নিঃশ্বাস

নিঃশ্বাস
গভীর রাতে প্রায়ই একটা নিঃশ্বাসের শব্দ শুনে ঘুম ভাঙ্গে দিশার। মনে হয় কেউ যেন তার আশে পাশেই রয়েছে। কিন্তু কক্ষের বাতি জ্বলালেই দেখা যায় কক্ষে সে ছাড়া আর কেউ নেই। রাতের পৃথিবীটা বেশ শান্ত এবং নীরব। যার কারণে দূরের শব্দও স্পষ্ট শুনতে পাওয়া যায়। রাতে শুনতে পাওয়া এই নিঃশ্বাসের শব্দ দিশার কানে স্পষ্টভাবেই ভেসে আসে। মনে হয় মানুষটা তার একদম নিকটেই। যে রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায় সে রাতে চোখের পাতায় ঘুম আনা যেন ভীষণ কষ্টকর। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে দিশা। ঠান্ডা বাতাস বইছে খোলা জানালা দিয়ে৷ শীতকাল চলে এসেছে একটু একটু করে। জানালা বন্ধ করার জন্য জানালার কাছে দাঁড়ায় দিশা। চোখ জোড়া বাহিরে পড়তেই কেঁপে ওঠে সে। একটা অস্পষ্ট মুখ কিন্তু খুব চেনা তার। তাড়াতাড়ি টর্চ খুঁজতে লাগলো। খুঁজে পেয়ে গেলে অন্ধকারের সেই মুখটার দিকে আলো স্থির করলো। কিন্তু কোথাও কোনো মুখ দেখা গেল না। তাড়াতাড়ি জানালা বন্ধ করে শুয়ে পড়ে সে।
আগামী মাসে দিশার বিয়ে। বিয়ে উপলক্ষে আনন্দের বন্যা বইয়ে যায় তার মনে। জামিলকে বিয়ে করার জন্য বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছে তাকে। তবুও প্রশান্তি, জামিলকেই সে জীবনসঙ্গী হিশেবে পেতে যাচ্ছে। দিন যত যাচ্ছে, বিয়ের দিন তত ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু রাত গভীর হলেই নিঃশ্বাসের শব্দটা ভাবিয়ে তুলছে দিশাকে। মাঝে মাঝে সেই অস্পষ্ট মুখটা দেখে আঁতকে ওঠার কথাটা আর চেপে রাখতে পারলো না নিজের মাঝে। ‘জামিল, তোমাকে একটা কথা বলার ছিল।’ ‘বলো।’ ‘আমি প্রায় রাতেই একটা মহিলার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাই। প্রথম প্রথম গুরুত্ব না দিলেও একদিন অন্ধকারে একটা অস্পষ্ট মুখ আমাকে ভাবিয়ে তুলছে ভীষণ।’ বেশ অবাক হয়ে প্রশ্ন করে জামিল, ‘কাকে দেখতে পেয়েছো তুমি?’ ভীত স্বরে জবাব দেয় দিশা, ‘রাবেয়াকে।’
ভয় পেয়ে ওঠে জামিল। থতমত স্বরে বলে, ‘পাগল হয়েছো তুমি? রাবেয়া আসবে কি করে! এটা অসম্ভব।’ ‘আমিও তো তাই জানি। কিন্তু একদিন নয় আমি প্রায়ই রাবেয়াকে জানালার ওপাশে তাকালেই দেখতে পাই। মুখটা অস্পষ্ট হলেও আমি বেশ চিনতে পারি ওর মুখ। কি ভয়ানক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে।’ ‘তুমি হয়তো বিষয়টা নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তা করো, তাই এমন হচ্ছে।’ ‘আমারও যদি তোমার মত মনে হত। তবে শান্তি পেতাম।’ ‘শান্ত হও। আমাদের বিয়েটা হয়ে গেলে দেখবে সব ঠিক হয়ে গিয়েছে।’ ‘তাই যেন হয় জামিল।’ বাড়ি জুড়ে বিয়ের আয়োজন চলছে। দিশার আত্মীয়রাও জমা হয়েছে বাড়িতে। ধুমধাম করে বিয়ের অনুষ্ঠান করা হবে, এমনই পরিকল্পনা দুই পক্ষের। গুটি কয়েক আত্মীয় স্বজনের মাঝে বিয়ে নিয়ে কানাঘুঁষা চলছে। পাঁচ ছয়জনের আসরে বেশ জমে উঠেছে সে আলাপ আলোচনা।
‘ছেলের আগে একটা বিয়ে ছিল। তবুও কেন যে মেয়েটা এই ছেলের জন্য এত পাগল হলো!’ ‘তাতে কি! ছেলের ক্যারিয়ার কত ভালো। তাছাড়া বড়লোক বাবার একমাত্র সন্তান সে। বিয়ে একটা কেন পাঁচটা হলেও দিশার মত মেয়ে বিয়ে করার ক্ষমতা সে রাখে।’ অন্য একজন বলে উঠলেন, ‘তা ঠিক বলেছেন ভাবি। তবে শুনেছি, আগের বউটা গরীব পরিবারের মেয়ে ছিল। কিন্তু মেয়েটা নাকি খুব ভালো ছিল।’ ‘হ্যাঁ, আমি শুনেছি মেয়েটা খুবই ভালো ছিল। দুর্ভাগ্য যে অকালে মারা গেল।’ ‘আত্মহত্যা করেছিল। শুনেছিলাম, মাঝ রাতে ছাদ থেকে লাফ দিয়েছিল।’ বেশ অবাক হয়ে একজন বললো, ‘এত সুখের সংসার রেখে আত্মহত্যা করলো! অভাব ছিল না কোনো কিছুর! কেন মারা যেতে হলো?’ ফিসফিস করে একজন বলে উঠলো, ‘মাথায় নাকি একটু সমস্যা ছিল। কেউ নাকি বুঝতে পারেনি, এমন একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেলবে।’ ‘কি আর করার! কপালে সুখ না সইলে কত কিছুই তো হয়।’
হঠাৎ দিশার মা চলে এলে আসরের কথা বার্তা থেমে যায়। যে যার মত উঠে চলে যেত লাগলো যার যার কাজে।
ক্লান্ত শহরটা বিশ্রামে তলিয়ে। আগামীকাল সকালে বিয়ে। বাড়িটা বেশ সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। কক্ষের মধ্যে দিশার দম বন্ধ হয়ে এলে ছাদে এসে দাঁড়ায়। সুনসান শহর৷ বাড়ির সকলেই ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু ঘুম নেই দিশার চোখে। হঠাৎ অনুভব করে কেউ যেন তার পাশে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস ছাড়লো। আঁতকে ওঠে দিশা। পাশ ফিরে তাকাতেই দেখে কেউ নেই। কিন্তু সে নিশ্চিত কেউ একজন তার পাশেই ছিল। তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগলো, কিন্তু মিললো না কারো খোঁজ। ভয়ে ভয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায়। হঠাৎ মনে হলো, পিছনে কেউ দাঁড়িয়ে রয়েছে। পিছন ঘুরে তাকায় দিশা। ভয়ে কুঁকড়ে যায় সে। তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি থেকে নামতে গিয়েই ঘটে অঘটন। বিয়ের তারিখ পিছিয়ে যায়। ভাঙ্গা পা নিয়ে দিশার এখন সময় কাটে হুইলচেয়ারে। তবুও তার পিছু ছাড়ে না সেই মুখটা। রাত হলেই যার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পায় দিশা।
‘জামিল আমার বিশ্বাস রাবেয়া বেঁচে আছে। ও মারা যায় নি।’
‘এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয় দিশা। রাবেয়া মারা গিয়েছে।’
‘তাহলে আমি কেন রাবেয়াকে দেখতে পাই?’
‘তুমি নিশ্চয়ই বিষয়টা ভুলতে পারছো না কোনোভাবে। তাই এমন হচ্ছে। আমার মনে হয় তোমার কোনো ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।’
‘আমি কোনো ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে চাই না।’ ক্ষিপ্ত স্বরে বলে দিশা।
জামিল আর দিশা একই ভার্সিটিতে পড়াশোনা করতো। দিশার প্রতি একসময় জামিলের দুর্বলতা জমলেও পাত্তা দেয় না দিশা। কিন্তু যেদিন দিশা জানতে পারে জামিল উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলে সেদিন সে নিজ থেকেই জামিলকে পাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে। সম্পর্ক গড়ে তোলা দু’জন। কিন্তু উচ্চাভিলাষী দিশা একসময় জামিলকে রেখে সম্পর্ক গড়ে তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর প্রেমিকের সঙ্গে। জামিলের মন ভাঙ্গলেও দুর্বলতা রয়ে যায় দিশার প্রতি।
দুর্বলতা কাটাতেই মায়ের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করতে রাজি হয় জামিল।
নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ে রাবেয়া জামিলকে তার সমস্ত ভালোবাসা দিয়েও দখল করতে পারে নি কখনো দিশার স্থান। রাবেয়ার মাঝে আধুনিকা দিশাকে খুঁজে না পেয়ে রাবেয়ার প্রতি জামিলের ভেতর দূরত্ব আরও বাড়ে৷ কয়েক বছর বাদেই পুরাতন সব অভিমান অভিযোগ ধুয়েমুছে নতুন করে দিশার আবির্ভাব ঘটে জামিলের জীবনে। দুর্বলতার মাঝে আরও চেপে বসে দিশা। বাধা হয়ে দাঁড়ায় জামিলের পরিবার। স্পষ্ট জানিয়ে দেয় তারা, রাবেয়ার প্রতি অবিচার করলে ছেলের প্রতি অবিচার করতে বাধ্য হবে। জামিল থামলেও, দিশা থেমে থাকার মানুষ নয়। রাবেয়াকে সরিয়ে পথ পরিষ্কার করার নানা উপায় বের করতে থাকে সে। কিন্তু ব্যর্থ হয় প্রতি পরিকল্পনা। তারপর বেশ এঁটে সেটে একটা বুদ্ধি বের করে। সফলও হয় সে পরিকল্পনা। কিন্তু রাবেয়ার এই নিঃশ্বাস এখন তার সুখের রাস্তায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ক্রমশ।
‘আমি কেন রাবেয়ার নিঃশ্বাস শুনতে পাই বলতে পারো জামিল?’ কান্না জড়ানো কন্ঠে প্রশ্ন করে দিশা। ‘তুমি রাবেয়ার বিষয়টা এখনও মাথার মধ্যে চেপে রেখেছো দিশা। কিভাবে ভুলবে বলো!’ ‘না, আমি তো চেপে রাখি নি। আমি তো নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলছি সবকিছু ভুলে যাওয়ার। কিন্তু পেরে উঠছি না কেন!’ ‘তুমি শান্ত হও। উত্তেজিত হবে না। আমার মনে হয় ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলা উচিৎ।’ ‘ডাক্তারের কাছে আসল সমস্যা গোপন করে ঠিক চিকিৎসা পাওয়ার প্রত্যাশা কি করে করবো বলো তো? বৃথাই তো যাবে সব।’ চুপ করে থাকে জামিল। হুইলচেয়ারেই জীবন আবদ্ধ হয়ে রইলো দিশার। দিনে দিনে বিরক্ত হয়ে উঠেছে নিজের জীবনের প্রতি দিশা।
দেখতে দেখতে শীতকাল চলে এলো। খুব সকাল আর গভীর রাতে কুয়াশারা ঢেকে রাখে শহর। গভীর রাতে ঘুম ভাঙ্গে দিশার। জানলার কাঁচে কুয়াশা জমেছে। একটা নিঃশ্বাস আর খুব নিকটে থাকা একটা আবছা মুখ, যন্ত্রণা বাড়িয়ে তোলে দিশার। ভাঙ্গা পা নিয়েই মুখের পেছনে ছুটতে গেলে আবিষ্কার করে দিশা, ভাঙ্গা পা’টা একদম স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। খুশি না হয়ে বেশ ভয় পেয়ে যায় সে। ডাক্তার বলেছিল, পা’টা ভালো হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এরকম আশ্চর্যজনক ঘটনায় ভীত হয়ে পড়ে দিশা। বাড়িসুদ্ধ লোক এই অদ্ভুত ঘটনায় বেশ আশ্চর্য হয়ে গেলেও তা ঢাকা পড়ে পা ভালো হওয়ার খুশির তলে।
‘জামিল, গতকাল রাতে ও এসেছিল।’
‘রাবেয়া?’
‘হ্যাঁ। এই পা ভালো হওয়ার ঘটনাটা স্বাভাবিক নয় জামিল। গতকাল ও আমার খুব কাছেই ছিল। আমি ওকে ধরার জন্য এতটাই আকুল হয়ে উঠি যে ভুলে গিয়েছিলাম ভাঙ্গা পা’র কথা। ওর পিছু নিলেই আবিষ্কার করি ঘটনা, ভাঙ্গা পা আর ভাঙ্গা নেই। আমার কিছুই ভালো লাগছে না জামিল। কেন যেন এই বিষয়টাতে আমি খুশি হতে পারছি না।’
‘আহা দিশা। তুমি এভাবে ভাবছো কেন! বিষয়টা এমন নয়।’ ‘বারবার আমার মনে হচ্ছে, আমার পা আগের মত থাকলেই যেন ভালো হতো।’ ‘এসব চিন্তা বাদ দাও। এবার আমাদের চিন্তা করা উচিৎ।’ মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় দিশা। জামিল হাসিমুখে তাকিয়ে থাকে দিশার মুখের দিকে। বাড়িতে আবার বিয়ে নিয়ে শোরগোল ওঠে। দিনতারিখ ঠিক হয়। আগামী সপ্তাহে বিয়ে। এবার আর আগের মত আয়োজন নয়, স্বল্প পরিসরে বিয়ের আয়োজনের কথাই ভাবছেন দুই পরিবার।
কয়েকদিন যাবৎ দিশার আর নিঃশ্বাসের শব্দে ঘুম ভাঙ্গে না। রাবেয়ার আবছা মুখটাও দেখতে পায় না। বিষয়টাতে বেশ খুশি হয়ে ওঠে সে। আগামীকাল দিশার বিয়ে। সেই আনন্দে দু’চোখে ঘুম আসছে না তার। আজ কেন যেন তার গভীর রাতের আকাশ দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। ইচ্ছের তোড়জোড় এতটাই বেশি ছিল যে ছটফট করতে করতে ছাদে চলে যায় দিশা। আকাশ দেখতে দেখতে আনমনা হয়ে যায় সে। ছাদের কর্ণারে গিয়ে দাঁড়ায়। হঠাৎ একটা নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পায়। পেছন ফিরে তাকাতেই দেখে রাবেয়া দাড়িয়ে আছে, যেন সে জীবন্ত। চিৎকার করার আগেই একটা ধাক্কা লাগে দিশার শরীরে, তারপর ক্রমশ নিচে থেকে নিচে পড়তে থাকে সে। মনে পড়ে যায় দেড় বছরের আগের ঘটনা, এরকমই এক গভীর রাতের কথা। গভীর রাতের আকাশ ভালোবাসা রাবেয়া জামিলের সঙ্গে আকাশ দেখতে ছুটে এসেছিল ছাদে। বুঝতে পারেনি তাকে অন্ধকারের এক আকাশ দেখানো হবে।
ছাদে এসে দাঁড়াতেই কথার বাহানায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ছাদের কর্নারে। তারপর এক ধাক্কায় ক্রমশ নিচে তলিয়ে যেতে থাকে তার দেহ। চিৎকার করার সুযোগ থাকলেও চিৎকার করেনি রাবেয়া। কেবল একটা নিঃশ্বাস ছেড়েছিল। সকালের আলোয় অন্ধকারের সব ঘটনা ঢাকা পড়ে। আত্মহত্যা বলেই এখন অব্দি সকলে জানে। ঘটনার পুরো পরিকল্পনা করেছিলো, দিশা। জামিলকে দিয়েই তার পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ দেয়। সকাল হলে লোক জড় হয় দিশার বাড়ি। খুনের কোনোই চিহ্ন মেলে নি৷ তাই এটাও আত্মহত্যা বলেই ধরে নেয় সকলে। কিন্তু ভেতরে আঁতকে ওঠে জামিল৷ মনে পড়ে সেই গভীর রাতের কথা। ভয়ে কুঁকড়ে যেতে থাকে সে। তারপর থেকে জামিল প্রায় রাতেই নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পায়। একটা আবছা মুখও দেখতে পায়। সে বেশ ভালো করেই জানে, মুখটা আর কারো নয় রাবেয়ার।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত