বেঁচে থাকার আনন্দ

বেঁচে থাকার আনন্দ
যখন জ্ঞান ফিরলো তাকিয়ে দেখি, তাহিরা আমার উপর ঝুকে রয়েছে । ওর কপালের কিছুটা কেটে গিয়েছে । তবে সেখান থেকে রক্ত পড়ছে না । বড় বড় চোখ নিয়ে সে আমার দিকে তাকিয়ে আমার দিকে । বোঝার চেষ্টা করছে আমার কিছু হয়েছে কি না । আমি চোখে খানিকটা ঝাপসা দেখছি । মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে । কেন এমন করছে !
আমি তাহিরার দিক থেকে চোখ সরিয়ে এদিক ওদিক তাকালাম । মাটির উপর আমি শুয়ে আছি । মাটির উপরে শুয়ে কেন আছি এমন প্রশ্ন মনে আসলো । আর সাথে সাথেই আমার কিছু একটা মনে পড়লো । আমাদের গাড়ি দুর্ঘটনাতে পড়েছিল । তাহিরা গাড়িটা চালাচ্ছিলো । হঠাৎ করেই সব কিছু ঘটে গেল । দুর্ঘটনা এমন হঠাৎ করেই ঘরে আমার গাড়ি সাধারনত আমি নিজেই চালাই । তবে তাহিরার গাড়ি চালানোর বেশ শখ । সময় সুযোগ পেলে সে সেটা করতে ছাড়ে না । গাড়ি ও ভালই চালায় । ওর কেবল একটাই সমস্য । গাড়ির স্টিয়ারিং হাতে পেলে ও মনে করে ও প্লেনের পাইলট হয়ে গেছে । গাড়ি যেন উড়ে চলে তখন ।
আজকেও তাহিরা তেমন করেই গাড়িটা চালাচ্ছিলো । শহর ছেড়ে আমরা বেশ দুরে চলে এসেছিলাম । অন্য গাড়ি একেবারেই চোখ পড়ছিলো না। এক সময়ে একদমই কোন গাড়ি চোখ পড়লো না । কেবল দুই ধারে গাছের সারি । তার মাঝ দিয়ে এগিয়ে গেছে রাস্তা । এমন রাস্তাই তাহিরা সব সময় পছন্দ করে গাড়ি চালানোর জন্য । এক্সস্লেরেটরে চাপ দিতেই থাকলো আর গাড়ির গতি বাড়তে লাগলো হুহু করে । বেশ দক্ষ হাতেই তাহিরা গাড়ি চালাচ্ছিলো । আমার প্রথম প্রথম একটু ভয় করলেও এক সময়ে মনে হল রাস্তা এখন একদম ফাঁকা । কারো সাথে ধাক্কা মেরে দেওয়ার সম্ভবনা কম । আর তাহিরা বেশ ভাল গাড়ি চালায় । সুতরাং সমস্যা নেই ।
কিন্তু কপালে হয়তো অন্য কিছু ছিল । আমি যেই না একটু নিশ্চিন্ত হয়েছি ঠিক তখনই দুর্ঘটনাটা ঘটলো । ফাঁকা রাস্তার সামনেই হঠাৎ করেই একটা গরু জাতীয় প্রাণী এসে হাজির হল । তাহিরা সেটাকে পাশ কাটাতে গিয়েই বাঁধলো বিপত্তি । গাড়িটা রাস্তা ছেড়ে গাছপালার ভেতরে ঢুকে গেল । গাড়ির গতি এতোই ছিল যে তাহিরা কিছুতেই সেটা নিয়ন্ত্রন করতে পারছিলো না । ব্রেক চাপ দিচ্ছিলো কিন্তু যেটা মনে হল ব্রেকটা সম্ভবত কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে । আমি তখনই লক্ষ্য করলাম গাড়িটা নিচের দিকে নামছে । গাছগাছালির ভেতরেই নিচে নামতে ঝড়ের বেগে !
তাহিরার চেষ্টা করেই যাচ্ছে কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে না । কয়েকবার ঝাকি গেল । আমার মাথাটা সামনে ঠুকে গেল তারপরই লক্ষ্য করলাম তাহিরা গাড়ির গেটলক খুলে দিয়েছে । একটা ধাক্কা অনুভব করলাম । তারপরই আমি ছিটকে পড়লাম গাড়ি থেকে । চোখ বন্ধ হওয়ার কিছু সময় আগে কেবল একটা পতনের আওয়াজ পেলাম ! আমি তাহিরার দিকে তাকিয়ে দেখি ও দিব্যি সুস্থ্য রয়েছে । ওকে বললাম, তুমি ঠিক আছো ? কিছু বলল না ও । কেবল মাথা ঝাকালো ! তারপর আমাকে উঠতে সাহায্য করলো । আমি উঠে দাড়াতে গিয়ে অনুভব করলাম যে আমার আসলে তেমন কোন ব্যাথাই অনুভব হচ্ছে না । যেভাবে আমি গাড়ি থেকে পড়েছিলাম মনে হয়েছিলো যেন হাত পা ভেঙ্গে যাবে অথচ কিছুই হয় নি । তাহিরার দিকে তাকিয়ে বলল, কিছুই তো হয় নি দেখছি ।
তাহিরা একটু হাসলো । তারপর বলল, সত্যিই?
-হ্যা । সত্যিই কিছুই হয় নি । একটু কেটে ছিলে গেছে এই যা ।
-যাক ভাল । তবে তোমার গাড়িটা লাইণটা শেষ করলো না ও । মুখে একটা অপরাধীর ভাব ফুটে তুলেছে । আমি বললাম, বাদ দাও । তোমার আর কি দোষ! সামনে ঐ গরুর বাচ্চা গরুটা না চলে আসলে এমন টা কি হত?
-তাহিরা বলল, কিন্তু তবুও । দোষ আমার খানিকটা আছে । এতো জোড়ে গাড়ি ছোটানো উচিৎ হয় নি আমার ।
-যাক এখন আর এসব ভেবে লাভ নেই । গাড়ির ইন্সুরেন্স করা আছে । খুব একটা সমস্যা হবে না আশা করি ।
তাহিরা বলল, গাড়ির অবস্থা দেখতে চাও?
সে চোখের ইশারাতে দেখালো গাড়িটা কোন দিকে আছে । আমি সেদিকে পা বাড়াতে গিয়েও থেমে গেলাম । ভাঙ্গা চুড়া গাড়ির অবস্থা দেখতে মন চাইলো না । তাহিরার দিকে তাকিয়ে বললাম, থাকুক । আর দেখতে চাই না ।
তাহিরা যেন হাসলো । তারপর বলল, চল সামনে যাওয়া যাক । সন্ধ্যা হয়ে আসছে । আমরা কতদুর এসেছি খেয়াল আছে ? আমি আশে পাশে তাকাতে শুরু করলাম । সত্যিই কত দুর এসেছে সেটা চিনতে পারলাম না । জায়গাটা আমাদের অপরিচিত । কতদুর এসেছিলাম আমি নিজেই বলতে পারছি না । আর এখন খানিকটা সন্ধ্যা হয়ে আসছে । অন্ধকার নামছে দ্রুতই ।
আমি আর তাহিরা বেড়াড়ে এসেছিলাম । জায়গাটার নাম ড়ুপালসি । ছিমছাপ ছোট শহর । শহরটা শুরু হওয়ার আগেই শেষ যায় । প্রাকৃতিক পরিবেশ ছাড়া আর আলাদা ভাবে কিছুই দেখার নেই । অবশ্য আমাদের অন্য কিছু চাওয়ার ছিল না । আমরা ছিমছাম ফার্স্ট ক্লাস কটেজ ভাড়া নিলাম । মোট তিন দিন থাকার প্লান । প্রথম দিন বের হয়েছিলো আসে পাশটা ঘুরে দেখার জন্য । ফাঁকা রাস্তা পেয়ে তাহিরা যখন গাড়ির গতি বাড়ালো তখনই বিপত্তিটা বাঁধলো । আমি পকেটে হাত দিলাম । আমার মোবাইলটা পেলাম না । তাহিরার দিকে তাকিয়ে বললাম, মোবাইল? তাহিরা বলল, আমার টা তো গাড়ির ভেতরেই রয়ে গেছে । তোমারটাও সম্ভবত !
-এখন ?
-এখন কিছু করার নেই । চল রাস্তায় গিয়ে দাড়াই । গাড়ি পেলে তাদের কাছে লিফট নেওয়া যাবে । অন্তত একটা ফোন তো পাওয়া যাবে!
আমি তাতে সম্মতি দিলাম ! তাহিরা বলল, চল ঐদিকে যাওয়া যাক ! ঐদিকেই সম্ভবত রাস্তাটা ! আমি এদিক ওদিক তাকাতে লাগলাম । বেশ বড় বড় গাছ পালা । একদমই অপরিচিত মনে হচ্ছে । অবশ্য এটাই স্বাভাবিক । কিন্তু অবাক হলাম এই ভেবে যে গাড়িটা যখন রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলের রাস্তায় নেমে এসেছে তখন তো খুব বেশি দুরে আসে নি । বড় জোড় মিনিট খানেক গাড়িতে ছিলাম আমি । সেই হিসাবে খুব বেশি দুরে তো আমার আসার কথা না । এখান থেকেই তো রাস্তাটা দেখতে পাওয়া কথা । কিন্তু আমার চারিপাশ দেখে মনে হচ্ছে যেন আমি গভীর কোন জঙ্গলের ভেতরে প্রবেশ করেছি । এমন তো হওয়ার কথা না ! তাহিরা বলল, আসো, ঐ দিকে যাই ।
-তুমি নিশ্চিত?
-ঐ দিকেই তো জঙ্গল একটু ফাঁকা মনে হচ্ছে ।
আমি অবশ্য চারিপাশের কোন দিকেই কোন পার্থক্য খুজে পেলাম না ! আমার কাছে সবই একই মনে হতে লাগলো ! তবুও তাহিরার কাছে যেহেতু ফাঁকা মনে হয়েছে সেহেতু ঐদিকেই যাওয়া যাক আপাতত ! সেই পথেই পা বাড়ালাম !
আমি আমাদের গাড়ির চাকার দাগ খুজতে থাকলাম । কিন্তু আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম যে গাড়ির কোন দাগই নেই । এমন তো হওয়ার কথা না । নাকি আলো কমে আসছে বলে আমি দেখতে পাচ্ছি না ব্যাপারটা । ততক্ষনে তাহিরা হাটতে শুরু করেছে । আমি ওর পেছন পেছন হাটতে শুরু করেছি । তখনই আমার মনে হল খুব দুর থেকে কেউ যেন আমার নাম ধরে ডাকছে ! এবং কন্ঠটা আমার তাহিরাই মনে হল ! কিন্তু তাহিরা আমার একদম সামনে । ও যদি আমাকে ডাকতো, তাহলে এই ভাবে শোনাতো না মোটেই !
-তাহিরা ! আমার ডাকে তাহিরা পেছন ফিরে তাকালো । আমি বললাম, তুমি কি আমাকে ডাকলে ?
-কই নাতো !
-না মানে মনে হল কেউ মনে হচ্ছে আমার নাম ধরে ডাকছে !
তাহিরার চেহারাটা কেমন যেন মুহুর্তেই বদলে গেল । এবং সাথে সাথেই সেটা আবার আগের স্থানে ফিরে এল । সে আমার কাছে এসে আমার হাত ধরে বলল, আরে তোমার শকটা এখনও কাটে নি বুঝতে পারছি । এই জন্য এমন উল্টাপাল্টা শুনছো । আসো তো আমার সাথে ! তাহিরা এবার আমাকে খানিকটা জোর করেই যেন সামনের দিকে নিয়ে যাওয়া শুরু করলো । এই ব্যাপারটাও আমার কাছে কেমন যেন অদ্ভুত লাগলো । তাহিরা কিংবা আমি দুজনের কেউ এই এলাকাতে এর আগে এসেছি বলে আমার মনে পড়ে না । অন্তত এই জঙ্গলে যে দুজনের কেউ ই আসে নি সেটা আমি শতভাগ নিশ্চিত । কিন্তু তাহিরা এমন ভাবে সামনে এগুচ্ছে, তাতে দেখে মনে হচ্ছে যে ও যেন এই জঙ্গলটা বেশ ভাল ভাবেই চেনে ! সেই ভাবেই সে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে ।
আমি খানিকটা দ্বিধা দ্বন্দ্ব নিয়ে ওর সাথে সাথে এগিয়ে যাচ্ছি । এবং আমার মনে হচ্ছে যে আমরা যেন আরও গভীর জঙ্গলের ভেতরেই এগিয়ে চলেছি । আমি কয়েকবার কথাটা বলতে গেলাম তাহিরাকে । কিন্তু তাহিরা কথাটা উড়িয়ে দিল । ঠিক তখনই আমি আবারও ডাকটা শুনলাম । কেউ আমার নাম ধরে ডাকছে । তবে বেশ ক্ষীণ কন্ঠে সেটা আমার কানে আসছে । এবং কন্ঠটা তাহিরার সেটা আমার কোন সন্দেহ নেই ।
কী হচ্ছে এসব ? আমি এবার তাহিরাকে কিছু বলতে যাবো তখনই বাড়িটা দেখতে পেলাম । জঙ্গলটা খানিকটা ফাঁকা হয়ে এসেছিলো । সেই ফাঁকেই আমি বাড়িটা দেখতে পেলাম । ততক্ষণে বেশ অন্ধকার নেমে এসেছে । ঐ বাড়িতে আলো জ্বলছে । তাহিরা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, দেখেছো ! বাড়ি । চল চল জলদি চল !
তাহিরা এবার আমার পা ছেড়ে দিয়ে যেন দৌড়েই এগিয়ে গেল সেদিকে । আমি কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলাম । এভাবে কারো বাসায় গিয়ে হাজির হওয়াটা মোটেও ভাল কাজ হবে কি ! অবশ্য বিপদে পড়েছি । এই সময়ে আর কী ই বা করার আছে । আমি বাড়িটার সামনে গিয়ে থেমে গেলাম । কাঠের তৈরি বাড়ি । বাড়িটা চার কোনাই । সামনে একটা বারান্দা । ঘরের ভেতরে কোন আলো জ্বলছে না । তবে বাড়ির ঠিক সামনে একটা লাইট জ্বলছে । আমি কোন ইলেক্ট্রিক লাইণ দেখতে পেলাম না আশে পাশে । এমন কি জেনারেটরের আওয়াজও আসছে না । এই সমস্ত জঙ্গলের বাড়ি গুলো স্বাধারনত জেনারেটর দ্বারাই আলোকিত হয় ।
আরেকটা অস্বাভাবিক ব্যাপার চোখ পড়লো সেটা হচ্ছে বাড়িটা দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে বাড়িটা এখনই ভেঙ্গে পড়বে । খুব বেশি পুরানো মনে হচ্ছে । আলোটা না জ্বললে আমার মনে হতো বাড়িটা অনেক দিন আগেই পরিত্যাক্ত । এছাড়াও বাড়িটার থেকে একটা অশুভ ভাইব আসছে । আমার কেন জানি মনে পুরো বাড়িটা জুড়েই কোন অশুভ কিছুর দিকে ইঙ্গিত করছে । এমনটা মনে হওয়ার পেছনে আসলে কি কারণ থাকতে পারে সেটা আমার জানা নেই । কিন্তু আমার মনে হচ্ছে যে আছে ! বারবার মনে হচ্ছে যেন এই বাড়ির ভেতরে ঢোকা ঠিক হবে না । আমি আর তাহিরা বাড়ির সামনে দাড়িয়ে রয়েছি । ভেতরে ঢুকতে এখনও আমার ইচ্ছে করছে না । আবার চলে যেতেও পারছি না । আমি তাহিরার দিকে তাকিয়ে বললাম, এই বাড়িতে নক করতে ইচ্ছে করছে না ।
-কেন ?
-জানি না । কেবল ভাল লাগছে না ।
-আরে বাবা কী করবা আর !
-তবুও! এই বাড়িতে ঢুকবো না । চল !
-আরে বাবা দাড়াও ! একটু দাড়াও !
তাহিরা এমনিতে বেশ জেদি মেয়ে । তবে আমি কিছু জোর দিয়ে বললে সেটা সে শোনে । আমার সাথে কখনই জেদ দেখায় না সে ! কিন্তু আজকে এমন কেন করছে ! আমি ওকে কিছু বলতে যাবো তখনই বাড়ির দরজা খুলে একজন মাঝ বয়সী লোক বের হয়ে এসেছে । পরনে প্রিস্টদের মত কালো পোশাক । তবে গলাতে প্রিস্টদের মত সাদা কলার পরে নি । লোকটা বলল, আপনারা কারা ? এই সময়ে এখানে ? আমার কিছু বলার আগেই তাহিরা বলল, আসলে আমরা একটু বিপদে পরেছি !
লোকটা আমার দিকে বলল, তা তো বুঝতেই পারছি । বিপদে না পড়লে আসলে কেউ এই দিকে আসে না ।
এই বলে লোকটা কেমন শব্দ করে হাসলো । এমন একটা কথা যেন খুব হাসির কিছু বলেছে সে । দেখলাম তাহিরাও সেই হাসিতে যোগ দিয়েছে । কিন্তু আমি মোটেও হাসির কিছু পেলাম না । তবে মুখে একটু জোর করে হাসি নিয়ে এলাম । তারপর বললাম, আসলে আমাদের গাড়িটা লোকটা বলল, এই রাস্তায় এতো জোরে গাড়ি চালাতে নেই । জঙ্গলের ধারে ফাঁকা রাস্তায় প্রায় কোন না কোন জন্তু চলে আসে । গাড়ির সামনে পড়ে যায় । তখনই দুর্ঘটনা ঘটে !
আমার মনে এবার একটু খটকা লাগলো । কারণ আমাদের গাড়ি কিভাবে দুর্ঘটনাতে পড়েছে সেটা এই লোকের কোন ভাবেই জানার কথা না । এই লোকটা কিভাবে এই কথা জানলো । আমার কেন জানি আমার মবের ভেতরের কুডাক টা আবারও ডেকে উঠলো । লোকটা বলল, আপনারা ভেতরে এসে বসুন ! তাহিরা কিছু বলতে যাবে তার আগেই আমি বললাম, আসলে আমরা বাসায় যাবো । রাস্তাটা কোন দিকে যদি বলে দিতেন তাহলে খুবই উপকার হত ! কিংবা আপনার কাছে কি ফোন আছে ? আমাদের ফোন গুলো গাড়িতে ! লোকটা বলল, এই রাতের বেলা যাবেন ? এর থেকে রাত টা এখানে থেকে যান ! সকালে যাবেন ! তাহিরা এবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল, হ্যা । আমিও তাই বলছিলাম । উনি যখন বলছেন । রাতটা এখানেই থাকি । সকালে যাওয়া যাবে !
আমি এবার তাহিরার দিকে ভাল করে তাকালাম ! ব্যাপারটা আমার কাছে একটু অবাক লাগলো । কারণ তাহিরার একটা দিক আমি খুব ভাল করেই জানি সেটা হচ্ছে থাকার ব্যাপারে সে অনেক খুঁতখুঁতে । যে কোন স্থানেই সে থাকতে পারে না । বেড়াতে গেলেও নিজে আগে সেই কটেজ কিংবা হোটেল রুম নিজে চেক করবে । বিশেষ করে ওয়াশ রুম যদি তার পছন্দ না হয় তাহলে সেখানে মোটেই থাকবে না । আর এই তাহিরা একদম কিছু না দেখেই বলছে এখানে রাত কাটাতে ! আমি সরু চোখে তাকালাম তাহিরার দিকে । তখনই আমার পার্থক্যটা ধরা পরলো ।
তাহিরার চোখ !
তাহিরার চোখ ঘন কালো । এই এই তাহিরার চোখ তো অনেকটা বিড়াল চোখী । আমার চোখ বাড়ির সামনে দাড়ালো ঐ লোকটার দিকে গেল । এবং আমি আরও অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যে ঐ লোকটার চোখ আর তাহিরার চোখের ভেতরে আশ্চর্য রকমের মিল ! আমার মনে হল এই বাড়ি থেকে আমাকে এখন দুরে যেতে হবে না । যে কোন ভাবেই এদের থেকে দুরে যেতে হবে । এই বাড়ির ভেতরে ঢোকা যাবে না কোন ভাবেই । কয়েকটা মুহুর্ত কেউ কোন কথা বললাম না । কেবল একে অন্যের দিকে তাকিয়ে রইলাম । আমি মনে মনে ভাবছি কোন দিকে আমি দৌড় দিব । ঠিক তখনই আমার নাম ধরে কেউ ডাক দিল । এবার অনেকটা কাছে । এবং কন্ঠটা তাহিরার এই ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নেই । আমি এক পা পিছনে নিলাম । সাথে সাথেই লোকটা তাহিরাকে উদ্দেশ্য চিৎকারে বলে উঠলো, ওকে ধর । ও যেন পালিয়ে যেতে পারে না ! দেহের সাথে এখনও ওর বন্ডটা মজবুত হয়ে আছে !
আমার চোখের পলকে তাহিরা আমার কাছে চলে এল । আমার এক হাত ধরলো । তাহিরার ধরার ধরন দেখেই আমার মনে হল যে কি পরিমান শক্তি দিয়ে যে আমার হাত ধরেছে । এতো শক্তি তাহিরার শরীরে থাকার কথা না । দেখতে দেখতে লোকটাও আমার অন্য হাত ধরে ফেলল । আমি নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলাম কেবল । কিন্তু বুঝতে পারলাম কোন লাভ নেই । এদের দুজনের কাছ থেকে আমি নিজে কোন দিন মুক্তি পাবো না ! তবুও আমি নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলাম । তাহিরা বলল, অপু তুমি জোর করো না । পারবে না । কেবল ঐ ঘরে ঢুকলেই হবে ! আর কিছু না । ঐ ঘরে ঢোকার পরেই শান্তি !
-মানে কি বলছো তুমি!
-বিলিভ মি ! এই জগতে কিছু নেই । ঐ ঘর তোমাকে মুক্তি দিবে !
এই বলে দুজনে আমাকে অনেকটা টেনে হিড়চেই নিয়ে যেতে লাগলো বাড়িটার দিকে । আমি আরও ভীতু চোখে বাড়িটার দিকে তাকালাম । আমার কাছে মনে হল এই বাড়িটা আমাকে এখনই গিলে খাবে । আমি নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করতে লাগলাম কিন্তু খুব একটা কাজ হল না । আস্তে আস্তে ওরা আমাকে বাড়ির দিকে নিয়ে যেতে লাগলো ।
বাড়ির সিড়ির কাছে যেতেই হঠাৎ ওরা দুজন থেমে গেল । আমি অনুভব করলাম যে ওরা আমাকে সামনে নিয়ে যেতে পারছে না । আটকে গেছে । আমি নিজেও অনুভব করতে পারলাম ব্যাপারটা ! আমাকে কেউ যেন টানছে পেছন থেকে ! লোকটা তাহিরার দিকে তাকিয়ে বলল, শক্তি লাগাও । ওর দেহ ওকে টানছে ! আমার দেহ ! আমাকে টানছে ! মানে কি ! এরা কি বলছে ? তখনও টান অনুভূত করলাম আমি । দেখলাম আমার সাথে সাথে ওরা দুজনও চলে আসছে । শেষ শক্তি দিয়ে আমার হাত ধরে রাখার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না । আমার আস্তে আস্তে বাড়ি থেকে দুরে সরে যেতে লাগলাম ! একটা সময় দুজনই আমার হাত ছেড়ে দিল । তাররপই আমি হেচকা টান অনুভব করলাম ! বন জঙ্গল অন্ধকার পার হয়ে আমাকে কেউ টানছে ।
এতো শক্তি সেই টানে যে আমি নিজের চোখ মেলে রাখতে পারলাম না । জ্ঞান হারালাম ! দ্বিতীয় বার যখন চোখ খুললাম তখন তাকিয়ে দেখি তাহিরা আমার উপর ঝুঁকে আছে । ওর মুখ কপালের অনেক টা অংশ কেটে গেছে । তাজা রক্তের ছড়াছড়ি ! ঘন কালো চোখ দিয়ে পানি পরছে । ওর চোখের দিকে তাকাতেই বুঝতে পারলাম যে এই তাহিরা আমার তাহিরা ! আমার চোখ মেলে তাকাতেই তাহিরা কান্না সুরে বলল, থ্যাঙ্ক গড ! আই থট আই লস্ট ইউ ! আমি কিছু সময় কিছু বুঝতে পারলাম না । আমি আবার এখানে কিভাবে কিভাবে এলাম সেটাও মাথায় এল না ! একটু উঠতে গেলাম । কিন্তু তীব্র একটা ব্যাথা অনুভব করলাম । তাহিরা বলল, উঠো না ! সম্ভবত ঘারের হাড় ভেঙ্গেছে । একটা হাতও ভেঙ্গেছে ! এভাবে শুয়ে থাকো । আমি ফোন দিয়েছি । এম্বুলেন্স আসছে । ও মাই গড ! আমি ভেবেছিলাম তুমি ….
-আমি কি?
-বেশ কিছুটা সময় তুমি নিঃশ্বাস নিচ্ছিলে না ! আমি ভাবলাম …..
বলতে বলতে তাহিরা আবার কেঁদে ফেলল ! তার একটু পরেই আমি এম্বুলেন্সের আওয়াজ শুনতে পেলাম !
পরিশিষ্টআমার পুরোপুরি ঠিক হয়ে প্রায় মাস দুয়েক লেগেছিল । এ সময়টা আম পুরোপুরি খাটে শুয়ে ছিলাম । তাহিরার বেশ কেটে কুটে গেলেও বড় রকমের ক্ষতি হয় নি । সে সপ্তাহখানের ভেতরেই ঠিক হয়ে গেল । যদিও পুরো দুইমাস সে আমার দেখা শুনা করেই কাটিয়ে দিল ! আমি এই দুইমাস কেবল ঐ বাড়িটার কথা ভেবেই কারিয়ে দিলাম । কি ছিল ঐ বাড়িটা !
আমার সাথে ঐ ঘটনা ঘটার মানে কি ! অনেক ভেবে কেবল একটা ব্যাখ্যাই আমি দাড় করিয়েছি মনে মনে ! তাহিরা বলেছিলো যে আমি কিছু সময়ের জন্য নিঃশ্বাস নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম । তখন সম্ভবত কিছু সময়ের জন্য আমার আত্মা আমার দেহ থেকে বের হয়ে গিয়েছিলো । সেটাটে সংগ্রহ করতে এসেছিলো তাহিরার রূপ ধরে । আর ঐ ঘরটা ছিল আমার গন্তব্য । আত্মারা সম্ভবত ঐখানেই যায় । একবার ঐ ঘরে প্রবেশ করলে আমি আর আমার নিজের দেহের কাছে পৌছাতে পারতাম না ।
তাই ঐ দুজন আমাকে ঐ ঘরে ঢোকাতে ব্যস্ত ছিল । আর আমার দেহ থেকে তখনও আত্মার পুরোপুরি মুক্তি হয় নি বলেই হয়তো তাহিরার যখন আমার দেহের কাছে আমার নাম ধরে ডাকছিলো তখন আমি সেটা শুনতে পাচ্ছিলাম ! এই ব্যাখ্যার কোন ভিত্তি নেই । এটা আমি ভাল করেই জানি নি। কিন্তু আমার কাছে এর থেকে ভাল ব্যাখ্যা নেই । আর আমার ব্যাখ্যার দরকারও নেই খুব একটা । আমি আর তাহিরা বেঁচে আছি এটাই সব থেকে বড় কথা । বেঁচে থাকার আনন্দই সব থেকে বড় আনন্দ !

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত