অসম বয়সে বিয়ে

অসম বয়সে বিয়ে
আমার মায়ের নানীর সাত বিয়ে হয়েছে। হুম, ঠিকই বলেছি সাত বিয়ে! তিনি ৯৯ বছর বয়সে ২০০২ সালে মৃত্যুবরণ করেন। একজন মানুষ কতটা সুন্দর, কতটা গোছানে, কতটা পরহেজগার হয়। বড় মাকে না দেখলে কখনো কল্পনাও করতে পারতাম না। এত সুন্দর করে কুশি কাটা দিয়ে সুয়েটার বুনতেন! কী বলব! আমার একটা ছিল বড় মার বানানো কুশি কাটার সুয়েটার। কী ভাবে যেন হারিয়ে ফেলেছি! তিনি সারারাত জেগে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তেন তজবি পড়তেন। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কত হাজার দোয়া আছে। আয়না দেখা থেকে শুরু করে পায়খানায় যাওয়া পর্যন্ত। বড় মা অক্ষরে অক্ষরে সবগুলো পালন করতেন।
জীবনে মনে হয় স্বজ্ঞানে কোনো পাপ করেননি। ধবধবে ফর্সা ছিল গায়ের রং। দুধে আলতার মতো। কোমড় ভেদ করে একগোছা কাঁচাপাকা চুল ছিল। আমি কল্পনা করতে পারতাম না, যুবতী বয়সে এই নারী কত সুন্দরি ছিলেন। আমি ৮০/৯০বছর বয়সের এক মহিলার রূপের বর্ণনা দিচ্ছি। অথচ এই সুন্দরি মহিলা ১০০ বছর বয়সে ৭ পুরুষের সাথে সংসার করলেও গড়ে ১০ বছর স্বামীকে নিয়ে সংসার করতে পারননি। তাকে ৭ বছর বয়সে বিয়ে দেয়া হয় ৫০ বছর বয়সী তিন সন্তানের জনক এক বিপত্নীক পুরুষের কাছে। ৭ বছর বয়সী শিশুটা বিয়ের দুই বছর পর নারী হয়ে উঠেন। বিয়ের তিন বছর পর, তাঁর ১০ বছর বয়সে তিনি ৫৩ বছর বয়সী পুরুষের সন্তানের মা হন। বছর না ঘুরতেই তিনি দ্বিতীয় সন্তানের মা হন। ১২ বছর বয়সে দুই কন্যাশিশুর মা। এবার পনেরো বছর বয়সে বিধবা। রাতের অন্ধকারে কিশোরী বউয়ের উপর স্বামীত্ব ফলানো লোকটাকে ভালোবাসার অাগেই তিনি বিধবা হয়ে গেলেন।
একজন দুই কন্যাশিশুর কিশোরী মা শ্বশুর বাড়িতে কী পরিমান যৌন হেনস্থার শিকার হতে পারেন যার জলন্ত প্রমান ছিলেন তিনি। বাধ্য হয়ে কন্যাশিশুদের শ্বশুর বাড়িতে রেখে তিনি যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত ৯০ বছর বয়সী আরেক বৃদ্ধার দেখাশোনার দায়িত্ব নেন বিয়ে নামক সার্টিফিকেট গলায় ঝুলিয়ে। বছর না ঘুরতেই তিনি আবার বিধবা হন। এভাবে একে একে তিনি ৭ পুরুষের হাত বদল হয়েছেন। বিয়ের আগে একটাই শর্ত থাকে তিনি সন্তানের মা হতে পারবেন না। অসুুস্থ বৃদ্ধ লোকদের স্ত্রী হয়ে তিনি কেবল সেবাই করেছেন। শেষ বয়সে ছোট মেয়ের স্বামীর বাড়িতে তাঁর ঠাঁই হয়। জীবনে তাঁর একান্ত নিজের বলতে কিছু ছিল না। তিনি ভাসমান যাযাবরের মতো একবার এই ঘাটে আবার ঐ ঘাটে, কেবল ভেসে বেড়িয়েছেন। এটা অবশ্য ১৯৩০/ ৪০ সালের চিত্র। আজ সকালে আম্মাকে কল দিয়েছিলাম। কুশলাদি জানার পর রান্নার অায়োজন জানতে চাইলাম। আম্মার ঝটপট উত্তর। আজ রান্না করবেন না। আজ পাশের বাড়ির চাচাতো বোনের বিয়ে দুপুরে- রাতে ওখানে খাবেন। অবাক করা কান্ড হলো মেয়েটার বয়স মাত্র পনেরো বছর।
২০০৫ সালে জন্ম। অথচ যার সাথে তার বিয়ে হয় সে একজন মাদ্রাসার শিক্ষক। বয়স খুব কম করে হলেও তেত্রিশ। চিন্তা করা যায় এই কিশোরী মেয়েটা যেদিন যুবতি হবেন তখন তার থেকে ১৮ বছর বড় লোকটা হবেন বৃদ্ধ। আমি নিশ্চিত দিয়ে বলতে পারি বছর না ঘুরতেই আম্মার কাছেই শুনতে পাব। তানহা সন্তানের মা হয়েছে। চিন্তা করা যায় কী নির্মমতা! কী নিষ্ঠুরতা! এদের ঘর হবে, সংসার হবে, সন্তান হবে অথচ কোনো দিন মনের মিল হবে না। এরা দুজনে সুখী হওয়ার ভান করে নিভৃত্তে চোখের জল ফেলবে। আমি ২০০১য়ের ব্যাচ, আমার বর১৯৯৪। মাত্র সাত বছরের পার্থক্য। তারপরও যখন মুভি দেখতে বসি, আমার বরের পছন্দ মাধরী দিক্ষিত আবার পছন্দ রানী মুখার্জী। অল্প হলেও একটা জেনারেশান গ্যাপ। আমি কখনো তার সাথে গল্প করে আড্ডা দিয়ে আনন্দ পাই না। ঐ যে সাত বছরের জেনারেশান গ্যাপটা কোনোভাবেই ফিল -আপ করতে পারি না। তাও আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।
সপ্তম শেনিতে বিয়ে হওয়া এক সহপাঠী মাঝেমাঝে ফোন করে নাকি সুরে কান্নাকরে। বাচ্চারা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। বর ডায়াবেটিস,প্রেসার, সাথে যৌন ইচ্ছে হারিয়ে নিজের মতো আছেন। সে এই বয়সে একাকীত্বের বোঝা অার বহন করতে পারছে না। বাচ্চারা বড় হয়েছে বন্ধু-বান্ধব আছে। তাদেরকে নিয়েই তাদের জগৎ। রোগব্যাধি, ঔষধপথ্য নিয়ে বরের একটা জগৎ। মাঝখানে সে একাকীত্বের দহনে পুড়ে আঙ্গার। অথচ তার বয়সী কত মেয়ের এখনো বিয়েও হয়নি। আমি জানি যত দিন বাঁচবে নিভৃতে চোখের জল ফেলবে। না হয় মাঝেমাঝে নাকি সুরে কান্না করবে। একদিন বরকে বললাম নীগারের মা ভাবীর অবস্হা খুব আশংকাজনক। মনে হয় বাঁচবেন না।
তিনি তাচ্ছল্যর হাসি হেসে ” কী বলছ এসব! পুরুষ জীবিত অবস্থায় কোনো নারী মরতে শুনেছ? নারীরা হচ্ছে ‘কই মাছের প্রাণ’। ” তার এমন নিন্ম মনমানসিকতা দেখে আমি তো রীতিমত তাজ্জব। আর কোনো কথা বলার প্রবৃদ্ধিই ছিল না। এবার সে আমাকে দুইচার বাড়ির মিনিমাম ত্রিশটা উদাহরন দেখেয়েছেন। যারা বিধবা হয়েছেন যথাক্রমে ত্রিশ বছর, চল্লিশ বছর, কেউ বা পঞ্চাশ বছর হবে। এখনো সুস্থ ভাবে বেঁচে আছেন। তার ধরনা ছেলেরাই অল্প বয়সে মারা যায়। অথচ এসব নারীরা যে অল্প বয়সে বিয়ে নামক সম্পর্কে বলিদান হয়েছে সেটা বুঝে না। এই নির্মম প্রহসন কেন মেয়েদের সাথে? আমার মেয়ের ছয় বছর পূর্ণ হবে আগামীকাল আলহামদুলিল্লাহ। আমি কোনো সাত-পাঁচ না ভেবে একটা ইচ্ছে পোষণ করে রেখেছি মেয়েকে আঠারো বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে দিব।
হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছি। না! আমার মেয়ের সব অানন্দের বলিদান আমি হতে পারি না। সে ঘাস ফড়িং হয়ে উঠে বেড়াবে নিজের মতো করে। বিয়ে নামক শিকল আমি তার পায়ে পরাব না। মেয়েদের দীর্ঘশ্বাসেরও দাম আছে। আমার প্রায় দশবছরের বিবাহিত জীবনে কোনো আনন্দ নেই। আমি খাই -দাই, ঘুমাই আর মোবাইল টিপি। আমি কখনো আমার বরের সাথে একসাথে উঠানে নেমেও দাঁড়াইনি, কখনো শপিং করিনি, কখনো রেস্টুরেন্টে খাইনি, কখনো রিক্সায় ঘুরিনি। এই যে নিরানন্দ ফানসে একটা জীবন। তারপরও বেঁচে আছি। কারণ বিয়ের পূর্বের জীবন ছিল আমার স্বাধীন ও আনন্দময় জীবন। সেসব সময়ের স্মৃতি রোমান্থন করেই আমার জীবিত লাশের দিন মন্দ কাটে না।
অথচ আমার ২৬ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছে। আমি পোস্টগ্রাজুয়েট একটা মেয়ে। আমার যদি এমন করুণ পরিনতি হয়। একজন পর পরুষ কখনো আপনার মেয়ের জীবনের আনন্দের উৎস হবে না। আপনার মেয়ের আনন্দপর্ণ জীবনের পরিবেশ আপনাকেই তৈরি করে দিতে হবে। অল্প বয়সে অসম বয়সের পুরুষের কাছে অর্থ, শিক্ষা, চাকরি আর সৌন্দর্য দেখে বিয়ে দিয়ে। সারাজীবন তাঁর দীর্ঘশ্বাসের কারণ হবেন না।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত