অপূর্ণ প্রেম

অপূর্ণ প্রেম
গোপনে হোটেলের এক বিলাল বহুল রুমে আনন্দে সময় কাটাচ্ছে রিয়া আর সাগর। দুজনেই খুব আনন্দ ঘন মূহুর্ত অতিবাহিত করছে। এমন সময় সাগর রিয়ার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। তুমি আমার শরীরটা ভোগ করে চলেছো রিয়া সাগরের বুকে মাথা রেখে হেঁসে হেঁসে বললো, আর এদিকে আমি তোমার সন্তানের মা হতে চলেছি! সাগরের বুকে এতো ক্ষন পরম শান্তিতে মাথা রেখে শুয়েছিল রিয়া! কথটা শোনা মাত্র সাগরের বুকে ঢেউ শুরু হয়ে গেল। উথাল পাথাল ঢেউ! সেই ঢেউয়ের তান্ডবের প্রচন্ডতায় সাগরের বুকে শুয়ে থাকা রিয়া ছিটকে পড়ে। সাগর রিয়াকে ঠেলে দেয়। রিয়া প্রায় বিছানা থেকে পড়ে যাচ্ছিলো! সাগর তার হাত ধরে পতন রোধ করে। রিয়া আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে কি হলো তোমার? আমার এই অবৈধ সন্তান চাই না। তুমি আগে কেন কোন ব্যাবস্থা গ্রহণ করলেনা?
রিয়া আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে তুমি আমায় ভালোবাসো না? ভালোবাসা আর সন্তান নেওয়া এক নয় রিয়া। তোমায় ভালো লাগে তাই তোমায় ভালোবাসি! তাই বলে বিয়ে না করে সন্তান নিতে হবে? এমন কোন কথা আমি তোমাকে দেই না। কেন প্রেম করে প্রেমিকার শরীর ভোগ করা অবৈধ নয়! হ্যা! অবৈধ কিন্তু সেটাতে তোমারও মত আছে আমারও আছে তাই তোমার শরীর আমাকে দিয়েছো! কিন্তু সন্তান নেওয়াতে তোমার মত থাকতে পারে আমার নেই! উত্তেজিত হয়ে বলে সাগর! রিয়া সাগরের দিকে তাকিয়ে অনুরোধের সুরে বলে, আমার ভুল হয়ে গেছে! সাগর বলে ভুল শুধরে নাও। রিয়া আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে, তুমি কি আমাকে বাচ্চা ফেলে দেবার কথা বলছো? সাগর ওর দিকে না তাকিয়ে পাষাণের মতো বলে, হ্যা!
কিন্ত এখন তো তা করা যাবেনা। এতে করে আমার জীবনের ঝুঁকি আছে। আমি মারা যেতে পারি। সাগর চোখের রঙ পাল্টে দিয়ে বলে, অসম্ভব হলেও করতে হবে রিয়া! এতে আমার মৃত্যুর ঝুঁকি আছে! একটু ঝুঁকি তো নিতেই হবে সোনা! রিয়া চোখের জল মুছে বলে, তাই বলে এটা তুমি আমাকে করতে বলতে পারলে। কিন্তু এতো মহাপাপ! সাগর হেঁসে বলে এতোক্ষণ কোন পূন্য করছিলাম দুজন মিলে? সাগর এত পাষাণ হয়োনা! বলে কান্নায় ভেঙে পড়ে রিয়া। রিয়া বলে এটা তো তোমার মনের দিকে তাকিয়ে করেছি। সাগর হেঁসে বললো, এই কাজটাও আমার মনের খুশির জন্যই কর! সাগরের পাষাণ হৃদয় গলে না! ধমকে উঠে বলে আমি এই পাপ গোপনীয় ভাবে নষ্ট করে দিতে চাই।
রিয়া বলে, তুমি আমায় যখন ভালোবাসো তখন বিয়ে করে নিলেই তো আমাদের সন্তান আর অবৈধ থাকেনা? আমাদের একটা সুখের সংসার হয় সাগর। আর আমাদের এভাবে গোপনে সাক্ষাৎ করতে হবেনা। সাগর হেঁসে বলে এই তোমরা মেয়েরা কি মনে করো ভালোবাসলেই বিয়ে করতে হবে? তাহলে তুমি এতদিন ধরে যে আমার দেহ ভোগ করেছো ভালোবাসার নামে? সাগর হেঁসে বলে ভালো আমি এখনো তোমাকে বাসি তাই বলে তোমাকে বিয়ে করবো এমন কোন ওয়াদা তোমাকে আমি দেয়নি! তুমিই বলো দিয়েছি কি? দেইনি তো? আর তুমি যে বলছো রিয়া তোমার দেহ আমি ভোগ করেছি! তুমি আমাকে ভোগ করনি? রিয়া,কান্নায় ভেঙে পড়ে জবাব দেয়, না আমি তোমার দেহ ভোগ করিনি! তোমার খুশির জন্য নিজের দেহ বিলিয়ে দিয়েছি! তুমি তো বলতে আমাকে ছাড়া তুমি বাঁচবে না? হ্যা ঠিক কথাই তো!
তাই বলে কি আমি কোনদিন তোমাকে বলেছি তোমাকে বিয়ে করতে না পারলে বাঁচবো না! বলো জবাব দাও? কোন দিন বলিনি রিয়া। তুমিই বড়লোকের পুত্রবধূ হবার স্বপ্ন দেখেছো! তোমার মনের মধ্যে লোভ বাসা বেঁধেছে। রিয়া কি বলবে ভেবে পায়না। সাগর বলে যায় তোমাকে ভালোবেসে আমার পকেট থেকে হাজার হাজার টাকা খরচ করেছি। এরকম দামী হোটেলে এনে রাত কাটিয়েছি দামী দামী খাবার খাইয়েছি। যা তোমার মতো মেয়ে কোনদিন কল্পনাও করতে পারেনা! তুমি আমার চাইতে আমার টাকার প্রেমে বেশি পড়েছ। রিয়া আঁতকে উঠে বলে তুমি এমন কথাও বলতে পারলে! ঠিক আছে তুমি তোমার ধারণা নিয়ে থাকো।
সাগর সে কথার কোন জবাব না দিয়ে বলে,আমি এখনও বলছি আগেও বলেছি তোমাকে আমি প্রচন্ড ভালোবাসি! কিন্তু তাই বলে, বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ আমার বাবা-মা কোনদিন তোমাদের মতো পরিবারের মেয়েকে মেনে নিবেন না। এখন তুমি যদি মনে মনে আমার সাথে তোমার বিয়ের স্বপ্ন দেখে থাকো তবে তা তোমার ভুল। এখানে আমি অপারগতা স্বীকার করছি তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে পারছিনা! তুমি আমায় ক্ষমা করে দিও রিয়া! তোমাকে অনেক ভালোবাসি কিন্তু বাবা-মা এর অনুমতি ছাড়া বিয়ে করতে পারবোনা।
তুমি তো ক্ষমা চেয়ে পার পেয়ে যেতে চাইছো কিন্তু আমার এই ক্ষতি কেমন করে শুধরাবো? সাগর চুপ করে থাকে।
রিয়া এবার চোখ মুছে বললো তবে আমার আত্মহত্যা ছাড়া কোন উপায় নেই! সাগর হেঁসে বলে এটা কোন সমাধান নয়। কিন্তু তবুও আমাকে তাই করতে হবে সাগর । সমাজের মানুষের কাছে মুখ দেখাবার আমার কোন রাস্তা নেই! আমি এখন এই হোটেলের ছাঁদে যাবো এবং নিচে লাফিয় পড়ে প্রাণ বিসর্জন দেব। রিয়া এবার নাগিনীর মতো ফুঁসে ওঠে বলে। এর জন্য সম্পূর্ণ দায়ী থাকবে তুমি! সাগর হেঁসে বলে,তা না করে আমি তোমাকে অনেকগুলি টাকা দিচ্ছি তা দিয়ে সমাধান খুঁজে দেখ। আর হোটেলের ছাঁদে তোমাকে যেতে দেবেনা কারণ তোমার আগে একজন এমন কাজ করেছিল! তাই ছাঁদে যাবার রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে কতৃপক্ষের আদেশে। হেঁসে হেঁসে কথাগুলো বলে সাগর! তোমার সে চেষ্টা ব্যার্থ হবে।
রিয়া সাগরের গালে ঠাস করে একটা চড় মেরে বলে, টাকা দিয়ে পৃথিবীর সব কাজ হয়? সাগর গালে হাত দিয়ে বলে, অনেক কাজই হয়। যেমন তোমাদের মতো মেয়েদের আকর্ষণ করা যায়। টাকা না থাকলে তোমার মতো সুন্দরী আমার কাছে আসতে না! টাকা দিয়েই তোমার মতো মেয়েদের পাওয়া যায়! বুঝতে পারলে? এতো বড় কথা তুমি আমায় বলতে পারলে! আমি টাকার জন্য তোমার সাথে সম্পর্ক করেছি। ঠিক আছে আমার ভুলের মূল্য আমিই দেব! আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমিই করে যাবো! কিন্তু পাপ তোমাকেও ছাড়বেনা মনে রেখ? মাথায় হাত রেখে কান্নায় ভেঙে রিয়া। তার সামনে এখন একটাই রাস্তা!
সাগর হাসতে হাসতে বলে, সে যখন হবে দেখা যাবে। এই বলে হোটেল থেকে বেড়িয়ে এলো সাগর তার পিছু পিছু রিয়া! রিয়া পেছন থেকে ডেকে বলে সাগর হোটেলের ছাঁদে উঠা নিষেধ কিন্তু এখানে রাস্তায় কোন বাঁধা নেই।
একটা কথা তোমাকে বলি মনে রেখো, সবাই টাকা দেখে নয় মনটাকেই ভালোবাসে! তোমাদের মতো মানুষ টাকার অহংকারে বুঝতে পারোনা অথবা বুঝতে চাও না! কিন্তু একদিন এমন হবে যখন বুঝতে পারবে তখন তোমার টাকাও কাজে আসবেনা। তোমার জীবন দিয়েই তা বুঝতে পারবে! কথাটা শুনে তাচ্ছিল্যের সাথে হাসে সাগর! বোকা মেয়ে কোথাকার! এই বলে রিয়া দৌড়ে গিয়ে দ্রুত গামী একটা বাসের নিচে ঝাপিয়ে পড়ে। আর সাথে সাথে একটা রক্তপিণ্ডতে পরিনত হয়! শত শত মানুষ আফসোস করে ছুটে যায়। সাগর তা দেখে বলে উঠে ওহ্ সিট! কোন দিকে না তাকিয়ে তার প্রাইভেট কারের সিটে বসে পড়ে। ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দেয়! সেদিনের সেই অতৃপ্ত প্রেম তার পিছু নেয় তা সে বুঝতে পারে না।
এরপর তার জীবনে কত মেয়ে আসে যায়! টাকার অহংকারে সে উশৃংখল জীবন যাপন করতে থাকে। কিন্তু একদিন সে এমন এক মেয়ের প্রেমে পড়ে যাকে ছাড়া সে দু চোখে অন্ধকার দেখে। যাকে না পেলে তার জীবন অসম্পূর্ণ! মূল্যহীন মনে হয় কিন্তু মেয়েটি তাকে পাত্তাই দেয়না। সে ধনীর দুলালী নয় তবুও তার রয়েছে কঠিন দৃঢ়তা। তার রয়েছে এক অজানা অহংকার! পাহাড় সমান আত্মপ্রত্যয়। তার কাছে সাগর একেবারেই নগন্য হয়ে যায়। এটা বহু টাকার মালিক সাগর মেনে নিতে পারে না। তাকে পাবার জন্য কত কি করে। কিন্তু বারবার বিফল হয়। সেই মেয়ের চোখের সামনে সে নিজেকে নিঃশেষ করে দিতে থাকে কিন্তু মেয়েটির কোন প্রতিক্রিয়া হয়না এতে করে। সাগর বুঝতে পারে আজ যে ভাবে সে মেয়েটিকে চাইছে। একদিন এমনি ভাবেই কি রিয়া তাকে চেয়েছিলো? মেয়েটি তার টাকার মোহে পড়েনি বরং উল্টো ঘৃণার বাণী ছুঁড়ে দিয়েছে। তবে কি তার মন শান্ত করতে সেই পথ বেছে নিতে হবে? যে পথ বেছে নিতে হয়েছে রিয়াকে।
সাগর একটা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে নিজেকে জিজ্ঞেস করে, সে কি চায়? চোখের সামনে ভেসে ওঠে মেয়েটির ঘৃণা মিশ্রিত চাহনি। না এই চাহনি সে আর দেখতে চায় না। এখানেই তার শান্তি খুঁজে নিতে হবে। আজ মনে হলো সেদিনের রিয়ার সেই আকুতি। আমাদের খুব সুন্দর সুখের একটা সংসার হবে। হয়তো সেদিন টাকার অহংকারে অন্ধ না হলে তাই হতো? তারপর মনে পড়লো তার সেই অশ্রু মুছে রিয়ার সেই অভিশাপ! আজ সে রিয়ার কাছে ক্ষমা চাইলো। বুঝতে পারলো আজ রিয়ার ক্ষতি পূরণ করতে হবে। চোখ বোজে লাফ দিলো নিচের গভীর শূন্যে!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত