বাঁধ

বাঁধ
আবার ট্রান্সফার.!!ধুৎ,সরকারি চাকরীর এই একটাই সমস্যা।আবার জিনিসপত্র সব টানাটানি।একটা বাড়তি ঝামেলা। “দাদার কাছে মানুষ হয়েছি।বাবা-মার বিবাহবিচ্ছেদে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয়েছে আমার।কখনো বাবা-মার আদর আমার কপালে জোটেনি।তাই,ছোটবেলা থেকেই বিয়ের প্রতি আমার একটা বিষাদময় অনুভূতি জন্মেছে।কিন্তু,দাদার শেষ ইচ্ছা পূরণের জন্য আমাকে বিয়ে করতেই হলো।
বিয়ের ৩ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও নীলাদ্রির প্রতি আমার সামান্য মায়াও হয়নি।দুজন আলাদা রুমে শুই।মাঝে মাঝে গভীর রাতে ওর রুম থেকে ক্ষীণ কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে।তারপরও একবারের জন্যও ইচ্ছা হয়নি যে ওকে গিয়ে একটু থামাই।হাতটা ধরে একটু আচ্ছ্বাস দেই যে,আমি আছিতো।কিন্তু,পারিনি।আমার বিষাদময় স্মৃতিগুলি আমাকে পারতে দেয়নি।তবুও,নীলাদ্রি আমার সাথে একটুও খারাপ ব্যবহার করেনি।মুখ ফুটেও বলেনি যে,তার কষ্ট হচ্ছে।রান্নায় লবণ কম হলে যেমন বকতাম,তেমনি বাসায় ফিরলে দরজা খুলতে একটু দেরি হলেও তাকে ছাড় দিতাম না।” এসব ভাবতে ভাবতেই ভ্যানওয়ালা এসে হাজির।জিনিসপত্র যা আছে তা নিয়ে নতুন বাসায় উঠে সব ঠিকঠাক করতে প্রায় ৩/৪ দিন লেগে গিয়েছে।আজকে নতুন অফিসে যাচ্ছি।মনে মনে দোয়া করছি যাতে বের হওয়ার আগে রাগারাগি না করতে হয় নীলাদ্রির সাথে।
রাগারাগি করতে হয়নি, কারণ ও যেভাবে সেজেছে,কী যে বলবো!আমি কয়েক মূহুর্তের জন্য মোহে পড়ে গিয়েছিলাম।নীল রঙের শাড়িতে কি অপরুপ লাগছে ওকে।চুলগুলি খোলা,চোখে কাজল।আমি নিজেকে সামলে নিলাম।এই ব্যাপারটা দেখে নীলাদ্রি বোধহয় একটু খুশি হলো,তাই সামান্য হাসল।কে না খুশি হয়,তার কাছের মানুষটাকে এভাবে অবাক হতে দেখলে।নীলাদ্রির হাসিটারও মোহে পড়ে গেলাম।কত সুন্দর এই হাসি।গত ৩ মাসে ওকে একটুও হাসতে দেখিনি।আর দেখবই বা কিভাবে?ওর তৃপ্তির হাসিটা দেখার জন্য কী এমন করেছি।যাক,এইসব ভাবা বন্ধ করি।অফিসে লেট হলে তো প্রথম দিনেই নাক কাটা যাবে। ইসস,ভাজিতে লবণই হয়নি।মেজাজটা আবার তিরিক্ষি হয়ে উঠলো।কিন্তু,কেন জানি ধমক দিতে ইচ্ছা করছে না।শুধু বের হওয়ার আগে আস্তে বললাম,
-ভাজিতে লবণ হয়নি।
নীলাদ্রি হা করে তাকিয়ে রইলো।ও ভাবছে অন্যদিন হলে তো আমি তোলপাড় শুরু করে দিতাম।কিন্তু,আজকে কি হলো। যাক অফিসে সময়মতই আসতে পেরেছি।তাই আর কোনো কথা শুনতে হয়নি।প্রথম ৩/৪ দিনেই পরিচিত হলাম মোটামুটি সবার সাথে।কিন্তু,একজন বাদে প্রায় সবার সাথে পরিচিত হলাম।আমার এক পোস্ট সিনিয়র ওই ব্যক্তি।অফিসে টাইম মতো আসে।আবার অফিস শেষ হওয়ার ৫/১০ মিনিটের পরেই আর উনাকে পাওয়া যায় না অনেকের কাছে শুনতে পেলাম,এই ভদ্রলোক নাকি বউভক্ত।যাকে সাধারণ ভাষায় বউপাগলাও বলা হয়।তো একদিন এই মিয়া সাহেবকে হাতেনাতে পেয়েছি।আমি জিজ্ঞাসা করলাম,
-কেমন আছেন?
-আলহামদুলিল্লাহ,আপ-আলহামদুলিল্লাহ,আপনি?
-জ্বী,আমিও।আচ্ছা,কিছু মনে করবেন না একটা কথা বলি?
-হ্যাঁ,অবশ্যই।
-সবাই আপনাকে এমন নাম দেওয়ার কারণ কি?
-“কারণ,আমি আমার বউকে একটু বেশিই ভালোবাসি।
আচ্ছা,দেখুন আমি সারাদিন অফিস করি।সে বাসায় একা থাকে।তার কি একটু ইচ্ছা হয়না আমার সাথে সময় কাটানোর?হয়,অবশ্যই।আসলে মেয়েদেরকে খুশি করতে অনেক বড় কিছু দরকার হয়না।সামান্য ছোট ছোট উপহার দিয়েই তাদেরকে খুশি করা সম্ভব।তাই,প্রতিদিন অফিস শেষে আমি কলিগদের সাথে সময় না কাটিয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরি।কারণ,একটা মানুষ আমার জন্য বসে থাকে।যে মানুষটা হয়ত ক্ষিদে লাগলেও আমার অপেক্ষায় থাকে।তাই,বাসায় ফিরার সময় আমি মাঝে মাঝে ফুল বা অন্য ছোটখাটো কিছু নিয়ে যাই।যেমন,পায়েল,কাজল বা চুড়ি।যেই হাসিটা দেখতে পাই,তা দেখে সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয় আমার।তাই হয়ত লোকে আমাকে এই নামে ডাকে।” উনার কথা শুনে আমি কয়েকমিনিট স্তব্ধ হয়ে রইলাম। উনি আবার বললেন,
-ভাই দেরি হচ্ছে আমার চললাম।
-জ্বী,অবশ্যই।আচ্ছা,ভাই আমরা বন্ধু হতে পারি?
-কেন নয়?আমার নাম তাসিব।কাল আবার কথা হবে।আল্লাহ হাফেজ।
আমি রিক্সায় বসে ভাবছি, আমি কেন আমার বাবা-মার কারণে নীলাদ্রিকে শাস্তি দিচ্ছি?ও তো কোনো দোষ করেনি।বিয়ে তো টিকিয়েও রাখা যায়।হঠাৎ,রিক্সাওয়ালা মামা ডাক দিলেন,
-ভাইসাব,বাসা আইসা পড়ছে।
আমার ঘোর কাটলো।নেমে ভাড়া দিলাম।দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি কিন্তু,কলিংবেল চাপছি না।এভাবে ৫ মিনিট দাঁড়িয়ে রইলাম।এমন সময়ই ফোনের স্ক্রিনে নীলাদ্রির কল।আমি কেটে দিলাম।ওর নামটা কেটে ওয়াইফ নামে সেভ করলাম।কিছুক্ষণ পর কলিংবেল দিলাম।কেন জানি নিজেকে অনুভুতিহীন মনে হচ্ছে।দরজাটা খুলেই নীলাদ্রি হয়ত কিছু জিজ্ঞাসা করতো,কিন্তু,ভয়ে করেনি।আমি ভিতরে ঢুকে ফ্রেশ হলাম।ডাইনিং এ গিয়ে দেখলাম নীলাদ্রি খাবার বাড়ছে।কখনো ওকে জিজ্ঞাসা করা হয়নি ও খেয়েছে কিনা।আমার খাবার বেড়ে সামনে বসে থাকত।শুধু আমার মুখ থেকে একবার শুনার জন্য যে,রান্নাটা ভালো হয়েছে।কিন্তু,যা শুনতো তা ছিলো শুধুই অপমান।তারপরেও শুধু আমার মুখটা দেখার জন্য হয়তো বসে থাকতো।আজকে নিরবতা ভেঙ্গে দিয়ে বললাম,
-তুমি খেয়েছো?
-না,(মাথা নিচু করে)
-বসো তাহলে এখন। ও হা করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।হয়তো বিশ্বাস করতে চাইছে না।আমি আরেকবার বললাম,
-বসো,
-জ্বী,বসছি। খাওয়ার সময় আমি লক্ষ্য করলাম যে,ও কেমন জানি একটু অসস্তিবোধ করছে।আমি বললাম,
-খেতে অসুবিধা হচ্ছে?
-না,
-তাহলে খাও।বসে আছো যে?
ও আর কিছু বলল না।খাওয়া শেষ করে আমি আমার রুমে ও ওর রুমে।এই ৩ মাসে এত বড় দেয়াল তৈরি হয়েছে আমাদের মাঝে।আমি দেয়াল টপকে যাইনি ওপাশে কিংবা নীলাদ্রি আসেনি।নাহ!কিন্তু,আজ আর না।আজ আমি দেয়াল ভেঙ্গে ওপাশে যাবই।আমি গেলাম,দরজাটা হালকা ফাঁক করে দেখলাম নীলাদ্রি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।আওয়াজ না করে আস্তে আস্তে কাছে গেলাম।কাছে যাওয়ার পর দেখলাম নীলাদ্রি কাঁদছে।নিঃশব্দ কান্নায় মগ্ন সে।আমি আলতো করে ওর কাঁধে হাতটা রাখলাম।থতমত খেয়ে উঠলো বেচারি।আমাকে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে গেল।চোখের পানি মুছে বলতে লাগলো,
-বাবা-মার কথা অনেক মনে পড়ছে।
-মিথ্যা বলবে না।
ও আর কিছু বলে সুবিধা করতে পারলো না।আমি আরেকটু কাছে গেলাম।এতটা কাছে আগে কখনও আসা হয়নি।আমি বললাম,
-আমাকে একবার সুযোগ দিবে নীলা?সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো ভালো একজন স্বামী হওয়ার জন্য।যতগুলো দিন তোমার,আমার কারণে কাঁদতে হয়েছে ততগুলো দিন না হয় আমায় শাস্তি দিও।কিন্তু,তারপরেও একবার সুযোগ দাও।
-স..স…সত্যি?
-হ্যাঁ,
-আমাকে আরেকবার ওই নামে ডাকবে,প্লিজ?
-নীলা,মাফ করে দেও আমাকে।
এবার ও যা করলো তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো এত রাতে।কান্নার আওয়াজ যাতে বেশি জোরে না হয় সেজন্য আমি ওকে আমার বুকের সাথে মিশিয়ে নিলাম।ওর ফুঁপানো আরো বাড়তে লাগলো।প্রায় বেশ কিছুক্ষণ এভাবে কাঁদলো।এবার ফুঁপানো কান্না বন্ধ হল।আমি দুহাত দিয়ে নীলাদ্রির মুখটাকে তুলে ওর গাল বেয়ে পড়া পানিগুলা মুছায় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।এমন সময় হঠাৎ নীলাদ্রি মুখটা সামনে বাড়িয়ে আমার ঠোঁটজোড়াকে আপন করে নিলো।অদ্ভুত এক অনুভতির শিহরণ বয়ে গেল আমার সমগ্র শরীরে।এতদিন পর আজ আমাদের সব দুরত্ব,ঘৃণা,কষ্টগুলো ভালোবাসায় পূর্ণ হলো।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত