোকানে গিয়ে একটা কোরআন শরীফ কিনলাম। কোরআন শরীফের নাকি হাদিয়া নিয়ে দরদাম করতে নাই। করলামও না। এখন এটাকে রেপিং করে সুন্দর করে দিতে হবে। আমি বুঝলাম না উপহার হিসেবে কোরআন ই কেন কিনলাম? রেপিং করাতে যখন ভদ্র লোকের হাতে দিলাম। সে বলল
-মা কাউকে গিফট করবেন?
-জ্বী।
-তাহলে রেপিং করার টাকা টা লাগবে না।
এত পবিত্র একটা উপহার দিচ্ছেন। কিছু যদি মনে না করেন আমিও এত শরিক হতে চাই। ভদ্র লোকের কথা শুনে খুব আবেগী হয়ে গেলাম। তাকে অনুমতি দিলাম … সে আমাকে সুন্দর করে রেপিং পেপারে মুড়িয়ে দিলো। উপহার নিয়ে রওনা হলাম কমিউনিটি সেন্টারে।
আমার সেখানে প্রথম পা পড়তেই মনে হল বিশ্রী কিছু পোড়ার গন্ধ আসছে। কলিজা পোড়ার বিশ্রী গন্ধ। ঢুকতেই একদল মহিলার মাঝে একজন চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকালেন। যেন তিনি আশা করেন নি আমি সেখানে আসবো। তিনি হলেন আমার প্রাক্তন শ্বাশুড়ী … তারই ছেলের বিয়ে আজ। যে ছিলেন আমার প্রাক্তন স্বামী। বছর ঘুরে গেলো সে আমাকে ছেড়ে দিয়েছে। তাদের মনমত ঢের উপহার আমার বাবা তাদের কে বিয়ের সময় দেন নি। এই ছিলো মূল কারণ আমাকে সহ্য না করার। এক সময় মানসিক তারপর শারীরিক নির্যাতন শুরু করলেন। একসময় পাঠিয়ে দিলো ডিভোর্স লেটার যেভাবে পাঠালো সেদিন তার পুনঃ বিবাহের কার্ড।
প্রেম করে বিয়ে করেছিলাম আমরা। তার বাসার মানুষ আমাকে আগে থেকেই দেখতে পারতো না একমাত্র তার ভরসায় টিকে ছিলাম খুব নির্যাতনের পর। সেও তাদের তালে তাল মিলিয়ে আমাকে একদিন তার থেকে আলাদা করে দিলো। কত কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে উঠেছি আমিই জানি। ইফতির সাহসের দাম দিতে হয় মা শা আল্লাহ। বিয়ের কার্ডটা পাঠিয়ে দারুন সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে বেচারা। প্রাক্তন স্ত্রীকে বিয়েতে দাওয়াত দেওয়া বিশাল মনের অধিকারী লোক পারে নয়তবা খুব বেশি ছোটলোকরা পারে। সে জানতো আমি এই কার্ড দেখে কষ্ট পাবো। কান্না করবো। অসুস্থও হয়ে যেতে পারি।
আমাকে মানসিক ভাবে ভাঙ্গার খুব কঠিন পরিকল্পনা ছিলো। তবে ও ভাবে নাই হয়ত আমি চলে আসবো। একটু একটু করে সবার বড় বড় চোখকে অতিক্রম করে বৌ এর স্টেজের সামনে এগিয়ে গেলাম। ইফতি আমার এক হাত দূরে। মাত্র এক ইঞ্চি দূরত্বের সম্পর্ক প্রথমে কোটি মাইলের দূরে চলে গিয়েছিলো। আজ আবার এক হাত দূরে। বুকের ধুকধুক টা বেড়ে গিয়েছে। খুব বেড়ে গিয়েছে। মনে হচ্ছিলো এত আওয়াজ য আশে পাশের মানুষ শুনে ফেলবে … কত ভালোবাসার মানুষ ছিলো সে আমার। সব আবেগকে একমুহুর্তে মনে মনে ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিলাম। স্টেজে উঠে বৌ এর হাতে উপহার দিয়ে বললাম
-এটা রাখো। এটার মধ্যে কোরআন শরীফ। এখানে সেখানে ফেলে রেখো না।
-জ্বী আচ্ছা। কিন্তু আপনি? আমার উত্তর দেওয়ার আগে কেউ একজন পিছন থেকে বলল
-অনেক হইসে নতুন বৌকে নিয়ে খাবার টেবিলে আসো। আওয়াজ টা পরিচিত। সে আমার প্রাক্তন শ্বাশুড়ী আম্মা। হয়ত ভাবছিলেন আমি যদি কিছু বলে দেই? ইসসস এত টা ছোটলোক আমি না। তারা নিজেরা যেমন সবাইকে তেমনই ভাবে। স্টেজ থেকে বৌ কে নিয়ে যাওয়া হলো। সে আবার আমার দিকে ঘুরে বলল
-এত সুন্দর উপহারের জন্য ধন্যবাদ আমি হালকা করে হেসে স্টেজ থেকে নেমে অন্য একটা খাবারের টেবিলে খেতে বসলাম। কতগুলা পরিচিত চোখ আমার দিকে বেহায়ার মত তাকিয়ে আছে। নেহায়েত তারা আমাকে ছেচড়া ভাবছিলেন হয়ত বিয়েতে এসেছি খেয়ে যাবো না? কিন্তু কেউ আমার সাথে একটা কথাও বলল না। তারা দাওয়াত দেওয়ার সাহস পেয়েছিলো। আর আমার আসাটা কি ছেচড়ামি হবে নাকি? আমি আসার পর থেকে ইফতির চেহারা দেখার মতন ছিলো। খাওয়া শেষে বের হয়ে আসলাম। বের হওয়ার সময় আর ঘুরে তাকাই নাই। হুম মনে মনে বলছিলাম
-ইফতি যেদিন ছেড়ে দিয়েছিলে সেদিনই বিসমিল্লাহ বলে ডান পা রেখেছিলাম জীবনের উদ্দেশ্যে। তুমি হয়ত ভেবেছিলে আমাকে তোমার বিয়ের দাওয়াত দিয়ে আরেকটাবার মানসিক আঘাত দিতে পারবে কিন্তু আমি এখানে এসে তোমার নতুন বৌয়ের হাতে কোরআন শরীফ ধরিয়ে দিয়ে তোমাকে আজীবন মানসিক রোগ টা ধরিয়ে দিয়ে গেলাম। আমি নাহলে গত একবছর কেঁদেছি। আজকে থেকে তুমি আমার আজকের চেহারা মনে করে হাসতেও পারবে না। কাঁদতেও পারবে না। কাউকে বলতেও পারবে না। একা সইতেও পারবে না।
তুমি দাওয়াত দিয়ে আমার সাহস ভাঙ্গতে চেয়েছিলে আর আজ আমার সাহস দেখে আজকের পর থেকে তুমি প্রতিদিন দুর্বল হুম খুব দুর্বল হয়ে গেলে মন থেকে। এগুলা তাকে বলার প্রয়োজন নাই। কারণ সে আমার হাসির ঝলক দেখে বুঝে যাচ্ছিলো আমি তাকে মনে মনে এগুলাই বলছি। আমি বাসায় ফিরলাম। এক ফোটা চোখের পানি না ফেলে আমি সফল ভাবে ফিরলাম। এতদিন আমাকে সবাই সাহসী বলত। আজকের পর আমিও আমাকে সাহসী বলে দাবি করতে পারবো……

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত