ছবি

ছবি
অল্প কয়েকদিন হলো আমরা নতুন ফ্ল্যাটে উঠেছি। বাবা তার সমস্ত জীবনের সঞ্চয় দিয়ে এই ফ্ল্যাটটা কিনেছেন। বাবা চাইতেন আমাদের একটা স্থায়ী ঠিকানা হোক। তাই আমি চাকরি পাবার কয়েকদিন পর বাবা এই ফ্ল্যাটটা কিনেন। আগে নতুন কোন বাসায় ভাড়া উঠলে তখন আশেপাশের সমস্ত ভাড়াটিয়ারা সবাই এসে আমাদের সাথে পরিচিত হতো। কিন্তু এই ফ্ল্যাটে উঠার পর কেউ আমাদের সাথে পরিচিত হতে আসে নি। হতে পরে বড়লোকরা হয়তো এমনি। একই বিল্ডিংয়ে থাকার পরেও হয়তো কেউ কারো খবর নেয় না রাতে খাবার টেবিলে বসে সবাই যখন খাচ্ছি তখন মা বললো,
-তোকে একটা কথা বলবো? আমি নিচের দিকে তাকিয়ে খেতে খেতে বললাম,
— বিয়ে করা বাদে অন্য যে কোন কিছু বলতে পারো আমার কথা শুনে বাবা আমাকে কিছু বলতে চেয়েছিলো কিন্তু এর আগেই আমি বাবাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম,
— বাবা প্লিজ, তুমিও এখন মা’র মত শুরু করো না
আজকাল আমার সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। অবশ্য আমার সিগারেট খাওয়ার পিছনে আমার অফিসের কলিগ তনিমা দায়ী কারণ এই মেয়েটা আমাকে আজকাল খুব পেইন দিচ্ছে যার ফলে সিগারেট খাওয়া শুরু করেছি। তাছাড়া রাতে খাওয়ার পর সিগারেট না খেলে খুব অস্বস্তি লাগে। নিজের রুমে সিগারেট খাবো তার উপায় নেই কারণ মা যদি জানতে পারে আমি সিগারেট খাই তাহলে চিৎকার চেঁচামেচি করবে। তাই বাধ্য হয়ে ছাদে উঠলাম সিগারেট খাওয়ার জন্য। সিগারেটে টান দিয়ে যখন ধোঁয়া ছাড়লাম তখনি আমি একটা মেয়েলী কাশির আওয়াজ শুনলাম। আমি কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম। ভাবতে লাগলাম এত রাতে ছাদে মেয়ে আসবে কোথা থেকে। পাশে তাকিয়ে দেখি একটা মেয়ে। অন্ধকারে মেয়েটাকে আগে খেয়াল করি নি। মেয়েটি তখন রাগে বললো,
– আপনার কি কোন কমনসেন্স নেই? একে তো ছাদে সিগারেট খাচ্ছেন আর দ্বিতীয়ত সেই সিগারেটের ধোঁয়া আমার মুখের উপর ছাড়ছেন আমি তখন লজ্জায় মাথাটা নিচু করে বললাম,
–দুঃখিত, আমি অন্ধকারে আপনাকে খেয়াল করি নি মেয়েটি এইবার আমার থেকে একটু দূরে গিয়ে বললো,
– আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না আমি বললাম,
— আমরা নতুন এসেছি। C1 ফ্ল্যাটটা আমরা কিনেছি এই বার মেয়েটি বললো,
– আমরা D2 তে থাকি আমি কিছুটা অবাক হয়ে বললাম,
— তা আপনি এত রাতে ছাদে কেন? মেয়েটি মুচকি হেসে বললো,
– রাতের আকাশ দেখতে আমার খুব ভালো লাগে তাই প্রতিদিন ১১টার পরে ছাদে এসে কিছুক্ষণ হাটাহাটি করি
এর পরের দিন কেন জানি আমি রাত ১১টার দিকে আবার ছাদে উঠলাম। আজ অবশ্য জোছনা ছিলো। আমি খেয়াল করলাম খোলা চুলে মেয়েটা ছাদের কার্ণিশে হাত ধরে ব্যস্ত শহরটার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি মেয়েটার পাশে গিয়ে কাশির আওয়াজ দিতেই মেয়েটা পিছন ফিরে আমার দিকে তাকালো। চাঁদের আলোতে মেয়েটার চেহারাটা দেখে আমি চমকে উঠলাম। মেয়েটাকে শুধু সুন্দরী বললে ভুল হবে কারণ মেয়েটা ভয়ংকর রকম সুন্দরী আমাকে দেখে মেয়েটা মিষ্টি হেসে বললো,
– রাতে উপর থেকে ব্যস্ত শহরটাকে দেখলে অনেক সুন্দর লাগে তাই না? আমি মুখে কিছু না বলে শুধু ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিলাম হ্যাঁ । আসলে আমি তখনও মেয়েটার সৌন্দর্য্যের মোহে আটকে ছিলাম এত পর থেকে প্রতিদিন আমি ছাদে আসতাম । অনেক রাত পর্যন্ত দুইজনে গল্প করতাম। আস্তে আস্তে কি করে আমি মেয়েটার এতটা কাছে এসে পড়লাম জানি না।
আজ যখন ছাদে আসলাম তখন খেয়াল করলাম মেয়েটা আসে নি। ভাবলাম হয়তো কোন সমস্যার জন্য আসতে পারে নি৷ এর পরের দিন যখন গেলাম তখনো দেখি মেয়েটা আসে নি। এইভাবে বেশ কয়েকদিন গেলো মেয়েটা আর আসে না। আজ রাতে যখন শুয়ে শুয়ে চিন্তা করছিলাম মেয়েটা কেন ছাদে আসে না তখন হঠাৎ মনে হলো আমি কয়েকদিন আগে ওর অনুমতি বাদে ওর একটা ছবি তুলেছিলাম সেজন্য ও খুব রাগ করেছিলো। হয়তো এজন্যই আসে না। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম আমি মেয়েটার কাছে গিয়ে সরি বললো কলিংবেল বাজাতেই হাবীব সাহেব দরজা খুললেন। আমি উনাকে সালাম দিয়ে বললাম,
— আংকেল, আমি পাশের ফ্ল্যাটে থাকি। একটু খোঁজ খবর নিতে আসলাম আর কি। উনি আমাকে ভিতরে আসতে বললেন। তারপর সোফায় বসতে বসতে বললেন,
-তা বাবা, তোমারা কত দিন হলো ফ্ল্যাটে উঠেছো? আমি বললাম,
— এইতো আংকেল কয়েকদিন হলো। তা আংকেল বাসার সবাই ভালো আছে? উনি অবাক হয়ে বললেন,
– বাসার সবাই মানে? আমি তো একা থাকি আমি অবাক হয়ে বললাম,
— একা থাকেন মানে? আপনার একটা মেয়ে আছে না, যে প্রতিদিন রাতে ছাদে উঠে হাটাহাটি করে? উনি আমার কথাশুনে ধমক দিয়ে বললো,
– আমি তো বিয়েই করি নি। মেয়ে আসবে কোথা থেকে? আমি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে মেয়েটার ছবি দেখিয়ে বললাম,
— এটা আপনার মেয়ে না? ছবিটা তুলা সুন্দর হয়েছিলো বলে আমি এটা ফোনে ওয়ালপেপার করে রেখেছিলাম
উনি ভালো করে ছবিটা দেখে বললো,
– তুমি কি গাঁজা খাও না কি?এই বিল্ডিংয়ে এমন নেশাখোর মানুষ ফ্ল্যাট কিনেছে জানলে এইখানে ফ্ল্যাট কিনতাম না। অন্ধকারের ছবি দেখিয়ে বলছো মেয়ের ছবি আমি বাসায় এসে সবাইকে ছবিটা দেখালাম কিন্তু কেউ ছবির মেয়েটা দেখতে পেলো না। সবাই শুধু অন্ধকার দেখে। আমি বুঝতে পারছিলাম না আমার সাথে এমনটা কেন হয়েছে। এরপর মেয়েটাকে কখনো দেখতে পাই নি। আস্তে আস্তে আমিও মনের ভুল ভেবে সব কিছু ভুলে যেতে শুরু করলাম রাত ১২ঃ২১ বাজে।আমি যখন গেইট দিয়ে বাসায় ঢুকি তখন হঠাৎ দারোয়ান চাচা বললো,
-স্যার, আপনার ফোন দিয়ে এক মিনিট কথা বলা যাবে? আমার ফোনে টাকা নাই আমি ফোনটা দারোয়ান চাচার হাতে দিয়ে বললাম,
–এত রাতে কাকে ফোন দিবেন? দারোয়ান চাচা কিছু না বলে একটু মিষ্টি হেসে ফোনটা কানে নিয়ে দূরে গেলো ফোনে কথা বলা শেষ করে যখন দারোয়ান চাচা ফোনের স্কিনের দিকে তাকিয়ে কিছুটা অবাক হয়ে আমায় বললো,
– আপনার ফোনে দেখছি শ্রাবণী আপার ছবি আমি অবাক হয়ে বললাম,
— আপনি মেয়েটার ছবি দেখতে পারছেন? দারোয়ান আবারও হেসে বললো,
– না দেখতে পাওয়ার কি আছে? উপরে তাকিয়ে দেখেন শ্রাবণী আপা এখনো ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে
আমি উপরে তাকিয়ে দেখি সত্যি সত্যি মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে। আমি যখন উপরে উঠতে যাবো তখন দারোয়ান চাচা আমার হাতটা ধরে বললো,
-স্যার, আপনি কি আপনার বাবা মা’র একমাত্র সন্তান? আমি বললাম,
— হ্যাঁ, আমি একাই আমার কোন ভাইবোন নেই দারোয়ান চাচা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
– স্যার, এই জগতে মানুষ চিনা খুব কঠিন। আপনার চোখের সামনে যে মানুষটাকে ফেরেশতার মত লাগবে সেই মানুষটার ভিতরের খবর নিলে জানা যাবে সেখানে শয়তানের বসবাস আমি দারোয়ান চাচার কথা শুনে কোন উত্তর দিলাম না কারণ এই মুহূর্তে এইসব ফালতু কথা শুনার কোন মানেই হয় না। আমার এই মুহূর্তে মেয়েটার সাথে কথা বলতে হবে দারোয়ান রমজান আলী আজ ২৭ বছর ধরে এইখানে কাজ করে। নিজ চোখে অনেক কিছু দেখেছেন। একটা সময় না বুঝলেও এখন তিনি সব বুঝতে পারেন। আজ রাতে ঘুমানো যাবে না কারণ এখন অনেক কাজ করতে হবে। ঝাড়ু দিয়ে বাসার সামনের জায়গাটা পরিষ্কার করতে হবে, ইমাম সাহেবকে খবর দিয়ে খাটিয়ার ব্যবস্থা করতে হবে আমি পিছন থেকে হালকা কাশির আওয়াজ দিতেই মেয়েটা ঘুরে আমার দিকে তাকালো। আমি তখন বললাম,
— তোমার নাম কি শ্রাবণী? মেয়েটি বললো,
-হুম আমি কিছুটা রেগে বললাম,
— তুমি আমায় মিথ্যা বলেছিলে কেন? তুমি কোন ফ্ল্যাটে থাকো? তুমিতো D2 তে থাকো না। তাছাড়া আশ্চর্য বিষয় হলো তোমার ছবি শুধু আমি আর দারোয়ান চাচা বাদে কেউ দেখতে পায় না মেয়েটি হেসে বললো,
– আমি মিথ্যা বলি নি। আমি D2তেই থাকি আর দারোয়ান চাচা আমায় দেখতে পায় কারণ উনিই প্রথম ছাদ থেকে পরে যাওয়া আমার প্রাণহীন রক্তান্ত শরীরটা স্পর্শ করেছিলো আমি অস্পষ্ট স্বরে বললাম,
— মানে! পাগলের মত কিসব বলছো? মেয়টি মুচকি হেসে আকাশের দিকে তাকালো আর আমি আশ্চর্যজনক ভাবে লক্ষ্য করলাম চাঁদের আলোয় আমার শরীরের ছায়া পরেছে কিন্তু মেয়েটির শরীরের ছায়া পরে নি কেন জানি আমার এইমুহূর্তে শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে তাছাড়া সারাশরীর আমার ঘামতে লাগলো। তারমানে আমার সামনে একজন মৃত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে….
সকালে ঘুম থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তনিমা নিজে নিজেকে দেখতে লাগলো। আজকাল এই শরীরটাকে তার খুব ঘৃণা লাগে । পিয়াস নামের একটা জানোয়ার দিনের পর দিন ভালোবাসার নাম করে এই শরীরটা নিয়ে খেলা করেছে। পিয়াসকে বিশ্বাস করে তনিমা কিছু ওর ব্যক্তিগত ছবি দিয়েছিলো আর এখন এই ছবিগুলোর ভয় দেখিয়ে পিয়াস দিনের পর দিন ওকে ভোগ করে যাচ্ছে। তনিমা জানে না ও কবে মুক্তি পাবে শুধু এটা জানে যেদিন ওর মৃত্যু হবে নয়তো পিয়াসের মৃত্যু হবে সেদিনেই হয়তো ওর মুক্তি মিলবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তনিমা এইকথাগুলো যখন ভাবছিলো তখনি ফোনটা বেজে উঠলো আর তনিমা ফোনটা রিসিভ করতেই উপর প্রান্ত থেকে ওর বান্ধবী মিতু বললো,
– তুই মুক্তি পেয়েছিস। জানোয়ারটা আর বেঁচে নেই
৪ বছর পর মামুন অবাক হয়ে দারোয়ান রমজান আলীকে বললো,
— আপনি ছবিটা দেখতে পাচ্ছেন? দারোয়ান রমজান আলী মুচকি হেসে বললো,
-এটা তো শ্রাবণী আপার ছবি। উপরে তাকিয়ে দেখেন শ্রাবণী আপা ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে মামুন দৌড়ে উপরে উঠতে লাগলো আর রমজান আলী বাসার সামনের দিকটা পরিষ্কার করতে লাগলেন কারণ একটু পর এইখানে অনেক মানুষের ভিড় হবে আর মামুন সাহেবের ক্ষতবিক্ষত লাশটা পরে থাকবে,,,
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত