বড় আপা

বড় আপা
বড় আপার হুট করে কী যে হয়ে গেল, আমরা কেউ বুঝতে পারলাম না। সবার আগে বুঝল মা। তারপর একদিন বাবাও বুঝে গেল। শুধু বুঝলাম না আমি। অব্যাখ্যেয় ব্যাপারটি নিয়ে কেউ আমার সাথে আলাপ করল না। পাশের বাড়ির জমিলা চাচী ফিসফিস করে বলল, ‘বাবু, নিলুর ঘটনাটা কী রে? বল তো শুনি।’
আমি ঘটনা জানি না। জমিলা চাচীকে কিছুই বলতে পারলাম না। কাউকে যে জিজ্ঞাসা করে জেনে নিব এমন সুযোগও নেই। পড়তে বসে একবার আপাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপা তুই একাএকা কাঁদিস কেন রে? বড় মানুষ কী এভাবে কাঁদে?’ মা কাপড় ধুচ্ছিলেন। হাতে সাবানের ফেনা। ফেনা হাত দিয়েই আমার গালে ঠাস করে চড় দিলেন। ব্যাপারটির সুরহা শুধুমাত্র চড়ে হল না। শার্টের কলার ধরে বাড়ির গেটের বাইরে রেখে আসলেন। কলার টানতে গিয়ে শার্টের সবগুলো বোতাম ঝুরঝুর করে ছিঁড়ে পড়ল। মা কখনো কাউকে ধমকান না। সাংসারিক ক্ষুদ্রাত্তিক্ষুদ্র বিষয় ছাড়া সবকিছুতেই তার অসীম অনাগ্রহ। চুপচাপ রান্নাঘর-শোবারঘর-রান্নাঘর করেন। সেই লোক বড় মানুষ কাঁদে কেন এমন সহজ ও সাধারণ প্রশ্নে ক্ষেপে গেল কেন বোঝা গেল না। এটা কী জটিল ধরণের প্রশ্ন?
সারাটা বিকেল চলে গেল। রাত বাড়ল। আমি গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। বালুচর থেকে শেয়ালের ডাক আসছে। আমি অসহায় বোধ করলাম। সবাই হয়ত আমার কথা ভুলে গেছে। বড় আপা আসতে পারত। আগে তো আসত।
একরাতে আমি কান্নাকাটি করে না খেয়ে ঘুমিয়েছি। কান্নাকাটি কারণ তুচ্ছ। আলফ্রেড নোবেলকে ‘এলফ্রাড’ নোবেল উচ্চারণ করেছি বলে বাবা আমাকে তুলকালাম মারধোর করলেন। আক্ষরিক অর্থে বিচ্ছুর তেল মাখানো কাচা বেত দিয়ে আমার পীঠে মেরে কালশিটা ফেলে দিলেন। সাদা শার্টে লম্বা লম্বা রক্তের ছোপ। রাতে গা কাঁপিয়ে জ্বর আসল। মা অস্থির হয়ে বাবাকে বলল, ‘আপনি মানুষ না। এভাবে কেউ মারে?’ বাবা কিছু বললেন না। একদলা থুতু ফেলে বারান্দার এমাথা থেকে ওমাথা হাটাহাটি শুরু করলেন। প্রবল ঘোরের মধ্যেও আমি বাবার অস্তিত্ব বুঝতে পারছি। তিনি যতক্ষণ বারান্দায় থাকেন, লাগাতার বিড়ি টানেন। আকিজ বিড়ির তামাকের কড়া গন্ধ আমার নাকে আসছে। গন্ধটা তেমন খারাপ লাগে না।
শেষরাতে জ্বর বাড়ল। আমার জ্ঞান নেই। জ্ঞান ফেরার পর দেখলাম, মা কান্নাকাটি করছে। নিলু আপা আমাকে কোলে নিয়ে বসে আছে। আমাদের উপর ঝুকে আছেন কমলেশ ডাক্তার। ডাক্তার স্টেথোস্কোপ লাগিয়ে খানিকটা টেপাটিপি করে যোগীশ্রেষ্ঠ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের মত মধুর ভঙ্গিমায় বলল, ‘বেঁচে গেল। আর এভাবে মারবেন না।’ সে রাতে নিলু আপা সারারাত গল্প করল। বিচিত্র সব গল্প। গল্পের বিষয়বস্তু সবসময় একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে থেমে যাচ্ছে। নাম—মুকুন্দ দাস। মুকুন্দ দাস গল্পের রাজপুত্র। বড় আপার ভাষায়, তার গায়ের রঙ পিওর হোয়াইট। পিওর হোয়াইট অর্থ বোধগম্য হল না। যতটুকু বোঝা যায় তাতে ধরে নিলাম, মুকুন্দ দাস ফর্সা মানুষ। অতিরিক্ত ফর্সা। এই ফর্সা মানুষটার জন্য বড় আপার অনেক মায়া। আপা বলল,
‘কিছু খাবি? চা?’
‘মুকুন্দ দাস কি চা খায়?’
আপা বলল,
‘হুম, খায়।’
‘যদি বাবা আবার মারে?’
‘বাবা জানতে পারবে না। আমার কাছে আরও একটা জিনিস আছে। চায়ের সাথে খাব। খাবি?’
‘কি?
‘আকিজ বিড়ি। বাবার পকেট থেকে চুরি করেছি।’ আমি বললাম, ‘মুকুন্দ দাস কি আকিজ বিড়ি খায় রে আপা?’ আপা হাসল। মুকুন্দ দাস সম্ভবত আকিজ বিড়ি খায় না। পরবর্তীতে আপার গল্পের প্লট বদলেছে। গল্প বলার ধরণ বদলেছে। বদল হয়নি শুধু মুকুন্দ দাস। বড় আপার সকল গল্পের প্রধান চরিত্র এই রহস্যময় মানুষটি। মুকুন্দ দাস সম্পর্কে আমি যতটুকু তথ্য জোগাড় করতে পেরেছি তা হল—তিনি পেশায় কলেজ শিক্ষক। অংক পড়ান। উঠেছেন ভাড়া বাসায়। আপাতত একা থাকছেন। বউ বাচ্চা গ্রামে থাকে। কলেজের সময় বাদে দিনের অধিকাংশ সময় তিনি ব্যাচ করে ছাত্র-ছাত্রীদের অংক শেখান।
সে রাতে বড় আপার সাথে চা বা বিড়ি কিছুই খাওয়া হয়নি। আমার বারবার মনে হচ্ছিল, আমার ভাল লাগার জন্য নিলু আপা প্রাণপন চেষ্টা করছে। নিজেকে জগজ্জননী মনে হচ্ছিল। আমার জগতে নিলু আপা পুজার ফুল ও নৈবদ্যর ফল হাতে সহাস্যবদন পূজারিণী। আমার রোগমুক্তির মহানন্দে মা সারারাত নামাজ পড়লেন। আমার অতি রাগী বাবা একবারও কাছে আসলেন না। আমি শুধু বুঝতে পারছি, তিনি আছেন। বারান্দায় আছেন। তিনি তার সন্তানের কাছে আসবেন না। অযাচিত স্নেহ নামক ব্যাপারটি তার মাঝে নেই। পিতৃহৃদয় থেকে মায়া নামক তুচ্ছ আবেগীয় ব্যাপারটি ত্যাগ করে নিজেকে লোকোত্তর মহাপুরুষ পর্যায়ে পৌছে দিয়েছেন। আজ নিলু আপার কী হল? এত রাতে ছেড়া শার্টে আমি বাড়ির বাইরে একা দাঁড়িয়ে আছি, তার কি আমার কথা মনে নেই?
রাত দশটার দিকে গেট খুলল। গেট খুলল বাবা। আমি আরেক দফার মার খাবার প্রস্তুতি নিলাম। বাবা আমাকে হকচকিয়ে দিয়ে বলল, ‘ভাত খেয়েছিস বাবু?’ আমি মাথা ঝাকালাম। ভাত খাইনি। ‘ক্ষুধা লাগছে?’ আমি আবার মাথা ঝাঁকালাম। বাবা শান্ত গলায় বললেন, ‘ভয় পাচ্ছিস কেন রে ব্যাটা। মুখে জবাব দে।’ ‘হুম। ক্ষুধা লাগছে।’ বাবা হাসলেন। বাবা যখন হাসেন তখন তার কথার মাঝে দার্শিনকতা চলে আসে। এই মুহুর্তে এসেছে। ‘ব্যাটারে, ক্ষুধার কথা বলতে হয় গলা ফাটিয়ে। আরো কিছু ব্যাপার আছে যেগুলো গলা ফাটিয়ে বলতে হয়। যেমন দাওয়াতে গিয়ে আরো মাংস চাওয়া। সত্য কথা বলতে হয় ধীরে। মিথ্যা বলতে হয় গলা ফাটিয়ে। যেন সত্যের মত শোনায়। ঠিক বলেছি কিনা গলা ফাটিয়ে বল?’ আমি গলা ফাটিয়ে বললাম,
‘ঠিক।’ বাবা বললেন,
‘চল আজ বাইরে খাই। অনেকদিন বাইরে খাই না। মোড়ের আকবরিয়া খোলা আছে। শিং মাছের ঝোল দিয়ে এক থাল খাব।’
আমি অবাক হয়ে বাবার পিছুপিছু হাটতে শুরু করলাম। বাবা আমার হাত ধরল। আমি খানিকটা লজ্জা পেয়ে মুষড়ে গেলাম। বাবা সাধারণত বাইরে খান না। আমার জ্ঞান হবার পর থেকে তাকে বাইরে খেতে দেখিনি। নিশ্চয় বড়আপা কেন্দ্রিক বাসার সমস্যাটা বেড়েছে। মা রান্না করেন নি। আকবরিয়া হোটেল বন্ধ। গলির মাথায় টং দোকানে দুটো বনরুটি আর এক পিরিচ ছোলাসিদ্ধ খেয়ে বাসায় ফিরলাম। বাবা তার ঘরে চলে গেল। বাড়িময় শুনশান নিস্তব্ধটা। মাকে দেখলাম বারান্দায় বসে আছে। মাথাটা ঝুলে আছে বুকের কাছে। আজন্ম বটগাছ হয়ে থাকা মা হঠাৎ এভাবে মুষড়ে পড়ল কেন বোঝা গেল না। বড়আপার ঘরে হারিকেন বন্ধ। আমি বুঝতে পারছি আপা টুলে পা ছাড়িয়ে বসে আছে। আপার যখন মন খারাপ থাকে তখন সে হারিকেন বন্ধ করে ছোট টুলে পা ছড়ানো অবস্থায় চুপচাপ বসে থাকে। এসময় তারসাথে কেউ কথা বলে না।
বসার ঘরে তিনজন মানুষ। আমি কাউকেই চিনি না। তিনজনই বেশ বয়স্ক। একজন কড়া সবুজ রঙের কোর্ট-টাই পরে আছেন। গায়ের রঙ অতিরিক্ত ময়লা। দেখলেই মনে হয় রাস্তার পাশের ড্রেন থেকে তাকে চুবিয়ে আনা হয়েছে। কাঁঠালপাকা গরম ও মোটা কোর্টের উপরিপাতিত গরমে তিনি ঘেমে যাচ্ছেন। কিছুক্ষন পরপর ঘোঁতঘোঁত শব্দে বলছেন, ‘কারেন্ট নাই? কারেন্ট নাই?’ এই প্রশ্ন প্রত্যশিত নয়। কারেন্ট নাই এই ব্যাপারটা ঘরের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। আশেপাশে সব বাসায় কারেন্ট আছে। আমাদের নেই। বাবা নেননি। কেন নেননি এ বিষয়ে তিনি কিছু বলেন না। মাকে জিজ্ঞাসা করলে বলেন, ‘কারেন্টের খরচ নাই? খরচ কী ভেসে আসে?’ কোর্ট পরা মানুষটা আমাকে ডাকল। আমি ভয়েভয়ে কাছে গেলাম। ঘোঁতঘোঁত করে কোনোমতে বলল,
‘হাতপাখা আছে? হাতপাখা?’  এই লোকের সম্ভবত সবকিছুই দু’বার বলার অভ্যাস। আমি হাতপাখা এনে দিলাম। উনি হাতে নিয়ে বলল,
‘এত ময়লা কেন? হাহ? এত ময়লা কেন?’
এরপর চোখমুখ কুঁচকে ময়লা ঝাড়ার জন্য হাতপাখাটা বাম হাতের উপর কয়েকবার বাড়ি দিল। মা আমাকে বলল বাইরে ঘুরে আসতে। আমি গেলাম না। বারান্দার এককোনায় গিয়ে চুপচাপ বসলাম। বাবা ব্যাগভরা বাজার এনে মাকে দিলেন। মা ব্যাগ হাতে রান্নাঘরে চলে গেল। ব্যাগভরা বাজার দেখে আন্দাজ করা যায় আজ বিশেষ দিন। বিশেষ দিনে বাবা বাজার করেন। আর মা নতুন শাড়ী পরে রান্নাবান্নায় বসে যান। দীর্ঘকালের রেওয়াজ। আজ তেমন কিছুই দেখা গেল না।আমি নিলু আপার ঘরে গেলাম। নিলু আপা বিছানায় বসে আছে। আজকের একমাত্র বৈসাদৃশ্য হল আপার পরনে লাল শাড়ি। পরিচিত রঙ। আমার ক্ষুদ্র জীবনে প্রতিটা আড়ম্বর দিনে মাকে এই শাড়ি পরতে দেখেছি।
বড় আপা বলল,
‘এখানে আয়। বস।’ আমি বসলাম। পাশের ঘরে বাবার গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। বাবা গলার স্বর যতটা সম্ভব মৃদ্যু রেখে বললেন, ‘কী করব এখন? আপনিই বলেন?’ কেউ একজন কিছু একটা জবাব দিল। বাবা বললেন, ‘বিয়ে হোক। বিয়েটা হলে কেউ কিছু বলবে না। বুঝতেই পারবে না।’ আবার কোন একটা কথা হল। বাবা বেশ অনুনয় করলেন। ‘আপনারা চাইলেই হবে। শুধু একবার রাজি হন। দেখেন আমি কী করি ছেলের জন্য।’ এবার কেউ কোন কথা বলল না। সম্ভবত বাবার প্রস্তাবে কেউ সন্তুষ্ট নন। আমি নিলু আপাকে জিজ্ঞাসা করলাম,
‘কার বিয়ে আপা?’ নিলু আপা জোর করে হাসার চেষ্টা করল।
‘আমার।’
‘কার সাথে? মুকুন্দ দাসের সাথে?’
‘হুম।’
‘কবে?’
‘জানি না।’
‘তোর বিয়েতে আমাকে কী দিবি?’
‘কী চাস?’
‘কিছু চাই না আপা।’ নিলু আপা হাসল। আবার জোর করে হাসা। হাসি শেষ হবার আগে ঘোঁতঘোঁত শব্দের লোকটা বেশ উচ্চস্বরে বলল, ‘আমার কী দোষ? আহ? আমার কী দোষ?’ বাবা বলল, ‘তোমার দোষ নেই বাবা।’
বাবার এই গলাটা আমার পরিচিত নয়। তিনি কোন কারণে মন খারাপ করে আছেন? কেউ কান্না চেপে রাখলে এমন আওয়াজ হয়। আবার আওয়াজ আসল, ‘সেই আমাকে বলেছে। সেই বলেছে। ডাকেন তারে। গিয়া ডাকেন তারে।’ বাবা কিছু বললেন না। চিকন কণ্ঠে কেউ একজন বলল, ‘সে হইল অংকের মাস্টার। অংক পড়ায়। বালবাচ্চাও আছে। আপনার মেয়ে যদি পা না বাড়াইত, এই ঘটনা ঘটত? বলেন?’ এবার চড়া গলায় কথাবার্তা শুরু হল। বাবা চুপচাপ শুনছেন। আমি ভয়েভয়ে আপার দিকে তাকালাম। আপা নিষ্প্রাণ হাসি দিয়ে বলল, ‘ড্রয়ার খোল। যা পাবি সেটা তোর।’ আমি ড্রয়ার খুললাম। কয়েকটা চকচকে একশ টাকার নোট। মোট ছয়শ টাকা। আপা বলল, ‘যা, একটা শার্ট কিনে আন।’ আমি বললাম,
‘আজ থাক। আরেকদিন কিনব। টাকাটা তোর কাছেই রাখ।’ আপা বলল, ‘রাখতে বলেছি রেখে দে।’ আমি বুকপকেটে ছয়শ টাকা নিয়ে আপার ঘর থেকে বের হলাম। মা রান্নাঘরে চুপচাপ বসে আছে। তার সামনে ঝুড়িভরা বাজার পড়ে আছে। চৈত্র মাস চলে আসল। আপার বিয়ে হয়নি। মুকুন্দ দাসের বিরুদ্ধে বাবা মামলা করলেন। জলের মত অর্থ খরচ হল। বাবা মামলায় কুলিয়ে উঠতে পারলেন না। পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ল। পরিবারের দৈন্যদশা দেখে প্রতিবেশীরা চাপা গলায় হাসাহাসি শুরু করল। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে জমিলা চাচী আমাকে রাস্তায় আটকে ফিসফিস করে বলল,
‘নিলুর বিয়ে নাকি ভেঙে গেছে। ঘটনা কি সত্যি বাবু?’
‘হুম।’
‘জামাই নাকি হিন্দু ছিল?’
‘হুম।’
‘ঐ লোকটা? আলকাতরার মত, তোদের বাড়িতে আসছিল? ঐটা?’
‘হুম।’
‘হুম হুম করছিস কেন?
আরেকটা কথা। তোর বোনের নাকি বাচ্চা হবে। ঘটনা কতদুর সত্য?’ আমি কিছু বললাম না। চুপচাপ বাসায় চলে আসলাম। মাকে প্রায় দেখি রাতে কেঁদে ওঠেন। বাবা তাকে বোঝান। আল্লাহপাকের খেলা—-বলে শান্ত করার চেষ্টা করেন। শেষরাতে মা শান্ত হোন। মাত্রাতিরিক্ত কান্নায় ক্লান্তিতে তিনি আবার ঘুমিয়ে পড়েন। বাবা পুরোপুরি বদলে গেছেন। আজকাল আমাকে আর পড়তে বসতে বলেন না। সারাদিন এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করেন। মাঝরাতে বাসায় ফেরেন। বাড়ি ফেরার মুহুর্তটার জন্য আমি জেগে থাকি। বাবা আসার শব্দটা আজকাল বুঝতে পারি না। নিঃশব্দে আসেন। বারান্দায় হাটলে বুঝতে পারি না। বাবা হয়তো বিড়িও ছেড়ে দিয়েছেন।
বড় আপা দীর্ঘদিন হল বাড়ির বাইরে বের হয় না। সারাদিন ঘরে বসে থাকে। লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে। তাকে এখন চেনা যায় না। চোখের নিচে কালি। মুখ শুকিয়ে গেছে কিন্তু পেটের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিটা কারো চোখ এড়াতে পারে না।
চৈত্রের তেরো তারিখ নিলু আপাকে নিয়ে বাবা রৌমারী সীমান্ত পাড়ি দেবার পরিকল্পনা করলেন। সীমান্তের ওপারে কী আছে আমার জানা নেই। বাবার ভাষ্যমতে- আপা কিছুদিন থেকে ফেরত আসবে। ততদিনে সবকিছু স্বাভাবিক হবে। কী স্বাভাবিক হবে এব্যাপারেও তিনি কিছু বললেন না। বাবার সাথে গেলাম আমি। নিলুকে নিতে এল মোমেনা খালা। মোমেনা খালার বিয়ে হয়েছে এক ভারতীয় বাঙালীর সাথে। নিলু আপা তার বাসাতেই থাকবে। মোমেনা খালার হাত ধরে নিলু যখন লুকিয়ে সীমান্ত পার হল তখন রাত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। অন্ধকারে তার মুখ চেনা যাচ্ছিল না।
দীর্ঘ এক বছর পার হল। নিলু আপা এখনো ফিরে আসেনি। বাবা প্রায় রাতেই বাড়ি ফেরেন না। আমি খুজেখুজে রেলস্টেশন থেকে বাড়িতে আনি। বাবা টলতে টলতে আমার কাঁধে হাত দিয়ে বাসায় ফেরেন। বাবাকে প্রবল ঝড়ে শিকড় উপড়ে পড়া বটগাছের মত মনে হয়। মা একদিন উঠোনে গড়াগড়ি দিয়ে তুমুল মরাকান্না করলেন। এই কান্নার উৎস কী—-এধরনের কোন প্রশ্ন করার সাহস হয়নি। তারপর মা একদিন শীতল হলেন। কথা বলেন না। চুপচাপ বাড়ীতে পড়ে থাকেন। সামনে আমার এসএসসি পরীক্ষা। সবাই নতুন শার্ট-প্যান্ট কিনে ফেলছে। শুধু আমি পুরাতন শার্ট পরে উদভ্রান্তের ঘোরাঘুরি করি। মাঝেমাঝে বড়আপার কথা মনে হয়। তাকে দেখতে ইচ্ছা হয়। না দেখার প্রবল হাহাকারে মাঝেমাঝে গলা ফাটিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে। বড়রা কেন কাঁদে এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো খুঁজে পেতে শুরু করেছি।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত