শেষের শুরু

শেষের শুরু
আঠারো বছর বয়সে বিয়ে হচ্ছে অবনীর এ বয়সটা নাকি বিয়ের জন্য একদম ঠিকঠাক, বেশিও না কমও না। সৌন্দর্যের বিচারে এ বয়সের তুলনা হয়না। কিশোরী যেন দু কদম পা ফেললেই উদয়ীমান যুবতী, সরল বাক্যে ষোড়শী থেকে অষ্টাদশী। এবয়সে কণের চাহিদা যেন আকাশচুম্বী বয়স বাড়বার সাথে সাথেই তা নিম্নগামী। গুরুজনেরা বলেন মেয়ে মানুষ বাপু সে যতই তুমি বিদ্যানওয়ালা হওনা কেন হাড়ী তোমাকে ঠেলতেই হবে। তো তাই যখন করতে হবে তখন বেলা গড়িয়ে কি লাভ। দুদিন পর যখন ফিরে আর কেউ চাইবেনা সেদিন ওসব বিদ্যা বুদ্ধি দিয়ে কি আর সমাজ সংসারের মুখ বন্ধ করা যাবে। তার চাইতে এই বেশ সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত। বিয়ে যখন করতেই হবে এত ভাল ভাল সম্বন্ধ পায়ে ঠেলে আইবুড়ো নাই বা হলে সাধ করে।
মরিচ বাতি দিয়ে মোড়ানো বাড়ীটায় অবনীই যেন একমাত্র কাঠের পুতুল। নতুন বাড়ীতে ব্যস্ত কোলাহলে চুপসে থাকা মেয়েটা ঘোমটার ফাঁকে পরিচিতকারো দেখা পাবার অপেক্ষায়। বেশ আদরে আমন্ত্রিত অবনী সেদিন ভয় ভেঙ্গে ভালবাসতে শুরু করেছিল নতুন বাড়ীর সবাইকে। সপ্তাহ খানেক বাদে সে বাড়ীর সবার থেকে বিদেয় নিয়ে নতুন ঘর হল তার নতুন মানুষটার সাথে। উজ্জল বর্ণের দীর্ঘকায় সুদর্শন সুযোগ্য সে পুরুষের সঙ্গী হতে পারায় রোজকার স্বপ্ন বুননে হারিয়ে যায় অবনী। নিখুত সংসারী হয়ে উঠতে তাই নিজেকে নতুন করে গড়বার কাজে মনোনিবেশ করে সে। পড়িমড়ি করে রোজ সাত সকালে রুটি-সব্জি করে সাথে ডিম ওমলেট, নাস্তা শেষে ফার্স্ট ক্লাস চা করা,অফিসের খাবার গুছিয়ে দিয়ে স্বামীকে হাসি মুখে বিদায় দেওয়া। ছুটা বুয়া আসলে দুপুরের খাবার তৈরী করে একটা ভাত ঘুম তার পর অলস বিকেল এক কাপ নিঃসঙ্গ চা আর প্রতীক্ষা। নিজের সেরা সবটুকু দিয়ে পরতে পরতে সাজানো সংসারটায় যেন ছমাস যেতে না যেতেই আর উৎসাহ থাকেনা।
এক ঘেয়ে জীবনটাতে আর সিরিয়ালের মত রোমাঞ্চ জাগেনা। বান্ধবীদের রোজাকার আড্ডা,ইউনিভার্সিটি, ট্যুর, ডেটিং, প্রেমের টানাপোড়নের গল্প শুনতে শুনতে ক্লান্ত হাতে ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ ই মনে হয় তার ধুর! ফোনটা ছুড়ে মারে বিছানায়। টিভি চ্যানেল বদলাতে বদলাতে অধৈর্য হয়ে ফেসবুক, ফেসবুক ছেড়ে গল্পের বই, প্রিয় গান,শখের রান্নাঘর সব কিছুতেই কি এক নিরবিচ্ছিন্ন নিরানন্দ বিদ্যমান। এদিকে মা,শাশুড়ী, ননদ,ভাবী সবার এক কথা, তা নতুন মানুষের মুখ দেখছি কবে? একা একা তো এভাবে ভাল লাগারো কথানা একটা বাচ্চা নাও দেখবা সব একাকীত্ব কোথায় চলে গিয়েছে তখন দম ফেলারও সময় পাবেনা, বাচ্চা হলে দেখবা শোভন তখন অফিস থেকে বাসায় ফেরবার জন্য ব্যস্ত হয়ে যাবে, বাচ্চা হল সংসারের বন্ধন নিতেই যখন হবে তখন দেরী কেন?
শোভন কেও এগুলা শুনতে হয় তবে তার পক্ষ থেকে কোন রকম মতামত না পেয়ে অবনী আরো অস্থিরতায় ভোগে। না সে স্বস্তী পায় না তার সংশয় সত্য হয়। বিয়ের আগে শুনে এসেছে বিয়ে যখন করতেই হবে তখন দেরী কেন? এখন শুনছে বাচ্চা যখন নিতেই হবে তখন দেরী কেন,আচ্ছা এর পর কি বলবে ‘একা তো বোকা’ আরেকটা নাও,তার পর কি বলবে বাচ্চাদেরকে ঠিকঠাক মানুষ কর, বড়টাকে সবার মন মত গড়তে পারলে ছোটটকেও পারতে হবে, ছেলে মেয়েকে যোগ্য সঙ্গী দেখে বিয়ে দিতে হবে, তার পর আবারো সেই একই চক্র চলতেই থাকবে। তো এসব যখন করতেই হবে তা এত ব্যস্ততার কি আছে বুঝে পায়না অবনী। শোভন কল করে যায় অবনীকে অবনীর সাড়া নাই। পাঁচ বারে এক বার তাকে পাওয়া যায়, রোজকার পোঁড়ারুটি, দু পদের তরকারী, উদাসীনতায় উপেক্ষিত ভালবাসা গুলো যেন শোভনের মনে চিড় ধরায়। পঁচিশে এসে বিয়েটাকি তবে ঠিক সঠিক সময়ে হয়নি, নাকি অবনীকে ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি ,নাকি অবনীই তাকে মেনে নিতে পারেনি। প্রথম দেখায় যে মুগ্ধতা তার অবনীকে ঘিরে ছিল তার সন্ধান যেন মনে মনে খুঁজে চলা শোভন কিছুতেই পায়না।
নিরস,উদাস কিশোরী মেয়েটা তার সাজানো সংসারে যেন সত্যি সত্যিই এক কাঠের পুতুল। সারাদিনের ক্লান্তি শেষেও নির্ঘুম শোভন যেন এমন নানান ঝাপসা প্রশ্নে আজ জর্জরিত। অবনীর ছেলে মানুষী অহেতুক হেয়ালীপনার কোন যৌক্তিক কারন সে পায়না। শত ব্যস্ততায় পাশে ঘুমিয়ে থাকা মেয়েটার দীর্ঘশ্বাস এর রহস্য জানা হয়না। অবনীর ফোনে রিং হচ্ছে অবনী ধরছেনা পরম অবহেলা ভরে তাকিয়ে আছে স্ক্রিনে এক বার দু বার তিন বার। ইচ্ছে হয়না শুনতে তার রোজ সেই এক কথা, খেয়েছ? ঘুমিয়েছ? কোন সমস্যা হচ্ছে নাতো। অথচ বিয়ের আগে এই অবনীই ছিল বন্ধু মহলের কেন্দ্র বিন্দু। চটপটে,বন্ধুসুলভ,হাসি,খুশি প্রাণচ্ছোল অবনী যেন এখন ঝাপসা প্রায়। না হল পড়াশোনা,না হল ভালবাসা না হল মনের মত সংসার। বন্দী, একঘেয়ে সাজানো সংসার তবু যেন কোথায় একটা ফাঁক শোভনের সাথে তার। নিয়ম করে নীতি মেনে সংসার করলেও যেন বিশৃঙ্খলার বড় অভাব। শোভনের মত চমৎকার মানুষটার মাঝেও যেন চমক নেই।
হঠাৎ ই ক্ষুদে বার্তার আগমন, ‘ ঠিক বিকেল ছটায় টি.এস.সি। সোজা রিক্সা নিয়ে চলে আসবে। আলমারীতে দ্বিতীয় তাকে একটা সবুজ রং এর শাড়ী রাখা আছে সেটাই পরবে। খুব বেশী না সাজলেও চলবে।’ অবনী এক বার দু বার তিন বার পড়ে…. নাহ ভুল দেখছেনা সে ক্ষুদে বার্তাটা শোভনই পাঠিয়েছে। ভুল করে অন্য কাউকে পাঠাতে গিয়ে তাকে পাঠায় নিতো? সে কল করে শোভন কে, না শোভন ফোন ধরছেনা। নিশ্চয়ই ধরা পড়ার ভয়ে। রাগ করতে গিয়েও হঠাৎ কি যে খেয়াল হল দৌড়ে গেল আলমারীর কাছে। হ্যাঁ ঠিকইতো লিখেছে, এই যে দ্বিতীয় তাকে সবুজ রং এর শাড়ীটা রাখা অবনী এক দ্বিধা দ্বন্দ ভাললাগায় তলিয়ে যেতে থাকে। ঠিক বিকেল ছটায় অবনী আর শোভন চায়ের কাপ হাতে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে। কথা বলবে বলবে করেও যেন ঠিক কি বলবে বুঝে উঠতে পারছেনা। পারবে কি করে বুঝবার মত, বুঝে নেবার মত করে যে কখনোই কারোরই কাউকে জানার সুযোগ টাই হয়নি।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা আবছা আধারে ফুলার রোড ধরে হেঁটে চলে শোভন-অবনী। এপথ ধরে কতবার যাতায়াতে কত বার মনে মনে হারিয়েছে নিজেকে অবনী। না চাইতেই ভর সন্ধ্যায় এ পথে প্রিয়জনের সাথে পা মেলানোর কত স্বপ্নেরা ঘুরে বেড়িয়েছে ওর চোখের পাতায়। সে সব চাপা পড়া স্বপ্নরা যেন আজ ওকে হাতে ধরে নিয়ে এসেছে, শোভন যেন আজ অচেনা এক পথিক, না চাইতেই যে তার সঙ্গী হয়েছে। মনের ভেতর অনেক কথার তোলপাড়, হঠাৎ দেখা হওয়া পথিকের কাছে তার অনেক চাওয়া, অনেক জিজ্ঞাসা।
তবু যে মন খুলে বলতে পারেনা, ঐ যে কোথায় যেন একটা ফাঁক। কোলাহলের নগরীতে শুধু ওদের মাঝেই যেন তখন নিশ্চুপ নিরবতা। নিরবতা ভেঙ্গে শোভনই কথাটা তুলল, এভাবেই কি সারা টা জীবন হাতাশা নিয়ে আমাকে অবহেলা করে যাবে নাকি নিজেকে একটু নিজের মত করে বাঁচতে দিবে? সামনে এগুতে গিয়েও থামিয়ে দিল অবনী নিজেকে, চোখ তুলে চাইল। সে চোখেই প্রশ্ন সুস্পষ্ট মুখ খুলবার প্রয়োজন বোধয় খুব একটা নেই। শোভন বলল, না মানে বলছিলাম সারাদিন বাসায় না থেকে একটু তো বের হলেও পার আমার সাথে, বন্ধুদের সাথে,রান্নার ফাঁকে পড়াশোনাটাও না হয় চালিয়ে নিলে। সে সাথে আমাকেও না হয় দিন শেষে মেঘে ঢাকা মুখটা দেখা থেকে মুক্তি দিলে। যদি সায় থাকে তবে ক্ষণিকের জন্য হলেও আমার নাম মাত্র ঘরনী থেকে প্রেয়শী হলে। অবনী চুপ থাকে। ভেতরে ভেতরে দমিয়ে রাখা উচ্ছাসেরা যেন বিনা অনুমতিতেই ডানা ঝাপটাতে থাকে।
শোভন খুব অবাক হয়ে অনুভব করে অবনীর না বলা উচ্ছাসগুলো যেন ওকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। এই প্রথম যেন অবনীর মনকে ও ছুঁতে পারছে। সোডিয়ামের আলোয় খুব সন্তপর্ণে নেমে আসা আঁধার কে যেন দূরে ঠেলে দেওয়ার মত করে সে সন্ধ্যায় অবনী আর শোভনের যেন আড়াল হওয়া কথা গুলো আধার ছেড়ে আলোর দেখা পেল। সযতনে নিজের হাতের মাঝে অবনীর হাত লুকিয়ে সামনে পা বাড়ায় সে। এক অচেনা সুখের অনুভূতি যেন এই প্রথম ধরা দিল তাদের কাছে। নীলক্ষেত থেকে বই কিনে শোভন, অবনী আপত্তি করে বাড়ি থেকে না হয় আনিয়ে নিবে তার বইগুলো। শোভন তার কথা শোনেনা বলে,সবই যখন নতুন করে শুরু হচ্ছে বই গুলা কেন পুরানো হবে? তবে একটা শর্ত সামনের বার এডমিশন টা খুব ভালভাবে দেওয়া চাই। আমাকে ছেড়ে,ঢাকা ছেড়ে কোথ্থাও যাওয়া চলবেনা। অবনী মাথা কাত করে সায় দেয়।
অবনী বইয়ের পাতাগুলা ছুঁয়ে দেখল,বইয়ের ঘ্রাণ নিল। ফেরার সময় সারাটা পথ সে বই গুলা বুকে আগলে রইল। শোভন শান্ত দৃষ্টিতে সে প্রশান্তি উপভোগ করল। দিন মাস পেরিয়ে অবনী যেন খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে দুজনে মিলে ঘরের টুকটাক কাজ করতে করতে শোভন হাসি মুখে অবনীর সারা দিনের খুটিনাটি সব না বলা গল্পগুলোকে মনে গেথে নেয়। অবনীর ক্লাসের গল্প,বন্ধুদের গল্প,শপিং এর গল্প, পড়াশোনার গল্প, ক্লান্তির গল্প…. ব্যস্ততা যেন ওদের দূরে সরিয়েও প্রতিক্ষণে কাছে টেনে চলেছে। দিনশেষে তাই যতটুকু সময় সবটাই তাদের নিজেদের মত করেই চাই।
রাত দশটা, আজ তাদের জোস্না বিলাস, ছাদে দাঁড়িয়ে ভারাডুবি জোস্নায় নিমগ্ন শোভন দু মগ কফি হাতে যেন অবনীকে আবিস্কার করে এক সহজ সরল প্রাণবন্ত নারী হিসেবে যে কিনা কখনো বন্ধু,কখনো প্রেমিকা, কখনো ঘরনী আবার কখনো শিক্ষার্থী রুপে প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করে চলেছে তাকে। কারো সুখের সন্ধান না করে তার সাথে সুখী হতে চাওয়ার মত বোকামী বোধয় দ্বিতীয় টি নেই। সেই বোকামির অবসান ঘটিয়ে এমন সুখের সন্ধান কজন পায়?
অবনী অবাক হয়ে বলে, কই মগটা দাও,কি ভাবছ এত বলত? শোভন হেসে অবনীর মাথায় আলতো করে টোকা দিয়ে বলে, সব কিছু যে বুঝতেনেই বোকা মেয়ে।
অবনী সত্যিই বোকা হয়ে যায়। কখনো কখনো চেনা মানুষকেও ঠিক চিনতে পারা যায় না, ক্ষতি কি? তাতে তো আরো বেশী করে চিনবার অবকাশ রইল তাই না? অবনী কাপ টা হাতে নিয়ে হাসে। শোভন বলে, হাসছ যে? অবনী দু পাশে মাথা নাড়িয়ে বলে, সব কিছু যে জানতে নেই কাগজে কলমে স্বামী স্ত্রী হওয়ার চাইতেও সঙ্গী হওয়াটা যে বেশী জরুরী। নিজেরদের ইচ্ছা গুলো সঙ্গীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চাইতেও তার ইচ্ছাকে পূর্ণতা দেওয়ায় যে এক অলিখিত সুখ নিহিত। সহযোগীতা,সম্মান যে সংসার জীবনটাকে কতটা সহজ,সুন্দর করে তোলে তা বুঝি অবনী-শোভন ঠিক বুঝে নিয়েছিল।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত