আমার বাবা

আমার বাবা
নানী আমার নতুন বাবা কে নিয়েই ব্যাস্ত হয়ে আছেন সাথে মা ও।এইদিক আমি ক্ষুধার্ত সবেই স্কুল থেকে ফিরেছি।হঠাৎ নানীর দৃষ্টি আমার দিকে এল
—কিরে কখন এসেছিস?
— এইতো কিছুক্ষন আগেই।আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছে খেতে দাও
–তুই তোর নতুন বাবার সাথে দেখা করে আয় একবার।তোকে সকালে খুজেছে
–পারব না।
নানী আমার দিকে রাগী চোখ দিয়ে তাকালেন কিছু বললেন না। আমার আসলে কিছুই মনে হচ্ছে না।নানীর রাগকে একরকম উপেক্ষা করলাম বলা চলে আমি রুহি।ক্লাস সিক্সে পড়ি।আমার মার নতুন বিয়ে হয়েছে।আমার যখন দুই বছর বয়স তখন ই বাবা মা ডিভোর্স হয়ে যায়।তাই ছোট থেকে মা আর নানী আমায় মানুষ করেছেন।নানু মারা যাওয়ার কিছুদিন পর থেকেই শুরু হয় ঝামেলা। গ্রামবাসীর জ্বালায় অনিচ্ছা থাকা সত্বেও মা কে আবারও বিয়ে করতে হল। মা ডাকা শুরু করল
—এই রুহি ড্রেস চেইঞ্জ করে খেতে আয় মা। তোর বাবা তোর জন্য ওয়েট করছে। বলছে তোর সাথেই নাকি খাবে
—মা আমার ক্ষুধা নেই। পরে খেয়ে নিব।তুমি উনাকে খেতে বল।
—সে কি কথা।এখনি তো তোর নানীকে বললি যে তোর ক্ষুধা পেয়েছে। আর উনি কী?বাবা বলতে কী হয় তোর।এই ঘরে একবার আয়
—(ভালবাসার সুরে নতুন বাবা বলল) ছেড়ে দাও রাণু। আস্তে আস্তে ওর অভ্যাস হয়ে যাবে।
—না বাদ দেয়া যাবেনা।ব্যাপার টা।ও কাল থেকে আমার সাথে রাফ বিহেইভ করছে মা আমার ভাল্লাগছে না।আমি সোহেলী দের বাড়িতে গেলাম
—এই শুন।কই যাচ্ছিস থাম মা কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চলে এলাম বলা চলে। সোহেলী একমাত্র যে আমার কষ্ট গুলোকে বুঝে। স্কুলের সবাই আমার মা এর নতুন বিয়ে নিয়ে মজা করলেও ও তা করেনি উল্টো প্রতিবাদ করেছে।
—কিরে রুহী আজ তুই বিকাল না হতেই খেলতে এলি?তোকে ফ্যাকাসে লাগছে কেন?কিছু খাস নি?
— না রে।ভাল্লাগছে না বাড়িতে।তাই চলে এলাম।আমি সহ্য করার চেষ্টা করছি উনাকে কিন্তু পারছিনা।
— ভাল করেছিস এসে।ভাল না লাগলে আমার বাড়িতে আসবি।তোর নতুন বাবা কিন্তু ভালই আছে।মা এর কাছে শুনলাম।চেষ্টা কর আসতে আসতে উনাকে বাবার মত ভাবতে পারবি।এখন কিছু খেয়ে নে
— না থাক রে।খাব না চল না আজকে ফারিন দের সাথে লুকোচুরি খেলে। এমন সময় আমার নতুন বাবা এল।
—রুহী মা এখানে তুমি এসেছো?আমি তো না খেয়ে আছি এখনো। তুমি খাবে তারপর আমি। আমি আর খারাপ ব্যাবহার করলাম না। চলে গেলাম নতুন বাবার সাথে। একপ্রকার অনিচ্ছা নিয়েই উনার সাথে ভাত খেলাম।
রাত্রি নেমে এল পৃথিবীর বুকে।রাতেই শান্তি।সকাল হওয়ার সাথে সকলের তিরস্কার আর অপমান সইতে হবে। সকালে তাড়াতাড়ি খেয়ে চুপচাপ স্কুলে গেলাম।মা এর সাথে কথা না বলেই।ক্লাস রুমের এক কোণায় বসে পড়লাম।সোহেলী আজ আসেনি স্কুলে।প্রথম ক্লাস আজকে নতুন স্যার এর। আজকেই উনার ফার্স্ট ক্লাস। একটু পর নতুন স্যার এল।কিন্তু এ কি! এ তো আমার নতুন বাবা। ফারিন, রূম্পা,ইফতা আমাকে দেখেই কটাক্ষের সুরে হাসা শুরুকরল। নতুন বাবা খানিকটা বিব্রত হলেন।বিব্রতিকর পরিস্থিতি কে কাটিয়ে উঠার জন্য তিনি নিজেই আমার পরিচয় দিলেন। আর হেসে বললেন আমি কিন্তু তোমাদের ও বাবার মত।গনিতে কোন সমস্যা কিংবা অন্যান্য যেকোনো সমস্যাই আমাকে দ্বিধাহীনভাবে বলতে পারো।তারপর তিনি ক্লাস নেয়া শুরু করলেন।সত্যি বলতে তিনি অনেক ভাল গনিত বুঝাতেন।আমরা সবাই খুব ভালভাবে বুঝেছি। টিফিন পিরিয়ডে আমি হাটছিলাম টিসার’স রুমের সামন দিয়ে এসময় নতুন বাবা আমাকে ডাকলেন গেলাম খানিকটা অনিচ্ছা নিয়ে।তারপর তিনি হেড স্যার কে বললেন
—স্যার আমার মেয়ে।ওর মা এর কাছে শুনেছি ও নাকি অনেক ব্রিলিয়ান্ট।
—হ্যাঁ। আপনি ঠিক এ শুনেছেন।রুহী তো সমাপনী পরীক্ষায় ট্যালেন্ট পুলে বৃত্তি পেয়েছিল।মেয়েকে আরো ভালভাবে দেখাশোনা করেন সে অনেক ভাল করবে।
—জ্বী স্যার।দোয়া করবেন ও যেন অনেক বড় হতে পারে। আমার মেয়েই তো আমার সবকিছু ক্যান জানি আমার খুব মেজাজ গরম হচ্ছিল মনে হচ্ছিল সব নাটক উনার।আমার সামনে ভাল সাজার জন্য হয়ত এমন করছে।আমি কিছু না ভেবেই হুট করে বলে দিলাম
—উনি আমার বাবা না।আমি মোটেও উনার মেয়ে নই।আর আপনি কখনোই কারো সামনে আমাকে মেয়ের পরিচয় দেবেন না। স্যার আমি চললাম। আমার ক্লাস শুরু হবে। নতুন বাবা খুব অপমানিত হলেন।হেড স্যার ও এমন টা আশা করেননি শুধু সান্তনার দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকালেন। স্কুল থেকে ফিরে এসে নানীর সাথে ঝগড়া লেগে গেল। আমি দুপুর বেলা আর কিছুই খেলাম না।মা ও এগিয়ে এল না।খুব খারাপ লাগছে মনে হচ্ছে নতুন বাবা হয়ত মা কে আমার থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। নিজের রুমের মধ্যে আনমনে বসে আছি।এ সময় বাবা এল
—কিরে তুই নাকি না খেয়ে থাকার পণ করেছিস।আয় আজকে আমি নিজেই তোকে খাইয়ে দেব। আমি রাগ করে অন্য ঘরে চলে যাচ্ছিলাম।তখনি নতুন বাবা আবারও ডাকলেন
—মা শোন।তুই আমার সাথে এমন করছিস কেন?আমি তোর নিজের বাবা নই এজন্য?
—আমি জানি না।
—তুই জানিস।
তুই অনেক ছোট।বড় হলে বুঝবি তখন আর আমার সাথে এমন করবি না।তোর বাবা মা আর আমি তিনজন খুব ভাল বন্ধু ছিলাম।তারপর তোর বাবা রাণুকে প্রপোজ করল।ওদের দুইজনের বিয়েও হয়ে গেল।কিন্তু কে জানত দুইবছর পর ওদের সংসার ভেঙ্গে যাবে।আমার আর দেখা হয়নি। ওদের বিয়ের পরে আমি আর এদিকে আসি নি।আচ্ছা অনেক কথা হল এখন খেয়ে নে
—আপনি এত বছর বিয়ে করেন নি কেনো?
—ওটাই তো কথা।সে না হয় বলব যখন তুই বড় হবি।তবে মা শোন তুই আমার জীবনের সব থেকে বড় পুরস্কার হয়ত।আর হ্যা শোন আমাকে তুমি করে বলবি আর বাবা ডাকবি।এটা আমার অনুরোধ আমার খুব খারাপ লাগছে নতুন বাবার কথা গুলো শুনে।
—সরি।আমি আসলে এমন করতে চাইনি কিন্তু৷আচ্ছা ঠিক আছে বাবা
—না মা।খেয়ে নে এখন।বিকেলে আমার কাছে ম্যাথ করতে বসবি।আর শোন একবার মা কে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলবি যে কখনও মা এর সাথে রুড বিহেইভ করবি না। আমি যেন এক মূহুর্তে নতুন বাবার অনুগত মেয়ে হয়ে গেলাম। মা আর নানীর কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইলাম। নানী মা কে বলল
–দেখছিস রাণু,জাহিদ রুহি কে একদম অনুগত করে ফেলেছে।
—তাই তো দেখছি মা।রুহি তো আমার অনুগত মেয়েই।এদিক আয় তো একটু আদর করে দেই মেয়েটাকে। ধীরে ধীরে আমিও নতুন বাবাকে নিজের বাবার মত ভালবাসতে শুরু করলাম।উনার সব কথা শুনতাম। যেভাবে পড়তে বলত সেভাবে পড়তাম।পড়াশোনা রেজাল্ট সব ই ভাল হচ্ছিল।সিক্স সেভেনের গন্ডি পেরিয়ে আজ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে যাব। বাবা মার সঙ্গে ভয় লাগছিল খুব।কিন্তু বাবা মা আমকে সাহস যোগালেন। দেখতে দেখতে পরীক্ষাও শেষ হল।রেজাল্ট এর দিন ঘনিয়ে এসেছে।ভয় পাচ্ছি।বাবা আমাকে ডাকলেন
—রুহি মা এসএসসি পরীক্ষা কিন্তু মানুষের জীবনে অনেক বড় একটা পরীক্ষা।রেজাল্ট এর ভ্যালু ও কিন্তু অনেক।আমার এখনো মনে আছে আমাদের রেজাল্ট ডে এর কথা।তুই বরং স্কুলে যা রেজাল্ট নিতে।
—যদি আমার রেজাল্ট খারাপ হয় তাহলে?তার থেকে বাসায় থাকাই ভাল
—কে বলছে রেজাল্ট খারাপ হবে?ভাল হবে ইনশাআল্লাহ। আর যা ফ্রেন্ডদের সাথে অনেক মজা হবে।তোর রেজাল্ট এর জন্যই আজকে ছুটি নিয়েছি
—আচ্ছা বাবা।দোয়া করো আমার জন্য।মা গেলাম। আমি স্কুলে পৌছানোর আগেই রেজাল্ট দিয়েছে।স্কুল গেইটের কাছাকাছি যাওয়ার সাথে সাথে সবাই আমাকে ঘিরে ধরল। কিছুউ বুঝতে পারছিলাম না। সোহেলী হঠাৎ চিৎকার করল
—রুহি তুই গোল্ডেন প্লাস পেয়েছিস।একমাত্র তুই ই পেয়েছিস। আমার বিশ্বাস ই হচ্ছিল না।এবার পরীক্ষার প্রশ্ন খুব কঠিন হয়েছিল। এ প্লাস পাওয়াই টাফ ছিল সেখানে গোল্ডেন পেয়েছি। ফারিন বলল
—রুহি স্যার আসে নি?
—না রে।বাবা ছুটি নিয়েছেন।আমার রেজাল্ট এর জন্য।
—তাহলে কিছুক্ষণ থাক স্কুলে।আমরা সবাই মিলে কিছু খেয়ে তারপর বাড়ি যাব।
—আচ্ছা চল।কিন্তু বেশি দেরী করা যাবে না।বাবা আজকে আমায় নিয়ে খেতে যাবে বলেছে।
—আচ্ছা বাবা ঠিকাচ্ছে বাইরে খেয়ে দেয়ে ঘুরতে ফিরতে পাচঁটা বেজে গেল। এক কাজ করি বাবার জন্য কিছু ফুল কিনে নিয়ে যাই। খুশি হবেন আফটার অল আমার ভাল রেজাল্টের পিছনে উনার অবদান অনেক। বাসার সামনে অনেক মানুষ। কিন্তু এত মানুষ তো থাকার কথা না।আর শুধু মানুষ ই না।কান্নার রোল পড়ে গেছে।খুব ভয় লাগছে। নানীর কিছু হয় নি তো। বাসার ভিতরে ঢুকে দেখি বাবার নিথর দেহ পড়ে আছে।মা অজ্ঞান হয়ে আছেন। নানী আমাকে ধরে কাদছ। আমি নিজের চোখ কান কিছুই বিশ্বাস করতে পারছি না।এ কি করে সম্ভব নানী আমাকে সব কিছু বল খুলে বল নানী কাদছে আর বলছে
—তুই যাওয়ার পরে তোর ঘরের ফ্যান টা ঠিক করার জন্য তোর বাবা রুমে গিয়েছিল।আমি তোর সাত্তার নানুর বাসায় গিয়েছিলাম আর তোর মা রান্না ঘরে কাজ করছিল।কিছুক্ষণ পর তোর বাবার চিৎকার শুনা গেল সবাই এগিয়ে এসে দেখে তোর বাবা ঘরের এক কোণে পড়ে আছে। রাণু অজ্ঞান হয়ে আছে তখন থেকেই। আমি সব শুনে পাথর হয়ে গিয়েছি।যেন কাদতেও ভুলে গেছি। চোখ দিয়ে পানি বেরোচ্ছে না।কথাও বেরোচ্ছে না।ফারিন সোহেলী আমাকে এসে জড়িয়ে ধরল কিন্তু আমি কিছু অনুভব করতে পারছিলাম না। মার জ্ঞান ফিরল।মা বাবার লাশের পাশে বসে পাগলের মত বকে যাচ্ছে
—জাহিদ কেনো এমন করলা?বার বার করে বললাম একটা ইলেকট্রিসিয়ান ডাকতে।কেন শুনলে না। তোমার মেয়ের কথা একবারও ভাবলা না। বাবার দাফন কাফন শেষ প্রায়৷ বাবাকে নিতে এসেছে। আর কখনোই দেখতে পারবনা প্রিয় মানুষ টাকে।নানী কান্না থামিয়েছে আমাকে ডাকছে
—রুহি তোর বাবা শেষ বারের মত দেখে নে বাবার মুখটা দেখার মত সাহস পাচ্ছিনা।শেষবারের মত দেখে নিলাম। মা সেই সন্ধ্যা থেকে কুরআন তিলাওয়াত করে যাচ্ছেন।নানী ও নফল নামাজ পড়তে বসেছেন। আমার কাছে সব কিছু এখনও দু:স্বপ্ন মনে হচ্ছে।আজকের সন্ধ্যা টা আমার কাছে শ্রেষ্ঠ সন্ধ্যা হতে পারতো অথচ আমার জীবনের সব থেকে প্রিয় মানুষ টাকে হারালাম।ফুল গুলো এখনো শুকায় নি।বাবা কে কখনো আলাদা করে বলা হয় নি যে বাবা তোমাকে অনেক ভালবাসি।বলা হয় নি বাবা তুমি শ্রেষ্ঠ বাবা।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত