নীলিমার বুকে মেঘ জমেছে

নীলিমার বুকে মেঘ জমেছে
-এই যে শুনছেন?
পেছন থেকে একটা মেয়েলি স্বর ভেসে এলো। অল্প বয়স্ক স্বর। আমি পেছন ফিরে তাকালাম। তাকাতেই মোটামুটি অবাক হতে হলো আমাকে। আকাশি কালারের শাড়ি পরা একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। খোলা চুল। ফর্সা চেহারা। সে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। আমি তার দিকে তাকাতেই সে হাসলো। কী অমায়ীক হাসি! আমার বুকের ভেতরটা কেমন কেঁপে উঠলো যেন।
আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলাম। মেয়েটি আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকলো। তার হাঁটতে খানিক কষ্ট হচ্ছে। শাড়ি পরে হাঁটতে অনবিজ্ঞ হয়তো। সে ধিরে ধিরে আমার কাছে চলে এলো। আমার চোখে চোখ রাখলো। একদম সরাসরি তাকিয়ে থাকলো আমার দিকে। অপরিচিত কারো দিকে এমন ভাবে তাকানোটা অস্বস্তিকর। আমার অস্বস্তি হলো। তবুও কেন জানি আমি তাকিয়ে থাকলাম। আমাদের চোখাচোখি হলো। অপরিচিত এই চোখ জোড়ার দিকে আমি কেবল তাকিয়েই থাকলাম। চোখ সরিয়ে লজ্জা পাওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পেলাম না। তার চোখের মাঝে কিছু একটা ছিল।
অন্য রকম কিছু একটা৷ অন্য রকম একটা টান ছিল। যা আমাকে তার চোখের দিকে তাকাতে বাধ্য করছে। আমার ইচ্ছে জাগছে তাকিয়ে থাকতে। আমি তাকিয়ে আছি। আমার চোখে ঘোর ধরেছে৷ অদ্ভুত একটা ঘোর। এই চোখ দুটোয় নেশা আছে৷ একবার তাকালেই তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। আমার কী হলো জানি না, আমি অনেকক্ষন তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তারপর চট করেই চোখ নামিয়ে নিলাম। তখন মনে হলো আমার সমস্ত শরীর শীতল হয়ে আছে। মৃদু কাঁপছে৷ বুকের ভেতরটা অস্বাভাবিক রকম ধপ ধপ করছে। আমি অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম। জীবনে অনেক মেয়ের সাথে কথা হয়েছে৷ কিন্তু কখনই এমন হয়নি৷ এমন দূর্বলতা অনুভব করিনি৷ আমার মনে হচ্ছে আমি ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি৷ অতিরিক্ত অনুভূতি আমাকে ক্লান্ত করে দিচ্ছে। আশ্চর্য! এটা কী হলো আমার সাথে? এমনটা কেন হলো? আমি জানি না। কিছুই জানি না। মেয়েটি স্পষ্ট কোমল স্বর টেনে বলল,
-কেমন আছেন? আমি অন্যদিকে তাকালাম। দ্বিতীয়বার তার চোখে চোখ রাখার সাহস হলো না৷ বললাম,
-ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন? মেয়েটা চোখেমুখে রাজ্যের প্রশান্তি মেখে বলল,
-কয়েকটা বছর ছিলাম না। আজ আছি৷ আজ ভালো আছি বলতেও ভালো লাগছে৷ কেমন অন্য রকম প্রশান্তি লাগছে।
-সরি৷ বুঝলাম না। মেয়েটি হাসলো,
-আপনি অনেক কিছুই বুঝবেন না। দোষটা আপনার না৷ আল্লাহ পুরুষদের এভাবেই তৈরী করেছেন৷ যাতে তারা রহস্যের ভাঁজে আঁটকে থাকে৷ বুঝতে না পেরে-না পেরে আজীবন সেই রহস্যের মধ্যে কাটিয়ে দিতে পারে।
আমি অভিভূত হলাম। বললাম,
-আর সেই রহস্যটা হচ্ছে মেয়ে জাতি। রহস্যময়ী জাতি। পুরুষেরা এই রহস্যে আঁটকে যায়৷ আজীবন আঁটকে থাকে৷ অতি চালাকেরা অবশ্য তা কাটিয়ে আরো রহস্যের সন্ধানে যায়। তারা জানে না রহস্য ভালো। তবে অতি রহস্য মোটেও ভালো নয়৷ মেয়েটি স্ফিত হাসলো৷ কী দারুণ হাসি! তার মাঝে কোনো জড়তা নেই৷ কোনো অস্থিরতা নেই৷ সে বেশ স্বাভাবিক। যেন আমার সাথে তার দীর্ঘদিনের পরিচয়। সে আমাকে খুব চিনে। খুব জানে৷ আমি অবাক হলাম। কে এই মেয়ে? আমি কি তাকে চিনি? জানি? সে বলল,
-আপনি লেখক মানুষ। কথাটা ধরতে পারবেন সেই ক্ষুদ্র আশাটুকু ছিল৷ মেয়েটা আমাকে চেনে নিশ্চয়ই। তা না হলে আমি যে লেখক তা সে জানলো কী করে? আমার মনের কোণে তীব্র একটা আগ্রহ জাগলো। এই মেয়েকে জানার আগ্রহ। যে আমাকে জানে তাকে জানার আগ্রহ হওয়াটা অস্বাভাবিক না। আমি বললাম,
-কে আপনি? মেয়েটি এবার আমার দিকে থেকে মুখ সরিয়ে নিলো। অন্য দিকে তাকালো। চারপাশ দেখে, আমার প্রশ্নটা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বলল,
-ওখানে একটা বেঞ্চি আছে৷ আমরা কি ওখানে বসতে পারি? প্লীজ না বলবেন না৷
এমন ভাবে বললে কোনো ছেলে না বলতে পারবে? কে জানে! আমার দ্বারা সম্ভব হলো না। আমি মেয়েটির সাথে গিয়ে সেখানে বসলাম। জায়গাটা নীরব৷ কপোত-কপোতীদের জন্যে উপযুক্ত। সেখানে আমরা দু’জন অপরিচিত মানুষ বসে আছি। ভাবতেই অবাক লাগছে৷ মূহুর্ত হঠাৎই পরিবর্তন হয়ে যায়। নীল আকাশে চট করেই মেঘ জমে। আবার চট করেই তা উড়ে যায়। ফর্সা চেহারা হঠাৎ কালো হয় কিংবা লাল। হাসতে থাকা মানুষটাও মূহুর্তে কেঁদে দেয়৷ মূহুর্ত বদলের কারণে। আজ কী তেমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে? আমি এতো দিন যাবত যেই অনুভূতিটা অনুভব করতে পারিনি, আজ কয়েক মূহুর্তের মাঝেই তা অনুভব করে ফেললাম? আমার কাছে এতো ভালো লাগছে কেন? আর কে এই মেয়ে? আমার ভালো লাগার উৎস তাকে ঘিরে কেন?
আমি কখনই কোনো মেয়ের সাথে এমন ভাবে মিশিনি। এমন একটা বেঞ্চে বসে গল্প করার কথা কল্পনাও করিনি৷ মিহিন মেয়েটা কতো করে বলেছে তার সাথে ঘুরতে যেতে। আমি যাইনি। মিহিন, এটি যন্ত্রণাময়ী একটি নাম। আমার কাজিন। সারাক্ষণ পেছন পড়ে থাকে৷ ভালোবাসি ভালোবাসি বলে গলা ফাটায়৷ আমাকে নিয়ে তার সখ আহ্লাদের গল্প শোনায়। রঙিন স্বপ্নের গল্প বলতে বলতে কখনই মেয়েটাকে হাঁপিয়ে উঠতে দেখনি। ভালোবাসা নিয়ে তার মাঝে কোনো ক্লান্তি নেই৷ যতো ক্লান্তি-গ্লানি আমার মাঝেই। যতো অনিচ্ছা আর অনাআগ্রহ মাকড়সার জালের মতো আমার হৃদয়ের ভেতরে বাসা বেঁধেছ৷
আমার ব্যাথাময় হৃদয় আজ অবুজ। মিহিনের এক পাক্ষিক ভালোবাসা আজ আমাকে ছুঁয়ে যায়, অনুভব করায় না। আগ্রহ জাগায় না। কারণ একটা সময় কেউ আমার প্রেম নিয়ে অঙ্কুরিত আগ্রহটা মাড়িয়ে নষ্ট করে দিয়েছে৷ সদ্য ফোটা অনুভূতি গুলোকে বিচ্ছেদের আগুনে পুড়িয়ে তচনচ করে দিয়েছে। সব কিছুই এখন আমার কাছে কালো, ধূসর, প্রেমহীন, মেকি লাগে। এখন আমার এসবে তেমন আগ্রহ জাগে না৷ কিছু জাগলেও আমি তা সহজে এড়িয়ে যেতে জানি। এড়িয়ে গেলে যে সুপ্ত আঘাত বোধ হওয়ার কথা, আমার তাও হয় না৷ আমি আড় চোখে মেয়েটার দিকে তাকালাম। সে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে। কিছু বলছে না৷ হঠাৎই যেন তার মাঝে ভীষণ নীরবতা এসে ভর করেছে৷ আমি একটু ভালো করে তাকালাম তার দিকে। খুব যত্ন করে চোখের পাড়ে কাজল আঁকা। কপালে ছোট্ট কালো একটি টিপ। ঠোঁটে লিপস্টিক। কাঁধের দু’পাশ বেয়ে ঝর্ণার মতো নেমে গেছে পাতলা কালো চুলে সারি। মেয়েটি খোলা চুলে এসেছে কেন? এমন ভাবে সেজে এসেছে কেন? সে কি জানে আমি এসব পছন্দ করি? সে কি আমাকে মুগ্ধ করতে এসেছে? আমি অন্যদিকে ফিরে বললাম,
-আপনার পরিচয় জানা হয়নি। মেয়েটা আমার দিকে ফিরলো মনে হয়। বলল,
-পরিচয়টা কি বিশেষ জরুরি?
-আগ্রহ আরকি।
-শুনলাম, আপনি নাকি আগ্রহবোধটা হারিয়ে ফেলেছেন? তাহলে?
-হারিয়ে ফেলা আগ্রহ কি ফিরে পাওয়া যায় না?
-তা যায়।
-তাহলে? বললেন যে?
-আপনার চোখেমুখে তীব্র আগ্রহের ছাপ৷ তা দেখেই বলা। অনুমান করেই আরকি।
-পরিচয়টা কি বিশেষ গোপনীয়?
-না নয়। আসলে মেয়েটি একটু থামলো। বললাম,
-রহস্য? রহস্য রাখতে চাইছেন?
-সব সময় রহস্য করা মানায় না। মাঝে মাঝে নিজেকে মেলে ধরাটাও প্রয়োজন।
-তাহলে পরিচয় দিতে এতো অনীহা কেন?
-শেষ একটু রহস্য করার সখ বলতে পারেন৷
-শেষ রহস্য?
-হ্যাঁ, কিছু রহস্যের দ্রুতই শেষ হয়ে যাওয়া ভালো। অনিষ্ট হয় না।
-তা এই রহস্য শেষ না হলে কার অনিষ্ট হতো?
মেয়েটা আমার দিকে সরাসরি তাকালো। আমাদের দ্বিতীয়বার চোখাচোখি হলো৷ আমি দ্রুত চোখ নামিয়ে নিলাম। সে অনেকক্ষন চুপ থেকে বলল,
-আপনার।
আমি বেশ অবাক হলাম। মেয়েটার দিকে তাকালাম আবার৷ সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে৷ টানা টানা চোখ দুটো কী মুগ্ধ হয়ে আমাকে দেখছে। আমি দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলাম। অবাক ভাবটা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। মেয়েটা বেশ স্বাভাবিক স্বরেই বলল,
-আপনি আমার দিকে তাকাতে পারেন। আমার চোখে চোখ রাখতে পারেন। আপনাকে আজ সেই অধিকার দেয়া হলো৷ কেবল আজকের জন্যে৷ আমি তার দিকে তাকালাম না। ভেতরে ভেতরে তুমুল আগ্রহ আমার। জানার আগ্রহ। আমার অনিষ্ট কিসে? তার রহস্যের সাথে আমার অনিষ্টের সম্পর্ক কী? বললাম,
-আমার অনিষ্ট হবে কেন?
-আপনি আগে আমার দিকে ফিরুন৷
-আপনার দিকে ফিরতে হবে কেন?
-আপনার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে ভালো লাগছে৷ তাছাড়া কেউ আমার দিকে না তাকিয়ে কথা বললে আমার ভালো লাগে না৷ মনে হয় সে আমাকে এভয়েড করছে। আপনি কি তাই করছেন?
-না, আসলে ব্যাপারটা সেটা নয়। আমি আসলে…
-বেশি কথা বলবেন না। বাড়াবাড়ি অপছন্দ আমার। আজকে আপনি আমার সব কথা শুনবেন৷ সব কথা৷ আপনাকে শুনতেই হবে।
কী অধিকারী গলায় কথা বলছে মেয়েটি! কীভাবে হুকুম চালাচ্ছে! মনে হচ্ছে আমি তার বিশেষ কেউ। আমার উপর তার অনেক অধিকার। অনেক। বললাম,
-আপনি কিন্তু আমাকে জোর করছেন৷
-আপনাকে জোর করার অধিকার আমার অাছে।
-কীভাবে?
-সেটা একটু পরেই টের পাবেন৷ আগে আপনি আমার দিকে তাকান। তাকান বলছি?
শেষ কথাটা একটু কঠিন শোনালো। আবার সেই অধিকারী শাসনের স্বর। আমি তার দিকে তাকালাম। আবার চোখ ফিরিয়ে নিলাম। মেয়েটা কঠিন দৃষ্টিতে তাকালো। আমি আবার তাকালাম। মেয়েটি বলল,
-এই চোখ দুটোর মতো অসাধারণ চোখ আপনি এই জীবনেও পাবেন না৷ জীবনেও না৷ একটু সুন্দর করে তাকান না?
আমি তাকালাম। মেয়েটাও তাকিয়ে থাকলো। তাকিয়ে থেকে বলল,
-ভালো করে দেখুন। আপনি নিজেকে দেখতে পাবেন৷ আমি তাকিয়ে থাকলাম। কাজল কালো চোখ জোড়ার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম। আসলেই কী অসাধারণ চোখ তার৷ কী মায়াময় চাহনি। কী গভীরতা। চোখ ভর্তি রাজ্যের মায়া এসে ভর করেছে যেন! আশ্চর্য! এই মেয়েটির চোখ আমাকে এমন ভাবে আকর্ষিত করছে কেন? কী আছে এই চোখে? কিসের এতো টান? দম নিয়ে ফেলার মতো চাহনি। পৃথিবীতে এমন কিছুও ঘটতে পারে? আমি আনমনে বললাম,
-এই চোখ দুটো এমন কেন? এতো টানে কেন আমাকে? মেয়েটি খানিক নরম স্বরে বলল,
-দুই দুইটা বছরের প্রেম জমে আছে এই চোখে। ভালোবাসার চাহিদায় আজ সমস্ত জল শুকিয়েছে। সেখানে বহুদিনের ক্ষুদার্ত একপাক্ষিক প্রেম। টানটা কি তীব্র হবে না? আপনি লেখক মানুষ৷ বোঝার কথা। আমি আবারও অবাক হলাম। মেয়েটি প্রেমের প্রসঙ্গ টেনে আনলো কেন? আর দু’বছরের প্রেম বলতে? বললাম,
-কী বলছেন এসব? দু’বছরের প্রেম মানে?
-আপনি বুঝতে পারছেন না তাই না?
-আমি শব্দ হারিয়েছি। বোঝার শক্তি লোপ পেয়েছে হয়তো।
-শেষ অনিষ্ট। তবে দ্রুতই সেরে যাবে।
-আপনি রহস্য রেখে কথা বলেন৷ কথার আড়ালে প্রশ্নের জবাব দেন। আমি তা ধরতে পারি না। আমি সে দিক দিয়ে অক্ষম। আমাকে বুঝিয়ে বললে ভালো হয়।
-আপনি লেখক মানুষ। কথার আড়ালের কথাটুকু বুঝে ফেলতে পারেন। পারতেন। এখন কেন পারছেন না?
-পারতাম, তা জানেন কী করে?
-প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়াটা অন্যায়৷
-আমার জীবনটাই হয়তো অন্যায়ে অন্যায়ে কেটেছে। তাই তো এতো এতো ব্যাথা। সেখানে আপনার সাথে এই সুপ্ত অন্যায়টুকু বিশেষ দোষ রাখবে বলে মনে হয় না।
-এতো ব্যাথা কিসের আপনার?
-এবার আপনি কিন্তু প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন করছেন!
-বারে! অন্যায় কি কেবল আপনিই করতে জানেন? আমি জানি না?
-এতো কোমল একটি মানুষ এমন অন্যায় করতে পারবে?
-আপনি পারলে অবশ্যই পারবে।
-আমি তো কোমল নই।
-আপনি কোমল নন, তা ভুল কথা। আমি ভীষণ কোমল। ভদ্রবেশি অগোছালো মানুষ। আমার কাছে আপনাকে প্রেমিক প্রেমিক লাগে৷ আপনার সাথে ভীষণ প্রেম করার ইচ্ছে৷ কী? করবেন প্রেম? আমি থতমত খেয়ে গেলাম। আচমকা তার এমন কথায় হতবিহ্বল আমি কী বলব ভেবে পেলাম না। অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। গা টা স্থির হয়ে আছে। বুকের ভেতরের ধপধপানিটা যায়নি। সেটি যেন সমস্ত শরীর কাঁপিয়ে তুলছে৷ আমি চুপচাপ বসে থাকলাম। কেমন ক্ষুদ্র একটি চাপ অনুভব করলাম হৃদয়ে। তখনই মেয়েটা মন খারাপের স্বরে বলল,
-ইশ! কী একটা কথা বলে ফেললাম। আপনি অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন। সরি সরি৷ আমি কিছু বললাম না। চুপচাপ বসে থাকলাম। মেয়েটি বলল,
-আমাকে গল্পটা বলুন না৷ আমার ভীষণ শুনতে ইচ্ছে করছে। আমি নিচের দিকে তাকিয়ে বললাম,
-আমার ধারণা আপনি আমার সম্পর্কে সবটাই জানেন এবং এটাই সত্য৷ তাহলে কেন আবার শুনতে চাইছেন?
-আপনার মুখ থেকেই শুনতে চাওয়া আরকি। আপনার অনুভূতির গল্প আপনার মুখ থেকে শুনলে অন্য রকম ভালো লাগবে।
-এই গল্পে অনুভূতি নেই৷ কেমন খাপছাড়া অস্বস্তিকর গল্প।
-অথচ এই গল্পটাই তো আপনার জীবনের মোড় পাল্টে দিয়েছে৷ আপনার অনিষ্টের শুরু এখান থেকেই তো!
আমি মেয়েটির দিকে তাকালাম। কে জানি কেন, আমার চোখ গেল তা ঠোঁটের উপর৷ পাতলা ঠোঁট দুটো টকটকে লাল রং করা। আমার বুকের ভেতরটা আবারো খানিক কেঁপে উঠলো। সেই কেঁপে উঠাটা ছিল শীতল। মূহুর্তে সমস্ত দেহের আঙ্গিনায় আঙ্গিনায় পৌঁছে যায়৷ মেয়েটা চট করেই বলে ফেলল,
-এভাবে তাকাবেন না প্লীজ। তা না হলে আমি যে কোনো মূহুর্তে আপনার ঠোঁটে চুমু খেয়ে ফেলবো। আপনার সামনে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা রীতিমতো যুদ্ধ মনে হচ্ছে।  আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। লজ্জায় যাচ্ছেতাই অবস্থা আমার। এভাবে ধরা পড়ে যাবো ভাবিনি। মেয়েদের দৃষ্টি আসলেই প্রখর। মেয়েটি বলল,
-বলুন না প্লীজ। বাচ্চাদের মতো আহ্লাদী আবদার৷ খানিকটা সময় চুপ থেকে বললাম,
-এই গল্প শুনতে কারোই ভালো লাগে না৷ আপনার যে লাগবে সেই প্রত্যাশাও নেই৷ যাই হোক, গল্প শুরু করা যাক।
গল্প শুরু হলোঃ
-হঠাৎই বাবা মারা যান৷ অফিস থেকে ফেরার পথে লরির সাথে ধাক্কা। সেই ধাক্কায় মৃত্যু। বাবার বিদায়টা আমার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম একটি কষ্ট ছিল। কারণ বাবা আমাকে ভালোবাসতেন। প্রচন্ডরকম ভালোবাসতেন। কিন্তু কেন জানি তার সাথে আমার কিছুটা দূরত্ব ছিল।
আমি তাকে তেমন পছন্দ করতাম না৷ তার অবশ্য একটা কারণ আছে৷ আমি যখন মায়ের গর্ভে ছিলাম তখন নাকি বাবা একটা রিলেশানে গিয়েছিলেন। অন্য একটি মেয়ের সাথে৷ সে অনেক কাহিনী। বিস্তর আমি জানতাম না৷ তবে বুঝ হওয়ার পর নানুর বাড়িতে যখন প্রায়ই বাবার এই কান্ডটা নিয়ে আলোচোনা হতো তখন খুব খারাপ লাগতো। সেই খারাপ লাগা থেকেই আসলে ঘৃণা। ঘৃণা থেকে দূরত্ব। বাবা বেশ চাপা স্বাভাবের ছিলেন। প্রথম প্রথম আমার এড়িয়ে যাওয়া দেখে কিছু বলেননি৷ তবে সময় বাড়তেই তিনি কিছু গড়বড় বোধ করলেন হয়তো৷ সেখান থেকেই আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা। আমি স্পষ্ট উত্তর দেই, ‘তুমি খারাপ বাবা। আমাকে মায়ের পেটে রেখে তুমি কীভাবে অন্য একটা মেয়ের সাথে সম্পর্কে গেলে?’ বাবা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। সেদিন দূর থেকে তার চোখের জল দেখার ভাগ্যটা আমার হয়নি। হলে হয়তো দেখতে পেতাম একজন বাবা কাঁদছেন।
আমাকে অবাক করে দিয়ে তারপর দিন থেকেই সব স্বাভাবিক ভাবে চলতে থাকলো। ঘরের সমস্ত কাজ কর্ম আগের মতো৷ কোনো চেঁচামেচি নেই৷ ভেবেছিলাম বাবা বাজে বিহ্যাভ করবে। ঝগড়াঝাটি হবে৷ কিন্তু তিনি তা করলেন না৷ সয়ে গেলেন। তখন বুঝতে পারলাম বাবা কতোটা চাপা স্বভাবের৷ ঘরের সব কিছুই ঠিকঠাক চললো। কেবল বাবার সাথে আমার কথা হয় না। অঘোষিত দূরত্ব। এই যা! এছাড়া আমার পকেটে প্রতিদিন সকালে টাকা এসে যেতো আগের মতোই।
গভীর রাতে আমার রুমের দরজা ফাঁক করে বাবার একবার দেখে যাওয়াটা পরিবর্তন হয়নি৷ আমার পছন্দের সব কিছুই হতো আমাদের বাসায়৷ রান্না ধরে সব কিছু। তবে কোনো দিন বাবার পছন্দের কিছু রান্না হয়েছে বলে শুনিনি। আমি আসলে তখনও বাবাকে বুঝতে পারছিলাম না৷ ঠিক এমন সময় বাবার মৃত্যু৷ আঘাতটা মোটামুটি ভালোই পাই। তখনই উপলব্ধি করি বাবা কী? বাবা নামক মানুষটা আসলে কী? তিনি যে মাথার উপর একটি ছায়া হিসেবে ছিলেন তা টের পাই। তখনও এতোটা ব্যাথা আমায় গ্রাস করেনি৷ কিন্তু যখন বাবার ডায়েরিটা হাতে পেলাম তখনই সবচে বড় ধাক্কাটা খাই। আঘাত পাই৷ যে সত্যটাকে এতোদিন সত্য ভেবে বাবাকে ঘৃণা করে এসেছি সেই সত্যটা আসলে সত্য নয়৷ চরম মিথ্যা৷ বাবা আসলে কারোই প্রেমে পড়েননি৷ ওটা ছিল মায়ের ভুল বোঝাবুঝি।
কারণ বাবাকে কয়েকদিন অন্য একটা মেয়ের সাথে দেখা গিয়েছে৷ সেটা অফিসিয়াল ছিল। মা সেটা মানেন নি৷ ভুল বুঝে বাবাকে ছেড়ে চলে গেলেন। পরে জানতে পারলেন সব মিথ্যা৷ এই মিথ্যাটা কেবল বাবা এবং মায়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। মা ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেলেন। বাবাকে এভাবে ভুল বুঝবেন সেটা তিনি ভাবেনওনি। সেই লজ্জায় মা কখনও কোথায় মুখ ফুটে বলেননি সেটা মিথ্যা ছিল। আর বাবা তো চাপা স্বভাবের৷ তাকে নিয়ে কে কি ভাবলো এসব তাকে তেমন প্রভাবিত করে না৷ অথচ আমি যেদিন বললাম ‘বাবাকে আমি ঘৃণা করি’ সেদিন বাবা আঘাতটা পেলেন। তীব্র আঘাত৷ তবুও তিনি আমাকে সত্যটা বললেন না। তিনি তো মহান ছিলেন। তার ভাবনাও তেমন। এই মূহুর্তে আমাকে সত্যটা বলে বাবা মাকে আবার লজ্জায় ফেলতে চাইলেন না৷ তাই কিছুই বলা হয়নি। চাপা মানুষের সব কিছুই চাপা থাকে। বাবা সেই ব্যবস্থাই করে গিয়েছিলেন।
বাবার মৃত্যুর পর এসব জেনে ভীষণ হতাশাগ্রস্ত হই আমি। তীব্র একটা আঘাত আমাকে বেশ ভোগায়৷ সূচালো যন্ত্রণা হয় হৃদয়ে। মস্তিষ্কে। ব্যাথা লাগে৷ এই গল্পটা থেকেই আরেকটা গল্পের শুরু৷ মানুষের জীবনের প্রতিটা গল্পই হয়তো সম্পর্কযুক্ত। আপনি প্লীজ এভাবে তাকাবেন না৷ আমার অস্বস্তি লাগে৷ গল্প বলতে সমস্যা হচ্ছে। তাকাবেন না প্লীজ।
মেয়েটি আচমকা আমার এমন কথায় থতমত খেয়ে গেল। কী বলবে ভেবে পেল না৷ লজ্জা পেল খানিক। এতোক্ষণ আমার দিকে মনোযোগী হয়ে তাকিয়ে ছিল। এখন মুখ নামিয়ে নিলো৷ আমার কেন জানি মনে হলো মেয়েটার তাকিয়ে থাকাই ভালো ছিল৷ এভাবে বলাটা ঠিক হয়নি। সে অস্বস্তিতে পড়ে গেল৷ তাও সে বলল,
-তারপর? অন্য গল্পটা বলবেন না? আমি অন্য গল্পটা বলা শুরু করলাম,
-তখন আমার হতাশার মৌসুম। হতাশ এবং যন্ত্রণাময় জীবন পার করছি৷ এদিকে হঠাৎই মায়ের সাথে আমার এক অচেনা দূরত্বের দেয়াল খাড়া হলো। আমি মায়ের সাথে ফ্রি হতে পারছিলাম না। অন্যদিকে নিজেকে দোষী মনে হতে থাকলো। এমন যন্ত্রণাময় মূহুর্তে যে কারো সঙ্গই ভালো লেগে যায়৷ কারো ছোট্ট একটি কথাও অনেক মোটিভ করে। সেখানে ওই মেয়েটি আমাকে জানতো৷ আমার সমস্ত জানতো৷ যার কারণেই সে সহজে মিশে গিয়েছে আমার সাথে৷ আমাকে হাসিয়েছে। নতুন একটা পথ দেখিয়েছে বাঁচার। ফেসবুকে একদিন আচমকা তার মেসেজ আসে।
“আপনাকে এমন ছন্নছাড়া অবস্থায় একদমই ভালো লাগে না। আপনি বরং হাসুন৷ হাসলে আপনাকে এতো অসাধারণ লাগে! একদম সিনেমার নায়কদের মতো।” কী সহজ সরল বাচনভঙ্গি তার৷ আমার মাঝে কৌতূহল বাসা বাঁধলো। সেখান থেকেই শুরু আমাদের কথাবার্তা। অচেনা অজানা একটি মেয়ের সাথে চট করেই মিশে গেলাম। মেয়েটাও৷ মিশতেও সময় লাগলো না৷ মেয়েটার অনিন্দ্য একটা দক্ষতা ছিল। কাউকে মায়ায় জড়িয়ে ফেলার দক্ষতা৷ কথার মাঝে মায়া ফলাতে একমাত্র তাকেই দেখলাম। তখন মেয়েদের মায়াবী মনে হলো। এরা পুরুষের চারপাশের মায়ার একটা আবরণ তৈরী করে তাকে সেখানে আঁটকে রাখে৷
আঁটকে রেখে তাকে নিজের মতো করে চালায়। তাকে গড়ে তোলে। গড়ে তোলাটাই হয়তো মেয়ে জাতির স্বভাব৷ সে কারণেই হয়তো ফেসবুক কন্যা আমাকে গড়ে তুললো৷ নিজের মতো করে। প্রতি বেলায়ই তার সাথে ম্যাসিজিং হতো। নানা কথা হতো৷ সময় ফুরাতো৷ অথচ কথা ফুরাতো না। এরপর ফোন নাম্বার আদানপ্রদান। কথা যেন দিন দিন বাড়তেই থাকে। আমরা ঘনিষ্ট হই৷ আমাদের কথা গভীরতা বাড়ে৷ তার ছায়াটাকেও বড় নির্ভরশীল মনে হয়৷ তাকে মনে হয় অচিনপুরের রাজকন্যার মতো৷ যদিও তাকে দেখিনি কখনও। তবে মনে মনে তার অদৃশ্য এক অবয়ব এঁকে ফেলেছিলাম। আমাদের কথা হতে হতে এমন পর্যায়ে চলে আসে যে তখন একদিন কথা না বলে থাকা যেত তো না। থাকাটাও দমবন্ধকর লাগতো। ফোনে একটু ব্যস্ত পেলেই দু’পক্ষে হাসফাস শুরু হয়ে যেতো৷ কঠিন জেরা হতো৷ মেয়েটি কঠিন স্বরে বলতো,
এই, কার সাথে কথা বলেছো শুনি? কার সাথে এতো কথা হু? কোন মেয়ের সাথে টাংকি মারা শুরু করেছো? দেখি আমাকে ডায়াল লিস্টের স্ক্রিনশট দাও। জলদি দাও।” কী সব পাগলামি করতো নীলিমা। নীল নীলিমা আইডির নাম। তার আসল নামটা পর্যন্ত জানতাম না। আজও জানিনি। আমি তাকে নীলু বলে ডাকতাম। প্রথম যেদিন নীলু বলে ডেকেছি সেদিন কি যে কান্না করছিল পাগলিটা বলে বোঝানো যাবে না। বড় আবেগি মেয়ে সে। আবেগে আবেগে আমরা অনেকদূর হেঁটে যাই৷ হাঁটতে হাঁটে হঠাৎ মনে হলো আমার অন্য পাশটা খালি। হাঁটার সঙ্গিটা হারিয়ে গিয়েছে। কেউ নেই। কোথাও কেউ নেই।
নীলুর বিয়ে হয়ে গিয়েছে। একদিন কেবল এই ছোট্ট একটি মেসেজ আসে৷ আর কোনো কথা নেই। কোনো আলাপ নেই। অঘোষিত বিদায়৷ নীলুর বিদায় হলো ঠিকই। তবে তার মায়ার বেষ্টনী থেকে গেল। আমি সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি৷ আজ পর্যন্ত না৷ তাই আমার এই ছন্নছাড়া অবস্থা৷ এতো অনাগ্রহ। মিহিন বলে একটা মেয়ে পেছনে পড়েছে আজকাল। সে আমাকে খুব করে চাইছে৷ নিজের করে গড়তে চাইছে৷ অথচ এসব টানে না আর। কোনো বোধ পাই না। মূহুর্ত আসলে চরম একটা জিনিস৷ কখন খারাপ হয় আর কখন ভালো হয় বোঝা মুশকিল। একি আপনি কাঁদছেন কেন? আপনার চোখে জল কেন? আশ্চর্য তো! মেয়েটি অপ্রস্তুত হয়ে চোখের জল মুছল। কাজল খানিকটা লেপ্টে গেছে৷ বললাম,
-গল্পটা এতোটা আবেগিও নয় যে আপনি কেঁদে দিবেন৷ আপনি তো ভীষণ আবেগি মেয়ে! দেখে বোঝা যায় না৷
আকাশি শাড়ি পরা মেয়েটি মুখ মলিন করে বসে আছে৷ এই প্রথম এমন প্রাণচঞ্চল মেয়েটার বেদনায় কাতর চেহারা দেখলাম। বুকের ভেতরটা শিনশিন করে উঠল। কেমন একটা ব্যাথা হলো। মেয়েটা নরম স্বরে বলল,
-নীলুকে খুব ভালোবাসতেন তাই না? আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম,
-আকাশ সমান ভালোবাসি তাকে। কিংবা তারও বেশি৷ এখন প্রায় মাঝরাতে তার কথা ভেবে আমার চোখে জল আসে। একটু একটু ব্যাথাবোধ হয়৷ মেয়েটির স্বর নেমে আসে,
-কে জানে! হয়তো মেয়েটিরও তেমন হয়৷
-জানি না। তবে তার সাথে দেখা হলে একটা কথা জিজ্ঞেস করতাম। আমাকে এতো সুন্দর করে গুছিয়ে দিয়ে আবার অগোছালো করে দিলো কেন? আচ্ছা, আপনার কী মনে হয়? নীলু এমন করেছে কেন?
-নীলু হয়তো নির্দয়৷ কঠিন মনের মানুষ।
-কে জানে। কিন্তু আপনি এতো কাঁদছে কেন? আশ্চর্য ব্যাপার৷ কাঁদতে কাঁদতে তো চোখ লাল করে ফেলেছেন!
মেয়েটা কান্না করেই গেল৷ আমি বেশ অবাক হলাম। তার কান্নার কারণ খুঁজে পেলাম না। মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-আপনাকে আমার জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে। জড়িয়ে ধরে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। অথচ আমি সেটা করতে পারছি না। কোথাও যেন বাধা লাগছে৷ কিছু একটা টেনে ধরে আছে যেন! কথাটা বলেই মেয়েটা একটু থামলো। আমি অবাক নেত্রে তাকে দেখে গেলাম। তার চোখ লালছে হয়ে গেছে৷ নাকের ডোগা লাল হয়ে আছে৷ মুখটা ফ্যাকাসে। আমার গায়ের কাঁপন শুরু হয়েছে আবার৷ কপাল ঘামছে৷ পিঠের দিকটা ঘেমে একাকার। আমার কেমন জানি লাগছে৷ মেয়েটা তার হ্যান্ডব্যাগ থেকে ফোন বের করে কাকে যেন ফোন দিলো। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-হ্যালো, আপনি কোথায়? ওপাশের কথা শোনা গেল না।
-জলদি আসুন না প্লীজ।
-আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারছি না৷ আমার কান্না পাচ্ছে ভীষণ। আপনি জলদি আসুন প্লীজ। আপনাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদবো আমি।
-কতোক্ষণ লাগবে?
-আচ্ছা। আচ্ছা, ঠিকাছে৷
-আমি বলে দেবো।
-লেকের উল্টো দিকে এলেই পাবেন।
-আচ্ছা, আপনি ওকে নিয়ে জলদি আসেন৷ মেয়েটা কথা শেষ করে একটু শান্ত হলো। কিছু সময় চুপচাপ বসে থাকলো। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো। আমি গভীর ভাবে তাকে লক্ষ্য করলাম। বললাম,
-কে আপনি? মেয়েটা হেসে বলল,
-আমি অনিষ্ট৷ নীলিমার বুকের মেঘ৷ সেই মেঘ আজ ঝরবে৷ বৃষ্টি নামবে৷ কথাটা বলেই সে হাসতে থাকলো। হাসতে হাসতে তার চোখে জল দেখা গেল। সে বলল,
-নীলু আপনাকে বলেনি সে প্রথম কোথায় আপনাকে দেখেছে? কীভাবে দেখেছে? সে আপনাকে কীভাবে জানতো সে সব কিছুই কি নীলু বলেনি? আমি একভাবে তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। সে বলল,
-আমার গল্পটা বলি। ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারের মাঝামাঝি সময়ের ঘটনা। কলেজে একটা ছেলেকে দেখি। কে জানে কেন সে কলেজে এসেছে। হয়তো আমার জন্যেই৷ হয়তো আমাদের দেখা হবে এই কারণে। প্রথম দেখাতেই আমার বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠলো। মনে হলো, আশ্চর্য, আমি এটা কী দেখলাম। কে এই ছেলে? একেবারে আমার স্বপ্নের রাজপুত্রের মতো। কেমন শিরশিরে একটা শীতল অনুভূতি আমার সমস্ত শরীরকে আবৃত করে ফেললো। প্রথম দিনে দেখার পর তাকে হারিয়ে ফেলি৷ কী এক যন্ত্রণা হচ্ছিলো বলে বোঝানো যাবে না৷ তাকে দ্বিতীয় বার আবার কলেজে দেখি৷ তৃতীয়বার দেখি সুপার মার্কেটে। সেখান থেকেই তার পিছু নেই৷ বাসা পর্যন্ত যাই৷ কে জানে, আমিই হয়তো প্রথম মেয়ে যে একটা অচেনা ছেলের জন্যে এতোটা পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। উন্মাদের মতো লাগছিলো৷ মনে হচ্ছিল এই ছেলের জন্যে সব করতে পারবো আমি৷ সব৷ মাঝে মাঝে রাতে সমস্ত আলো বন্ধ করে রুমের এক কোনায় বসে কোলবালিসের সাথে কথা বলতাম।
মাঝে মাঝে মাঝে কোলবালিসকে জড়িয়ে ধরতাম। চুমু খেতাম। বারান্দায় একা একা বসে তার কথাই ভাবতাম। তাদের এলাকা দিয়ে কলেজ যাওয়ার একটা রাস্তা ছিল। আমি সহজ সরল রাস্তা ছেড়ে সেই রাস্তা দিয়ে রোজ যেতাম। তাকে একবার দেখবো বলে। কেমন সব পাগলামী করতাম। এই পাগলামি গুলো করতেও বেশ লাগতো। অথচ সব কিছু করতে পারলেও আমি তার সামনে গিয়ে কথা বলার সাহস যোগাতে পারিনি৷ যখনই ভেবেছি যাবো তখনই দেখা গেল বুকের কাঁপনটা বেড়ে গেল কিংবা হাত-পা অবস হয়ে এলো। কোনো ভাবেই সামনে আসতে পারছিলাম না। কেমন জানি ভয় হতে থাকলো। অদ্ভুত এক যন্ত্রণা। আমি এই যন্ত্রণায় ভুগতে ভুগতে অতিষ্ঠ হয়ে গেলাম।
তার ফেসবুক আইডি পেতে তেমন বেগ পেতে হয়নি৷ রিকোয়েস্ট দিলাম। একসেপ্ট করলো। তবে মেসেজ দেওয়ার সাহস হয়নি। প্রতিদিনই ভাবি মেসেজ দিবো৷ অথচ এই কথাটা ভাবার পরই মনের মাঝে কেমন জানি জড়তা এসে বাসা বাঁধতো৷ ভয় হতো৷ আর মেসেজ দেওয়া হতো না। তবে তার আইডি ঘুরে ঘুরে দেখা বেশ ভালোই হতো৷ প্রতি দিন অগণিত বার তার আইডিতে গিয়ে ঘুরতে আসতাম। এতেই কেমন শান্তি লাগতো। এরপর একদিন শুনলাম তার বাবা মারা গিয়েছে৷ তাকে দেখে বেশ অস্বাভাবিক লাগলো। কেমন পাগলের মতো, ছন্নছাড়া ভাব৷ চোখের নিচে কালি পড়ে তাকে তখন কেমন নেশাখোরের মতো লাগছিল। তখন নিজেকে আর রুখিয়ে রাখতে পারিনি। প্রথমবারের মতো মেসেজ আমার মনে হলো এই মেয়েটাই নীলু৷ এই সেই নীলু। আমার নীলু৷ আমি চট করেই বলে উঠলাম,
-নীলু? তুমি নীলু তাই না? মেয়েটা চট করেই আমার দিকে তাকালো। তার চোখের কোণা বেয়ে কয়েক ফোটা পানি পড়ে গিয়েছে৷ সে কান্না করছে৷ ভীষণ কান্না করছে। আমার চোখটা ভিজে এলো৷ চোখের পানি গাল বেয়ে পড়লো। অদ্ভুত এক যন্ত্রণা হচ্ছিল। তার এমন কান্না দেখে আমার ভীষণ কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। চিৎকার দিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছিলো৷ মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-নীলু। আমিই তোমার নীলু। আমিই তোমার অনিষ্ট, ধূসর, ঘোলাটেই এই ছন্নছাড়া জীবনের জন্যে দায়ী৷ আমিই সেই পাপি। মেয়ে মুখের উপর দু’হাত রেখে কান্না করতে থাকলো। গা কাঁপিয়ে কান্না করছে সে। তার পিঠময় খোলা চুল। মাথার দু’পাশ দিয়ে কিছু চুল নেমে গিয়েছে৷ তাকে কী অনিন্দ্য লাগছে! কী ভীষণ সুন্দরী! কাঁদার সময় কাউকে এতো ভালো লাগে? কে জানে! মেয়েটা একটু স্থির হলো। বলল,
-হুট করেই আমার বিয়ে ঠিক হয়৷ ছেলে একজন আর্কিটেক্ট ইঞ্জিনিয়ার। তখন অনার্স প্রথম বর্ষে আমি৷ তোমার সাথে আমার আবেগি সম্পর্কের শেষ সময়৷ তুমি তখনও গ্রেজুয়েশন কমপ্লিট করতে পারোনি৷ এদিকে বাবা চট করেই বিয়ে ঠিক করে ফেলেন। সব কিছু এতো দ্রুত হয়ে যায় যে আমি বুঝতেও পারিনি কী করবো৷ একজন অচেনা অজানা মানুষের সাথে আমার বিয়ে হয়ে যায়৷ বাবাকে অনেক বোঝাই৷ অনেক কাঁদি৷ পড়তে চাই৷ কঠোর বাবাকে বোঝানো দায়৷ আমি হেরে যাই৷ আমার ভালোবাসা হেরে যায়৷ মেয়েটা খানিকটা ফুঁপিয়ে উঠে। অল্প একটা বিরতি নেয়। আমি কেবল তার দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার কিছুই বলতে ইচ্ছে করে না। কিছুই না। সে আবার বললো,
-বিশ্বাস করো, এই এতো দিন যতোটা কষ্ট তুমি পেয়েছো তার চেয়ে বেশি কষ্ট আমি পেয়েছি। পেয়ে যাচ্ছি। কারণ তোমাকে আবিষ্কার আমিই করেছি। আমিই কাছে টেনে আবার দূরে ঠেলে দিয়েছি৷ আমাকে মাপ করে দাও প্লীজ। আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি শান্তিতে নেই৷ একটুও নেই। কাঁদতে কাঁদতে কথা গুলো বলে আকাশি রঙের শাড়ি পরা রাজকন্যাটা৷ আমি কেবল তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমি এখন বুঝতে পারি, কেন এই চোখে এতো টান৷ এতো আকর্ষণ। সে কিছু সময় চুপ থেকে বলল,
-মিল! মিলতে হবে? ভালোবাসলেই মিলতে হবে এমন কোথাও লেখা নেই৷ ভালোবাসা দূর থেকেও হয়৷ একই সময় দূরে থেকে একই কিছু অনুভব করাটাই ভালোবাসা। ব্যস৷ এই অনুভূতিটাই তো অনিন্দ্য৷ সবাই তো তা পায় না৷ আমরা পেয়েছি। আর কী চাই? এই, চলো না, যা হয়েছে সব ভুলে যাই৷ সব ভুলে গিয়ে আপনজনদের খুশি রাখি৷ এটা কি আমাদের দায়িত্ব নয়? আমাদের কি ভেঙ্গে পড়লে চলবে? উঠে দাঁড়াতে হবে না? বলো, হবে না? আমি কেমন জানি স্বরে বললাম,
-নীলু, তুমি কি ভুলতে পারবে আমাকে?
-জানি না। তবে চেষ্টা করবো৷ আমার জন্যে রবিন আছে৷ সে আমাকে ঠিক করে নেবে। গুছিয়ে নেবে। তোমার মিহিন আছে৷ বড় লক্ষি মেয়ে৷ সেও তোমাকে গুছিয়ে নেবে৷ আমার থেকে ভালো৷ তুমি আবার নতুন করে বাঁচতে শিখবে৷ সব কিছু নতুন করে শুরু করবে৷ কথা দাও প্লীজ। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা দাও। আমি তখনই বিশ্বাস করবো৷ তার আগে না। আমি তার চোখের দিকে তাকালাম এবং কথা দিলাম। সে আমার চোখের দিকে তাকিয়েই থাকলো। তাকিয়ে তাকিয়ে জল ফেলল। বলল,
-এই রহস্যটার সমাধান অতি দ্রুত হওয়া উচিৎ ছিল। আর দেরি হলে হয়তো তোমার আরো অনেক ক্ষতি হয়ে যেতো৷ ঠিক না? ঠিক এমন সময় দু’জন লোক এলো। একজন সুদর্শন পুরুষ আর অন্যজন মিহিন। এদের দু’জনকে দেখে বেশ অবাকই হলাম। ছেলেটাকে দেখে নীলু উঠে গেল। মিহিনকে টেনে এনে আমার পাশে বসালো। বলল,
-চিন্তা করবে না। আমি জানি তুমিই ওকে ঘুছিয়ে নিতে পারবে৷ বলো পারবে না? মিহিন হাসলো। বলল,
-অবশ্যই পারবো। আপনি জানেন না, আমি বড্ড জেদি৷ যে চাই, সেটাকে যে করেই হোক, নিজের করে নেই৷
নীলু উঠে গিয়ে ছেলেটার পাশে দাঁড়ালো। মাথা নিচু করে বলল,
-ও হচ্ছে রবিন। আমার হাজবেন্ড। আমি তার দিকে তাকালাম। ছেলেটা হাসলো। এগিয়ে এসে হাত মেলালো। তার মুখটা আমার কানের কাছে এনে বলল,
-সরি ফর এভ্রিথিং। ওর মনের এতোটা জুড়ে আপনি আছেন জানলে বিয়েই করতাম না। তাকে দেখেই আমার এতোটা ভালো লেগেছিল যে আমি বিয়ের জন্যে উঠে পড়ে লেগে যাই এবং আপনাদের বিচ্ছেদের কারণ হই৷ ভেরি সরি ভাই। এতটুকু বলে একটু থামল সে। আবার বলল,
-সে এখনও আমাকে তাকে ছুঁতে দেয়নি। বাসর রাতে তার হাত ধরেছিলাম কেবল। সে পুরো রাত কেঁদে ভাসিয়েছে৷ চিন্তা করে দেখেন কেমন মেয়ে সে। বড় অদ্ভুত। মিহিনের পেছনে আমাকে গোয়েন্দাগিরি করতে বলেছে। না করলে সে আমার সাথে কথা বলবে না৷ কী আর করার৷ বউয়ের আদেশ তো মানতেই হয়৷ যাই হোক, আপনাদের জন্যে শুভ কামনা রইলো। গুড লাক। আমি হাসল। বললাম,
-থ্যাংকিউ ভেরি মাচ ভাই৷ উইশ ইউ গুড লাক টু। নীলুর জন্যে তো এক বুক ভালোবাসা আছেই।
-থ্যাংকিউ ভাই৷ নেক্সট উইকে অস্ট্রেলিয়া চলে যাবো। ওখানেই সেটেল্ড হয়ে যাবো। দোয়া করবেন।
-দোয়া রইলো।
তারা দুজন ধীরে ধীরে দৃষ্টি সীমানা অতিক্রম করলো। আমি স্পষ্ট দেখলাম নীলু রবিনের হাত শক্ত করে চেপে ধরে আছে। তার মাথাটা রবিনের কাঁধের সাথে মিশে আছে। মেয়েটা কি কাঁদছে? আমি তাকিয়ে থাকলাম। ভাবলাম সে ফিরে তাকাবে হয়তো। অথচ সে একবারও পেছন ফিরে তাকায়নি৷ একবারও না। পাশ থেকে হঠাৎ মিহিন বলে উঠলো,
-ভালো লাগছে এখন?
আমি তার দিকে একবার তাকালাম। তারপর ধিরে ধিরে তার দিকে এগিয়ে গেলাম। তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিলাম। কী তীব্র কান্নার বেগ। কাঁদতে কাঁদতে বললাম,
-আমার কষ্ট হচ্ছে মিহিন। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত