ভাঙা চশমা

ভাঙা চশমা
আমি বাবলী আফরোজা। অনার্স ১ম বর্ষের ছাত্রী। আমরা তিন ভাই বোন। আমি সবার বড়। ছোট ভাই মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী আর ছোট বোন ক্লাস সেভেনে পড়ে। আমার মা হাউস ওয়াইফ‌। বাবা ৩০ হাজার টাকা বেতনের একটা চাকরি করতেন। দাদুর তৈরি একটা পাকা স্যাঁত স্যাঁতে ভবনই আমাদের শেষ সম্বল। এটুকু লিখেই বাবলী কাগজটা দুমরে মুচড়ে ছুড়ে মারলো পাকা মেঝেতে। জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতেই কয়েক ফোঁটা পানি টপটপ করে গড়িয়ে পড়লো ধপধপে সাদা মসৃন খাতার পাতায়। হাতের উল্টো পিঠে বারবার চোখ মুছে আর্টিকেল লিখার চেষ্টা করছে সে কিন্তু মাথায় ইউনিক কিছু আসছেই না। এই তো কিছুদিন আগে পর্যন্ত কতো সুনাম শুনেছে সে সবার মুখে লেখালেখিতে এত সৃজনশীলতা থাকার জন্য। তাহলে গত ৭ দিনে একটা আর্টিকেল কেন সাজাতে পারছে না সে? কিভাবে পারবে?
এই বয়সে পুরো পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়েছে যে তার ঘাড়ে। ৩ সপ্তাহ আগে তার বাবা মামুনুর রশিদ স্টোক করেছেন। এখন সে প্যারালাইসডের রুগী। বাবার চিকিৎসা করতে গিয়ে জমানো সব টাকা খরচ হয়ে গেছে। মায়ের গহনাগুলোও বন্ধক রাখা হয়েছে। তার ভাইটা যদি বড় থাকত তাহলে হয়তো আজ এত ভাবতে হতো না তাদের। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে কান্নার বেগ রেড়ে যেতে লাগলো বাবলীর। বিয়ের বয়সী মেয়ে রেখে বাবার যদি এই অবস্থা হয় তাহলে একটা পরিবারের জন্য কতোটা কষ্টের বিষয় হতে পারে সেইটা কেবল সে পরিবারই জানে। বাবলীর মা রুকিয়া বেগম ঠিক করেছিলেন তিনি অন্যের বাড়িতে কাজ করবেন। কিন্তু বাবলী তাকে বারন করে দিয়েছে। বাবলী বলেছে..
বাবলী: এই বয়সে এসে তুমি অন্যের বাড়িতে কাজ করবে আর মেয়ে হয়ে সেইটা আমি দেখবো? না মা তা হয় না। তোমরা আমাকে কখনো ছেলে আর মেয়ের মাঝে ফারাক রেখে মানুষ করোনি। আমিও আজ তোমাকে বলছি একজন ছেলে হলে এই সময়ে তোমাদের যতোটা খেয়াল রাখতো তার থেকেও বেশি খেয়াল আমি রাখবো তোমাদের।
রুকিয়া: ছলছল চোখে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন এতো বড় হলি কিভাবে রে মা? দুদিন আগেও কতোটা ছেলে মানুষ ছিলি আর এক মূহুর্তের একটা ধাক্কা এতোটা পাল্টে দিলো তোকে? সময় বুঝি এমনই হয়। কিন্তু মা রে তুই তো একজন মেয়ে। আর তুই তো জানিস এই দেশে মেয়েদের কতোটা নিরাপত্তার দরকার। এই বয়সে নিজেকে কি করে সামলাবি তুই বদ লোকেদের থেকে?
বাবলী: তোমার মেয়ে ছেলে মানুষ হতে পারে মা কিন্তু ভীতু নয়। লড়াই করার ক্ষমতা তার আছে। তুমি শুধু আমার পাশে থেকো।(হালকা হেসে)
রুকিয়া: আজ মনে হচ্ছে তুই সত্যিই আমার মা।(মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে) কথাগুলো কানে যেন বারবার বেজেই চলেছে বাবলীর। সে যে বড় মুখ করে কথা দিয়েছে তার মাকে। সে যদি কিছু করতে না পারে তাহলে তো বাধ্য হয়ে তার মাকে অন্যের বাড়িতে কাজ করতেই হবে। না না না এইটা সে কিছুতেই হতে দেবে না। এখন তাকে উত্তেজিত হলে চলবে না এখন শান্ত হয়ে ভাবতে হবে।
সূর্যের আলো মুখে এসে পড়ায় ঘুমটা ভেঙে গেল বাবলীর। চোখ ডলতে ডলতে তাকিয়ে দেখে সূর্য উঠে গেছে। হাই তুলতে তুলতে বিছানা থেকে পা নামিয়ে জানলার কাছে দাঁড়ায় সে। এলোমেলো চুলগুলো চুলকাতে চুলকাতে পেছনে ফিরে তাকায়। পুরো বিছানা জুড়ে বই,খাতা,কলম আর পেন্সিলের ছড়াছড়ি। বই খাতার ভিড়ে মোটা ফ্রেমের চশমাটা চোখেই পড়ছে না। পুরো মেঝেতে ছড়িয়ে আছে দুমরে ফেলা কাগজের টুকরো। কাল কখন যে ঘুমিয়ে গেছে সে নিজেই জানে না। চুলগুলো হাত খোঁপা করতে করতে ঘড়িটার দিকে তাকায়। ঘড়ির কাঁটা ১২টার ঘরে আটকে আছে। তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে সময় যখন খারাপ যায় সব দিক দিয়েই যায়।
বাবলী ১৫ মিনিট যাবত দাঁড়িয়ে আছে একটি বড়সড় গাছের ছায়ায়। পড়নে কালো রঙের সুতি একটি কাপড়,কাঁধে ব্যাগ ঝুলানো। সময় বাড়ার সাথে সাথে তার ভেতরের অস্থিরতাও যেন বাড়ছে। হাতের তালু দিয়ে বারবার মোটা ফ্রেমের চশমাটা ঠিক করছে। এখানে সে তার বয়ফ্রেন্ড কাফির সাথে দেখা করতে এসেছে। কাফির সাথে তার সম্পর্ক ৩ বছরের। কলেজে লাইফ থেকেই তাদের রিলেশন। কাফি বড়লোক ঘরের ছেলে। ওর কাছে একটা চাকরির কথা বললে ও নিশ্চয় ম্যানেজ করে দিবে। বাবলীর ভাবনার মাঝেই পেছন থেকে বলে উঠলো কাফি….
কাফি: এতো দিন কোন খোঁজ নেই আজ হঠাৎ এতো জরুরী তলব কেন শুনি?
বাবলী: আসলে বাবা হঠাৎ করে স্টোক করেছিল কিছুদিন আগে। প্যারালাইসড হয়ে গেছে। বাবার চিকিৎসা করতে গিয়ে জমানো টাকা সব শেষ হয়ে গেছে। বাবার চাকরিটাও চলে গেছে। ছোট ভাই বোনের পড়াশোনার খরচ দিতে মা খুব হিমসিম খাচ্ছে। (বিষন্ন মুখে) বাবলী ভেবেছিল কাফি দুঃখ প্রকাশ করে তাকে শান্তনা দিবে। আমি তোমার পাশে আছি বলে ভরসা জোগাবে। কিন্তু কাফি এমন কিছুই করলো না।
কাফি: হুম তো এর জন্য আমি কি করতে পারি?
বাবলী: কিছুটা অবাক হয়ে গেল। জোর করে হাসার চেষ্টা করে বললো না এই আর কি। এই জন্যই যোগাযোগ করার সুযোগ পাইনি। কিন্তু তুমিও তো একটা বারও খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করোনি কাফি।(অভিমানী সুরে)
কাফি: তুমি ভালো করেই জানো বাবলী আমার এতো সময় নেই। সারাদিন ব্যাস্ত থাকি আমি।(বিরক্ত হয়ে)
বাবলী: হুম জানি।(দীর্ঘশ্বাস ফেলে)
কাফি: তা এভাবে কেন ডেকেছো সেইটা বলো।
বাবলী:না মানে তোমার তো অনেক জানাশোনা আছে আর তোমাদের তো কয়েকটা কম্পানিও আছে। তুমি যদি আঙ্কেলকে বলে আমার জন্য একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে…..(ভয়ে ভয়ে)
কাফি: ওহ্ বাবলী জাস্ট স্টপ ইয়ার। কম্পানি গুলো আমার বাবার আমার নয়। তাছাড়া তুমি তো অনার্স শেষ ও করোনি। আমি থার্ড ইয়ার হয়েই এইসব ভাবার সাহস পাই না আর তুমি কি করে এইসব ভাবো কে জানে।(বিরক্ত হয়ে)
বাবলী: বাবলীর মুখটা চুপসে গেল। মুখ কালো করে বললো তুমি বললে আঙ্কেল নিশ্চয় তোমার কথা শুনবে কাফি।(ভীত হয়ে)
কাফি: এই জন্যই না তোমাদের মতো মিডিল ক্লাস লোকের থেকে দূরে থাকতে চাইতাম আমি। কিন্তু কপাল দেখো, না চাইতেও সেই একি জায়গায় ফেঁসে গেলাম। যতোসব উট্কো ঝামেলা। (উল্টো দিকে ঘুরে)
ভালোবাসার মানুষের মুখে এমন কথা শুনে চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে গেল বাবলীর। চশমাটা হাতে নিয়ে ধরা গলায় বললো…
বাবলী: তাহলে সেদিন কেন এসেছিলে কাফি? আমি তো মাইনিং তোমার কাছে!(ধরা গলায়)
কাফি: হ্যাঁ আমিই গিয়েছিলাম। আর সেইটাও ছিল আমার সবথেকে বড় ভুল।(রাগে গজগজ করতে করতে)
বাবলী: কান্না চাপার চেষ্টা করে বললো আমাকে ভালবাসো তাই এসেছিলে এইটাও বুঝো না? যাকে এতো ভালোবাসো তার এমন বিপদের সময় তুমি যদি পাশে না থাকো তাহলে কার কাছে যাবো বলো তো? কথাটা শেষ করে বাবলী কাফির কাঁধে হাত রাখে। কাফি এক ঝটকায় বাবলীকে সরিয়ে দেয়। বাবলীর হাতের চশমাটা গাছের চারপাশে ঘেরা শানের উপর পড়ে ভাঙ্গন ধরে যায়। ভাঙ্গা চশমাটা হাতে নিয়ে কয়েক ফোঁটা চোখের পানি ফেলে বাবলী। এমনিতেই এতো অভাব এর মাঝে চশমাটাতেও ভাঙ্গন ধরলো? চশমা ছাড়া তো চোখে দেখে না সে ঠিক মতো। চশমা ছাড়া থাকলেই যে মাথা ব্যথা করে তার। চশমাটা যদি পুরোপুরি ভেঙ্গে যায় তাহলে কি করে নতুন চশমা কিনবে আবার? চশমাটা শানের উপর রেখে সে নিজেও বসে পড়ল শানের উপর। আকাশের দিকে মুখ উঁচু করে কয়েক ফোঁটা অশ্রু বিসর্জন দিলো। কাফি পেছনে তাকিয়ে বাবলীর ভাঙ্গা চশমাটার উপর নজর দিলো। তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল……
কাফি: আগে চশমা সামলাতে শেখো বাবলী। সম্পর্কটা না হয় তার পরই সামলাতে এসো। কথাটা বলেই হনহন করে চলে গেল কাফি। বাবলী আকাশের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দেয়। মুখে চাপা হাসি আর চোখে কষ্টের অশ্রু।
বান্ধবীর মাধ্যমে অনেক চেষ্টায় একটা টিউশনি জোগাড় করেছে বাবলী। পাশাপাশি একটা চাকরির খোঁজ করছে। বেশ কিছু জায়গায় যোগাযোগ করেও চাকরি পায়নি সে। কয়েকটি জায়গায় আর্টিকেলও দেওয়ার চেষ্টা করেছিল কিন্তু লাভ হয়নি। সবাই তার দিকে বাজে নজরে তাকিয়ে হেসেছে। সে হাসির মানে খুঁজতে গিয়ে বাবলী নিজেই হাসতে হাসতে কান্না করে রাত পার করে দেয়।
বাবলীর এক বান্ধবী বলেছে বাবলী যদি কোন সৃজনশীল গল্প বা কবিতা লিখে দিতে পারে তাহলে সে একটা পত্রিকার সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারে। তাই বাবলী রাত জেগে সেই ভাঙ্গা চশমাটার সাহায্যে একটা গল্প লিখে কালকে সেই পত্রিকায় জমা দেবে বলে। এদিকে তার ভাইয়ের সামনেই মাধ্যমিক পরীক্ষা। প্রাইভেট, কোচিং আর স্কুলের ফি না দেওয়ায় সে লজ্জায় পড়তে যেতে চায় না। ২ মাস হয়ে গেছে বাবলী কোন চাকরির ব্যবস্থা করতে পারে নি। একজন ছাত্র পড়িয়ে মাস শেষে ৫০০ টাকা পায়।
সেই টাকা বাবার ঔষধ কিনেই শেষ হয়ে যায়। ইতিমধ্যে কিছু ধার দেনাও হয়েছে। বোনের বেতনও দেওয়া হয়নি এখনও। মায়ের মুখের দিকে তাকানো যায় না। ধবধবে ফর্সা মুখ খানায় ছোপছোপ মেসতার দাগ পড়ে যাচ্ছে। চোখের নিচে কালি জমে গেছে। মনে হয় সারারাত না ঘুমিয়ে টেনশন করেই কাটিয়ে দেয়। ছোট ভাই একটু আগে রুমে এসে বলে গেছে কালকে বেতন না দিলে সে আর পড়তে যাবে না। এর মধ্যে আবার ফর্ম ফিলাপের নোটিশ এসেছে। টাকা না দিলে ভাইয়ের পড়াশোনাটা বন্ধ হয়ে যাবে। জমিজমা যা ছিল সব বর্গা দেওয়া হয়ে গেছে। কোন উপায় না দেখে নিজের ফোনটা বেঁচে দেবে বলে সিদ্ধান্ত নেয় বাবলী। বড় সাধ করে ফোনটা কিনেছিল ভাবতেই চোখে পানি চলে আসে। চশমাটা খুলে বিছানার চাদরের এক কোনা দিয়ে মুছে চোখে পড়ে নিল। ভাবলো আজকে একটা নতুন চশমাও কিনে আনবে। তারপর বেরিয়ে গেল মোবাইল ফোন বিক্রি করবে বলে।
মোবাইল বেঁচে ৭৮০০ টাকা পেয়েছে। ভাইয়ের স্কুলের বেতন, ফর্ম ফিলাপ, কোচিং ফি, প্রাইভেট ফি মিলিয়ে ৪৭৫০ টাকা খরচ হয়ে গেল। বোনের বেতন দিয়ে হাতে থাকলো ১৫০০ টাকা। বাজার করলো ৩০০ টাকায়। বাজারে গিয়ে একজন পাওনাদারের সাথে দেখা হয়ে গেল। তাকে দিতে হলো ৮০০ টাকা। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় মাকে চশমার কাঁচ লাগাতে দেখেছিল। তার মানে দাঁড়ায় তার মা বাবলীর থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে ভাঙা চশমাটাই ব্যবহার করছে। তাই চশমার দোকান থেকে মায়ের জন্য একটা চশমা কিনে ২৫০ টাকা দিয়ে। বাকি টাকায় বাবার ঔষধ কিনে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরে বাবলী। রান্নাঘরে বাজারের ব্যাগটা রেখে ছোট ভাই রাকিবকে ডাকলো। জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে চেয়ার টেনে বসলো। উড়নার আঁচল দিয়ে কাপলের ঘাম মুছে নেয়। রাকিব এসে পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো…
রাকিব: কি হয়েছে আপু? গ্লাসের পানি টুকু ঢগঢগ করে শেষ করে বললো…
বাবলী: এই নে তোর এডমিট। স্কুলের সব টাকা পরিশোধ করে দিয়েছি। কাল থেকে ঠিক মতো পড়তে যাস। রেজাল্ট ভালো হওয়া চাই।(মুচকি হেসে)
রাকিব: ছলছল চোখে বলে এতো টাকা কোথায় পেলি আপু?
বাবলী: সে তোকে ভাবতে হবে না যা পড়তে বোস। পরীক্ষা তো এসে পড়েছে। এইসব ভাবার জন্য আমি তো আছি। যা যা পড়তে বোস গিয়ে।(ক্লান্তির হাসি দিয়ে) রাকিবের সাথে সাথে ছোট বোন মিষ্টি আর তার মাও এসেছিল। ছোট বোনকে গোমড়া মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আবার বলে উঠলো…
বাবলী: তোর বেতনও দিয়ে দিয়েছি মিষ্টি। আর লজ্জায় ফেলবো না তোদের।(হালকা হেসে) কাল থেকে স্কুল যাবি কেমন? মিষ্টি হেসে হেসে মাথা নাড়ে। রুকিয়া বেগম এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে …
রুকিয়া: হ্যাঁ রে এতো গুলো টাকা কই পেলি?
বাবলী: বাবলী ব্যাগ থেকে চশমাটা বের করে মায়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল নাও ধরো। এবার ঐ ভাঙ্গা চশমাটাকে একটু রেহাই দাও তো মা। এবার থেকে এই চশমাটা পড়বে তাহলে আর কাজ করতে অসুবিধা হবে না। আর হ্যাঁ আমার চোখে ফাঁকি দেওয়া এতো সোজা নয় হুঁ।(হেসে) রুকিয়া বেগম মুখে আঁচল গুজে কান্না জুড়ে দেয়। বাবলী ধমকের সুরে বলে এভাবে একদম কাঁদবে না বলে দিলাম আমি। আর হ্যাঁ বাবার ভাঙ্গা মোবাইলটা কোথায়?
রুকিয়া: নাক টেনে বলেন সেইটা তো ঘরেই আছে। কেন কি করবি?
বাবলী: আমার মোবাইলটা বেঁচে দিয়েছি ভাবছি এখন থেকে বাবার ফোনটাই চালাবো।
রুকিয়া: এবার উনি হেঁচকি তুলে ফেললেন কাঁদতে কাঁদতে। অস্পষ্ট স্বরে বলল কিন্তু ঐ মোবাইলটা তো তোর অনেক প্রিয় ছিল।
বাবলী: হুম ছিল কিন্তু তোমাদের থেকে না। কথাটা বলেই একটা চাপা হাসি দিয়ে নিজের রুমের দিকে হাটা দিল। পেছন থেকে ঠেকে উঠল রুকিয়া বেগম।
রুকিয়া: বাবলী….(শান্ত হয়ে)
বাবলী: পেছনে ঘুরে বলে হ্যাঁ মা….
রুকিয়া: তোর চশমাটায়ও তো ভাঙ্গন ধরেছে। আমার কাছে ৩০০ টাকা আছে কালকে একটা নতুন চশমা কিনে আনিস মা।
বাবলী: এতোটাও ভাঙ্গে নি যে নতুন কিনতে হবে। আমার কোন অসুবিধা হচ্ছে না এই চশমাটা পড়ে।(মুচকি হেসে) তুমি বরং রাকিবকে একটা নতুন শার্ট কিনে দিও কদিন পর তো ওর পরীক্ষা শুরু হবে।( বলেই রুমে ঢুকে গেল) রুকিয়া বেগম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চেয়ার টেনে বসে পড়ে। ঝাপসা চোখে তাকিয়ে থাকে মেয়ের যাওয়ার পথে। তার মেয়েটা যে সত্যি সত্যিই অনেক বড় হয়ে গেছে।
৬-৭ মাস যাবত একটা ছোট খাট পত্রিকার হয়ে লেখালেখি করছে বাবলী। টিউশনিও বাড়িয়েছে সে। সকাল বিকাল মিলে ৭টা টিউশনি করে এখন। পত্রিকা থেকে ১২০০ মতো পায় আর টিউশনি থেকে ৪৫০০ টাকা পায়। মোট ৫৫০০ টাকা দিয়ে সারা মাসের খরচ চালাতে হয় তাকে। বোনের ক্লাস ৮ এর ফর্ম ফিলাপ আর ভাইয়ের জন্য একজোড়া কেটস কেনা খুব দরকার। সেই ক্লাস ১০ থেকে একজোড়া কেটস দিয়েই চলছে ভাই। এখন কলেজে যাচ্ছে এতো বন্ধুবান্ধব। সবাই কতো রকম জামা কাপড় জুতা পড়ে আর সেখানে ভাই এক জোড়া কেটস পড়ে যায়। মায়ের পড়নে ভালো কাপড় নেই। তাই নিজের নুপুর জোড়া বিক্রি করে ভাইয়ের জন্য কেটস, মায়ের জন্য একটা কাপড়, বোনের ফর্ম ফিলাপের টাকা আর ওর জন্য একটা ঘড়ি, বাবার জন্য ঔষধ আর কিছু ফল নিয়ে রওনা দিলো। ইদানিং চশমাটার অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেছে।
বারবার চশমার কাঁচটা খুলে খুলে যায়। মাথাটাও ইদানিং খুব বেশিই ব্যাথা করে। হয়তো সেও বুঝিয়ে দেয় যাতে চশমাটাকে এবার রেহাই দেই। কিন্তু আমি এই চশমাটা পাল্টাতে চাই না। কারণ এই চশমাটা আমাকে শক্তি জোগায়, সাহস জোগায়, জীবন নামক যুদ্ধের জন্য অনুপ্রেরণা দেয়। আমার জীবনটা যেমন হঠাৎ করেই পাল্টে গেছে ঠিক একই ভাবে সেদিন চশমাটাও হঠাৎ করেই ভেঙে গেছিল। তাই আমার জীবন আর এই ভাঙা চশমাটার মাঝে ভীষণ রকম একটা মিল খুঁজে পাই আমি। যখনি ক্লান্ত হয়ে যাই টেবিলের এক কোণে পড়ে থাকা চশমাটার সাথে নিজের খুব মিল খুঁজে বেড়াই। তারপর ভাবি এতোটা ক্ষত বিক্ষত হয়েও যদি এই ভাঙা চশমাটা আমাকে দেখার শক্তি দিতে পারে তাহলে আমি কেন সামনে এগিয়ে যেতে পারবো না? নিশ্চয় সকল দুঃখ ঘুচে গিয়ে একদিন সুখ ধরা দিবেই ইনশাআল্লাহ।
ভীষণ দ্বিধা দ্বন্দ্বিতায় আছি। আমার এক ছাত্রীর ভাই আমাকে বাজে ভাবে বিরক্ত করছিল। কাউকে কিছু বলতেও পারছিলাম না আবার তার আজে বাজে কথা সহ্য করতেও পারছিলাম না। আজকে উনি সব মাত্রা অতিক্রম করেছেন। রুমের মধ্যে ঢুকে আমার সাথে জোর জবরদস্তি করার চেষ্টা করেছিলেন বলে কষিয়ে এক থাপ্পর মেরেছি। মাসের মাঝ বরাবর হওয়ার কারণে হাফ বেতন দিয়ে পড়াতে যেতে না করে দিয়েছে। আমি যখন উনার মাকে সত্যি কথাটা বলি তিনি উল্টো আমার উপর দোষ চাপিয়ে দেন। অনেক বাজে কথা শুনিয়েছে। চোখের পানি ফেলা ছাড়া তো আর কোন উপায় নেই। কার কাছে বিচার চাইবো? এই পৃথিবীতে সবাই সুবিধাবাদী। এইতো মাস খানেক আগে চাকরির জন্য গিয়েছিলাম। এতোটাই ভদ্র ব্যবহার করলেন মনে হয়েছিল কোন কর্মস্থলে না দেহ ব্যবসা করতে গেছি। নিজের সম্মানের জন্য বাধ্য হয়ে ফিরে এসেছি।
টিউশনিটা চলে গেছে বলে আমার এক বান্ধবীকে বলে ওর মামার কোম্পানিতে গেলাম চাকরির জন্য। ভাগ্য সহায় ছিল তাই পড়াশোনাটা ছাড়তে হয়নি। ভার্সিটির এক স্যারকে সবকিছু বলাতে আমার পড়াশোনার খরচ ফ্রি করে দিয়েছেন তিনি। অনেক কষ্টে ৩য় বর্ষের পরীক্ষাটা দিয়েছি এইবার। সারাদিন কাজ করে মাঝ রাতে ভাঙা চশমাটা চোখে পড়ে পড়াশোনাটা চালিয়েছি। পড়াশোনায় ভালো হওয়ায় সারারাত জেগে পড়ার দরকার হতো না আমার। বই কিনতে পারি না বলে আমাদের ডিপার্টমেন্টের সেই স্যার তার টিচার কপিটা আমাকে দিতো। স্যার আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। স্যারের আমাকে এতো ভালোবাসার তিনটি কারণ।
১. আমি পড়াশুনায় ভালো।
২.স্যারের মেয়ে নেই।
৩. আমার নাম।
আসলে স্যার বই পড়তে ভীষণ ভালোবাসেন। স্যারের বাড়িতেই ছোটখাটো একটা লাইব্রেরী আছে। সেখান থেকে বই নিয়েই পড়াশোনা করি আমি। স্যার ২০০ এরও বেশি উপন্যাস পড়েছেন। তার মাঝে বাবলী নামের একটি উপন্যাস সবথেকে পছন্দ তার। আর তাই আমাকে এতো ভালবাসেন তিনি। কথাগুলো অর্নার(বান্ধবী) মামার কেবিনের বাহিরে বসে ভাবছিলাম। হঠাৎ একজন মাঝ বয়সী মেয়ে এসে বলে গেল আমি যাতে ভেতরে যাই। দরজার কাছে যেতেই মেয়েটি এসে বললো…
মেয়েটি: একটু পড়ে যান আপনি। স্যার তার ভাগ্নীর সাথে কথা বলছেন। কথা বলা শেষ হলে ডেকে দেবো আপনাকে। আমি ভাবলাম হয়তো আমার বিষয়েই বলছে। তাই দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে গেলাম। ভেতর থেকে মামা
ভাগ্নির কথা শুনে দরজায় পিঠ ঠেকে গেল।
অর্না: মামা ওই মেয়েকে তুমি আচ্ছা মতো অপমান করবে। ওর জন্যই আমি কখনো ক্লাসে প্রথম হতে পারিনি। ওর ভালো হোক এইটা আমি কখনোই চাই না। প্লিজ তুমি ওকে চাকরি দিবে না। তুমি ওকে বুঝিয়ে দেবে যে ক্লাসে প্রথম হলেই ভালো চাকরি পাওয়া যায় না।
মামা: কিন্তু অর্না ওর তো কোন দোষ নেই। ও ভালো পড়াশোনা করেছে তাই প্রথম হয়েছে। তুমি যদি ভালো করে পড়াশোনা করতে তাহলে তুমিও প্রথম হতে।
অর্না: তার মানে আমার ইচ্ছের কোন দাম নেই তোমার কাছে?
মামা: আচ্ছা ঠিক আছে ঠিক আছে। ডাকো মেয়েটাকে। বাবলী দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে সালাম দিলো। লোকটি ওকে বসতে বল্লে বাবলী বলে উঠলো…
বাবলী: না স্যার আর বসবো না এখানে। ২ বছর যাবত ৫৫০০ টাকায় ৫ জনের সংসার চালাচ্ছি আল্লাহ সহায় থাকলে আরো ২ বছর নিশ্চয় চালিয়ে দিতে পারবো ইনশাআল্লাহ। আর অর্না তোমার সময়ের দাম নাই থাকতে পারে কিন্তু আমার সময়ের দাম আছে। এতো নাটক না করে আগেই বলে দিতে পারতে যে এখানে মেধার কোন দাম নেই বরং ক্ষমতার জোরে সব চলে।
অর্না: তোমার এতো বড় স্পর্ধা।
বাবলী: অর্নাকে থামিয়ে দিয়ে বলে এইটা আমার স্পর্ধা না ক্ষোভ। কথাটা বলার সময় বাবলী হালকা হাসে যেইটা অর্নাকে আরো জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়।
৬ বছরে ছোট বোনকে ইন্টার পাশ করিয়ে বিয়ে দিয়েছে বাবলী। বিয়ের পরও সে পড়াশোনা করে যাচ্ছে। ছোট ভাইকে উকিল বানিয়েছে। ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে দিয়েছে। ওদের একটি দেড় বছরের ছেলে আছে। বাবলীর বাবা এখন হাঁটা চলা করতে পারে। বাবলীর মায়ের মুখের ছোপছোপ দাগ গুলো আর নেই। মায়ের সব গহনা বন্ধক থেকে ছাড়িয়েছে সে সাথে কিছু নতুনও গড়িয়ে দিয়েছে। সমস্ত ধার দেনাও শোধ করেছে এখন। জমিজমার বর্গাও ছাড়িয়েছে। চুন খসানো স্যাতস্যাতে বাড়িটা এখন চকচকে দোতলা বাড়ি। বাড়ির সদর দরজায় বড় করে লেখা চাশমিশ ভবন। এখন এই বাড়িটাকে সবাই চাশমিশ ভবন বলেই চেনে। কিন্তু সবার কথা ভাবতে গিয়ে নিজের চুলে পাক ধরিয়েছে বাবলী।
ভাই বোন আর বাবা মার কথা ভেবে এখনো বিয়ে করেনি সে। তবে আজ সে সফল লেখিকাদের তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে। এখন সে আর ভাঙা চশমাটা পড়ে না নতুন চশমা কিনেছে। তবে ভাঙা চশমাটা তার রুমের সোকেজে জায়গা নিয়েছে। আজ অনেক দিন পর চশমাটা বের করেছে সে। চশমার কাঁচে দাগ পড়ে ফ্যাকাশে আর ঘোলাটে হয়ে গেছে। ফ্রেমের রংটা উঠা উঠা হয়ে গেছে। বাবলী তার শুষ্ক ঠোঁটে ফুঁ দিয়ে চশমার উপর জমে থাকা ময়লাটা পরিষ্কার করার চেষ্টা করে। ছাই রঙের শাড়িটা আজই প্রথম পড়েছে সে। বেশ দামী শাড়ি এটা। তার ছোট ভাই কিনে দিয়েছে শাড়িটা। শাড়ির আঁচলটা চশমার ফ্রেমে ঘসতে ঘসতে পুরনো কথা ভাবে বাবলী। তার ভাইয়ের বউ সুমি চুল ঠিক করতে করতে এক টুকরো কাপড় হাতে বাবলীর রুমে ঢুকে। সুমি রুমে ঢুকে দেখে বাবলী রাকিবের কিনে দেওয়া শাড়িটার এক কোণা দিয়ে সযত্নে চশমাটা মুছতে ব্যাস্ত।
সুমি: সেকি বড়পা এভাবে মুছতেছেন যে? আমি তো চশমা মুছার জন্য কাপড় নিতেই গিয়েছিলাম।
বাবলী: মুচকি হেসে বলল আসলে কি বলো তো সুমি, এই চশমাটার থেকে দামি আর কিছুই নেই আমার কাছে। সুমি মুচকি হেসে বলে….
সুমি: সেকি আর জানি না আমি? দেড় বছর ধরে তো দেখে আসছি। এমনকি এই চশমাটার প্রতি আপনার দূর্বলতা দেখে বাড়ির নামটাও চাশমিশ রাখা হয়েছে। তবে যাই বলুক বড়পা নামটা কিন্তু আমার খুব মনে ধরেছে। বাবলী খিলখিলিয়ে হেসে উঠে আর সুমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। মনে মনে ভাবতে থাকে কিছু তো একটা আছে এই মাঝ বয়সী মানুষটার ভেতর। চুলে পাক ধরে গেছে,চামড়ায় ভাঁজ পড়ে যাবে কিছুদিন পর অথচ এখনো কি রুপ! কি প্রান ঢালা হাঁসি! একটা পুরুষ যেখানে অনায়াসে তাকে দেখে কাব্য রচনা করতে পারে সেখানে সে নিজেই ছন্দের রানী। ভাবতেই ভালো লাগে এতো ভালো একজন লেখিকাকে সে বড়পা বলে ডাকার সুযোগ পেয়েছে।
চারপাশে বিশাল আয়োজন। অনেক লোকের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। সামনে প্রেস মিডিয়ার ছড়াছড়ি দেখা যাচ্ছে। সবার মধ্যেই উত্তেজিত অবস্থা দেখা যাচ্ছে। বাবলী গাড়ি থেকে নামতেই লোকজন দৌড়ে তার কাছে গেল অটোগ্রাফ নিতে। বাবলীর লিখা একটি উপন্যাস”ভাঙা চশমা” সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিখ্যাত এই উপন্যাসের জন্য বাবলীকে পুরুস্কৃত করা হবে আজকে। প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়েছে। বাবলী সবাইকে অটোগ্রাফ দেওয়ার সময় দূরে তার সেই বান্ধবী অর্নাকে একটি ডায়রি হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো। হয়তো লজ্জায় অটোগ্রাফ চাইতে পারছে না। বাবলী মুচকি হেসে একটি ছেলেকে ডেকে হাতের ইশারায় অর্নাকে দেখিয়ে বলল ওকে ডেকে দিতে। অর্না জড়তা ভরা পায়ে এগিয়ে আসতেই বাবলী হাত বাড়িয়ে ডায়রিটা চাইলো। অর্না ডায়রিটা এগিয়ে দিতেই বাবলী বলে উঠলো….
বাবলী: তোমাকে অনেক ধন্যবাদ অর্না। সেদিন যদি তুমি ঐ কথাগুলো তোমার মামাকে না বলতে তাহলে হয়তো আমার ভাঙ্গা চশমাটার জোর কমে যেতো। সে হিসেবে আমার সফলতার পেছনে তোমারও কিছু ভূমিকা আছে। আর তার জন্য মাত্র একটা অটোগ্রাফ যথেষ্ট নয়। কথাটা বলে বাবলী কয়েকটি পাতায় তার অটোগ্রাফ দিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। অর্না অপরাধীর মতো সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
মঞ্চের কাছে যাওয়ার পর একটি চিরোচেনা মুখ আবিষ্কার করলো সে। হ্যাঁ তার কিশোরী বয়সের প্রথম প্রেমের মানুষ কাফি মঞ্চের এক কোণে বসে আছে। মুখটায় তার বিষন্নতার ছাপ। হয়তো আজ সে অনুতপ্ত আবার হয়তো বিরক্ত! কাফি এখন তার বাবার বিজনেস দেখাশোনা করে। বিয়ে করেনি এখনো। কেন করেনি জানা নেই বাবলীর। বাবলী কাফির পাশের চেয়ারে গিয়ে বসলো। সবার চোখে মুখে বিষ্ময়ের ছাপ। কিছুক্ষণ পর কাফি নিচু স্বরে বলল…
কাফি: আমাকে মাফ করে দাও বাবলী। আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি সত্যিই অনুতপ্ত।
বাবলী: মুচকি হেসে বলল সে তো কবেই মাফ করেছি তোমাকে। যাকে এতো ভালোবেসেছি তাকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দেখাটা খুব কঠিন।(ধরা গলায়)
কাফি: আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি বাবলী। বিয়ে করবে আমাকে?
বাবলী: মুচকি হেসে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তারপর বলে যখন তোমার হাতটা খুব বেশি প্রয়োজন ছিল তখন তুমি আমাকে একা ছেড়ে দিয়েছিলে। যখন তোমার আমাকে সামলানো উচিত ছিল তখন তুমি আমাকে আমার চশমা সামলাতে বলেছিলে। যখন এই সো কল্ড মিডিল ক্লাস মেয়েটি লোকের দরজায় দরজায় চাকরির জন্য গিয়ে অপমানিত হয়েছে তখন কোথায় ছিল তোমার ভালোবাসা? শুধু মাত্র একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে বলায় যে ছেড়ে চলে যায় তাকে নিয়ে কখনো স্বপ্ন দেখা যায় না। কথাগুলো বাবলী মুচকি হেসেই বললো। বাবলীর এই হাসিটাই কাফিকে আরো পোড়াচ্ছিল।
কাফি: প্লিজ এভাবে বলো না। আমি সত্যিই ভালোবাসি তোমায়। সারা জীবন তোমার সাথে সুখে থাকতে চাই।
বাবলী:হাসি চাপার চেষ্টা করে বললো দুঃখগুলো যখন পরিবারের সাথে ভাগ করে কাটিয়ে দিতে পেরেছি বাকি জীবনের সুখগুলো তাদের থেকে কেড়ে নিয়ে একজন সুখের সাথীকে দিয়ে দেবো? যে কিনা আমার দুঃখে নয় সুখের সাথী হতে চায়! তা কিছুতেই হবার নয়। দুঃখগুলো যখন পরিবারের সদস্যদের সাথেই কাটাতে পেরেছি বাকি জীবনের সুখগুলো ও তাদের সাথেই কাটিয়ে দিতে পারবো। আশা করি তোমার আর কিছু বলার নেই। কথাটা বলেই অন্যদিকে মনোযোগ দেয় বাবলী। আর কাফি ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে তার দিকে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের অপরাধবোধের জানান দেয়। পুরষ্কার দেওয়ার পর মিডিয়ার লোকেরা বাবলীকে নানা রকম প্রশ্ন করতে থাকে। একজন বলে ম্যাম আপনি এতো বড় একজন লেখিকা,আজ এতো বড় একটা দিন আপনার জন্য। কিন্তু আপনি আজকের দিনে ভাঙা চশমা কেন পড়েছেন?
বাবলী: হাসতে হাসতে বলে কারণ এই ভাঙা চশমাটাই আমার ইচ্ছে শক্তি, আমার অনুপ্রেরণা, আমার সুখ দুঃখের সাথী, আমার সবথেকে প্রিয় বন্ধু। আমি বড় লেখিকা হলেও আপনাদের মতোই একজন সাধারণ মানুষ। সে হিসেবে আমারও কিছু পছন্দের জিনিস আছে। আর এই চশমাটা সেই জিনিস গুলোর মাঝে সবথেকে কাছের জিনিস।
আরেকজন বলে ম্যাম আপনার জীবনের গল্প তো আমাদের সবার জানা। এতো কষ্টের মাঝেও আপনি নিজেকে সামলে রাখতেন কি করে? এতো ধৈর্য্য ধারণ কি করে করতেন?
বাবলী: আমার এক শিক্ষক আমাকে একটা কথা বলেছিল। দুধ ফোঁটানোর পর সেইটা ২ ঘন্টা ভালো থাকে। আবার দুধ দিয়েই দই বানালে সেইটা কিন্তু ২-৩ দিন ভালো থাকে। সেই দুধ দিয়ে তৈরি সাদা ঘন মাখনই আবার কয়েক সপ্তাহ ভালো থাকে। আবার এই দুধের তৈরি ঘি কয়েক বছর পর্যন্ত ভালো থাকে। এর কারণ হচ্ছে তাপ এবং বিশুদ্ধতা। কথাটা দ্বারা বোঝানো হয়েছে ধৈর্য্যের তাপ এবং বিশুদ্ধতার কথা। আপনি যতো ধৈর্য্য ধারন করতে পারবেন ততো বিশুদ্ধতা আসবে আপনার ভেতর। আর আমাকে সেই ধৈর্য্যর যোগান দিতো আমার এই ভাঙা চশমা। কথাটা শেষ করেই মুচকি হাসে সে। চোখের কোণে পানি চিকচিক করছে। তখন আরেক জন বলল ম্যাম আপনি এখনো বিয়ে করেননি কেন? আপনি কি কাউকে ভালোবাসতেন?
বাবলী: একটু শব্দ করেই হাসে। তারপর বলে সার্থপরের এই পৃথিবীতে সুখের সাথী যতো সহজে পাবেন দুঃখের সাথী ততো সহজে পাবেন না। দুঃখে যখন কাউকে পাশে পাইনি সেখানে শুধুমাত্র সুখ গুলো কারো সাথে ভাগ করা মানে বিশাল বোকামো। এইটা সত্যিই আত্নসম্মানে লাগার মতো একটি ব্যাপার। আর আমার কাছে আমার আত্নসম্মানটা খুবই ইম্পর্ট্যান্ট। তাই বাকি জীবনের সুখগুলো আমার পরিবারের সদস্যদের সাথেই কাটাতে চাই। অতীতে কি হয়েছে সেইটা না হয় আমার ডাইরিতেই তোলা থাক। এতো বছরের জীবনে আপনার সবথেকে বড় পাওয়া কি?
বাবলী: এ কয় বছরে আমি অনেক কিছুই পেয়েছি। ভাইয়ের ভালোবাসা, বোনের ভালোবাসা, মায়ের ভরসা, বাবার সুস্থতা, আমার ভাইয়ের জন্য সুযোগ্য বউ, ছেলের মতো ভাতিজা, বোনের জন্য সুপাত্র, আর আপনাদের সবার ভালোবাসা। কিন্তু আমার কাছে সবথেকে বড় পাওয়া হচ্ছে আমার পাঠক শ্রেনীর থেকে পাওয়া”রাইটার” নামটা। কিছু কিছু না পাওয়া কষ্ট গুলো এই একটা নামই ভুলিয়ে দেয় আমাকে। যখন কেউ রাইটার ম্যাম বলে ডাকে সকল কষ্টগুলো লাঘব হয়ে যায়। কথাটা বলতে বলতে চশমাটা খুলে চোখের পানি মুছে নেয়। আপনার এই সফলতার পেছনের প্রধান কারণ কি?
বাবলী: ভাঙা চশমাটার গায়ে শ্বাস ছাড়ে। চশমাটা ঝাপসা হতেই শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে নেয় চশমাটা। তারপর মুচকি হেসে চশমাটা চোখে পড়ে নেয়। উপস্থিত সবাই অধির আগ্রহে তার দিকে তাকিয়ে আছে উত্তরের আশায়। বাবলী ট্রফিটা হাতে নিয়ে ট্রফির গায়ে হাত বুলিয়ে বলে.. আমার সকল সফলতার প্রধান কারণ হচ্ছে আমার এই ভাঙা চশমাটা…….

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত