আমার পরী

আমার পরী
বিয়ের সময় প্রথম যখন শ্বশুর বাড়িতে ডুকবো ঠিক তখনই ছোট্ট ৩ বছরের একটা মিষ্টি মেয়ে ছোট ছোট হাতে আমার হাতের আঙ্গুলগুলো ধরলো। মিষ্টি কন্ঠে আদৌ আদৌ করে বলতে লাগল- “এতা আমাল তুন্দর ভাবী।”
মাহমুদের সাথে রিলেশন থাকলেও বিয়েটা হয়েছিল পারিবারিক ভাবে। ওর ফ্যামিলিতে মাহমুদ আর ওর মা ছাড়া আর কেউ ছিলো না। ৩ বছর আগে যখন রোড এক্সিডেন্টে মাহমুদের বাবা মারা যায় তখন আমার শাশুড়ি মা প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। তার সঙ্গ দেওয়ার জন্য একজন মানুষের খুব প্রয়োজন ছিলো। মাহমুদ চাকরি করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হতো। ঠিক তখনই মাহমুদের ছোট খালা বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে মারা যায়। বাচ্চাটা বেঁচে থাকলেও তাকে দেখার মতো কেউ ছিল না। ,তখন মাহমুদ নিজের কোলে করে সেই ছোট্ট পরীটাকে এনে নাম রেখেছিলেন “পরী”। ,সেই থেকেই এ পরিবারের সবাই পরীকে একজন সদস্য মনে করে। আর শাশুড়ি মাও পরীকে পেয়ে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়।
পরী নাম টা যতোটা সুন্দর তার থেকেও বেশি সুন্দর ছিলো ওর মিষ্টি চেহারা। কেমন যেন, চেহারায় মায়া মায়া কাজ করতো। প্রথমদিকে ওকে খুব ভালো লাগলেও কিছুমাস পর পরীকে খুব বিরক্ত লাগতো। খেতে গেলে, ঘুমাতে গেলে পরী বলত নতুন ভাবীর কাছে যাব। এইসব বিষয়গুলো খুব বিরক্ত লাগতো। সারাদিন কাজ করে মাহমুদ বাসায় আসলে রাতে ওর কাধে মাথা রেখে ছাদে বসে কথা বলতাম আর তখনই পরী দৌড়ে চলে আসত আমাদের মাঝে এসে বসত। মাহমুদও তখন আদর করে পরীকে কোলে জড়িয়ে ধরত। কোনো অনুষ্ঠানে গেলে পরীকে কোলে করে আমার ঘুরতে হতো। ,যেই ওকে কোলে নেয় না কেনো ও ওর আদৌ আদৌ ভাঙ্গা কন্ঠে বলত নতুন ভাবীর কোলে যাবো। এসব ব্যাপার গুলো কেমন যেন বিরক্ত লাগতো। তবুও মানিয়ে নিয়েছিলাম।
ছোট বেলা থেকে বান্ধবীদের কাছে শাশুড়ি আর ননদ সম্পর্কে খারাপ কথাগুলো শুনতে শুনতে কেমন যেনো একটা ভয়, ঘৃর্না কাজ করতো। আর তার বেশ ধরেই আজ পরীকেও বিরক্ত লাগে। বিয়ের এক বছর পর হঠাৎ শাশুড়ি মা সিড়ি দিয়ে পরে যায়। মাথায় আঘাত লাগার ফলে আর বাঁচানো যায় নাই তাকে। মরার আগে আমার হাতের উপর হাত রেখে বলেছিলেন- “মা এটা তোর ননদ না এটা তোর মেয়ে। পরীকে তোর নিজের মেয়ের মতো মানুষ করবি।” মা মারা যাওয়ার মাহমুদ ও কেমন চুপচাপ হয়ে গেলো। তার কর্তব্য গুলো ঠিকই পালন করতো তবে সব সময় কেমন যেনো মন মরা হয়ে থাকত। পরীর উপর প্রথম দিকে ভালোবাসা থাকলেও পরে দয়া কাজ করত কিন্তু ওর সব আবদারগুলোর জন্য আবার বিরক্ত কারন হয়েছিলো।
রাতে পরীকে ঘুম পরিয়ে যখন নিজের বিছানায় ঘুমাতে যেতাম তখন পরী ওর রুম থেকে চিৎকার করে বলত ওর ভয় লাগছে। মাহমুদের সামনে কিছু বলতেও পারতাম না দৌড়ে গিয়ে পরীকে নিয়ে পরীর রুমেই ঘুমিয়ে পরতাম। মাহমুদ ওকে পড়াতে বসালে বলত নতুন ভাবীর কাছে পড়ব। সহ্যের সীমা পেরিয়ে গিয়েছিল, মাহমুদকে অনেক বুঝিয়েছি যে “পরীকে অন্য কোনো আত্মীয় বাসায় দিয়ে আসো। নয়ত এতীম খানায় রেখে আসো দরকার পরলে আমরা প্রতি মাসে ওকে দেখে আসবো।” মাহমুদ কে যখন এসব বলতাম ও সব সময়ের মতো চুপ করে থাকতো সব শুনে আবার চুপচাপ কাজে লেগে পরতো।
একদিন যখন এগুলো বলছিলাম সেইদিন মাহমুদ আমার গালে একটা চড় দিয়ে বলেছিলো- “মা মারা যাবার শেষ সময় তার কেবিনে আমাকে না ডেকে তোমাকে ডেকেছিলো। পরীকে দেখে রাখার দায়িত্ব তোমাকে দিয়েছিলো আর আজ তোমার এসব বলতে একটুও খারাপ লাগলো না। তোমাকে আমি ভালোবাসি তাই বলে পরীর মতো একটা মেয়ের সাথে অন্যায় করতে পারবো না। তুমি থাকার হলে থাকো নয়তো চলে যাও।” সেদিন মাহমুদের উপর বড্ড অভিমান কাজ করছিলো। সেই রাতেই চলে এসেছিলাম ওর বাসা থেকে। বাবার বাসায় আসার একদিন পর কেমন দম বন্ধ লাগছিল ছুটে চলে যেতে ইচ্ছা করছিল মাহমুদের আর পরীর কাছে কিন্তু ভিতরের অভিমানের জন্য ইচ্ছাশক্তি আর ডানা মেলে নিই। তারপরের দিন সকাল বেলা ঘুম ভেঙ্গেই দেখি আমার হাত ধরে পাশে পরী বসে আছে চোখে পানি টলমল করছে। আমাকে চোখ মেলতে দেখেই পরী বলে ওঠল- “ভাবী তরি, আমি আত তোমাতে নতুন ভাবী, নতুন ভাবী বলে বিলক্ত কলবোনা।
তুমি প্লিদ ফিলে তলো। রাতে ঘুমাতে গেলে ভয় লাগলেও তোমাকে ডাকবোনা। এখন থেকে একা একা আমি নিতেই পলবো, খাবো, ঘুমাবো। তুমি প্লিদ ফিলে তলো। আম্মু তারা হয়ে যাওআত পলে সবাই বলেছিলো আম্মুর সেই তারাটা তোমাল মাঝে। তাই তো তোমালে সব সময় বিলক্ত কলতাম। কিন্তু আল কলবোনা তুমি প্লিজ ফিলে চলো।” পরীর অভিমানভরা কথা গুলো শুনে খুব কান্না পাচ্ছিলো। ওকে জড়িয়ে ধরে খুব কেদেছিলাম। মাহমুদ আমাদের বাসার সামনের রুমে বসে ছিল, পরীকে কোলে করে দৌড়ে চলে গিয়েছিলাম মাহমুদের কাছে। মাহমুদ সেদিন কান্না করে বলেছিলো- “প্লিজ সুরাইয়া মাফ করে দাও, সেদিন রাগ করে তোমার গায়ে হাত তুলছি প্লিজ ক্ষমা করে দাও ফিরে চলো। তোমাকে ছাড়া আমার পরী বাঁচতে পারবেনা।
এইদুদিন ধরে কিছু খায়নি শুধু কান্না করছে আর তোমার কথা বলছে।” সেদিন খুব কেঁদেছিলাম পরী আর মাহমুদ কে ধরে। ফিরে এসে নতুন করে সব শুরু করছিলাম। পরীর জন্য আর নিজে কোন সন্তান নেয় নিই। যদি আবার স্বার্থপর হয়ে যাই,পরীর ভালোবাসা আবার কমে যায় এই ভয়ে। ২৬ বছর পর মাহমুদের কবরের সামনে দাড়িয়ে আছি আমি আর আমার পরী। মাহমুদ স্বার্থপর পরের মতো একাই চলে গিয়েছে এই একবছর হলো। আজ বিভিন্ন এতিমখানায় পরী মাহমুদের নামে খাওয়াচ্ছে।
মাহমুদের ছোট ব্যবসা টা এই এক বছরে অনেক বড় করেছে পরী। নিজের বড় চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে বাবার মতো ভাইয়ের নাম উজ্জ্বল করেছে। মাহমুদের ছোট এক কোনে পরে থাকা ব্যবসাটা আজ বড় বড় ব্যবসার ভিতরে একটি। আজ আমার পরী আমারই স্বার্থকতা। এ পরীতো সেই ছোট্ট পরী। আজ এ পরীকে নিজের মেয়ে বলতে পেরে আমি গর্বিত।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত