বাবা-মা

বাবা-মা
গ্রাম অঞ্চলে দেখা যেতো যেসব বাবা মায়ের জমিজমা,টাকা পয়সার কোনো অভাব নেই। শেষ বয়সে সেসব বাবা মায়েরা অনেক সুখের জীবন উপহার পেতো। ছেলে মেয়ে শিক্ষিত হোক কিংবা অশিক্ষিত হোক। নিজের বাপের যদি বিঘা বিঘা সম্পত্তি থাকে,টাকা পয়সারও কোনো অভাব না থাকে তাহলে শেষ বয়সে তাদের ছেলে মেয়েরা চাইলেও তাদেরকে ফেলে দিতে পারে না। একপ্রকার বাধ্য হয়েই হোক,জমিজমার লোভে হোক তারা তাদের বাবা মায়ের খুব ভালো দেখাশোনা করে।
কিন্তু যদি বাবা মায়ের জমিজমা না থাকে,বাড়ির জায়গাটাও যদি অন্য কারো থাকে। কোনো টাকা পয়সা না থাকে তাহলে শেষ বয়সে তাদের অনেক কষ্টের জীপন যাপন করতে হয়। অনেকের হয়তো ঠিকানা হয় বৃদ্ধাশ্রম।
আমাদের পাশের গ্রামে হাসান নামে একজন দিনমজুর বাস করতো। তাঁর সহধর্মিণী ছিলো আমেনা বেগম। তাদের দুইজন ছেলে একজন মেয়ে ছিল। জমিজমা বলতে কিছু ছিলো না তাদের। নিজের ভিটেমাটির বাড়িটাও অন্য কারো জমির ওপর ছিলো। এক জায়গায় কিছু জমি ছিল যেগুলো তাদের পূর্ব পুরুেষরা জালিয়াতি করে বিক্রি করে গিয়েছেন। তাঁর পক্ষে টাকা খঁরচ করে জমিটার জন্য কেস চালানোও সম্ভব ছিলো না। তবুও তিনি চেষ্টা করতেন। নিজের শেষ সম্বল বলতে তো কিছু নেই। একটু আলোর আশায় মাঝে মাঝে ওই জমিটার পেছনে কিছু টাকা ঢালতো। তিনি জানতেন যে ওই জমিটা ফিরে পাবে না। তবুও তিনি মাঝে মাঝে নিজেকে সান্ত্বনা দিতেন।
নিজের জীবনের সবটুকু শ্রমকে কাজে লাগাতেন হাসান সাহেব। এতো কষ্ট করে মানুষের জমি আবাদ করতেন। শীত নেই,গরম নেই,ক্লান্তি নেই,বিশ্রাম নেই। ফজরের নামাজের পরেই নেমে যেতেন খেতে কাজ করার জন্য। তাঁর স্ত্রী আমিনা বেগমও দিনের পর দিন, রাতের পর রাত বাড়িতেই কাজ করতেন। গোরু,ছাগল,হাস,মুরগি এমন কোনো কিছু ছিলো না যে তারা লালন পালন করতেন না। কিছু টাকার আশায় দিনরাত দুইজন মানুষ পরিশ্রম করে যেতেন। শুধুমাত্র সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায়।
আমি এমন একটা দিনও দেখিনি যেদিন হাসান সাহেব বসে কাটিয়েছেন কিংবা বিশ্রাম নিয়েছেন। যেদিন নিজের জমিতে কাজ থাকতো না সেদিন অন্যের জমিতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর জীবনের সমস্ত আরাম আয়েশ বিসর্জন দিয়েছেন ছেলে মেয়েদের সুখের কথা চিন্তা করে। তাদের লেখাপড়া করিয়েছেন। একসময় ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হয়েছে। দুটো ছেলেই ভালো চাকরি করে। মেয়েটাকেও ভালো ঘরে বিয়ে দিয়েছেন। এতো কিছুর পরেও তিনি জমিতে কাজ করতেন।
তাঁর দুই ছেলে বিয়ে করে বউ নিয়ে শহরে বাড়ি ভাড়া করে থাকে। দুজনই রাগ করে চলে গিয়েছেন। তাদের আক্ষেপ ছিলো অন্যদের বাবা মায়েরা ছেলে মেয়েদের জন্য কতো কি করে। বাড়ি করে দেয়,জমি করে দেয়। কিন্তু তাদের বাবা তাদের জন্য কিছুই করতে পারেনি। হাসান সাহেব একজন বাবা হিসেবে ব্যর্থ। তখন হাসান সাহেব বলেছিল- আমার জীবনের সবকিছুই তো তোদের জন্য খঁরচ করেছি। তোরা যাতে লেখাপড়া করে মানুষের মতো হতে পারিস,টাকা পয়সা কামাই করে বাড়ি গাড়ি করতে পারিস। সেজন্যই তো আমি আর তোর মা আমাদের সুখ বিসর্জন দিয়েছি। তোদের পেছনে যা খঁরচ করেছি সেগুলো দিয়ে তো বাড়ি করে দিতে পারতাম।
জবাবে হাসান সাহেবের ছেলেরা বাবা মায়ের সাথে রাগারাগি করে শহরে চলে যায়। একটিবারের জন্যও নিজেদের বাবা মাকে তাদের সাথে যেতে বলে না। কতো বছর ধরে এই গ্রামের একটা ছোট্ট ঘরে দুইজন বুড়া-বুড়ি কতো শত দুঃখ নিয়ে দিনের পর দিন,রাতের পর রাত,বছরের পর বছর কাটিয়ে দিয়েছেন তা হয়তো কেউ জানে না। হয়তো কোনদিন জানবেও না। তারা স্বপ্ন দেখেছিল তাদের ছেলে মেয়েরা বড় হয়ে শিক্ষিত হবে,টাকা পয়সা উপার্জন করে বাবা মাকে কষ্টের জীবন থেকে মুক্তি দিয়ে শেষ বয়সে সুখময় জীবন উপহার দিবে। কিন্তু তাদের স্বপ্নটা সত্যি হয়নি। তাদের ছেলে মেয়েরা শহরে সুখের জীবনে বাধা পড়লেও তারা ঠিকই সেই পল্লী এলাকার দরিদ্র জীবনেই আবদ্ধ রয়ে গিয়েছেন।
কিছুদিন পর হাসান সাহেবের প্রতি ওপরওয়ালা হয়তো একটু সুদৃষ্টিতে তাকিয়েছেন। তাঁর পূর্ব পুরুষেরা যে জমিটুকু অবৈধভাবে বিক্রি করে গিয়েছিলেন। সেই জমিটুকু ফিরে পেয়েছেন। যার বাজার মূল্য এক কোটি টাকা। যখন তাঁর ছেলে মেয়েরা জানতে পারলো তাদের বাবা জমি পেয়েছেন। তখনই তারা বাবার কাছে বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে এলেন। যখন হাসান সাহেব ও তাঁর স্ত্রীর বিশ্রাম করার সময় এসেছিলো। পুত্রবধূর সেবা পাওয়ার কথা ছিলো তখন তারা তাদের কে ছেড়ে চলে গিয়েছিলো।
কিন্তু আজ যখন সেই অকৃতজ্ঞ ছেলেমেয়ে রা হাসান সাহেবের কাছে ফিরে এলেন তখন তিনি তাদের বুকে টেনে না নিয়ে পারলেন না। এরই নাম বুঝি বাবা। মোমের মতো কমল হৃদয়, যে হৃদয়ে সন্তানের প্রতি ভালোবাসা ব্যতীত কিছু থাকে না। এখন হাসান সাহেব আর তাঁর সহধর্মিণী খুব সুখে জীবন যাপন করছেন। সকাল হলেই ছেলের বউরা রান্না করে ডাকাডাকি শুরু করে দেয়। ছেলেরাও এখন বাসা থেকে অফিস করে। অফিস থেকে ফেরার পথে বুড়ো বাবা মায়ের জন্য কতো রকমের ফল-ফলাদি নিয়ে আসে তা বলার বাইরে। মেয়ের জামাইও এখন ঘন ঘন আসে। শ্বশুর-শাশুড়ি কে দেখতে এসে কতো কি নিয়ে আসে।
হাসান সাহেবের অবসর সময়গুলো তাঁর নাতি নাতনির সাথেই কাটে। সর্বোপরি হাসান সাহেব এবং আমেনা বেগম শেষ বয়সে এসে এক স্বর্গীয় সুখের জীবন কাটাতে ব্যস্ত। এরকম জীবনই তো তারা চেয়েছিলেন। যেমনটা প্রতিটা বাবা মা চান।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত