ভরসা

ভরসা
মাকে দেখে রুবেল বেশ উত্তেজিত হয়ে বলল, মা বিশ্বাস করো আমি কিছু করে নি।ভাবিই আমাকে রুমে ডেকে আনলো। রুবেলের কথায় জয়া থ হয়ে দাড়িয়ে রইলো।কি বলবে না বলবে তা ভেবে না পেয়ে সে রুবেলের গালে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে বলল, লম্পট ছেলে কোথাকার, মিথ্যা বলছিস কেন? মা আমি কোনদিনই ভাবিনি রুবেল আমার সাথে এমন টা করবে।ওঁকে আমি সবসময় ছোট ভাইয়ের নজরে দেখেছি আর সে কি-না বদ মতলবে তোমরা কেউ না থাকার সুযোগে আমার রুমে এলো।কথাগুলো বলতে বলতে জয়ার চোখ ভিজে এলো।
এই মুহূর্তে কি করা উচিত সে ভেবে পাচ্ছিলো না।সকালে শ্বাশুড়ি মা পাশের এক আন্টির বাসায় গিয়েছিল,রুহান-ও অফিসে চলে গেলে জয়া রুমে এসে কাপড়চোপড় গুছিয়ে রাখছিল সেই সুযোগে রুবেল এসেছিল এক কাপ চা বানিয়ে দিতে বলার বাহানায়।জয়াও যাচ্ছিল বটে কিনতু রুবেল পিছন থেকে অতর্কিত ভাবে শাড়ির আঁচল ধরে টান দিতে শাড়ি কিছুটা এলোমেলো হয়ে যায়, ভীতগ্রস্ত জয়া শাড়ি যখনই ঠিক করতে যাবে তখনই শ্বাশুড়ি মা কে দরজার সামনে দেখে কিছুটা সাহস পেলো।তবে জয়া কিছু বলার আগে রুবেল মা’কে বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথাটা বললো, যেন জয়া-ই দোষী। জয়া ধরে নিয়েছিল শ্বাশুড়ি মা যখন সব টা নিজ চোখে দেখেছেন তার দিকে রায় দেবে আর রুবেল কে তার কৃত কর্মের শাস্তি দেবে।কিন্তু শাশুড়ী মা সেটা করলেন না।
উনি ছেলের পক্ষ নিয়ে বললেন, ছোট বেলা থেকে ছেলেকে মানুষ করেছি আমি, তাই মা হিসেবে আমিই তো জানি আমার ছেলে কেমন।মেয়েরা লোভ দেখালে সয়ং ফেরেস্তা তুল্য মানুষ টাও শয়তানের ধোঁকায় পড়ে যাবে।আর এখানে শয়তান টাও হচ্ছে তুমি।যত্তসব নষ্টের মূল,যেদিন থেকে সংসারে পা রেখেছে সেদিন থেকে বাড়ির সুখ শান্তিতে ভাটা পড়তে শুরু করে দিল।রুহান আসুক তারপর এর একটা ফায়সালা তো হবে। এই বাড়িতে হয় তোমরা থাকবে না হয় আমরা থাকব বলতে বলতে শ্বাশুড়ি মা রুবেলকে সহ নিয়ে রুমের বাইরে চলে গেল।
জয়া রুমে শক্তপুক্ত পাথুরে মুর্তির মতো বসে রইলেন। শুধু একবার ভাবলেন,একটা মেয়ে হয়েও আরেকটা মেয়ের দূর্বলতা বুঝলেন না,সন্তান কে বাঁচাতে নির্দোষের উপর দোষ চাপিয়ে দিলেন, একদিন তো ঠিক এর শাস্তি পাবেনই।
জয়া শুতে শুতে ভাবে সন্ধ্যার সময় রুহান অফিস থেকে ফিরলে সবটাই খুলে বললে রুহান তো অন্তত বিশ্বাস করবে।যদিও মা পাগল ছেলে,মায়ের কথার বাইরে এক পাও হাঁটে না।তবে জয়াকে সে অনেকটা ভালোবাসে।জয়ার ভয় হয়, যদি ওর কথা বিশ্বাস না করে?শ্বাশুড়ি মায়ের কথায় ওকে দোষারোপ করে?
তখন কি হবে তার?বাধ্য হয়ে তো বাপের বাড়ি যেতে হবে । আর গেলেই বা কিভাবে তাদের মুখ দেখাবে?বাবা-মা, ভাই ভাবি ওরাও তো আর ভালো চোখে দেখবেনা।সমাজে যে ডিভোর্সি মেয়েদের অভিশাপ মনে করে।তারউপর পাড়া পড়শীরা যদি কেন ডিভোর্স হয়েছে তা জানতে পারেন তাহলে চরিত্রহীনা বলে একশো দু’শ টাকায় পতিতালয়ে বিক্রি করতেও দ্বিধাবোধ করবেনা।রাস্তায় বেরোলে অশ্রাব্য কথা শুনাতে পিছু হাঁটবে না। এসব ভাবতে ভাবতে জয়ার মন অশান্ত হয়ে ওঠে,মিথ্যে অপবাদ হলেও ভবিষ্যৎ ভেবে নিজের প্রতি ঘৃণা হয়।ভেবে নেয় রুহানও যদি ওকে বিশ্বাস না করে তাহলে সে সুইসাইড করে নেবে।মিথ্যে অপবাদ নিয়ে বাঁচার চেয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে মরাই ভালো।
জয়ার ঘুম ভাঙলো রাতের দিকে, পায়ের নিচে কাউকে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদঁার শব্দ শুনে। জয়া চমকে ওঠে বসল।রুহান তার পায়ের কাছে বসে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে কাঁদছিল। জয়া আবার ভয় পেয়ে গেলো।নিশ্চয় শ্বাশুড়ি মা সব কথা বলে দিয়েছে রুহান কে।জয়ার খুব ভয় হয়,ভাবে রুহানের পায়ে পড়ে ক্ষমা চেয়ে নিবে সে রোহান কে সে অনেক ভালোবাসে।ভরসা করে অনেক সেই ভরসা যেনো না টুটে জয়ার যা করা দরকার তাই করবে,তার আগেই রুহান বুকে জড়িয়ে নিলো জয়া কে।জয়া বাচ্চাদের মতো কেঁদে ওঠে বলে,আমি কিছুই করিনি। রুহানের চোখগুলো আরো বেশি ঝাপসা হয়ে এলো,সে জয়ার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,আমি ওদের কথা বিশ্বাস করিনি জয়া। তোমাকে তো আমিই চিনি।আমি সবসময় তোমার পাশেই আছি।তুমি শান্ত হও। জয়া আর কথা বলতে পারলোনা, সে অঝোরে কেঁদে গেলো।
প্রকৃতির বুকেও যেমন নিম্নচাপ ঘনীভূত হলে বৃষ্টির হাত ধরে শান্ত হয়,আমরা মানুষেরাও তার ব্যাতিক্রম নয় আমাদের বুকেও ঘনীভূত হয়ে আসা নিম্নচাপগুলো চোখের বৃষ্টির হাত ধরে মুক্তির খোজ করে। এখানেও ব্যতিক্রম নারীরা, আমরা নারীরাই বিয়ের পর এতোই দূর্বল হয়ে পড়ি যে,তার কাঁদার জন্য চায় একটা কোল কিংবা সবসময় ভরসার জন্য একটা কাঁধ।তাহলে সব চুকিয়ে নতুনভাবে ভালোবাসার ডালপালা গজাতে ওরা নিজেকে সংসারে উৎসর্গ করে দেয়। জয়ার মন সে কোল কাঁধ দুটো পেয়ে গেলো।তার নেওয়া সারাদিনের খারাপ সিদ্ধান্ত গুলো বরফের মতো গলে গেলো।আরো কিছুক্ষণ সে রুহানের বুকে কেঁদে গেলো।তারপর মনের নিম্নচাপগুলো কেটে অনেক টা ফুরফুরে প্রকাশ হতে লাগলো।
রুহান জয়াকে বলে সিদ্ধান্ত নিলো,এই বাড়ি তে তারা আর থাকবেনা,অন্য কোথাও গিয়ে নতুনভাবে সবটাই শুরু করবে।যেখানে থাকবে ভরসা আর ভালোবাসায় গুছিয়ে তুলা একটা ছোট্ট সুংসার। জয়ার ঠোঁটে মেঘকাটা রোদের ঝলমলে হাসি ফুটল।স্ত্রীর প্রতি বিশ্বাস রেখে জয়াকে রুহান মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়েছে বলে জয়ার মানুষটার উপর বিশ্বাসটা বেড়ে গেলো।মনেমনে সৃষ্টিকর্তা কে ধন্যবাদ দিয়ে বলে গেলো,সবার বিশ্বাসের দরকার তার নাই,শুধু মানুষ টা তাঁকে ভরসা করলেই হলো।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত